Article

মিশরে বইপড়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ

September 25, 2026

3 views

মিশরে বইপড়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ

শেরিন এলবানহাউই

অনুবাদ: শাহনেওয়াজ শাহিন

 

 

এক দশক থেকে অন্য দশকে, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে—মিশরীয় পাঠকদের কেবল বেস্টসেলার বা সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় আটকে রাখা যায় না। পড়ার অভ্যাসটা গড়ে ওঠে অন্য কোথাও: মানুষের মাঝে, আড্ডায়, ঘরের কোণে। এটি ডাউনটাউনের 'অ্যাংলো-ইজিপশিয়ান বুকশপ'-এ ঘটে—যা আজও টিকে আছে, আজও আপন করে নেয় সবাইকে, বছরের পর বছর ধরে অগণিত পাঠকের নীরব সাক্ষী হয়ে। এটি ঘটেছিল 'মাদবুলি'-তে, যেখান থেকে আমি আমার জীবনের প্রথম উপন্যাসগুলো কিনেছিলাম, যার মধ্যে লিটল উইমেন-ও ছিল। পরবর্তীতে, এর দেখা মেলে এইউসি (AUC) প্রেস তাহরির বুকস্টোরে, যেখানে আমার হাইস্কুলের বিশ্বসাহিত্য ক্লাসের জন্য অনুবাদে নাগিব মাহফুজের লেখার সাথে আমার প্রথম পরিচয়। আমাদের ইংরেজি শিক্ষক কিছুটা নীরবেই সিলেবাসের বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন: আমরা যদি নিজেরা বইটি জোগাড় করতে পারি, তবেই তিনি আমাদের তা পড়াবেন। মিশরে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার সময়, আমি যেকোনো মূল্যে মিদাক অ্যালি (এইউসি প্রেস, ১৯৮৯) খুঁজে বের করার জন্য জেদ ধরেছিলাম। আমি বেশ আগেই অনুধাবন করেছিলাম যে, মিশরের সাহিত্য কেবল এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় পাড়ি জমায় না, বরং তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং অবাধ্যতার নানা সাহসিক কাজের মধ্য দিয়েও ডানা মেলে।

মিশরে পড়ার অভ্যাসটা সবসময়ই বহুভাষিক—আরবি, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ এবং আরও কত কী। পাঠকদের জন্য এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনায়াসে যাতায়াত করা, অনুবাদের সাথে মূল বইয়ের তুলনা করা এবং বিভিন্ন ভাষার বইয়ের মাঝে একসাথে বসবাস করা অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়।

আমার বিছানার পাশের টেবিলে স্তূপ করে রাখা পাঁচটি বই একটি ছোট কিন্তু অর্থবহ জগতের জানান দেয়। হানিন আল-সায়েগের 'মিথাক আল-নিসা' [দ্যা উইমেনস প্যাক্ট ] (দার আল-আদাব, ২০২৩), যা এই বছর 'ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর অ্যারাবিক ফিকশন'-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে, উপন্যাসটি বিয়ে, লৈঙ্গিক কর্তৃত্ব এবং নারীর স্বায়ত্তশাসনের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। যদিও আমি তার দ্রুজ সম্প্রদায়ের নই, এমনকি তার দেশেরও নই, তবুও উপন্যাসটিকে ভীষণভাবে ব্যক্তিগত মনে হয়। এটি আরব নারীদের জন্য—সব সীমান্ত ও ভেদাভেদ ভুলে—আমরা কীভাবে একই ধরণের সীমাবদ্ধতাগুলো সহ্য করি ও প্রতিরোধ করি, এবং পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা কাঠামোগতভাবে এক থেকেও কীভাবে নিজের রূপ বদলায়, তা নিয়ে কথা বলার একটি অনন্য মাধ্যম হয়ে ওঠে।

 

