Story

বাড়িওয়ালা।

September 28, 2026

7 views

গত কয়েক দিন ধরে মনে শান্তি পাচ্ছি না। বছর দুয়েক আগে পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের চারতলা কমপ্লিট করে পাঁচতলার কলামগুলো দাঁড় করিয়ে রেখেছি। ব্যাংকে কিছু লোন নেওয়া আছে। বাসা ভাড়া আর নিজের বেতন থেকে কিছু দিয়ে লোনের কিস্তি যাচ্ছে। এক এনজিও খুব করে ধরেছে, পাঁচতলা সেরে দিলে ভাড়া নেবে। কলামগুলো খোলা পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। কী যে করি? ভেবে উপায় পাচ্ছি না। বউকে বিষয়টা বললাম। বউ হালকা খেঁকি মেরে বলল, “তুমি আছো বাড়ি বাড়ি করে, এদিকে বড় আপা তার পরিবার নিয়ে দার্জিলিং যাচ্ছে। গত বছর তোমাকে বলে রেখেছিলাম, কথা দিয়েছিলে এবার যাহোক একটা ব্যবস্থা করে যাবে। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো ঝামেলা করে যাও না। আমার কপালটাই খারাপ।” আমার মেজাজটা বিগড়ে গেল। কোনোরকম নিজেকে সামলে নিলাম। ইদানীং প্রেশারটাও ভালো রকম ওঠানামা করছে। বউকে বললাম, “ঠিক আছে, তোমার শখটাই পূরণ করব।” আসলে আমি বাড়িটা নিয়ে চিন্তিত। পাঁচতলাটা সারতে পারলে ভালো অ্যামাউন্টের ভাড়া পাওয়া যেত। তাছাড়া কলাম গুলো কবেকার করা ,ড্যামেজ হয়ে যাচ্চে। এদিকে বউ বলল, “থাক, আমার শখ আর পূরণ করতে হবে না। নিজের শখটাই পূরণ করো।” কথাটা শুনে মাথাটা ঘুরে গেল। বউকে কিছু না বলে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। মাঝরাতে হঠাৎ শরীরটা খারাপ লাগতে লাগল। ভালো ঘুম হলো না। কিছু ভালো লাগছে না। এইসব বাড়িঘর কার জন্য করছি, কেন করছি—নানান ভাবনায় রাতটা পার হয়ে গেল। যথারীতি কোনো রকম খেয়ে অফিসে রওনা হলাম। বউয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। নিজেকে অপরাধী লাগছিল। বিষণ্ন মুখে অফিসে গেলাম।

আমার এক কলিগ—কলিগ বলা ঠিক হবে না, ওর সাথে যেহেতু আমার জীবনের অনেক কিছুই শেয়ার করি, বন্ধুই বলা যায়—ও আমাকে দেখেই বলল, “রাহাত ভাই, আজকে কেমন যেন আপনাকে লাগছে?” আমি তেমন কিছু না বলে উড়িয়ে দিলাম। সেও আর তেমন কিছু বলল না। সারা দিন আমার মনটাও কেমন যেন বিক্ষিপ্ত। কিছুই ভালো লাগছিল না। বিকেলের দিকে আবার আমার কলিগ কাম বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “বিষয়টা কী বলেন তো? বেশ কিছুদিন আপনাকে বিষণ্ন লাগছে, আর আজকে একটু বেশিই মনে হচ্ছে।” আমি তাকে সব খুলে বললাম। তো সে আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “ভাই, চিন্তা কইরেন না। সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। এইসব বাদ দেন। তার চেয়ে বরং চলেন, পদ্মার ধারে থেকে ঘুরে আসি। একটু খোলা হাওয়া খেয়ে আসি, একটু ভালো লাগবে।” কিছু না ভেবেই বললাম, “চলেন, যাই।” দুজন মিলে বাইক করে পদ্মার ধারে চলে গেলাম।

