Story

অচিন পাখির খোঁজে

September 25, 2026

13 views

কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়া। লালন সাঁইজির মাজারের প্রাঙ্গণে বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে। বাতাসের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে এখানে। মাটি, ঘাস আর শত বছরের পুরনো সুরের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। অবসরপ্রাপ্ত দর্শনবিদ্যার অধ্যাপক ড. আফতাব আহমেদ আজ কিছুক্ষণ আগেই এখানে এসেছেন। কিছুক্ষণ আখড়া এলাকায় হেঁটে হেঁটে দেখলেন। বিচ্ছিন্নভাবে নানান বয়সী কিছু লোকজন বসে আছে। প্রায় প্রত্যেকের চোখেমুখ কেমন একটা ধ্যানমগ্ন। তাদের কেউ কেউ একা একা গান গাচ্ছে। এখানকার মানুষগুলো যেন জাগতিক পৃথিবীর বাসিন্দা নয়। কপালে চিন্তার বলিরেখা, কিন্তু চোখে এক ধরণের কৌতূহল। সারাজীবন হেগেল, কান্ট, দেকার্ত আর সার্ত্র পড়িয়ে তার এখন মনে হচ্ছে, জীবনের অর্থ খোঁজার জন্য তিনিওতো মনে মনে অনেক ব্যখ্যা খুঁজেছেন। কিন্তু এখানকার বাউলেরা যেন সেই একই সফরে বেরিয়ে এখানে ঠাঁই নিয়েছে। মানুষগুলোকে দেখে তার মনে হলো, বইয়ের পাতার লেখায় নিজেকে খোঁজার অর্থ বোধহয় কেবলই আঙুল দিয়ে চাঁদের দিকে ইশারা করা মাত্র। এই মানুষগুলো কি কিছু খুঁজে পেয়েছে!
বাকি বাউলদের থেকে খানিক তফাতে একজন বয়স্ক বাউল বসে আছেন। পরনে জরাজীর্ণ এক জোব্বা, হাতে একতারা। বৃদ্ধ বাউলের চোখ দুটো যেন গভীর কোনো সমুদ্রের তলদেশের মতো শান্ত। তিনি তখন লালনের সেই কালজয়ী গানটি গাইছিলেন।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়,
তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়...
গানটা শেষ হলো, কিন্তু সুরের অনুরণন যেন বাতাসের সাথে মিশে গেল না, বরং অস্পৃশ্য কোনো এক শূন্যতায় আটকে রইল। সেখানে কোন শ্রোতা নেই। একা একা মানুষটা গান গাইল। অধ্যাপক আফতাব ধীরে ধীরে এগিয়ে বৃদ্ধ বাউলের সামনে গিয়ে বসলেন।
চমৎকার গাইলেন, আফতাব মৃদু হেসে বললেন। কিন্তু এই 'অচিন পাখি'টা কে? আপনারা যাকে সৃষ্টি রহস্য বলেন, সেটা কি কোনো একক সত্তা? নাকি কেবলই ভাবনা?
বাউল একতারাটি পাশে রেখে অধ্যাপকের দিকে তাকালেন। মৃদু হাসলেন, তবে সে হাসিতে কোনো শ্লেষ নেই।
বাবা, আপনি বইয়ের ভাষায় কথা বলছেন। আপনি যাকে ‘সৃষ্টির রহস্য’ বলছেন, তা কি কোনো ধাঁধা যে উত্তর দিলেই শেষ হয়ে যাবে? এই পাখি তো সে, যে খাঁচার ভেতর থেকেও খাঁচার সীমানা চেনে না। আপনি কি বলতে চান, খাঁচার বাইরে কিছু নেই?