দ্বিতীয় বইটি হলো মাই সেরহানের ‘আই ক্যান ইমাজিন ইট ফর আস: আ প্যালেস্টাইনিয়ান ডটার'স মেমোয়ার’ (এইউসি প্রেস, ২০২৫), যা নির্বাসন ও উত্তরাধিকারের অভিজ্ঞতাকে কাব্যিক সংবেদনশীলতা ও আন্তঃপ্রজন্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে অনুসরণ করে।  ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাসের সূত্র ধরে বইটি দেখায় কীভাবে মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান থাকে এবং পরিচয়, স্মৃতি ও অন্তর্গত হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দেয়।  যখন আমাদের সার্কেলের কেউ—আমাদের লেখকসমাজের, আমাদের 'রোয়ায়াত' (Rowayat) সম্পাদকীয় পরিবারের একজন—পাঠকের বুকশেলফে পৌঁছে স্বীকৃতি ও উদ্‌যাপনের অংশ হয়ে ওঠেন, তখন তা আর কেবল ব্যক্তিগত অর্জন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে আমাদের সবারই আনন্দের উপলক্ষ। তাঁর সাফল্য আমাদের একটি নাজুক কিন্তু অপরিহার্য বিশ্বাসকে নতুন করে দৃঢ় করে—এখনও শিল্পীর জন্য একটি পথ খোলা আছে, এমন এক পৃথিবীতেও যা ক্রমশ ভিন্নমত, মমতা এবং জটিলতার প্রতি আরও বেশি বৈরী হয়ে উঠছে।

 

 

কাছেই রাখা আছে আসমা আলাতাওনার 'আ লং ওয়াক ফ্রম গাজা' (ইন্টারলিঙ্ক, ২০২৪), যা অনুবাদ করেছেন মিশেল হার্টম্যান এবং ক্যালিন নাসরাল্লাহ। হার্টম্যান—ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটিতে আমার এমএ (MA) করার সময় সুপারভাইজার ছিলেন—যিনি আরব নারী লেখকদের বিশটিরও বেশি উপন্যাস অনুবাদ করেছেন। এই বইটিতে তিনি গাজার সেই প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য ও অভিজ্ঞতাগুলোকে ইউরোপীয় নির্বাসনের পটভূমিতে তুলে ধরতে সাহায্য করেছেন। হার্টম্যান যেমনটা উল্লেখ করেছেন, এই গণহত্যা উপন্যাসটিকে একটি ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত করেছে: "এই জায়গা, রাস্তাঘাট, ভবন বা পাড়া-মহল্লার কোনোটিরই এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই।" আলাতাওনার গদ্য অত্যন্ত নিখুঁত ও নির্ভীক; তা গাজা, ইসরায়েল এবং ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে—যেখানে ক্ষতিকর পৌরুষবাদ , বর্ণবাদী বৈষম্য এবং ধর্মীয় ভেদাভেদকে নিশানা করা হয়েছে। তবুও এই লেখা তার গভীর অন্তরঙ্গতা এবং বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে পাঠককে ধরে রাখে: ভাষার প্রতি বিশ্বাস, এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনের প্রতি অবিচল বিশ্বাস।

 

এই তিনটির পাশাপাশি রয়েছে ওমর এল আক্কাদের 'ওয়ান ডে, এভরিওয়ান উইল হ্যাভ অলওয়েজ বিন এগেইনস্ট দিস' (নফ, ২০২৫), যা আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির নৈতিক ক্লান্তি ও শূন্যতাকে এমন এক স্পষ্টতার সাথে তুলে ধরেছে, যার কারণে বইটি মিশরে এবং বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে পঠিত হয়েছে। সবশেষে রয়েছে হিয়াম ইয়ারেদের ফ্রেঞ্চ ভাষায় লেখা উপন্যাস 'লা মালেদিসিয়ঁ' (এদিসিঁ দে জেকুয়াতর, ২০১২), যা আমি ভবিষ্যতে এর সম্ভাব্য ইংরেজি অনুবাদের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় পড়েছি; এটি আমাকে আবারও মনে করিয়ে দেয় যে আরবের সাহিত্যজগৎ বহু আগে থেকেই ভাষার সীমানা পেরিয়ে ফ্রেঞ্চ, ইংরেজি এবং আরবির মাঝে অনায়াসে যাতায়াত করছে।

 

একত্রে, এই বইগুলো মিশরে সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারের চিত্রটিকেই ফুটিয়ে তোলে। এখানে পড়া কোনো একাকী সাধনা নয়। সম্পাদক, লেখক, অনুবাদক, কবি, পরামর্শদাতা এবং পাঠকেরা—কেবল বিচ্ছিন্নভাবে বই পড়ার মাধ্যমে নয়, বরং পারস্পরিক ভরসা, কৌতূহল এবং যত্নের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ভাষা ও প্রেক্ষাপটের মাঝে এই কথোপকথনকে বাঁচিয়ে রাখেন। মিশরে সাহিত্য কেবল পড়াই হয় না; তাকে ধারণ করা হয়, তাকে ঘিরে কথোপকথন জন্ম নেয়, আর যত্ন ও চর্চার মধ্য দিয়ে তাকে জীবন্ত রাখা হয়।

