Story

যাত্রা

September 25, 2026

16 views

"আপনার পাশে বসতে পারি? কেউ আছে এই সিটে?"

মেয়েকন্ঠ শুনে হতচকিয়ে গেলাম !

এতোক্ষণ আনমনে জানালার দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম; কীভাবে পলকে অতীত পেছনে ফেলে তেড়েফুঁড়ে সামনে ছুটে যাচ্ছে আন্তঃনগর পার্বতীপুর এক্সপ্রেস।

• সন্ধ্যা ৬ টা বেজে ৩৫ মিনিট

আমার পাশের সিটটাও আমিই টিকেট করে রেখেছি, তাই ফাঁকাই পড়ে আছে। মানুষ এড়িয়ে চলতে পছন্দ করি বলে, দীর্ঘ যাত্রাপথে কাউকে পাশে বসতে দেয়ার ইচ্ছে নেই আমার।

মেয়েটি বোধহয় টিকেট পায়নি বলে মনে হলো।

— কেউ নেই। তবে-

আমার উত্তর পুরোটা না শুনেই সে তার হ্যান্ডব্যাগটি সিটে রেখে বসার আয়োজন শুরু করে দিল, আমাকে মানা করবার সুযোগ না দিয়েই।

সাথে আরেকটা ভারী ব্যাগ, সেটা উপরে তুলে রাখতে যথেষ্ট বেগ পাচ্ছে সে। আমার দিকে তাকিয়ে বোধহয় অবাকই হলো; আমি কেন তাকে সাহায্য করছিনা ভেবে।

চাইলেই হয়তো সাহায্য করতে পারতাম, কিন্তু 'মানুষ' জিনিসটা আমার অপছন্দের।

মানুষ স্বার্থপর অকৃতজ্ঞ প্রাণী..

মেয়েটি বেশ সুন্দর। সোনালী-শ্যামলা গায়ের বরন , চিবুকে ছোট তিল। ঘুমঘুম ক্লান্ত চোখ , উঁচু সরু নাক । কপালের ঘাম চুয়ে নাকের উপর এসে বিন্দু বিন্দু জমে আছে। রেলগাড়ির হলুদ সোডিয়াম বাতির প্রতিফলনে মনে হচ্ছে যেন সোনার নথ!

দেখলাম ব্যাগ সাজাতে গিয়ে’ তার গোছানো খোঁপা আলগা হয়ে এলো, ঝরঝরে চুল ঝেপে নেমে এসেছে কোমর বরাবর।

ওমনি দাঁতে রাবার ব্যান্ডটা আটকিয়ে দুই হাতে টানটান করে আবার খোঁপা করে ফেললো চোখের পলকেই। ওড়না দিয়ে মুখের ঘাম মুছে আলগোছে এসে পাশে বসলো।

- কোথায় যাবেন আপনি?

- কোথাও না..

- আজব লোক তো আপনি! কোথাও না মানে কী?

উত্তর দিলাম না। এত বড় দুনিয়ায় কারো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই— এটা মেনে নেওয়ার মতো না।

•••

টের পেলাম মেয়েটির দিকে অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে ফেলেছি আমি। এর আগে ঠিক এমন মনোযোগ দিয়েছিলাম যার উপর , শেষমেষ তার জন্যে আমাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের দরবারে নিয়মিত হাজিরা দিতে হয় এখনো।

মানুষ ভয়ংকর প্রাণী !

•••

উত্তর দেওয়ার মত কিছু ছিলও না আসলে। আমি কোথায় যাচ্ছি আমি নিজেও জানিনা। এ মাথা থেকে ও মাথা টিকেট কেটে রেখেছি। ট্রেনের জানালায় বসে আমি অতীত ছেড়ে তেড়েফুঁড়ে পালানোর স্বস্তি পাই।

আমার অন্ধকার অতীত;

আবার একেকটা স্টেশনে যখন ট্রেন থামে, মনে হয় যেন আমি একেক নতুন দুনিয়ায় এসে থেমেছি। নিজেকে সে নতুন দুনিয়ার নতুন নতুন মুখ দেখিয়ে ভোলাবার চেষ্টা করি পুরাতন কতক ভয়ানক মুখচ্ছবি।

এই পালিয়ে বেড়ানোকে বৃথা মাল্টিভার্স আর টাইম ট্রাভেল বলতে পারেন। হাহা, সে যাক গে!

•••

ভাবতে না চেয়েও ভেবে ফেললাম— মেয়েটি হয়তো মন খারাপ করেছে। আমাকে বদমেজাজী আর অসামাজিক কেউ ভাবছে নিশ্চয়।

‘আমার কি তার সাথে কথা বলা উচিত?’

ভাবনায় লাগাম দিলাম। এ সমস্ত মানবিক অনুভূতি থেকে পালাতে হবে আমার !

