হিজরতের পর মদিনায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রাথমিক সময়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ কুরাইশদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে কয়েকটি সামরিক দল প্রেরণ করেন। এর মধ্যে উবাইদাহ ইবনুল হারিস (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন সারিয়্যাহটি ইসলামের প্রথমদিকের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানগুলোর একটি। তবে এর ক্রম নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে মতভেদ রয়েছে। ইবন হিশামের বর্ণনায় হামযা (রা.) ও উবাইদাহ (রা.)-এর অভিযান একই সময়ের কাছাকাছি প্রেরিত হওয়ার কথা পাওয়া যায়; আবার কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে উবাইদাহ (রা.)-এর অভিযানকে হামযা (রা.)-এর পরের অভিযান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এটিকে নিঃশর্তভাবে “ইসলামের দ্বিতীয় সারিয়্যাহ” বলা হলে সেই মতভেদটি উল্লেখ করা উচিত।
উবাইদাহ ইবনুল হারিস (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আত্মীয় ও প্রাথমিক যুগের একজন সাহাবি। তাঁর নেতৃত্বে মুহাজির সাহাবিদের একটি দল মক্কার দিকে অগ্রসর হয়। প্রচলিত সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী তাঁদের গন্তব্য ছিল রাবিগ (رابغ) অঞ্চলের কাছাকাছি। সেখানে মুসলিম দলটি কুরাইশদের একটি দলের মুখোমুখি হয়। কুরাইশদের নেতৃত্বে ছিলেন আবু সুফিয়ান ইবন হারব—এমন বর্ণনাও সীরাতের বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি, তবে পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছিল যে উভয় পক্ষ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল।
এই ঘটনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর তীর নিক্ষেপের বর্ণনা। কিছু প্রাচীন সীরাত ও মাগাজি সূত্রে বলা হয়েছে, মুসলিম পক্ষ থেকে সা‘দ (রা.) একটি তীর নিক্ষেপ করেন এবং এটিকে ইসলামের সামরিক ইতিহাসে প্রথম নিক্ষিপ্ত তীর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়নি এবং তারা পৃথক হয়ে যায়। তবে এই ঘটনার বিভিন্ন বিবরণে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ও কিছু বিবরণে পার্থক্য রয়েছে; তাই নির্দিষ্ট সংখ্যাগুলোকে চূড়ান্ত হিসেবে উপস্থাপন না করাই অধিক সতর্ক পদ্ধতি।
উবাইদাহ (রা.)-এর এই অভিযান থেকে বোঝা যায় যে মদিনায় হিজরতের পর মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে সংঘাত তখনও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছায়নি, কিন্তু দুই পক্ষের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বদর যুদ্ধের মতো বড় সংঘর্ষের পূর্বে এ ধরনের ছোট ছোট সারিয়্যাহ মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যকার রাজনৈতিক-সামরিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ইতিহাসবিদদের গবেষণায় দেখা যায়, হিজরতের পর বদরের পূর্ববর্তী প্রায় এক বছরের মধ্যে একাধিক সামরিক অভিযান সংঘটিত হয়েছিল এবং এসব অভিযানের ক্রম ও তারিখ সম্পর্কে ইবন ইসহাক, ইবন হিশাম ও আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে।
এই সারিয়্যাহকে বোঝার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—এটি বদরের মতো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ছিল না। বরং এটি ছিল কুরাইশদের গতিবিধির মুখোমুখি হওয়া একটি প্রাথমিক সামরিক অভিযান, যেখানে সীমিত সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হলেও বড় যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। পরবর্তী ইতিহাসে মুসলিমদের সামরিক সংগঠন, নেতৃত্ব ও কৌশলগত প্রস্তুতির বিকাশের ধারায় এই অভিযানগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রধান তথ্যসূত্র: ইবন হিশাম, আস-সীরাহ আন-নাবাওয়িয়্যাহ; ইবন সা‘দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা; আল-ওয়াকিদি, কিতাবুল মাগাজি; এবং পরবর্তী সীরাতগ্রন্থসমূহ। ইবন হিশামের মূল বর্ণনায় হামযা (রা.)-এর সারিয়্যাহর ৩০ জন মুহাজিরের কথা স্পষ্টভাবে এসেছে এবং উবাইদাহ (রা.)-এর অভিযান সম্পর্কেও প্রাচীন সূত্রে পৃথক বর্ণনা রয়েছে।