 

 

মিশরে কিছু বই টিকে থাকে কেবল এই কারণে নয় যে সেগুলোকে ধ্রুপদী বা ক্লাসিকের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, বরং এই কারণে যে সেগুলো আজ‌ও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। আমি এমন তিনটি বইয়ের কথা বলব। প্রথমটি হলো রাদওয়া আশুরের 'গ্রানাডা ট্রিলজি', যা এইউসি প্রেসের অধীনে হুপো (হুপো, ২০২৪) থেকে প্রকাশিত হয়েছে। কে হাইকিনেনের দুর্দান্ত অনুবাদের জন্য এটি বুক রিয়ট (Book Riot) কর্তৃক ২০২৪ সালের অন্যতম সেরা বই হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল এবং আরব লেখক ইউনিয়নের বিংশ শতাব্দীর সেরা ১০০টি সাহিত্যকর্মের তালিকায় স্থান করে নিয়েছিল। রিকনকুইস্টা-পরবর্তী আল-আন্দালুসের পটভূমিতে রচিত এই ট্রিলজিটি ভেতর থেকে এক সংশোধিত ইতিহাসকে তুলে ধরে, যেখানে নারীর শ্রম, স্মৃতি এবং দৈনন্দিন যত্নের ছোট ছোট কাজগুলোকে বিজয় ও অস্তিত্ব মুছে ফেলার চেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক একটি মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে।

 

দ্বিতীয়টি হলো ১৯৬০ সালে লেখা লতিফা আল-জায়্যাতের 'দ্য ওপেন ডোর', যা ১৯৯৬ সালে নাগিব মাহফুজ সাহিত্য পদক লাভ করে। ২০ বছরেরও বেশি সময় আগে মেরিলিন বুথ এটি অনুবাদ করেছিলেন এবং হুপো (Hoopoe) থেকে এর একাধিক মুদ্রণ বের হয়েছে। উপন্যাসটি ১৯৪৬ সালের ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সুয়েজ খালের ওপর ত্রিপক্ষীয় আক্রমণ পর্যন্ত সময়ের প্রেক্ষাপটে লায়লার রাজনৈতিক সচেতনতার গল্প তুলে ধরে; যেখানে একটি বামপন্থী ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ভাবধারার মধ্য দিয়ে নারীর মুক্তিকে জাতীয় মুক্তির সাথে যুক্ত করা হয়েছে, যা আজও অসম্পূর্ণ বলে মনে হয়।

নারীবাদী চিন্তাধারার সাহিত্য অনুবাদে মেরিলিন বুথের নিষ্ঠা তার সারাজীবনের এক অনন্য সাধনা। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিনি জহরান আলকাসমির 'হানি হাঙ্গার' (হুপো, ২০২৩) বইটির জন্য 'সাইফ ঘোবাশ-বানিপাল প্রাইজ ফর অ্যারাবিক লিটারেরি ট্রান্সলেশন' লাভ করেন, যাকে বিচারকেরা "কাব্যময় অনুবাদের এক অনন্য দৃষ্টান্ত" হিসেবে প্রশংসা করেছেন।

 

তৃতীয় বইটি হলো ওয়াগিহ গালির 'বিয়ার ইন দ্য স্নুকার ক্লাব', যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে এবং এর পর থেকে বইটির বহু সংস্করণ বের হয়েছে; পরবর্তীতে ২০১৩ সালে 'দার আল-শুরুক' থেকে এটি আরবি ভাষায় প্রকাশিত হয়। প্রায়শই মিশরের 'ক্যাচার ইন দ্য রাই' হিসেবে আখ্যায়িত এই উপন্যাসটিতে এমন কিছু চরিত্রের চিত্রায়ণ করা হয়েছে যারা বিভিন্ন সংস্কৃতি, উত্তর-উপনিবেশবাদ, আপনজন হওয়ার আকুলতা এবং বাস্তুচ্যুতির বেড়াজালে বন্দি। তারা শ্রেণীভেদ, বিপ্লব, ভূ-রাজনীতি, ধর্ম এবং নৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের সাথে এমনভাবে লড়াই করে চলেছে যা আজও বেদনাদায়কভাবে প্রাসঙ্গিক। আমার নিজের জন্য, এটি এমন একটি বই ছিল যা পাঠক এবং লেখকের মাঝখানের দূরত্বটুকু ঘুচিয়ে দিয়েছিল; এই বইটিই আমাকে—হয়তো জীবনে প্রথমবারের মতো—অনুভব করিয়েছিল যে আমারও কথা বলার অধিকার আছে, এবং আমিও একদিন লেখক হয়ে উঠতে পারি।

