Posts

গল্প

রক্ত

June 11, 2024

রাকিব হাসান

19
View

রক্ত 

আরজ আলী মেম্বার যখন মাগরিবের নামাজ শেষ করে ঘরে ফিরলেন তখন সেখানে থাকা সকলেই একটু নড়েচড়ে বসল। মেম্বার সাহেবের এই ঘরটা নতুন, কিন্তু দৃশ্যটা নতুন নয়। কদমিরচর গ্রামে গত তিরিশ বছরে যত সালিশ হয়েছে তার কেন্দ্রে ছিলেন আরজ আলী মেম্বার, গত ষাট বছরে যত বিচার হয়েছে সবগুলোর সাক্ষী তিনি, গত আশি বছরে যত ঘটনা ঘটেছে সেখানে তার উপস্থিতি ছিল কোন না কোন ভাবে; সেটা হতে পারে তার মায়ের বুকের দুধ খাওয়া বা বাড়ির উঠানে গড়াগড়ি খাওয়া। তবে, তার সুবৃহৎ বসত বাড়ির মাঝখানে এই টিনশেড বিল্ডিং-এ এটাই প্রথম জমায়েত। গত একশ বছরের সকল গ্রাম্য সালিশের সাক্ষী তার দাদার আমলের সেই বাংলো ঘরটা আজ আর নেই-যেটা ছিল এই নতুন টিনশেড বিল্ডিং এর ঠিক পূর্ব পাশেই। সব কিছু বদলে যাচ্ছে দ্রুত। বাড়িতে বাড়িতে পুরনো ঘর ভেঙ্গে নতুন ঘর বা বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। কাঁচা মাটির রাস্তা পাকা হয়ে যাচ্ছে কোথাও কোথাও। বিদ্যুৎ চলে এসেছে এই কালাপাহাড় চরের প্রতিটা গ্রামে, প্রতিটা ঘরে। 

মাগরিবের নামাজ শেষ বাম কাঁধে সালাম ফেরাতেই শুনেছিলেন ঘটনার সারকথা, এবং বেশ বুঝতে পারছিলেন ইতোমধ্যেই তার বাড়িতে একটা বড় ধরনের জনসমাগম হয়ে গেছে যদিও তিনি এখনআর কদমিরচর গ্রামের মেম্বার না। না হলেও, স্বাধীনতার পর থেকে সুদীর্ঘ সময় তিনি এই গ্রামের মেম্বার ছিলেন। বিপদে-আপদে, প্রয়োজনে মানুষ তার কাছে ছুটে আর তিনি নিরপেক্ষ থেকে ন্যায় বিচার করেযে বিশ্বস্ততা অর্জন করেছেন তার ফল হিসেবেই মানুষ এখনো তার কাছেই ছুটে আসে সবার আগে। আর ‘মেম্বার সাব’বলে যে সম্বোধন করে তা যেন তার উপাধি নয়, নামই হয়ে গেছে। মেম্বার সাহেবের মেজ ছেলে আজ এই গ্রামের মেম্বার। তবু, সবাই আরজ আলী মেম্বারকেই আসল মেম্বার মানে। আর যে কোন বিপদে, প্রয়োজনে প্রথমে তাকেই স্মরণ করে, তার কাছে ছুটে আসে। 

ঘরে পা দিয়েই মেম্বার সাহেব দেখলেন জনসমাগম তার নামাজোত্তর ধারণার চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। তার নতুন ঘরের মাঝের কক্ষটা বেশ বড়, তবুও তিল ধারণের আর জায়গা নেই ঘরটাতে। ইতঃপূর্বে যে সকল গ্রাম্য সালিশ হয়েছে, অথবা যে কোন কারণেই হোক, বাংলো ঘরটাতে কোন জমায়েত হয়েছে, তাতে মূলত গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আর অল্প কয়েকজন উঠতি বয়সের যুবক উপস্থিত থাকতো। কিন্তু, আজকের এখানকার জমায়েতটা মোটেই সে রকম নয়। অবশ্য জমায়েত এর বিষয়টাও আগের মত না। ভাল করে একবার চারদিকে তাকালেন মেম্বার সাহেব। দেখলেন পাঁচ সাত বছরের ন্যাংটা পোলাপাইন থেকে শুরু করেউঠতি বয়সী যুবত-যুবতী, নব বিবাহিত নারী-পুরুষ, মধ্য বয়সীগণ্যমান্য ব্যক্তিসহ সব বয়সের আর সব ধরনের মানুষই এখানে উপস্থিত। যে যেখানে পেরেছে দাঁড়িয়ে গেছে, যারা আগে এসেছে তারা জায়গা দখল করে বসেও গেছে। মতিন, কাঁদের মিয়া, হক সাবও আছে, আর ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ঝড়েবিধ্বস্ত পাখির মত গা মুড়িয়ে বসে আছে মুক্তিযোদ্ধা রমজান আলী।মেম্বার সাহেব ঘরের উত্তর-পশ্চিম কোণে রাখা খাটিয়াতে বসতে বসতে হাতের লাঠিটাপাশেই রাখলেন। পকেট থেকে চশমাটাও বের করে বিছানায় রাখলেন। খাটিয়াতে মেম্বার সাহেব ছাড়া আর মাত্র একজন অতি সম্মানিত লোক ন্যাংটা হয়ে বসে আছে, তিনি মেম্বার সাহেবের পাঁচ বছরের নাতি।

