সারিয়্যাহ হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব (রা.) ইসলামের প্রাথমিক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান। হিজরতের পর মদিনায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হলেও মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা তখনও অব্যাহত ছিল। মক্কায় দীর্ঘদিন মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, সম্পদ ও ঘরবাড়ি থেকে বঞ্চিত করা এবং তাদের মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য করার পর নতুন পরিস্থিতিতে মুসলিমদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে রাসুলুল্লাহ ﷺ কয়েকটি সামরিক দল বিভিন্ন দিকে পাঠান, যার অন্যতম ছিল হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন এই সারিয়্যাহ।
হামযা (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর চাচা এবং ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম সাহসী ও মর্যাদাবান সাহাবি। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে প্রায় ত্রিশজন মুহাজির সাহাবির একটি দলের নেতৃত্ব দিয়ে মদিনার উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে পাঠান। ঐতিহাসিক সূত্রে এই অভিযানকে সাধারণত সীফুল-বাহর বা সমুদ্র উপকূলের অভিযান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মুসলিম দলটি সেখানে পৌঁছালে তারা কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফেলার মুখোমুখি হয়। কাফেলাটিতে প্রায় তিনশত আরোহী থাকার কথা বিভিন্ন সীরাতগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে এবং এর নেতৃত্বে ছিলেন কুরাইশ নেতা আবু জাহল ইবন হিশাম।
দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নেওয়ার পর পরিস্থিতি সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যায়। মুসলিমদের নেতৃত্বে ছিলেন হামযা (রা.), আর কুরাইশদের পক্ষে ছিলেন আবু জাহল। উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। মাজদি ইবন আমর আল-জুহানি নামের একজন ব্যক্তি দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করেন। তাঁর মধ্যস্থতার ফলে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং উভয় পক্ষ সংঘর্ষে না জড়িয়ে নিজ নিজ অবস্থানে ফিরে যায়। ফলে এই সারিয়্যাহতে কোনো বড় ধরনের যুদ্ধ বা প্রাণহানি ঘটেনি।
এই অভিযানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব মূলত এর প্রাথমিক পর্যায়ের সামরিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের মধ্যে নিহিত। মদিনায় হিজরতের পর মুসলিম সমাজকে শুধু ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি সংগঠিত সম্প্রদায় হিসেবে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করতে হচ্ছিল। কুরাইশদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও সামরিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণও তখনকার বাস্তবতার অংশ ছিল। তাই এই ধরনের সারিয়্যাহকে পরবর্তী বৃহত্তর সংঘর্ষগুলোর পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখা হয়।
এখানে ‘সারিয়্যাহ’ ও ‘গাজওয়া’ শব্দের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের সীরাতের পরিভাষায় যে সামরিক অভিযানে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে উপস্থিত ছিলেন না এবং তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাহাবিকে নেতৃত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল, সেটিকে সাধারণত সারিয়্যাহ বলা হয়। আর যে অভিযানে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে অংশগ্রহণ করেছেন, সেটিকে গাজওয়া বলা হয়। হামযা (রা.)-এর এই অভিযান ছিল সারিয়্যাহ, কারণ রাসুলুল্লাহ ﷺ এতে সরাসরি অংশগ্রহণ করেননি।
এই ঘটনা পরবর্তী ইতিহাসের দিকে তাকালে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর কিছুদিন পর মুসলমান ও কুরাইশদের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয় এবং শেষ পর্যন্ত বদর যুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। তাই হামযা (রা.)-এর সারিয়্যাহকে ইসলামের প্রাথমিক মদিনা-পর্বের সামরিক ইতিহাসের সূচনালগ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এটিকে সরাসরি একটি বড় যুদ্ধ বলা সঠিক নয়; বরং এটি ছিল একটি সামরিক অভিযান, যেখানে দুই পক্ষ মুখোমুখি হলেও মধ্যস্থতার কারণে যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি।