গল্প।। মাতৃত্ব
সারমেয়টি ছিল লাওয়ারিশ, কিন্তু বিড়ালটি ছিল পোষা। বিড়ালটির অতীত অজানা হলেও এক গ্রীষ্মের দুপুরে কোনো এক গৃহস্থের বাড়িতে আশ্রয় পেয়ে সে পুরোপুরি পোষা হয়ে উঠেছিল। অন্ন ও আশ্রয়ের বিনিময়ে সে হয়ে উঠেছিল পরিবারেরই একজন।
কুকুরটির ইতিহাস ভিন্ন। পৌষের হাঁড়কাঁপানো শীতে দুর্ভেদ্য কুয়াশার ভেতর থেকে তার আবির্ভাব। অতঃপর সে হয়ে ওঠে বাজারের প্রহরী। সামান্য খাবারের বিনিময়ে শুরু করে নিয়মিত বিশ্বস্ত প্রহরাদান।
দুটি ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী হলেও ওদের প্রভুভক্তি ছিল অভিন্ন। ক্ষুধা নিবারণের কৌশলও ছিল প্রায় একই। বিড়ালটি ক্ষুধা পেলে গৃহস্বামী-গৃহকর্ত্রীর পরিধেয় বস্ত্র ধরে টানাটানি করত। তার পর রান্নাঘরে গিয়ে বোবা দৃষ্টিতে চেয়ে থাকত। খাবার পেলে খেয়ে আহার শেষে নানা ভঙ্গিতে গড়াগড়ি দিয়ে মনোরঞ্জনের চেষ্টা করত।
বাজারের কুকুরটির আচরণও ছিল চমকপ্রদ। ক্ষুধা পেলে সকরুণ দৃষ্টিতে মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকত। মানুষের চোখে চোখ পড়লেই বুঝতে পারত, লোকটির হৃদয়ে তার জন্য করুণা আছে কি না। তাই পছন্দের লোকগুলোর পিছু নিত। গভীর রাতে কেউ বাড়ি ফিরতে ভয় পেলে তাকে সঙ্গে করে ঘরে পৌঁছে দিত। দরজার খিল লাগানোর শব্দ শুনে আবার বাজারে ফিরে আসত। তার পর ঘেউ,ঘেউ... মানে হয়তো–‘শুভরাত্রি’।
আরেকটি অবিশ্বাস্য মিল ছিল তাদের মধ্যে। ওরা মানুষের ভাষা বুঝত। কিন্তু আফসোস, দু-একজন মানুষ ছাড়া ওদের ভাষা কেউ বুঝত না।
একবার বিড়ালটি গর্ভবতী হলো। তার ইচ্ছে হলো গৃহস্থের টঙে বাচ্চা প্রসব করার। বাচ্চা জন্মের পর তার আনন্দ যেন আর ধরে না। গৃহস্বামীর মনও ভরে উঠল অপার আনন্দে। তার মনে হলো, আত্মীয়-স্বজনকে মিষ্টিমুখ করানো যায়। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলেন, কেউ যদি প্রশ্ন করে, কীসের মিষ্টি?
‘আমার পোষা বিড়ালটির কয়েকটি ছানা হয়েছে’, বললে সবাই হয়তো হাসিতে লুটোপুটি খাবে। তাই মিষ্টিমুখের সিদ্ধান্ত বাতিল হলো।
তবে মা বিড়ালকে অভিনন্দন জানানো যাবে না, তা তো নয়। গৃহস্বামী বললেন, ‘তোদের জন্য খুব ভালো খাবারের ব্যবস্থা করব। একসঙ্গে এক লিটার দুধ আনব।’
বিড়ালটি যেন মানবশিশুর মতো খুশিতে লাফাতে লাগল।
কিন্তু সুখ তার কপালে সইল না। কিছুদিন পর একজোড়া বাচ্চা উধাও হয়ে গেল। বিড়ালটির কী কান্না! আহার-নিদ্রা বিসর্জন দিয়ে সে হন্যে হয়ে সন্তান খুঁজতে লাগল।
গৃহস্বামী খাবার এগিয়ে দিলে সে নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। একদিন গৃহস্বামী অশ্রুসিক্ত চোখে বললেন, ‘নে, আগে খেয়ে নে। তোর বাচ্চা দুটো হুলো খেয়েছে।
বাকিটা রান্নাঘরে নিয়ে আয়, না হলে সেটাও খেয়ে ফেলবে।’
বিড়ালটি সামান্য আহার করল। তার পর অবশিষ্ট ছানাটিকে মুখে নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল।
এদিকে কুকুরটিকে কয়েক দিন বাজারে দেখা গেল না। সবাই ভাবল, হয়তো অন্য কোথাও আশ্রয় নিয়েছে। আসলে সে বাজারেই ছিল। একটি পরিত্যক্ত গোডাউনে আশ্রয় নিয়েছিল, কারণ সে পোয়াতি।
কিছুদিন পর দেখা গেল, ফুটফুটে ছয়টি সারমেয়-ছানা। মাতৃত্ব যেন কুকুরটির চোখে নতুন এক আলো এনে দিল। তার চোখে মমতার ঢেউ। সন্তানদের রক্ষায় সে যেন এক নতুন সংগ্রামে নেমেছে। সে সংগ্রামে পরাজয় বলে কিছু নেই। কারণ মাতৃত্বের শক্তির কাছে পরাজয়ের ইতিহাস লেখা নেই।
ইতোমধ্যে জোড়া-বাচ্চা হারানোর শোক কাটিয়ে উঠছিল বিড়ালটি। কিন্তু তার আচরণ তখনো স্বাভাবিক হয়নি। এক রাতে গৃহস্বামী ঘুমিয়ে পড়ার পর রান্নাঘর থেকে হঠাৎ ভাঙচুরের শব্দ এল।
টর্চ হাতে তিনি ছুটে গিয়ে দেখলেন, থালা-বাসন এলোমেলো। বিড়ালটি উন্মাদের মতো লাফালাফি করছে। তার ছানাটি কোথাও নেই।
গৃহস্বামী নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল সন্তানহারা এক মায়ের ছবি। কোনো দস্যু এসে যার কোল থেকে কেড়ে নিয়েছে প্রিয় সন্তান। এক সংজ্ঞাহীন নারী যেন তছনছ করে ফেলছে তার ঘর। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই।
ঠিক তখন গৃহকর্ত্রী এসে রান্নাঘরের অবস্থা দেখে চিৎকার করে বললেন, ‘এই, তুই বের হ! আমার ঘরে যাতে তোকে আর না দেখি।’
মা বিড়ালটি নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। আর কখনো ফিরে আসেনি।
কুকুরটির ছানাগুলোর বয়স তখন মাত্র সাত দিন। এক বিকারগ্রস্ত যুবকের চোখে পড়ল ছানাগুলো। নিষ্ঠুর যুবকটি ছয়টি ছানাকে একটি বস্তায় ভরে খালে ডুবিয়ে দিল।
কুকুরটি জানত না তার সন্তানদের কী হয়েছে। হন্যে হয়ে পুরো বাজার খুঁজতে লাগল। পরিচিত মানুষ দেখলেই করুণ সুরে যেন জিজ্ঞাসা করত, ‘আমার সোনামণিদের দেখেছ? ওদের পাচ্ছি না।’
তার স্তনে তখনো জমে ছিল দুধ। কিন্তু সন্তানকে দুধ খাওয়ানোর সুযোগ আর নেই। কেউ খাবার দিলে সে খেত না। সন্তান ছাড়া কোনো মা কি খেতে পারে?
মানুষের ওপর, মানবসমাজের ওপর যেন তার অন্তহীন ক্ষোভ। কিন্তু ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা নেই, বিচার চাওয়ার সুযোগও নেই। তাই অদ্ভুত এক সুরে তার কান্না থামত না। চোখে ছিল অনন্ত অপেক্ষা।
এই অপেক্ষা হয়তো একদিন অনাহারে, অপমৃত্যুতে শেষ হয়ে যাওয়াই নিয়তি!
এই তো সেদিন এই বাজারেই চলন্ত রিকশা থেকে এক ছিনতাইকারী হানা দিল। রিকশায় থাকা মায়ের কোলে ছিল ছয় মাসের শিশু, হাতে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ। ছিনতাইকারী ব্যাগটি ছিনিয়ে নিতে সজোরে টান দিল। আকস্মিকতায় মা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার কোলের শিশুটি রাস্তায় পড়ে গেল।
ছয় মাসের তুলতুলে কোমল শিশুটি পিচঢালা পথে ফুলের মতো ঝরে গেল। মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা জনপদ। যেন থেমে গেল ঘড়ির কাঁটা, থেমে গেল ব্যস্ত নগরীর সব চাকা।
এত এত অনাচার দেখে সূর্য কী সূর্যমুখী হয়ে অপমৃত্যুর শিকার সবশিশুর পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিল? রাতের তারাগুলো ফুল হয়ে তাদের জন্য মালা গাঁথতে চেয়েছিল? চাঁদ কী চেয়েছিল শিশুটির কপালে এসে বসতে?
কিন্তু সন্তানহারা মায়েদের কাছে এসবের কোনোটিই সান্ত্বনা হতে পারে না।
সেদিন যদি আকাশ ভেঙে পড়ত, মৃত্তিকা যদি গ্রাস করত সেই সব নির্বোধ সংহারককে, তবুও হয়তো মায়ের সামান্য সান্ত্বনা মিলত না।
হয়তো নির্বাক সেই মায়েরা তখনো বলতেন, ‘ওকে মেরো না। ও মরলে নিশ্চয়ই কোনো মায়ের বুক খালি হবে। আর কোনো মায়ের বুক খালি করো না।’
মাতৃত্বের এই বেদনার কাছে মানুষ, পশু, দেবদূত সবাই যেন অসহায়। সব মায়ের অনুভূতি একই সুতোয় বাঁধা। সন্তান হারানোর ব্যথায় কোনো প্রজাতির ভেদাভেদ নেই।
মায়েরা তাদের দিব্যদৃষ্টিতে হয়তো দেখতে পান, তাদের সোনামণি অন্য কোনো জগতে নতুন বন্ধুদের সঙ্গে খেলছে। সেখানে কুকুরছানা বা বিড়ালছানা বলে কোনো শব্দ নেই। নেই কোনো হুলো, নরপিশাচ কিংবা ছিনতাইকারী নামের কারো আনাগোনা।
সেই জগতের সবকিছুই কোমল। ফুল শিশু, ফল শিশু, জল শিশু। প্রকৃতির প্রাণ ও নিষ্প্রাণ সবকিছুই যেন অনন্তকালব্যাপী শিশু।
জায়গাটার নামও বেশ সুন্দর, শিশুস্বর্গ। সেখানে সকালও শিশু, বিকালও শিশু। দিন, মাস, বছরগুলোও শিশু-দিন, শিশু-মাস, শিশু-বছর।
সব শিশুহারা মা হয়তো কেবল দিব্যদৃষ্টিতেই অবলোকন করতে পারেন সেই শিশুতোষ জগৎ।
সেই জগৎ শাশ্বত সুন্দর, শিশুদের জন্য কেবল।
রাসেল হোসেন
লেখক ও শিক্ষক