বই পড়ার মাসিক বিল
আজকের নগরজীবন মানেই হল প্রতিটা চাহিদা মেটানোর জন্য আপনাকে অর্থ যোগান দিতে হবে। অসংখ্য চাহিদা সৃষ্টিকারী উপাদানের পসরা নিয়ে বসে এক একটা নগর। কোন কিছুরই অভাব নেই নগরের পথে-ঘাটে, অলিতে-গলিতে। তবে, আপনি যাই চান না কেন, সেটা এক গ্লাস পানি থেকে শুরু করে একটা বিলাসবহুল ফ্ল্যাট,আপনাকে অর্থ যোগান দিতে হবে। আমাদের পৃথিবী নিজ কক্ষে আবর্তিত হয় চব্বিশ ঘন্টায়, তবে নগর জীবনের আবর্তন মূলত মাস-কেন্দ্রিক। প্রতি মাসে এখানে নতুন করে জীবন শুরু হয়। নবাগত মাসে চলার হিসাব নিকাশ, গ্রহণ-বর্জন সবই করতে হয় মাসের শুরুতে। মাসের প্রথমেই আপনাকে বাসা ভাড়ার বিলটা দিয়ে দিতে হবে। আপনার বাসায় বিদ্যুৎ থাকবে, গ্যাস সংযোগ থাকবে, তার একটা মাসিক বিল আছে। বাসায় পত্রিকা রাখেন, ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, টিভি আছে; আপনাকের প্রতিটা চাহিদা পূরণের জন্য প্রতি মাসের শুরুতে আগের মাসের বিল পরিশোধ করতে হবে। আর এই বিল পরিশোধ করার জন্য আর্থিক সামর্থ অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ করতে হয়। পাশাপাশি খাবারের চাহিদা, পোশাকের চাহিদা ও অন্যান্য চাহিদা পূরণের জন্যও প্রতি মাসে আমাদেরকে অর্থ বরাদ্দ করতে হয় এবং তা খরচ করতে হয়।
আমরা যারা এসব চাহিদা পূরণ ও অর্থ যোগানে ব্যস্ত থাকি, তারা অনেক বড় একটা চাহিদার কথা ভুলে যাই। খাদ্য ও বস্ত্র যেমন আমাদের শরীরের চাহিদা, তেমনি শরীরের মত আমাদের মনের বা আমাদের আত্মারও চাহিদা আছে। কারণ শুধু শরীর দিয়ে মানুষ হয় না, শরীর এবং মন, এই দুই মিলে মানুষের অস্তিত্ব প্রকাশ ও পূর্ণতা পায়। সে মনের চাহিদা পূরণের সবচেয়ে বড় খাদ্য হল 'বই পড়া'। বই না পড়ে মনের সে চাহিদা পূরণ করা যায় না। তাই ডাচ দার্শনিক স্পিনোজা খাদ্য গ্রহণের সাথে বই পড়ার তুলনা করে বলেছিলেন, ‘ভাল খাদ্য বস্তুতে পেট ভরে, কিন্তু ভাল বই মানুষের আত্মাকে তৃপ্ত করে’। তাই আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, তৃপ্ত করার জন্য বই পড়তে হবে। তবে, আত্মার চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের কোন অর্থ বরাদ্দ থাকে কিনা, সে বিল আমরা পরিশোধ করি কিনা তা নিয়ে ভাবার দরকার আছে। পত্রিকা পড়াও এক ধরনের পড়া, তার জন্য একটা অর্থ বরাদ্দ আমাদের অনেকেরই থাকে। কিন্তু, শরীরের জন্য যেমন শুধু ভিটামিনই যথেষ্ট না, শর্করা, আমিষ, পানি ও স্নেহ জাতীয় খাবার লাগে, ঠিক তেমনি আত্মার চাহিদা পূরণের জন্য শুধু পত্রিকাই যথেষ্ট নয়, আরো বিভিন্ন ধরনের পাঠ্য উপাদান অবশ্যই দরকার আছে। তার মধ্যে বই নিঃসন্দেহে প্রধান পাঠ্য উপাদান। আপনার আত্মার চাহিদা পূরণের জন্য প্রেমের ও আবেগের কবিতা লাগবে, কল্পনাবিলাসী উপন্যাস লাগবে, জীবনমুখী কথাসাহিত্য লাগবে, দগ্ধ প্রবন্ধ লাগবে। তাহলেই কেবল আপনার আত্মার যে খাবারের চাহিদা তা পূরণ হবে। এ চাহিদা পূরণের জন্য আপনাকে অবশ্যই একটা অর্থ বরাদ্দ করতে হবে এবং তা খরচ করতে হবে। কারণ, দেহ যেমন খাবার ছাড়া বাঁচে না, আত্মাও খাবার ছাড়া বাঁচে না। আত্মার খাবার হল বই।
বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কম কথা হয়নি। রবি ঠাকুর বইকে দেখেছেন সাঁকোর মত করে। তিনি বলেছেন, ‘বই হচ্ছে অতীত আর বর্তমানের মধ্যে বেধে দেয়া এক সাঁকো।’ বই না পড়ে আপনি কখনো পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া সময়টা জানতে পারবেন না, বিশাল মন নিয়ে জন্মানো মানুষগুলোর সাথে দু-চারটা কথা বলতে পারবেন না। দার্শনিক রেনে ডেকার্তও বই পড়াটাকে অতীতের মানুষের সাথে কথোপকথনের মাধ্যম হিসেবেই দেখতেন। আর এই কথাটাই গ্যেটে একটু ঘুরিয়ে বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কতকগুলো বই সৃষ্টি হয় আমাদের শিক্ষা দেবার জন্য নয়, বরং তাদের উদ্দেশ্য হলো আমাদের এই কথা জানানো যে, বইগুলোর স্রষ্টারা কিছু জানতেন।’ অতীতের সেই জ্ঞান ভবিষ্যতের দিকে প্রবহমান রাখার জন্য, বর্তমানে থাকা মানুষকেই মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে হবে; এজন্য বই পড়ার কোন বিকল্প নেই। বই মানুষকে মানবতার পথের পথিক করে এবং সেই পথ থেকে বিচ্যুত হতে দেয় না। বই মানুষ হিসেবে মানুষকে পূর্ণতা দেয়, তাকে পরিপূর্ণ জীবনের স্বাদ দেয়। বই মানুষের মনে এই দৃশ্যমান পৃথিবী ছাড়াও আরেকটা ভুবন তৈরি করে, সেটা হল কল্পনার ভুবন। সেই ভুবনের মালিকানা একান্তই ঐ মানুষটি যিনি বই পড়েন। বইয়ের পাঠক স্বাধীনভাবে, নিশ্চিন্ত মনে কল্পনার ভুবনে বিচরণ করেন। বার্ট্রান্ড রাসেল এ জন্যই হয়তো বলেছেন, ‘সংসারে জ্বালা-যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে মনের ভেতরে আপন ভুবন সৃষ্টি করে নেওয়া এবং হতাশায় বা বিপদে সে ভুবনে ডুব দেয়া। যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, যন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার তত বেশি হয়।’ এই ভুবন সৃষ্টি হবে তখনই যখন মানুষের মনের সাথে বইয়ের একটা সম্পর্ক সৃষ্টি হবে। বই একদিকে যেমন মানুষের কল্পনায় দিগন্তবিস্তৃত ভুবন তৈরি করে, একই সাথে বই মানুষকে জীবনমুখী ও বাস্তববাদী করে তোলে। বই একজন মানুষকে প্রকৃত সফল ব্যক্তিদের কাতারে নিয়ে দাঁড় করায়। তাই বলা হয়, মানুষের জীবনের চলার পথে বইয়ের চেয়ে বড় বন্ধু যেমন হয়না, তেমনি এর চেয়ে বড় শুভাকাঙ্খী ও পথ-নির্দেশকও হতে পারে না। যে মানুষ বইকে তার জীবনের বন্ধু হিসেবে নিতে পারে, তার পার্থিব দুঃখ, শোক অনেকটাই কমে যায়। বই পড়া যে ভাল কাজ এবং দুনিয়ার মহৎ কাজসমূহের একটি এ কথা কেউই অস্বীকার করেনা। কিন্তু, বাস্তবতা ভিন্ন। বই পড়তে গেলে যেন আমাদের মধ্যে একটা গা সারা ভাব চলে আসে। তারও কারণ আছে। প্রমথ চৌধুরী বুঝেছিলেন আর তিনি বলেছিলেন, ‘দেহের মৃত্যুর রেজিস্টারি রাখা হয়, আত্মার হয় না।’ অথচ আমাদের দেহ ও আত্মা দুই মিলেই আমরা মানুষ, সে কথা ভুললে চলবে না। আত্মাকে বাঁচাতে না পারলে, মৃত্যুর পর নিশ্চিহ্ন হতে খুব বেশি সময় লাগে না। দেহ নশ্বর কিন্তু আত্মাকে আমরা অবিনশ্বর করে রাখতে পারি। সক্রেটিসের দেহ নাশ হয়েছে কিন্তু তার আত্মা অমর হয়ে আছে। শেইক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ, শেলী, নজরুলরা বেঁচে আছেন, তাদের দেহে নয়, তাদের কর্মে, তাদের জ্ঞান সাধনায়। আমরা এই সত্যটা উপলন্ধি করতে পারি না বলেই আত্মার মৃত্যুর হিসাব আমরা রাখি না। ফলে দেহের মৃত্যুর অনেক আগেই দেহের ভেতরে খাবার না পেয়ে আমাদের আত্মা মারা যায়। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন সত্যই বলেছিলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ পঁচিশ বছরে মারা যায় কিন্তু পঁচাত্তর বছরের আগে তাদের কবর হয় না।’ এভাবে, মৃতবৎ বেঁচে থেকে মাটির উপরে থাকা আর নিচে থাকার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই।
তবে, সব মানুষকে সাহিত্যিক হতে হবে, জ্ঞানের সাধক হতে হবে, দার্শনিক হয়ে হতে হবে, সে কথা বলছি না। যারা এরকম হতে পারেন তারা অতি উন্নত মানসের অধিকারী, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে, আপনি একজন ভালো সন্তান হয়ে বাঁচতে পারেন, একজন ভালো স্বামী হয়ে, ভালো পিতা হয়ে, সর্বোপরি, একজন ভালো মানুষ হয়ে বাঁচতে পারেন। জগতে যত ভালো আছে তার সব কিছুর সন্ধান পাওয়া যায় এই বইয়ের ভেতরে। এই বই আপনাকে উন্নত ও চৌকস মানসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবে, আপনাকে একজন ভালো মানুষ, একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ, একজন মানবিক মানুষ করে গড়ে তুলবে। আপনার দেহের শেষকৃত্যের পর আপনার আত্মা, আপনার মন, আপনার ভালো মানসিকতা ও কর্মের উদাহরণ আপনাকে অমর করে রাখবে। কোন বই পড়বেন তা ভাবার দরকার নেই। যে বই পড়তে ভালো লাগে, সেই বই দিয়ে শুরু করতে পারেন। বই-ই আপনাকে বলে দিবে আপনাকে সামনে আর কি কি বই পড়তে হবে। আবার, আপনি যদি চাকরিজীবী অথবা কর্মজীবী হন, আপনার সারাদিন বই পড়ার সুযোগ নেই, আবার দরকারও নেই। দিন ৩০ মিনিট করে পড়ুন অথবা ৪৫ মিনিট; ভোরে পড়ুন, সময় না হলে সন্ধ্যায়, অথবা রাতে ঘুমানোর আগে। কিন্তু, বই পড়তে হবে। জন্ম নিলেই প্রাণী হওয়া যায়, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে হলে আপনাকে বইয়ের স্বাদ আস্বাদন করে তবেই হতে হবে।
শেষ কথা হল এই যে, আমরা যারা দশ হাজার টাকা বাসা ভাড়ার জন্য বরাদ্দ করি, যারা আরো দশ হাজার টাকা খাদ্য সামগ্রীর জন্য মাসিক বরাদ্দ করি, পাঁচ হাজার টাকা পোশাকের জন্য অথবা এক-দেড় হাজার টাকা ইন্টারনেটের জন্য বরাদ্দ করি, তারা যেন মাসে অন্তত পাঁচশত টাকা হলেও বই কেনার জন্য বরাদ্দ রাখি। সাধ্য থাকলে বেশি, যদি না থাকে, আরো কম।বই সংগ্রহ করা মানে শুধুমাত্র একটা গল্প বা উপন্যাস সংগ্রহ করা নয়, বই সংগ্রহ করার মানে হল আনন্দ সংগ্রহ করা। তাই আনন্দের জন্য হলেও বই কিনতে হবে। আপনার যদি ইন্টারনেটের বিল দিতে কষ্ট না হয়, পত্রিকার বিল দিতে কষ্ট না হয়, তাহলে, মাসিক বই পড়ার এই বিল দিতে খুব কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আমাদের অনেকের কাছেই টাকা বড় না, ইচ্ছেটাই বড়। আসুন, বই পড়ার ইচ্ছেটাকে বাঁচিয়ে রাখি। দেহের ভেতরে আত্মাটাকে চির তরুণ করে রাখি।