যে বিষয়টা নিয়ে আজকের জমায়েত তা যেমন স্পর্শকাতর, তেমনি আবার সববয়সী মানুষের কাছে তা বন্য-আনন্দ আস্বাদের একটা উপলক্ষ্য বটে। জনসম্মুখে এই বিষয় নিয়ে কথা বলা আসলেইবিব্রতকর। বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়ের সামনে। তাই মেম্বার সাহেব একটু জোরে অনেকটা থমকের সুরেই বললেন, “অই, পোলাপাইন, এইহানে কি, যা সব, পড়তেব গিয়া’। পরক্ষণেই কন্ঠটাকে কানে বাধার মতই পরিবর্তিত করে নমনীয় সুরে তার নির্দেশনা শেষ করলেন, ‘এই তোমরাও যাও,’ শেষোক্ত কথাটা বললেন উঠতি বয়সের কয়েকজন তরুণীর দিকে লক্ষ্য করে। 

মেম্বার সাহেবের এই মোলায়েম ধমক আর নির্দেশকে আদেশ হিসেবে নিয়ে তা বাস্তবায়নের জন্য বেশ কয়েকজন তরুণ যুবক মাঠে নেমে গেল। ‘এই, পোলাপাইন, সব যা। আপনেরাও সবতে যান। পরে শুইনেন কি অইছে, অনে যান সবতে’। এভাবে বাচ্চা ও সকল বয়সী মহিলাদের তাড়না দিতে লাগলো তারা। তবে, কদমিরচর তো কদমিরচর, কালাপাহাড় চরের কারোইআর শোনার বাকি নেই কি ঘটনা ঘটে গেছে কদমিরচর গ্রামে আজকে সাঁঝের কিছু আগে এবং এরই মধ্যে হয়তো সারাদেশেই ছড়িয়ে যাচ্ছে তা। আরএই ঘটনানিয়ে বেশ হুলস্থুল পরে গেছে এই চরের প্রতিটা গ্রামে, প্রতিটা বাড়িতে, প্রতিটা ঘরে। 

যাই হোক, তড়িৎ পদক্ষেপে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই লোক সমাগম বেশ কমে গেল। এবার হালকা একটু কেশে নিয়ে মতিনই প্রথমে চিন্তিত কন্ঠে প্রশ্নটা করলো, ‘কাকা, অনে কি করণ?’গত তিরিশ বছরে গ্রামে বড় কোন সমস্যা, এমনকি ছোট খাটো সমস্যাতেও, মানুষ এসে মেম্বার সাহেবের বাংলো ঘরে বসেছে আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই একই প্রশ্ন দিয়ে সমাধান পর্ব শুরু হয়েছে। উপরিউক্ত প্রশ্নের উত্তর কখনো কখনো সালিশ বা মীমাংসার মাধ্যমে বের হয়েছে আবার অনেক সময় পূর্ব কোন অভিজ্ঞতা থেকে মেম্বার সাহেব বলে দিয়েছেন। তবে, রেইপ-এরঘটনা বিগত বিশ পঁচিশ বছর তো দূরের কথা গন্ডগোলের বছরও এই এলাকায় ঘটে নাই। তাই এই ধরণের বিচার করার কোন অভিজ্ঞতা মেম্বার সাহেবের নেই। আর এই শেষ বয়সে এই এই রকম এক ঘৃণ্য ঘটনার সাক্ষী তাকে হতে হবে, এটাও ভাবেননি তিনি কখনো।

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে মেম্বার সাহেব অলক্ষ্যে দৃষ্টি রেখেই বললেন,‘জমির কই?’