আফতাব চশমাটা ঠিক করে নিলেন। তিনি পাশ্চাত্য দর্শনের দ্বৈতবাদের ভাবনা থেকেই মনে করলেন, দেকার্ত বলেছিলেন, শরীর আর মন আলাদা।
আফতাব জবাব দিলেন, আমার কাছে মনে হয়, এই সৃষ্টি একটা যান্ত্রিক ঘড়ির মতো, যার একজন ঘড়ির কারিগর আছেন। কিন্তু সেই কারিগর কি আমাদের সাথেই আছেন, নাকি তিনি অনেক দূরে, সেটাই আমরা জানি না।
বাউল একটু হাসলেন। কার ভাবনার কথা বললেন, বাবা; সেটি আমি জানি না বাবা, তবে আমাদের লালন বলেছেন— আপন ঘরের খবর নিলেই সাঁইর বারামখানার দেখা পাবো। সৃষ্টির রহস্য কি বাইরে? দেখুন, এই যে আমার দেহ, একে কি কেবল হাড়-মাংসের কাঠামো বলবেন? না। এর ভেতরেই তো ব্রহ্মাণ্ডের সব খেলা। আপনি যে কারিগরের কথা বলছেন, তিনি তো কারিগর নন, তিনি নিজেই তো সৃষ্টিতে মিশে আছেন। যে পাখি খাঁচায় থাকে, সেই পাখিই তো আবার আকাশ। আলাদা কোথায়?
কথাগুলো শুনে অধ্যাপক একটু চিন্তিত মুখে তাকালেন। সর্বেশ্বরবাদের কথাইতো বললেন আপনি।
বহুবছর ধরে ছাত্রদের পড়িয়েছেন তিনি স্পিনোজার কথা। স্পিনোজা বলেছিলেন, ঈশ্বর এবং প্রকৃতি এক। সেটি মাথায় আসতেই তিনি এবার বললেন,
কিন্তু যদি তাই হয়, তবে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার দাম কী থাকল? আমি যদি নিজেই ব্রহ্মাণ্ড হই, তবে আমার দুঃখের দায় কার?
বাউল মাটির দিকে চেয়ে আঙুল দিয়ে একটা বৃত্ত আঁকলেন। তারপর বললেন,
খুব দামি প্রশ্ন করেছেন। আচ্ছা, আয়নায় যখন আপনি নিজের মুখ দেখেন, তখন কি আয়নার ভেতরের আপনি আর বাইরের আপনি আলাদা? আয়নায় আপনি হাসলে আয়নার আপনিও হাসে। আয়নার আপনি কি কোনোদিন আপনার চেয়ে বেশি স্বাধীন হতে পারবে? কিন্তু আপনার ওই প্রতিচ্ছবিটি না থাকলে কি আপনার অস্তিত্ব বোঝা যেত? সৃষ্টি হলো সেই আয়না। সৃষ্টিকর্তা নিজেকে দেখতে চেয়েছেন বলেই তো আয়নাটা ফেলেছেন। আর আয়নায় প্রতিফলন তো সবসময় উল্টোই হয়। আমরা সেই উল্টো প্রতিফলন দেখে মনে করি আমরা আলাদা, আমরাই স্বাধীন।
অধ্যাপকের মনে হলো, ক্লাসরুমের জটিল তত্ত্বগুলো বৃদ্ধ বাউলের সাদামাটা কথার কাছে কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আপনার কথা অনুযায়ী তাহলে আমরা কি? আমরা কি কেবল একটি বিচ্ছুরিত আলোর মত কিছু?
বাউল একতারাটা আবার হাতে তুলে নিলেন। আলো তো একই বাবা। এই আলোতেইতো সাতটা রঙ। যা কিছু দ্বন্দ্ব সব ওই রঙগুলোর, আলোর নয়।
কথাটা শুনেই অধ্যাপক আফতাব চুপ হয়ে গেলেন। তিনি ভাবনার অতলে ডুবে গেলেন। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে। মাজারের বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠেছে। বাউলের রঙের দ্বন্দ্ব কথাটা তখন তার মনে গেঁথে আছে। নিজের শিক্ষক জীবনকে পাশ কাটিয়ে তাঁর এখন ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে, তিনি কি কোন ভুল পথে ছিলেন এতদিন! তাঁর মনে হচ্ছে, জীবনের অর্থ নিয়ে যা ভাবছিলেন এতকাল, সবই কি ধোঁয়াশা কোন ব্যখ্যায় ভেবে রেখেছিলেন তিনি? লালনের গানটা- খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’তে যে পাখির কথা বলা হয়েছে, তাকে কেন খুঁজলেননা এতকাল?
দুই ভুবনের দুজন মানুষ তখনো মুখোমুখি বসে আছেন। অধ্যাপক আফতাব বললেন,
রুমি নামে একজন লোক ছিলেন।
ইচ্ছে করেই সহজ ভাষায় রুমির নামটা বললেন তিনি।
হ্যাঁ, উনার লেখার সাথে আমি পরিচিত। বৃদ্ধ বাউল বললেন। অধ্যাপক আফতাবের অবাক মুখখানা দেখে যেন পরিবেশটা হালকা করার উদ্দেশ্যেই বললেন,
আমি রুমির লেখার সাথে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করেই আমি এই আখড়ায় এসে বসেছিলাম ভাই, আজ থেকে বেয়াল্লিশ বছর আগে।
অধ্যাপক আফতাব এবার আরো অবাক হয়ে বাউলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মৃদু হেসে বাউল এবার তাঁকে বলল,
বলুন, রুমিকে নিয়ে কিছু বলতে চাইছিলেন।
আফতাব খুব সতর্কভাবে এবার বললেন,
আপনার তখনকার কথাগুলো রুমির দর্শনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তিনি বলতেন, এই মহাবিশ্ব হলো এক অবিরাম নৃত্য। তিনি এটাকে ‘সামা’ বলতেন। কিন্তু রুমি যখন বলতেন ‘ঈশ্বর প্রেমেরই অপর নাম’, তখন কি তিনি সৃষ্টির কাঠামোগত কারণগুলোকে উপেক্ষা করেছিলেন? বিজ্ঞান তো বলে, সৃষ্টির মূলে রয়েছে বিগ ব্যাং—বিস্ফোরণ, সংঘর্ষ, বিচ্ছিন্নতা।
বাউল এবার খুব নিচু স্বরে কথা বলা শুরু করলেন। যেন তিনি খুব কাছের কোনো বন্ধুর সাথে গোপন কথা বলছেন।
বিস্ফোরণ? হ্যাঁ, হতে পারে। কিন্তু প্রেম কী? প্রেম মানে তো এক হয়ে যাওয়ার ব্যাকুলতা। যখন দুটি সত্তা একে অপরের সাথে ধাক্কা খায়, তখন কি তারা দূরে সরে যায়, নাকি একটা নতুন কিছু সৃষ্টি করে? আপনি যাকে সংঘর্ষ বলছেন, আমি তাকে বলি মিলন। একটা বীজ যখন মাটিতে পড়ে, তখন মাটির সাথে তার সংঘর্ষ হয় না, হয় মিলন। সেই মিলন থেকেই তো অংকুর। এটাই কি সৃষ্টির মূল সুর নয়?