আমি পুণরায় জানালার বাইরের অন্ধকার দেখতে লাগলাম। আলোতে যার ভয়, তার জন্য অন্ধকারই দৃশ্যকাব্য।

ওদিকে আষাঢ়ের আকাশে মেঘ সেজেছে, ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকায়। আমার আঁধারবিলাসে হয়তো আজ বিধাতার সায় নেই।

•••

• রাত ৮ টা বেজে ০৪ মিনিট

— এই যে! আপনি মাথা বের করে এভাবে বৃষ্টিতে ভিজছেন যে? ঠান্ডা লেগে যাবে তো! কী অদ্ভুত লোক বাবা আপনি!

সম্বিত ফিরে দেখলাম বেশ খানিকটা ভিজে গেছি। অনেকখানি পাপ ধুয়ে গেছে নিশ্চয় এতক্ষণে আমার।

মেয়েটি তড়িৎ তার ব্যাগ থেকে একটা ছাইরঙা তোয়ালে বের করে দিলো আমায়, ভেজা মাথা মুছে ফেলবার জন্য।

— আপনার কি কোনো কারণে মন খারাপ?

তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলাম..

— দেখেন আপনি কোথায় নামবেন তা তো আমি জানিনা, কিন্তু আমার স্টেশন পেতে ভোর ছুঁবে।

আমি নাতাশা। বাচ্চাদের স্কুলে পড়াই। অভ্যেসের কারণে কথা না বলে থাকতে পারিনা। ভুল বুঝবেন না।

— না আমি ঠিক আছি।

— আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছেনা ঠিক আছেন। যদিও বেশ ভদ্রলোকই লাগে। তবে চুল-দাড়িগুলো তো কামাননি দেখি বহুদিন। রাতে ঘুমান না আপনি? আয়নায় নিজেকে দেখেছেন শেষ কবে বলুন তো?

— না মানে;

— কাছে আয়না থাকলে ঠিক দেখাতাম চোখজোড়া আপনার কেমন টকটকে লাল ! ভয় পাবে যে কেউ দেখলে, আমিও যে কিঞ্চিৎ আতংকিত নই তা নয়।

— ভয় পাবেন না। (আমার উত্তর সে শুনছে না বলেই মনে হলো)

— আর দেখুন সে চোখের নিচেও আস্ত জোড়া ডার্কসার্কেল পেতে রেখেছেন, বুড়িগঙ্গা থেকে কিছু কালো জলের মাছ এনে ছেড়ে দেয়া উচিত আপনার এই কালো ঝিলে। ঘুমান না যেহেতু, মাছ দেখবেন শুয়ে শুয়ে! কী বলেন?

— ইয়ে মানে;

— নেশা করেন? মনে তো হয়না। এই দুই ঘন্টায় একটাও সিগারেট খেতে দেখলাম না। তো মশাই কী কারণে এই সন্ন্যাসবেশ !

কয় কদম নীরবতায় বুঝলাম নাতাশার জেরা শেষ হয়েছে। ধীর গলায় উত্তর দিলাম—

— আসলে অচেনা কারো সাথে কথা বলতে ইতস্তত লাগে।

— কথা না বললে তো অচেনাই থেকে যাবেন। আর গৃহত্যাগী বেশের কারণ তো বললেন না!

এবার কিছুটা বিরক্তই হলাম। তাকিয়ে চুপ করে গেলাম।

মানুষ চেনার বা চেনানোর কোনো ইচ্ছে আমার নেই।

নাতাশা উত্তর না পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে বসলো, অভিমান ম ম করে ছুটছে তার নিঃশ্বাসে। সে অভিমান আমার পাত্তা দেবার কিছু নেই।

ট্রেন কোনো কারণে আস্তে চলতে শুরু হলো।

ওদিকে জানালার বাইরে ঝুম বৃষ্টি ।

•••

কিছুক্ষণ পর মনে হলো আমি চাচ্ছি মেয়েটা আবার আমাকে ডাকুক। কিন্তু ডাকলো না।

• রাত ৯ টা বেজে ৩৯ মিনিট

ট্রেন কোনো এক স্টেশনে থামা। ক্রসিং পড়েছে সম্ভবত ।

মেয়ে মানুষ মায়ের জাত, রাগ না তার সবটুকুই অভিমান, অপেক্ষা করেও তার সেই অভিমান কেউ না ভাঙালে নিজেই শেষে ভেঙে ফেলে সহজাতে। তবে আমার মত অচেনা ভয়ংকর ও একইসাথে অসামাজিক কারো জন্য তা ভাঙতে দেখে বেশ অবাকই হলাম— ব্যাগ থেকে প্লাস্টিকের টিফিন বক্স বের করে মেয়েটি ডাক দিলো—

— এই যে শুনছেন? আসার সময় মা এই ৫ টা রুটি, ১ বাটি আলুভাজি, আর এই ১টা ডিমভাজি করে সাথে দিয়েছেন। আমাকে দেখে কি মনে হয় আমি ৫ টা রুটি খেতে পারি?