‘গেছে গা, কাকা। মাইয়াডার সর্বনাশ কইরা দিয়া মেগনা পার অইয়া শহরে চইলা গেছে; মজনু দেখছে, অর নাও দিয়াই পার অইছে’, মতিন একটানা বলে গেল উত্তেজিত কন্ঠে।মজনু সায় দিল মতিনের কথায়, ‘ হ কাহা, আমার নাও দিয়া পার অইছে। আমি যুদি জানতাম কাহা অয় এই কাম কইরা যাইতাছে, অরে বাইন্দা রাখতাম। আমি তো অর চেহারা দেইখাও কিছু বুঝি নাই’।

‘মাইয়ার কি অবস্থা?’, মতিনের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন মেম্বার সাহেব। 

‘অবস্থা বেশি বালা না, কাকা। এসআই নজরুল বাড়িতেই আছিল, অয়, আবেদার বাপ-মায় আর কয়েকজন মিল্লা সদর হাসপাতালে নিয়া গেছে’, জানালো মতিন। 

এমন সময় ঘরের কোণ থেকে শুষ্ক-কাষ্ঠ কন্ঠে কেঁদে উঠলো রমজান আলী। ‘মেম্বার সাব, আফনে আমারে দাও দিয়া কাইট্টা টুরহা টুরহা কইরা মেগনায় বাসাই দ্যান। আমার পোলারে আমি মানুষ বানাইতে পারি নাই। আফনেরা সবতেআমার বিছার করেন’, বলতে বলতে আবারো ঢুকরে ঢুকরে করে কেঁদে উঠলো রমজান আলী। 

‘কাইন্দো না, জমিরের বাপ। তোমার আর দোষ কি? সময়ই খারাপ, পোলাপাইন সব নষ্ট হইয়া যাইতাছে’, হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে লাগলেন মেম্বার সাহেব। ‘বেশি দিন না, এরশাদ সাবের আমলেও সারা গাঁয়ে একটা মাত্র টিভির বাক্স আছিল, সাদা কালা টিভি। আর অহন, এই দশ বারো বছরে সবতের ঘরে ঘরে কালার টেলিভিশন’। একটু দম ফেলে বলতে লাগলেন মেম্বার সাহেব, ‘আগে দেশে বিদেশে ফোন করতে অইলে নয় মাইল দূরে রাদানগর গঞ্জে যাওন লাগত, আর অহন, সবতের আতে আতে মোবাইল অইয়্যা যাইতাছে, আবার নাকি দেশে ইন্টারনেট না কি আইছে?  সারা দুনিয়া পোলাপাইনের আতে, পোলাপাইন নষ্ট না অইয়া উপায় আছে?’ সবাই সম্মতি দেয় মেম্বার সাহেবের কথায়।‘এইসব ডিশ, টিভি, মোবাইল, ইন্টারনেট পোলাপাইন নষ্ট কইরা ফালাইতাছে’, মেম্বার সাহেব তার অভিমতেরউপসংহার টানেন এভাবে। 

হক সাব চাঁদর মুড়ি দিয়ে ডান কাঁধে হেলান দিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। সেখানে দাঁড়িয়েই বলে উঠে, ‘কিন্তু কি করবেন কাকা, এই সব তো আর আটকাইয়া রাহা যাইবো না, আর দুনিয়ার খোঁজ খবর রাহনের লাইগ্যাও এইগুলান লাগে’।

‘কথা তুমি মিছা কও না, হক সাব। তয় পোলাপাইনের আতে এইসব দেওন ঠিক না’, বলে মতিন মিয়া। মতিনকে সাপোর্ট দেয় কাঁদের মিয়া, আর মেম্বার সাহেবের দিকে লক্ষ্য করে বলে, “ হ, কাহা, কি যে অইছে পোলাপাইনের, সালাম টালাম তো দ্যাশ থেইক্যা উইঠাই যাইতাছে, নামাজ কালামেরও বালাই নাই। সারাদিন আছে মোবাইলে গান বাজনা নিয়া, আর এই রহম একটা কেলেঙ্কারি যে অইব এইডাতো আগেই বুজা যাইতাছিল’। 

‘আগে বুজা যাইতাছিল তয় কও নাইকিয়ের লাইগ্যা?’ হক সাব কিছুটা রাগা স্বরে অনেকটা কৈফিয়তই দাবি করে বসে কাঁদের মিয়ার কাছে। ছোট খাটো একটা তর্কের ঈষৎ সম্ভাবনা দেখে মেম্বার সাহেব দুজনেকেই চুপ করতে বলে, ‘অই থাম, তরা কি শুরু করলি?’ 