অধ্যাপক আফতাব নিস্তব্ধ হয়ে শুনলেন। তিনি বলতে চাইলেন হেগেলের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ বা ডায়ালেক্টিক্স অনুযায়ী দ্বন্দ্ব থেকেই পরিণতির জন্ম। কিন্তু বাউলের কথাগুলো সেই তত্ত্বকে যেন এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল।
আপনি কি বলতে চাইছেন, ধ্বংস বা বিচ্ছেদ বলে কিছু নেই? আফতাব প্রশ্ন করলেন।
মানুষের চোখে বিচ্ছেদই চরম সত্য, বাউল বললেন। কিন্তু মহাকালের চোখে? মনে করুন এক ফোঁটা জল যখন সাগরে পড়ে, তখন কি জলের মৃত্যু হয়? সে তো কেবল তার ক্ষুদ্র পরিচয়টি হারিয়ে বৃহত্তর পরিচয়ে ফিরছে। লালন সাঁইজিতো বলেই গেছেন, মনের মানুষ বাইরে কোথাও নেই বাবা। সে তো আমাদের ভেতরেই সেই অসীম। সৃষ্টির রহস্য হলো এই—যে নিজের ভেতরে ডুব দিতে পারে, সেই বাইরের মহাবিশ্বকে চিনতে পারে।
আফতাব মনে মনে ভাবলেন, এ মানুষটার জীবনদর্শন তার ভাবনার চেয়েও অনেক উচ্চমার্গের। তিনি প্রসঙ্গ পালটে এবার বললেন,
কিন্তু ভাই, এই যে অসীম দুঃখ, দারিদ্র্য, মৃত্যু—এগুলো তো বাস্তব। এগুলোকে কী দিয়ে ব্যাখ্যা করবেন? এটা কি কেবলই বিভ্রম?
বৃদ্ধ বাউল একতারাটার গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে এবার বললেন,
ব্যাখ্যা চাইলেই কি দুঃখ কমবে? আপনি পশ্চিমা দর্শনের ভাবনায় আপনার চিন্তাভাবনাকে পরিচালনা করছেন। তারা সবকিছুর উত্তর চায়। কিন্তু কিছু উত্তর কেবল অভিজ্ঞতায় পাওয়া যায়, ভাষায় নয়। মৃত্যু তো একটা দরজা মাত্র। একটা পুরনো কাপড় বদলে নতুন কাপড় পরা। আপনি যখন শোনেন, তখন কি শব্দের শব্দগুলো আলাদা করেন? না, আপনি সুরটা শোনেন। সৃষ্টি হলো সেই সুর। দুঃখ হলো সেই সুরের করুণ অংশটুকু। করুণ সুর ছাড়া কি রাগ পূর্ণতা পায়?
অধ্যাপক আফতাব আকাশের দিকে তাকালেন। কোটি কোটি নক্ষত্র জ্বলছে। আজ আর তার মনে হচ্ছে না যে এগুলো কেবলই গ্যাস আর ধূলিকণার পিণ্ড। মনে হচ্ছে, এক বিশাল অস্তিত্বের নিঃশ্বাস পড়ছে এই মহাকাশে।
আমি এতদিন বাইরে খুঁজেছি, অধ্যাপক বললেন, কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। কিন্তু সমাধানটা কি তবে অনুসন্ধানেই নিহিত?
বাউল এবার মৃদু হাসলেন। অনুসন্ধানই তো সৃষ্টি। যে খুঁজে, সে নিজেই তো সেই রহস্যের অংশ। আপনি যখন প্রশ্ন করছেন, তখনই আপনি সেই অচিন পাখিকে ডাকছেন। এটাই তো সৃষ্টির সার্থকতা।
রাত গভীর হয়। ছেউড়িয়ার মাটিতে বাউল এবং অধ্যাপক পাশাপাশি বসে থাকেন। কোনো উত্তর পাওয়া গেল কি? হয়তো না। তবে কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার চেয়ে, প্রশ্নটার গভীরতায় হারিয়ে যাওয়াই হয়তো জীবনের পরম পাওয়া। কাছেই কোন একজন বাউল একতারা বাজাচ্ছে। সেই একতারার সুর চারপাশকে অনুরণিত হচ্ছে।
