মানুষের মন কয়টা তিতির? একটা? দুটো? তিনটে? নাকি অনেক গুলো?
আমি জানিনা৷ তোমার চা খাওয়া হয়েছে বড় আপা? আমি পড়তে বসবো।
আজ যে তোর বড় পড়তে বসার তাড়া দেখছি.! নাকি বাকি সবার মতোন তুইও আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছিস..!
এড়িয়ে যাইনি৷ মা বলেছে তোমাকে চা দিয়ে পড়তে বসতে৷ বেশি কথা না বলতে।
ও বাড়ি থেকে কেউ ফোন করেছিলো?
না।
করবেও না৷ আচ্ছা তিতির?
বলো।
তোর কি মনে হয় আমি বিকারগস্ত? আমার কোনো সমস্যা আছে?
না৷ কিন্তু তুমি অতো ভালো বিয়েটা ভেঙে দিলে কেন বুঝতে পারছি না। ছেলেকে তোমার পছন্দ হয়নি?
হয়েছে।
তাহলে?
ওই যে বললাম, মানুষের মন। বড় হ তারপর বুঝবি।
আচ্ছা৷ দাও তোমার চায়ের কাপ দাও।
ধর। আর শোন, যাবার আগে দরজাটা ভেজিয়ে দিতে যাস। আমি একটু ঘুমুবো।
আচ্ছা।
তিতির ঘর ছাড়তেই পাশ বালিশটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে চোখ বন্ধ করলো মীরা। ছোটোবেলায় চোখ বন্ধ করলে অন্ধকার দেখতো৷ নিকষ কালো৷ কোনো বাড়তি হুজ্জত নেই৷ অথচ এখন? চাইলেও সেই পুরনো শান্ত অন্ধকার আর খুঁজে পায় না কোথাও৷ চোখ বুজলেই শত শত জোনাকি পোকা যেন তার মস্তিষ্কময় কিলবিল করে.! উফফফ কি যন্ত্রণা.!
মহিনদের বাড়ির টেলিফোন নম্বরটা নিলে ভালো করো৷ বাবা মায়ের তো মুখ নষ্ট হলোই৷ ও নিজে অন্তত একবার ক্ষমা চেয়ে নিতে পারতো মহিনের কাছে৷ যদিও খুব বেশি দুঃখের কিছু নেই৷ মহিনের একদিন আলো ঝলমলে একটা সংসার হবে৷ মীরার জন্য এসব নয়...... যদি তাই হতো তবে, রুদ্র ওকে ফেলে গেলো কেন..? ফিরে আসব বলেও কেন ফিরলো না? ও কি ঠিকানা ভুলে গেছে.....? নাকি মীরাকেই ভুলে গেছে?
না৷ ভুলে যায়নি৷ এ নিছকই মীরার ভ্রম। গতপরশু রুদ্রর ঠিকানা হয়ে একটি পোস্টকার্ড মীরার বাড়ি এসেছে৷ স্পষ্ট অক্ষরে তিনটা বাক্য লেখা, "আমি নিজেকে গুছিয়ে নিলাম মীরা।
তুমি ভালো থেকো। বিদায়।"
ইতি,
রুদ্র
এর আগে যতবার রুদ্র ওকে চিঠি লিখেছে, সবশেষে লিখেছে ইতি তোমার রুদ্র৷ অথচ এবারটা... ও হয়তো সত্যিই নিজেকে নিজের মতোন গুছিয়ে নিয়েছে৷
মীরাও ঠিক করলো ও নিজেকে গুছিয়ে নেবে৷ জানলায় কিছুক্ষণ মাথা ঠেকিয়ে রুদ্রর পোস্টকার্ড ডায়েরির ভাঁজে রেখে দিয়ে টেলিফোনটা করেছিল বাবাকে৷ শুধু বলেছিল, "বাবা, আমি বিয়েটা করতে চাই ৷" বাবা তখন অফিসে। প্রফুল্ল চিত্তে বাড়ি ফেরার সময় হাত ভর্তি মিষ্টির থলে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন৷ আগামীকাল মানে আজকের হিসেবে গতদিন আসার কথা ছিল মহিনদের সবার৷ মা এবং তিতির ব্যস্ত হয়ে পড়লো ওর শাড়ি গয়নার বাছকোছ করতে... কি যেন ভেবে স্তব্ধ মীরা ধীর পায়ে বাবা মায়ের কাছে এসে বসলো..
"বাবা, ও বাড়িতে একটা ফোন করবে?
কার? মহিনদের?
হ্যাঁ।
কেন?
বলো আমি বিয়েটা করতে পারব না৷
মানে? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস নাকি? গলা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন মা।
জানিনা মা। মন চাইছে না৷
আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ যেমন ধীর পায়ে এসছিল তেমন ধীর পায়ে নিজের ঘরে ফিরে গেল মীরা।
ডায়েরি খুলে বসলো৷ পোস্টকার্ডটা দেখল। তারপর লিখে রাখলো সেই পাতায়,
রুদ্র,
মানুষের মন কয়টা হয় বলো তো? যে মনে গতপরশু বাবাকে বললাম আমি বিয়েতে রাজি, কেন আজ সেই মনে সাজতে বসতে পারলাম না? কেন অন্য কোনো এক মন বলে উঠল " না না না.! এ অসম্ভব.! এ তুমি পারবে না মীরা.!"
তাহলে তুমি কি করে পারছো রুদ্র? আমি কেন পারছি না? কেন আমার সবকটা মন জুড়ে শুধু তুমি বসে আছো যেখানে তোমার একটা মাত্র মন তাতেও আমার জায়গা নেই..... নাকি তোমার অনেক গুলো মনের কোনোটাতেই আমি নেই রুদ্র.....? আমি কি কোত্থাও নেই..? ছিলাম কি আদৌ কখনও..?
লিখতে লিখতে বোধহয় এক ফোঁটা চোখের জল গাড়িয়ে পড়ল পাতায়..
মীরা খেয়াল করলো না। লেখা চালিয়ে গেল। মূল্যহীন যে জল, তা খেয়াল না করাই শ্রেয়।
রুদ্ররা ভালো থাক৷
তারা ভালোই থাকে। জাঁকিয়ে বসে থাকে সকল মীরার মনের মধ্যে মনে...