এমন সময় গাঁয়ে একটা ফ্যাকাশে ছাই রঙের পুরনো চাঁদর জড়িয়ে আবেদার জ্যাঠা এসে হাজির হয়। ‘স্লামালেকুম, কাহা’। ‘ওয়ালাইকুম, কেডা?’ জানতে চান মেম্বার সাহেব। ‘কাহা, আমি জুলমত’, দরজা থেকে খাটিয়ার কাছাকাছি যেতে যেতে পরিচয় দেয় জুলমত।  ‘ও, জুলমত, বও’, খাটিয়ায় বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় পায়ার সাথে রাখা চার পাঁচটা পিড়ির দিকে ইঙ্গিত করে বলতে থাকেন মেম্বার সাহেব, এনতে একটা ফিড়ি লইয়্যা বও’। সুস্পস্ট নির্দেশনা পেয়ে সেখান থেকে উপরের পিড়িটা পাছার নিচে দিয়ে বসে পড়ে জুলমত। তবে, আবেদার জ্যাঠা হিসেবে তার কাছ থেকেই সবাই যে আশা করেছিল যে তিনি আবেগ তাড়িত কন্ঠে এই কাজের বিচার দাবি করবেন মেম্বার সাহেবের কাছে, সেটা হল না। জুলমত কোন কথা না বলে মাটির দিকে স্থিরদৃষ্টিতে বসে রইল। 

নাতিদীর্ঘ বিরতি দিয়ে আরজ আলী মেম্বারই তাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘আর কোন খবর নিছিলা?” 

জুলমত জানায়, নজরুল সাথে আছে, তাই হাসপাতালে ভর্তি করাতে কোন সমস্যা হয় নাই। থানায় খবর গেছে।এমপি সাহেবেরেও জানানো হইছে বলে জানায় সে। 

‘তোমার ভাতিজির কি অবস্থা?’ জানতে চান মেম্বার সাহেব। 

‘বেশি বালা না, কাহা, চিরিসসা চলতাছে’। জানায় জুলমত।

কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে আসে মেম্বার সাহেবের ঘরের এইকক্ষটাতে। নীরবতা ভেঙ্গে মতিন জানতে চায়, “ কাকা, মামলা অইবো নাকি?’ 

‘রেইপ কেইসের বিষয়টা আজকাল অনেক জটিল, গ্রাম্য সালিশে সমাধা অইবো বইলা মনে অয় না। মামলাই অইবো। আবেদার বাপ-মা আইলে অগো লগে কতা কইয়া এমপির লগে বুইঝ্যা যা করার করতে অইবো’, সুচিন্তিতের মত গম্ভীর কন্ঠে মত দেন মেম্বার সাহেব। 

মতিন একটু নরম কন্ঠে একটা সমাধান দেয়ার চেষ্টা করে, “কাকা, নিজেগর মইদ্যে মিলমিশ কইরা কিছু একটা করন যায় না? আর কিছু না অউক, রমজান কাকার মান সম্মানের দিকে চাইয়্যা দেহেন না নিজেগর মইদ্যে মিলমিশ অয় কিনা?’ 

মেম্বার সাহেব মনোযোগ দিয়ে শুনে মতিনের কথা। রেইপ কেসের বিষয়টা অনেক জটিল সেটা মতিনও বোঝে। তারপরও, তার কাছে মনে হয়েছে রমজান আলীর ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। গ্রাম্য সালিশে সমাধান হইলে অবশ্যই বিষয়টা মানবিক দিক থেকে দেখা যেত। কিন্তু, আদালতে গেলে সেটা কি অবস্থা দাঁড়ায় তা বলা মুশকিল। ভিকটিম যদি আপোস না করে, যাবতজ্জীবনও হইয়া যাইতে পারে। 