রাত গভীর হতেই একসময় নীরবতার এক অসীম চাদর যেন কেউ বিছিয়ে দিল মাজারের প্রাঙ্গণে। অধ্যাপক আফতাব এবং বাউল, দুজন মানুষ এখন আর তর্ক করছেন না। বরং তারা দুজনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে গভীর শূন্যতাকেই ভাবছেন, যেখানে আলো এবং ছায়ার রহস্য মিলেমিশে একাকার।
অধ্যাপক আফতাব দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর মৃদু স্বরে বললেন,
সারাজীবন আমি যা খোঁজার চেষ্টা করেছি, তা কোনো জ্যামিতিক নকশা নয়, কোনো দার্শনিক সূত্রও নয়। আসলে আমরা সবাই সেই ‘অজানাকে’ চেনার চেষ্টা করছি, যাকে আমরা চিনিনা কিংবা তাকে চেনাও অসম্ভব।
বাউল মাটির দিকে চেয়ে মাথা নাড়লেন।
ঠিক ধরেছেন বাবা। মানুষ যখনই কোনো কিছুর নাম দেয়, তখনই সে জিনিসটাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। ঈশ্বর, আল্লাহ, ব্রহ্ম, কিংবা মহাজাগতিক শক্তি, নামগুলো তো মানুষের নিজের প্রয়োজনে দেওয়া। কিন্তু সেই যে অসীম শক্তি, যা আমাদের অস্তিত্বের মূলে স্পন্দিত হচ্ছে, তাকে কি কোনো নাম দিয়ে বেঁধে রাখা যায়?
অধ্যাপক আফতাব এবার একটু নড়েচড়ে বসলেন। রাখঢাক না করেই তিনি এবার বললেন,
পাশ্চাত্য দর্শনে কাণ্ট বলেছিলেন, যা আমরা দেখি তা সত্যের প্রকাশ হতে পারে, কিন্তু সত্যের সমগ্রতা নয়; বস্তু-স্বরূপের এক অংশ চিরকাল অজানার আড়ালেই রয়ে যায়। আজকে আপনার সাথে কথা বলে মনে হচ্ছে, সেই অজানাই হয়তো ধ্রুব সত্য।
তিনি এখন জানেন, এই বাউল শিক্ষিত মানুষ। তাঁকে এখন রাখঢাক করে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই।
অবিকল, বাউল মৃদু হাসলেন।
লালন সাঁইজিও বলতেন, কে কথা কয় রে দেখা দেয় না, নড়ে চড়ে হাতের কাছে, খুঁজলে জনমভর মেলে না। এই যে আমরা একেকজন একেক ধর্ম বা দর্শনের মোড়কে সেই শক্তিকে ব্যাখ্যা করি, এটাই তো সৃষ্টির সবচেয়ে বড় কৌতুক। কেউ বলে সে আলো, কেউ বলে সে শব্দ, কেউ বলে সে শূন্যতা। কিন্তু সব বর্ণনাই কি সেই অন্ধের হাতি দেখার মতো নয়?
কথাটি শুনে অধ্যাপক আফতাব কেন যেন খুব সন্তর্পণে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কেন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তা তিনি নিজেও জানেন না। তারপর বললেন,
আমরা যে আজ এখানে বসে এই অজানাকে নিয়ে ভাবছি, এটাও কি সেই শক্তিরই এক খেলা নয়? সে হয়তো আমাদের মাধ্যমে নিজেকেই নিজে অনুভব করতে চাইছে। অথচ সে নিজেই এক রহস্য, যা কখনোই পুরোপুরি উদঘাটিত হবে না।
বাউল একতারাটি আলতো করে কোলে টেনে নিলেন। সুর তুললেন না, কেবল কাঠের ওপর আঙুল বোলালেন।
হ্যাঁ বাবা, সৃষ্টির রহস্য উন্মোচন হওয়া মানেই তো সৃষ্টির সমাপ্তি। আমাদের সার্থকতা তো সেখানে নয়, আমাদের সার্থকতাতো সেই অজানার ছায়াতলে দাঁড়িয়ে বিস্ময় অনুভব করা। মানুষের ধর্ম হলো সেই অজানাকে অনুভব করা, আর বিজ্ঞানের ধর্ম হলো সেই অজানাকে খুঁজে চলা। দুই পথই একই অজানার দিকে যাচ্ছে।