 

এই ধরণের ক্লাসিক বইগুলো চিরকালই বেস্টসেলার বা সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় রাজত্ব করে, কারণ এগুলোতে বর্ণিত পরিস্থিতিগুলো সমাজে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এগুলো নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলে, আড্ডার টেবিলে টেবিলে এগুলো হাতবদল হয়, এবং এক গোপন কৌতূহল মেশানো স্বরে "তোমাকে এটা পড়তেই হবে" বলে অন্যের হাতে গুঁজে দেওয়া হয়। কেবল একটি চেনা জগতের প্রতিধ্বনি করে বলেই যে এগুলো পড়া হয় তা নয়, বরং এই জগৎটাকে আরও গভীরভাবে বুঝতে এগুলো আমাদের সাহায্য করে।

অতীতের এমন কিছু সহযাত্রীর মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে এক ধরণের গভীর স্বস্তি রয়েছে: এমন কিছু বই, যা আমাদের অস্তিত্বের ভেতরের অশান্তিগুলোকে ভাষা দেয়, আমাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক নিপীড়নের সত্যতাকে স্বীকৃতি দেয় এবং আমাদের এমন এক সত্তা হিসেবে ফুটিয়ে তোলে যাদের কণ্ঠস্বরের একটি নিজস্ব মূল্য আছে।

 

পাঠকেরা যা সহজাতভাবে অনুভব করেন—বুক ক্লাব, পরিচিতজনদের রেকোমেন্ডেশন কিংবা কিছু লেখার কাছে বারবার ফিরে আসার অভ্যাস —ঠিক সেই একই অনুভূতির প্রতিফলন ঘটে তাদের মাঝেও, যারা বুকস্টোরের ভেতর থেকে প্রতিদিন মানুষের পড়ার অভ্যাসকে খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করেন। মিশরের অন্যতম প্রভাবশালী বই বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান 'দিওয়ান বুকস্টোর'-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আমাল মাহমুদ যেমনটা বলেন:

 

ঐতিহাসিক উপন্যাস, ক্রাইম, থ্রিলার এবং সমকালীন কথাসাহিত্য মিশরীয় পাঠকদের মধ্যে ক্রমাগত শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে চলেছে। অনূদিত সাহিত্যের জনপ্রিয়তা বরাবরের মতোই আকাশচুম্বী, যার মধ্যে জাপানি ও কোরিয়ান কথাসাহিত্যের প্রতি পাঠকদের আগ্রহের এক লক্ষণীয় উত্থান ঘটেছে। আত্মউন্নয়ন এবং সেলফ হেল্প বিষয়ক বইগুলো তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে এবং অনবরত এক বিশাল পাঠকশ্রেণীকে আকর্ষণ করছে। একই সাথে, গল্পনির্ভর নন ফিকশন—যা সংস্কৃতির রূপ, সামাজিক প্রেক্ষাপট কিংবা দার্শনিক ভাবনার সাথে গল্প বলার শৈলীকে মিলিয়ে দেয়—তার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে; ঠিক যেমনটা বাড়ছে ব্যক্তিগত বা ঐতিহাসিক গভীরতা সম্পন্ন স্মৃতিকথা এবং আত্মজীবনীর চাহিদা। এছাড়াও, মিশরের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ঐতিহ্যের প্রতি পাঠকদের মাঝে এক নতুন ও দীর্ঘস্থায়ী আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে, যার মধ্যে পুনঃপ্রকাশিত ক্লাসিক বই এবং বিভিন্ন গবেষণামূলক কাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 

