সময় চলে যায় সময়ের গতিতে তেমনি আজ মায়া নগরে কেটে গেছে পাঁচ পাঁচটা বছর। প্রাসাদে পাঁচ বছর আগে কি কি ঘটেছে তা এখন পুরো রাজ্যের জানা। রাজ বাড়িতে আর কোন নতুন দাস দাসি যুক্ত হয়নি। প্রাসাদের নীচে অবস্থানরত দাসিরাই বর্তমানে রাজ প্রাসাদ দেখভাব করে। বর্তমানে চুরি খুন ধর্ষণ অনেক বেড়ে গেছে কেননা এখন আর বিচার হয় না। যে চুরি করে সে নিরদ্বিধায় ঘুরে বেড়ায়, যে খুন করে তাকে দেখে ভয়ে মানুষ সম্মান করে আর যে ধর্ষণ করে তার কথা তো বলাই উচিত নয়। যে রাজ্যে শাসন নেই সে রাজ্যে এটা হওয়া স্বাভাবিক। আর শাসন থাকবেই বা কিভাবে, যে শাসন করতো সেই তো নেই। বর্তমানে মায়া নগর রাজ্যই সব চেয়েমুখি রাজ্যের তালিকায় সর্বোচ্চ স্থানে যেখানে ৫ বছর আগের তার সর্ব নিম্ন স্তরে ছিলো। এখন রাজকন্যা কবে বড় হবে আর কবেই বা নতুন শাসন প্রতিষ্ঠা করবে।
আজ রাজ কন্যা নীলিমার ৬ বছরের জন্ম দিন। যা উপলক্ষে প্রাসাদে আজ এক বিশাল খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। দাসিরা রাণীকে যে কথা দিয়েছিলো তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে। তারা রাজকুমারী নীলিমাকে এমন যত্নে রেখেছে যে নীলিমা একবারের জন্যেও তার বাবা মায়ের কথা জিজ্ঞেস করেনি।
সন্ধা ৭:৩০ বাজে মানুষের খাওয়া দাওয়া শেষ তারা এতক্ষনে চলে গেছে। রাজ্যের সবাই ভাবছে হয়তো আজকের মতো অনুষ্ঠান শেষ তবে তারা এটা জানে না যে এই অনুষ্ঠানে শুধু মানুষ নয় পরিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে আর এখন তারা আসছে। রাজ বাড়ির সাথে পরিদের এক অদ্ভুত সম্পর্ক ছিলো অনেক আগে থেকেই। বলা হয় রাজার সাত পুরুষ আগে এই রাজ্যের যে রাজা ছিলো সে একজন পরিকে বিয়ে করেছিলো। তারপর থেকেই পরিরা রাজবাড়ির সদস্যদের সামনে আসে। রাজবারির মানুষরাও এটাকে বেশ স্বাভাবিক নেয় যা অন্যান্য মানুষদের কাছে খুবই অলৌকিক ব্যাপার।
রাজকন্যা নীলিমা বসে বসে খেলছে সে খুবই হাসি খুশি তার হাসি দেখলে দাসিরা শান্তি অনুভব করে যেন।
দাসিরা আপসোস করে কাজকুমার নীল আর রাজকুমারী নীলা যদি জিবিত থাকতো তাহলে তারাও হয়তো এরকম করে হাসতো।
দাসিদের ধারণা নীল আর নীলিমা মারা গেছে তবে তারা যেম কোথায় আছে তা জানে না কেউই।
অনেক সময় পেরিয়ে গেছে পরিরা এখন চলে যাবে তবে তার আগে প্রধাাণ ৫ পরি রাজ কন্যাকে কিছু উপহার দিতে চায়। পরিরা অবশ্যই মানুষের মতো কোন কিছু দেবে না তাই দাসিরা এটা ভেবে ব্যাকুল হচ্ছে যে তারা রাজকন্যাকে কি দেবে।
অতঃপর সবচেয়ে বড় পরি এগিয়ে এলো এবং তার হাতে থাকা জাদুর কাঠি নীলিমার মাথায় ছুঁইয়ে বলতে লাগলো— "সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী হও"।
এরপর দ্বিতীয় পরি এলো এবং সেও আগের পরির মতো করে বলতে লাগলো— "সুন্দর কন্ঠের অধিকারী হও"।
তৃতীয় পরি বলল— "লম্বাচুলের অধিকারী হও"।
চতুর্থ পরি বলল— "গুনবতী হও"।
এবার পঞ্চম পরির পালা। সে এবার এগিয়ে এলো। সে যখনই নীলিমার মাথায় তার জাদুর কাঠিটি ছোঁয়াতে যাবে তখনই পিছন থেকে এক কর্কশ কন্ঠ ভেসে এলো— "আমাকে ছাড়াই?"
তার কন্ঠ শুনে উপস্থিত সবাই পিছনের দিকে তাকালো।
সর্বনাশ কালো পরি!