অধ্যাপক আফতাব প্রথমবারের মতো অনুভব করলেন, তার দীর্ঘদিনের অর্জিত ডিগ্রি আর বইয়ের জ্ঞানের বাহিরেও আরেকটা পৃথিবী ছিল। এই বৃদ্ধ বাউল সে পৃথিবীর বিশাল এক দিগন্ত আজ তাকে দেখাল। তিনি বললেন,
আমাদের সব মতভেদ, সব সংজ্ঞা—সবই আসলে একই সুরের ভিন্ন ভিন্ন কম্পন। আমরা সবাই তো সেই অজানার যাত্রী, যে নিজের পরিচয় জানে না।
ঠিক তাই, বাউল বললেন। আপনার দর্শন আর আমার বাউলতত্ত্ব—দুটোই আসলে সেই অজানার সামনে নতজানু হওয়ার দুটি ভিন্ন ভঙ্গি। একেক জন একেক ভাষায় সেই শক্তির কথা বলে, কিন্তু অনুভবটা তো একই। যখন মানুষ এই অজানার সামনে দাঁড়ায়, তখন তার অহংকার ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে, সে ক্ষুদ্র, অথচ সেই অসীমতারই অংশ।
রাতের নির্জনতায় দুজনেই ভাবছেন, তাদের এই সংলাপ তাদের মনের ভেতর যেন নতুন আলোর রেখা আঁকছে। অধ্যাপক এবং বাউল; উভয়েই অনুভব করলেন, কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেয়ে এই প্রশ্নটাকে গভীরতাকে হৃদয়ে ধারণ করে রাখাটাই সবচেয়ে বড় উপলব্ধি। তারা কেউ কারো ধর্ম বা মতবাদ পরিবর্তন করেননি, কিন্তু তারা দুজনেই আজ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন, যেখানে সব ‘আমি’ মুছে গিয়ে কেবল সেই ‘অজানার’ উপস্থিতিই সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
অধ্যাপক আফতাব উঠে দাঁড়ালেন। মনে হচ্ছে, এক নতুন পৃথিবীর দিকে পা বাড়াচ্ছেন তিনি। বাউলও হাসিমুখে তাকে বিদায় জানালেন। কোনো উত্তর ছাড়াই তারা ভাবছেন, আজ এমন এক সত্যকে ছুঁয়েছেন, যা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। সৃষ্টির রহস্যময় অচিন পাখিটি তখনো খাঁচায় আছে কি নেই—তা আর বড় প্রশ্ন নয়, বড় প্রশ্ন হলো, সেই অচিন পাখির সুরটি হৃদয়ে ধারণ করতে পারা।
সৃষ্টি রহস্যের কোনো শেষ নেই, আর মানুষের জানার আগ্রহেরও শেষ নেই। সেই অজানাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়। অধ্যাপক আফতাব বৃদ্ধ বাউলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কিছুদূর এগোনোর পরই আবার ফিরে এলেন। বৃদ্ধ বাউলের কাছে এসে বসলেন। বৃদ্ধ বাউল এবার উৎসুক চোখে তার দিকে তাকালেন। ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসি নিয়ে অধ্যাপক আফতাব এবার বললেন,
আপনার কাছে আরো কিছুক্ষণ বসি। আপনাকে বিরক্ত করছিনা তো?
বৃদ্ধ বাউল মুখে কিছু বললেন না। তার মুখের স্মিত হাসি যেন সাদরে গ্রহণ করল এই নতুন বন্ধুকে।

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login

  • probash khobor 4 hours ago

    একটা দারুণ ফিলসফিক্যাল স্টোরি। ক্লাসিক ওয়ার্ক।

  • আপনি আসলেই অনেক ভালো লেখেন।