'দিওয়ান'-এর নিজস্ব যাত্রাপথও যেন ঠিক এই বিবর্তনেরই এক প্রতিচ্ছবি। ২০২০ সালে কোনো স্পষ্ট বা সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছাড়াই প্রকাশনাটি তাদের প্রথম বই বাজারে আনে—তারা কাজ করেছিল মূলত নিজেদের সহজাত প্রবৃত্তি থেকে এবং কোনো ধরাবাঁধা রূপরেখার চেয়ে তাৎক্ষণিক চাহিদাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল। তবে সেই দূরদর্শী ভাবনাটি খুব দ্রুতই একটি বাস্তব রূপ নেয়। নাগিব মাহফুজের বই প্রকাশের সুযোগ কেবল প্রকাশনাটির বইয়ের তালিকাকেই বদলে দেয়নি, বরং তাদের কাজের উদ্দেশ্যকেও এক নতুন অর্থ প্রদান করেছে।

২০২১ সালে মাহফুজের সাহিত্যকর্মের স্বত্ব লাভ করা কেবল একটি ব্যবসায়িক মাইলফলকই ছিল না; এটি ছিল একটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিজয়‌। বইগুলোর নতুন প্রচ্ছদগুলো এমন এক তরুণ পাঠকশ্রেণীকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছিল যারা আগে কখনো তার লেখা পড়েনি; যা মিশরের জনজীবনে সাহিত্যের চিরন্তন গুরুত্বকে আবারও প্রমাণ করে এবং এটি দেখিয়ে দেয় যে বই পড়ার বিষয়টি কীভাবে সবসময় স্মৃতি, ইতিহাস এবং যৌথ ভাবনার সাথে মিশে থাকে। এ বছর ৫৭তম বার্ষিক কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলায় 'পার্সন অব দ্য ইয়ার' বা বছরের সেরা ব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মানিত হয়ে মাহফুজ আবারও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন (WLT, Spring 2001, 205-13)

।

আমালের এই পর্যবেক্ষণ আজকের মিশরে বই পড়ার অভ্যাসের একটি মৌলিক বিষয়কে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে: আর তা হলো এর 'বহুমাত্রিকতা'। এখানে নতুন কোনো ধারা বা জনরা এসে পুরনো ধারাকে প্রতিস্থাপন করে না, বরং একটির সাথে অন্যটি যুক্ত হয়ে জমা হতে থাকে। পাঠকেরা খুব সহজেই উপন্যাস থেকে স্মৃতিকথায়, থ্রিলার থেকে দার্শনিক প্রবন্ধে কিংবা অনূদিত কোনো বেস্টসেলার থেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া কোনো ক্লাসিক বইয়ের পাতায় ঘুরে বেড়ান। এখানে পাঠকদের রুচি কোনো একমুখী বা সরল রেখায় চলে না; তা গড়ে ওঠে একের পর এক বৈচিত্র্যের স্তরে স্তরে।

 

প্রতিরোধ বা অবাধ্যতার বিষয়টি আবার আরও কিছু ভিন্ন উপায়েও প্রকাশ পায়। যেমন—পুরনো বইয়ের দোকান, কায়রোর বিখ্যাত 'আজবাকিয়া ওয়াল', রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিক্রি হওয়া ফটোকপি করা বই, কিংবা পাইরেটেড পিডিএফ; এই কালো বাজারি যেকোনো সাধারণ নৈতিক বিচারকে বেশ জটিল করে তোলে। পাইরেসি বা বেআইনিভাবে বইয়ের কপি তৈরি করা নৈতিকভাবে ভুল, তা সত্যি। কিন্তু এটি অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত: লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা দাম, স্থবির হয়ে থাকা বেতন এবং জীবনযাত্রার এমন এক ব্যয়ভার যা অনেকের জন্যই বই কেনাকে সাধ্যের বাইরে নিয়ে গেছে।

মিশরে বই পড়ার অভ্যাস নিয়ে সততার সাথে আলোচনা করতে গেলে এই অমীমাংসিত দ্বন্দ্বটির মুখোমুখি হতেই হবে: কীভাবে একদিকে প্রকাশনা জগতের একটি নৈতিক পরিবেশ বজায় রাখা যায়, আর অন্যদিকে কীভাবে এই সত্যকে মেনে নেওয়া যায় যে জ্ঞানের অধিকার দিন দিন অত্যন্ত অসম ও বৈষম্যমূলক হয়ে উঠছে। 'দিওয়ান পাবলিশিং'-এর প্রধান আহমেদ আল-কারমালাউই জোর দিয়ে বলেন যে, পাইরেসি বা অবৈধ প্রকাশনার বিরুদ্ধে যেমন সরকারি আইনের প্রয়োজন, ঠিক তেমনি সর্বসাধারণের জন্য বইয়ের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে লাইব্রেরিগুলোতে সরকারি অনুদান বাড়ানোও সমানভাবে জরুরি।