"আমাকে বল্লে না যে।"— এ কথা বলেই উক্ত পরিটি অর্থাৎ কালো পরিটি ভিতরে প্রবেশ করলো।
সেখানে থাকা দাসি গুলো ভয়ে জোরসোরো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আসলে এই পরিটি কোন সাধারণ পরি না। সে সবার ক্ষতি করে, যাকে ইচ্ছা তাকে অভিশাপ দিয়ে বসে। তাই দাসিরা তাকে আসতে বলে নি আর বাকি পরিদেরও বলেছিল সে যেন কোন ভাবেই না জানে এই উৎসবের ব্যাপারে।
পরিরাও তাকে পছন্দ করতো না তাই তারও কেউ জানায়নি। কিন্তু সে এখন কিভাবে জানলো আর কিভাবেই বা এখানে আসলো।
"কি ভাবছিস আমি জানতে পারবো না? আরে পরি আমি, মানুষ না। আমার কাছে যে ক্ষমতা আছে তা তোদের ধারননার বাইরে। এবার বল বলিস নি কেন?"
একটা দাসি খুব ভয়ে ভয়ে বলল— "আসলে ভুলে গিয়েছিলাম।"
পরিটি বেশ বিরক্ত হলো।
"ভুলে গিয়েছিলে নাকি বলতেই চাওনি এটা আমি বেশ ভালো করেই জানি।"
এরপর সে নীলিমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল— "আচ্ছা এসব কথা বাদ, এসেই যখন পড়েছি তখন আমিও কিছু উপহার দিয়ে যাই।"
উপস্থিত সকল দাস দাসি ও পরিরা যেন হাফ ছেড়ে বাচলো। তারা ভাবলো নীলিমার মুখটা দেখে হয়তো তার মায়া হয়েছে।
এরপর সে নীলিমার কাছে যায় এবং বলতে থাকে— "তুষার কন্যায় রূপান্তরিত হও।"
সাথে সাথে উপস্থিত সকলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এটা কি করলো সে, রাজকন্যাকে অভিশাপ দিয়ে দিল!
(বরফ কন্যা বা তুষার কন্যা বলতে বরফে জমা যাওয়াকে বোঝায় না, এটা এমন এক সত্তা যা রাক্ষসের চেয়েও ভয়ঙ্কর। কাঙ্খিত সময় হলে একটা সাধারণ মানুষ নিজের মধ্যে থাকে না, সে সব কিছু শেষ করে দেয়। তাকে মানুষের রক্ত খেয়ে বাচতে হয় এবং তার কাছে কিছু বিশেষ ক্ষমতা থাকে যেমন বসিকরন, বরফের জমিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। মোট কথা এটা একটা ভয়ঙ্কর সত্যা বা জীব)।
"কি করলে এটা?"— উপস্থিত পরির মধ্যে থেকে একটা পরি এই কথাটি বলে উঠলো।
"যা করি সব সময় তাই করলাম।"
"তুমি ভাবতে পারছো তুমি একটা নিশপাপ বাচ্চার জীবনকে ধ্বংস করে দিলে?"
"ওহহো আমার কাছে এত ভাবার সময় নেই তুমিই ভাবো। আমি তবে আসি।"
এক কথাটি বলে পরিটি চলে গেলো।
দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জ্বিনটি মুচকি হেসে বলল— "সব কিছু ঠিক ঠাকি চলছে।"
অন্যদিকে সব দাসিরা কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে নীলিমার জন্য, তবে বেচারি নীলিমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না কি হলো এসব।
হঠাৎ যেই পরিটিকে কালো পরি আটকে দিয়েছিলো সে সামনে এসে দাঁড়ায়। সে দাসিদের উদ্দেশ্য বলে— "তোমরা কান্না করো না আমি কিছু করছি।"
সাথে সাথে দাসিদের মুখে হাসির ঝলক দেখা গেলো এবং একটা দাসি বলে উঠলো— "তুমি পারবে রাজন্যার অভিশাপ কাটাতে?"
পরিটি বলল— "অভিশসপ তো কাটাতে পারবো না কিন্তু এর মুক্তির পথ বলে দিতে পারি।"
এরপর পরিটি নীলিমার মাথায় তার জাদু কাঠি ছুঁইয়ে দিয়ে বলল— "তুমি যখন তোমার ভাই বোনের সাথে মিলবে, তাদের আনতে পারবে, তারা তোমাকে চিন্তে পারবে তখন তুমি এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।"
"কিন্তু ওর ভাই বোনরা তো মরা গেছে।"
দাসির এই কথা শুনে পরিটি মুচকি হেসে বলল— "ওরা জীবিত।"
"কিহ সত্যিই!"
দাসিদের মুখে একটু খুশির ঝলক দেখা গেলো।
"কিন্তু কোথায় ওরা?"
"সেটা তো আমি জানি না, সেটা সময়ই বলে দিবে। তবে একটা কথা মনে রেখো, নীলিমাকে প্রাসাদের বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না। বিশেষ করে রাতে আর আরো বিশেষ করে ওর ১৫ বছরের জন্মদিনের দিন। কেননা কেউ তুষার কন্যা হলে তার পনেরো বছর থাকাটা জরুরি আর পনেরো বছরের জন্মদিনেরি দিনই এটা বেশি প্রকাশ্যে আসে তাই সাবধান।"
এই সব কথাগুলো বলেই সকল পরি চলে গেলো।
দাসিদের মনে পরে যায় রাণীর বলা কথা গুলো। সেও তো বলেছিল নীলিমার অভিশাপ লাগবে যা আজ সত্যি হলো। রাণী আগে কিভাবে জানলো!
"আচ্ছা এসব চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে ঘুমাতে চলো এখন আমাদের শুধু রাজকন্যাকে দেখে রাখতে হবে আর ওনার ভাই বোনকে খুঁজতে হবে..."