পদ্মার ধারে গিয়ে নৌকার ওপর গিয়ে বসলাম। মনটা একটু ভালো লাগছিল। আসলে প্রকৃতি মানুষকে জঞ্জালভরা সংসারজীবন থেকে মুক্তি দেয়, যদিও মানুষ সে মুক্তি বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না। সামনে দিয়ে বাদামওয়ালা যাচ্ছিল। আমার কলিগ আবার বাদাম খুব পছন্দ করে। সুযোগ পেলেই বাদাম কিনে খাবে, আর বাদাম খেতে খেতে তার প্রেমের পুরোনো দিনের কথা তুলবে। আমি নৌকা থেকে নেমে গিয়ে ১০০ গ্রাম বাদাম নিলাম। নৌকার একদম কোনায় গিয়ে দুজনে বাদাম খেতে লাগলাম। একটু অন্যমনস্ক ছিলাম। তারপর হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমার কলিগ কী যেন দেখছে। আমিও তাকিয়ে দেখলাম, বাদামওয়ালা চাচা মনের সুখে টাকা গুনছে। তার মুখে একেকটা টাকা গুনে আর খুশির ঝিলিক বয়ে যায়। আমাদের বন্ধুটি চাচাকে জিজ্ঞাসা করেই বসলো, “চাচা, কত টাকার বিক্রি করলেন?” চাচা বলল, “আজকে বেশ ভালোই বিক্রি হয়েছে।” আমি বললাম, “কত টাকা, চাচা?” জবাবে চাচা বলল, “৬৬০ টাকার মতো। এ বেলা থাকতে পারলে আরও এক-দেড়শো টাকা হবে হয়তো।” চাচা কথা বলার সময় চোখেমুখে তৃপ্তির ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। আমি আগ্রহী হয়ে চাচাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “চাচা, আপনার বয়স কত?” চাচা বলল, “কত আর হবে! যুদ্ধের সময় হাফপ্যান্ট পরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কত খাবার-টাবার নিয়ে গেছি।”

আমার বন্ধু একটু মজা করেই বলল, “চাচা, চাচি কি বেঁচে আছেন?” চাচার চোখে আরও বড় ঝিলিক খেলে গেল। চাচা বলল, “চাচি আছে বলেই তো এই করে পরিপাটি করে থাকি। দেখছেন না, আপনার চাচি কী সুন্দর করে সরিষার তেল দিয়ে মাথা আঁচড়ায়ে দিয়েছে।” “তা চাচা, আপনার কি প্রেমের বিয়ে নাকি?” “না চাচা, সেই সময় আর প্রেম-টেম কই ছিল! প্রেম হইলো এ জামানার।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “চাচার কয় ছেলে-মেয়ে?” চাচা বলল, “আমার ১ মেয়ে, ৩ ছেলে।” “তারা কী করে?” চাচা বলল, “বড় ছেলে শ্বশুরের এলাকায় জমি কিনে বাড়ি করেছে। মেঝো ছেলেটা ভাঙাড়ির ব্যবসা করে। আর ছোট ছেলেটা ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করে।” “আর মেয়েটা?” চাচা বলল, “মেয়েটার আল্লাহর রহমতে ভালো জায়গায় বিয়ে হয়েছে। জামাইয়ের খাবারের হোটেল আছে।” আমার বন্ধুটি বলে উঠলো, “বাহ, চাচার তো দারুণ সুখ!” চাচা বলল, “হ, বাবা, ভালোই আছি তোমাদের দোয়ায়। এই বাদাম বেচে আর তোমার চাচীর গরু পেলে চার রুমের টিন আর ইটের বাড়িও করেছি। ছেলেরাও যে যার মতো ভালো আছে—এই তো সুখ রে বাবা।” পাশেই একজন বাদাম নিতে আসল। চাচা বাদাম বিক্রয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। এদিকে আমি আর আমার বন্ধু বাদাম খাওয়া আর পদ্মার পাড়ে হাওয়া খেয়ে সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরলাম। আমার কলিগ অবশ্য জিজ্ঞাসা করছিল, “এখন কি একটু ফ্রেশ লাগছে, ভাই?” আমি তাকে বললাম, “অনেকটা হালকা লাগছে।”

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login