 

 

কিন্তু এই সবকিছুর ভেতরের তীব্র আকুলতাই প্রমাণ করে যে, তাৎক্ষণিক তৃপ্তি বা সস্তা বিনোদনের এই যুগেও মিশরীয়দের কাছে বই পড়ার গুরুত্ব একটুও কমেনি। বই এখনও প্রতিরোধের এক একটি শক্তিশালী মাধ্যম—যা আমাদের কিছুটা থামতে বলে, চিন্তা করতে, পড়তে, উপলব্ধি করতে এবং কল্পনার ডানা মেলতে সময় দিতে শেখায়। বই আমাদের নতুন নতুন জায়গায় নিয়ে যায়, অচেনা জীবনের মুখোমুখি করে এবং এমন এক অপ্রত্যাশিত আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি করে যা আমরা কখনো ভাবিনি। আজকের এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে, যেখানে স্ক্রিন আর অ্যালগরিদম আমাদের অনবরত একাকী ও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে, সেখানে বই আমাদের এক সুতোয় বেঁধে রাখে—বহু আগে চলে যাওয়া এবং এখনও বেঁচে থাকা মানুষদের সাথে, মুছে যেতে অস্বীকৃতি জানানো ইতিহাসের সাথে, আর স্মৃতিকে বয়ে বেড়ানো আমাদের চিরচেনা ভাষাগুলোর সাথে।

 

 

এখন তো লেখকরাও তাদের পাঠকদের সাথে সংযোগ স্থাপনের নতুন নতুন উপায় খুঁজে নিচ্ছেন। রিম বাসিউনির মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসের লেখকেরা তাদের উপন্যাসগুলোকে একেকটি ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখার আমন্ত্রণে পরিণত করছেন—তারা পাঠকদের নিয়ে শহরের বিভিন্ন রাস্তাঘাট, প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ এবং হারিয়ে যাওয়া সব গলিপথে ঘুরে বেড়ান, আর ঠিক সেই জায়গাগুলোতেই আড্ডার আয়োজন করেন যেখানে তাদের গল্পের পটভূমি রচিত হয়েছিল। এর ফলে বই পড়ার অভিজ্ঞতাটি হয়ে ওঠে বাস্তব, জীবন্ত এবং সামাজিক। সাহিত্য যেন তখন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবের এই চেনা পৃথিবীতে ডানা মেলে।

 

 

একই সময়ে, নতুন নতুন সাহিত্যিক অঙ্গনেরও বিকাশ ঘটছে। 'কায়রো আর্ট বুক ফেয়ার' তাদের চতুর্থ সংস্করণে বইয়ের কাঠামোগত রূপের সীমানাকে আরও প্রসারিত করছে, যা প্রতি বছর আরও বেশিসংখ্যক অংশগ্রণকারী এবং বিশাল পাঠকশ্রেণীকে আকর্ষণ করছে। অন্যদিকে, 'কায়রো কমিক্স'  চিত্র ও লেখার মিশ্রণে গল্প বলার এক নতুন ধারাকে লালন করছে; একসময়ের আড়ালে থাকা এই আয়োজনটি ২০২৫ সালে তার দশম বর্ষপূর্তি উদযাপন করেছে, যেখানে মিশরীয় কমিক্সের এক শতাব্দীর গৌরবময় ইতিহাসকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের শিল্পী, লেখক এবং ভক্তদের একই ছাদের নিচে নিয়ে আসা হয়েছে।

দীনা মোহাম্মদ, যিনি মিশরীয় বিপ্লবের সময় কমিক্স আঁকা শুরু করেছিলেন এবং যার বিখ্যাত 'শুবেইক লুবেইক' (দার আল-মাহরুসা, ২০১৮; ইংরেজি সংস্করণ: প্যান্থিয়ন বুকস, ২০২২) এই কায়রো কমিক্সেই উন্মোচিত হয়েছিল, তিনি এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন। তার এই কাজ ইংরেজি এবং ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং এটি প্রমাণ করে যে গ্রাফিক ঔপন্যাসিকদের জন্যও সফল হওয়ার একটি বাস্তব ও উজ্জ্বল পথ রয়েছে (WLT, Jan 2023,14-18)।