কথা তো বলছেন না, আর আপনাকে দেখে মনে হচ্ছেনা আপনি খেয়েছেন সকাল থেকে কিছু। আমার সাথে একটু খাবেন প্লিজ?

হঠাৎ মনে পড়লো আমি শেষ খেয়েছি গতকাল দুপুরে। আর আমাকে শেষ কেউ খেতে সেধেছে কবে মনে করতে পারছি না আমি। চোখ ভিজে আসছে আমার !

চকচকে হলদে মাখা আলুভাজির দিকে চোখ পড়তেই ক্ষুধার কাছে হেরে গেলাম ,জিভে পানি এসে ঠেকলো মায়ের হাতের রান্না শুনে।

'যাত্রাপথে অচেনা কেউ খাবার দিলে খাবেন না' এই সদুপদেশ ভিজে হাওয়া হয়ে গেল যেন নিমিষেই।

দুই লোকমা রুটি সাথে আলুভাজি আর ডিম পেঁচিয়ে খেলাম।

মেয়েটি দেখলাম হাসছে। মুক্তোর মত দাঁত।

লজ্জা পেয়ে গেলাম। ধন্যবাদ জানিয়ে আবারো ঘুরে জানালার বাইরে তাকালাম। ট্রেন ছেড়ে দিলো।

•••

• রাত ১১ টা ৩১ মিনিট

নাতাশার মতে বৃষ্টির দিনে নাকি রবীন্দ্র সংগীত শোনা ফরজ। আমার উপর আবারো কিছুক্ষণ অনধিকার চর্চাবলে আমি বেরসিক , বেরহম ,পাগল , উজবুক ইত্যাদি বকাঝকা করে তার ইয়ারফোনের এক মাথা জোর করেই আমার কানে গুজে দিলো।

এখন আমার কানে বাজছে—

"আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে, দেখতে আমি পাইনি, তোমায় দেখতে আমি পাইনি"

হঠাৎ কাঁধের উপর ভার অনুভব করলাম।

চেয়ে দেখি ক্লান্ত নাতাশা ঘুমে ঢলে পড়েছে আমার কাঁধের উপর। সারা শরীর কেঁপে উঠলো আমার। খুব কষ্টে নিজেকে সামলাচ্ছি যেন মেয়েটার ঘুম না ভাঙে।

সোডিয়াম আলোভেজা নিষ্পাপ একটা মায়াবী মুখ আমার সামনে! যাবতীয় ক্রোধ গলে আমার ইচ্ছে হচ্ছে এই পথ অনন্তকাল শেষ না হোক।

তবে কি মানবপ্রবৃত্তিই সবচেয়ে বড় দিগ্বীজয়ী? কেউ কি পেরেছে তার কাছে হার ঠেকাতে? __

পরের স্টেশন পেতেই আলগোছে নাতাশার মাথা আমার কাঁধ থেকে সরিয়ে সিটে হেলান দিয়ে দিলাম।

মনে মনে আওড়ালাম — এ কী স্নিগ্ধ সুন্দর নিখুঁত প্রতিমা দর্শালে আমায় প্রভু, এ মায়া কাটানোর সাধ্যি আছে কোথাও কাহারো কভু ?

•••

• রাত ২ টা বেজে ৪ মিনিট।

বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

ট্রেন থেকে নেমে গেলাম আমি।

এর বেশিক্ষণ থাকলে আমি আবারো ভুল করে বসতাম। যেই ভুলের মাশুল বিগত ৫ বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছি।

•••

আচ্ছা ঘুম ভাঙলে নাতাশা কি আমাকে খুঁজে ফিরবে ? ক্ষণিকের বেরসিক সহযাত্রীর চিন্তায় কি তার কপালে ভাঁজ পড়বে ?

বিন্দু বিন্দু অভিমানী ঘাম এসে জমবে নাকের চূঁড়ায় ! রেলগাড়ির হলুদ আলোর প্রতিফলনে যা সাজাবে সোনার বরণ কন্যার নাকে সোনার বরণ নথ !

হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশ অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি আমি । হৃদয়ের গহীন অরণ্যে বেজে চলেছে —

"দু চোখে তার আহারে কি মায়া, নদীর জলে পড়লো কন্যার ছায়া, একটা ছিল সোনার কন্যা.. "

ইহজগতের সবচেয়ে সুন্দর জিনিস ‘মায়া’। ইহজগতের সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস ও এই ‘মায়া’।

_______ • ওয়াসিক

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login