 

 

বিপ্লবের এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও, মিশরে বই পড়ার অভ্যাসটি রাজনৈতিক উথাল-পাথাল, মহামারীর চ্যালেঞ্জ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং গাজায় চলমান গণহত্যার পরিস্থিতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তা সত্ত্বেও, বিভিন্ন বুকস্টোরে, মানুষের ঘরে এবং অনলাইনের দুনিয়ায় বুক ক্লাবগুলো দারুণভাবে বিকশিত হচ্ছে—যা এমন কিছু ছোট ছোট কমিউনিটি বা দল গড়ে তুলছে যারা এই পৃথিবীটা ক্রমশ আরও বেশি রূঢ়, অবাস্তব এবং অন্যায়পূর্ণ হয়ে ওঠার পরেও বইকে কেন্দ্র করে একসাথে জড়ো হওয়ার ব্যাপারে অবিচল। এডওয়ার্ড সাঈদের সেই বহুল পরিচিত উক্তি—"ক্ষমতার মুখে সত্য বলা"—নিয়ে ভাবনার অবকাশ থেকে পাঠকেরা জর্জ অরওয়েলের 'অ্যানিম্যাল ফার্ম' এবং '১৯৮৪' এর মতো বইগুলো বারবার নতুন করে পড়ছেন; ঠিক এমন এক সময়ে, যখন স্বৈরাচারী বা ক্ষমতাসীনেরা যেকোনো ধরণের জবাবদিহিতা এড়িয়ে চলে।

 

আমার কাছে বই পড়া সবসময়ই এক যৌথ বা সামাজিক অভিজ্ঞতা। আমাদের বুক ক্লাব এবং লেখক সমাজ কেবল বই নিয়ে আলোচনার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না; আমরা বইকে মাধ্যম করে জীবনের গভীরতর অনুভূতির সন্ধান করি—সেখানে উঠে আসে দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ, অভিবাসন, বার্ধক্য আর রাজনীতির নানা গল্প। ঝুম্পা লাহিড়ী, এলিফ শাফাক, চিমামান্দা এনগোজি আদিচি—এই লেখকদের বই যে আজ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে, তা কোনো অ্যালগরিদমের কৃত্রিম ট্রেন্ডের কারণে নয়, বরং তারা এমন কিছু বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলেন যা আমাদের ভেঙে যাওয়া অস্তিত্বের টানাপোড়েন এবং উত্তর-উপনিবেশবাদের পরবর্তী জীবনকে প্রকাশ করার ভাষা জোগায়।

অনলাইন ম্যাগাজিন 'রোয়ায়াত' (Rowayat) এবং আমাদের বইগুলো নিয়ে আমার কাজের পেছনেও ঠিক একই আদর্শ কাজ করে: সাহিত্য হলো এক আত্মিক বন্ধন, টিকে থাকার লড়াই এবং এক নীরব প্রতিরোধ—আমাদের জন্য তৈরি না হওয়া এই বৈরী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে সবাই মিলে একসাথে নতুন কিছু গড়ে তোলার এক যৌথ প্রয়াস।

 

মিশরে বই পড়ার এই অভ্যাস আজ অব্দি টিকে রয়েছে কারণ এটি সমস্ত কিছুকে অস্বীকার করতে জানে—তা সে বাণিজ্যিকীকরণ হোক, বিলুপ্তি, নীরবতা কিংবা চরম ক্লান্তিই হোক না কেন। এটি পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। এটি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। প্রতিকূল পরিবেশের মাঝেও এটি নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে নেওয়ার ব্যাপারে অবিচল থাকে।

তাই, মিশরে আজ কী পড়া হচ্ছে—এই প্রশ্নটি করার চেয়ে বোধহয় আরও বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: কীভাবে এই পড়ার অভ্যাস এখনও অবলীলায় টিকে রয়েছে—এবং কোন জিনিসটিকে এটি কিছুতেই হাতছাড়া করতে রাজি নয়?

 

 

 

Comments

    Please login to post comment. Login