রমজান আলী যেভাবে ঘরের কোণটাতে চুপ করে বসে ছিল, সেভাবেই আছে। যে লোকটা সারা গ্রাম বীরদর্পে হেঁটে বেড়ায়, যার একটা কথার দাম গ্রামের একশটা মানুষের কথার দামের চেয়েও বেশি, আজ সেই রমজান আলীর উপস্থিতি এইঘরের ক্ষুদ্র কোণও যেন টের পাচ্ছে না। এবার সে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে অপরাধীর ন্যায় কন্ঠে বলতে লাগলো,‘আমার একমাত্র পোলা অইছে তো কি অইছে? অন্যায় করছে, একটা মাইয়ার সর্বনাশ করছে, অর শাস্তি পাওন লাগবো। ফাঁসি অইলে অরে ধইরা ফাঁসি দিয়া দ্যান, এই পোলার বাপ না অইয়া যদি গন্ডগোলের বছর মইরা যাইতাম তাও বালা আছিল’, কন্ঠটা আরো সিক্ত হয়ে উঠলো রমজান আলীর, তবুও বলে গেল সে, ‘নয় মাস যুদ্ধ কইরা দেশ স্বাধীন করছি, এই দেশে কোন জানোয়ার থাকতে পারবো না। অরে ফাঁসি দিয়া দ্যান’। বলতে বলতে এবার সশব্দেই কেঁদে উঠে রমজান আলী। সবাই তখন আনত বদনে অনড় নয়নে রমজান আলীর দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে। 

যুদ্ধের কথায় স্মৃতি কাতর হয়ে পড়েন মেম্বার সাহেব নিজেও। দেশটা স্বাধীন করার জন্য কি রমজান আলীর মত মহান হৃদয়ের মানুষগুলো কম ত্যাগ স্বীকার করছে? কিন্তু, যে পশুদের তাড়ানোর জন্য এই ত্যাগ, স্বাধীনতার তিরিশ বছর পর নিজের ঘরেই যে সেপশুঘুরে বেড়াচ্ছে তা কে জানতো? 

আরজ আলী মেম্বারের বেশ মনে আছে। একাত্তর সাল। তখন তিনি হাই স্কুলের হেডমাস্টার। মার্চ মাসে মুজিবকে বন্দি করে নিয়ে গেল পাকিস্তানে। ব্যস! কিছুদিনের মধ্যেই সারা দেশে শুরু হয়ে হয়ে গেল যুদ্ধ। গ্রামের সব মানুষ ছুটে এসেছিল সেদিনকার মাস্টার সাহেবের কাছে। 

‘মাস্টার সাব, অহন কি করণ?’ 

সেদিন এই মেম্বার সাহেবই বলেছিল, ‘মিয়ারা, মুক্তিবাহিনী গঠন করা লাগবো। অনক সহ্য করছি আমরা, এইবার দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেওন লাগবো’। গ্রামের শক্ত সামর্থ যুবক আর মধ্যবয়সী সতেরজনলোক নিয়ে কদমিরচর গ্রামে মুক্তিবাহিনী গঠন করেছিলেন মেম্বার সাহেব। তিনি নিজে শহরের মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন লোকের সাথে যোগাযোগ করে এইসতেরজনকে কয়েক ভাগে ভাগ করে একএক এলাকায় পাঠিয়েছিলন। এদের মধ্যেই একজন ছিল এই রমজান আলী। তখন সে পঁচিশ বছরের অবিবাহিত তাগড়া যুবক, রক্ত গরম তার। রক্তের নেশায় মাতাল হয়ে সেও যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। যখন মেম্বার সাহেব রমজান, করিম, দুলাল, আম্বর, এই চারজনকে কুমিল্লা জেলায় গিয়ে তিন নং সেক্টরের মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করতে বলে, তখন এই রমজান আলী বলেছিল, ‘মাস্টার সাব, যুদি পারি তয় দ্যাশ লইয়া ফিরা আমু, আর যুদি দ্যাশ আনতে না পারি তাইলে আর আমু না’। কদমিরচর গ্রামের মত কালাপাহাড় চরের প্রতিটি গ্রাম থেকেই মুক্তিবাহিনী যুদ্ধে গিয়েছিল। 

এদিকে কালাপাহাড় চরের গ্রামগুলো রক্ষার জন্যঅন্য গ্রামের গণ্যমান্যদের সহায়তায়মেম্বার সাহেব তার নিজ উদ্যোগে গ্রামরক্ষা বাহিনী গঠন করেছিলেন।যারা বিভিন্ন কারণে যুদ্ধে যেতে পারেনি তারা ছিল এই গ্রামরক্ষা বাহিনীর মধ্যে। তবে, ভাগ্য ভালো, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই কালাপাহাড় চরে আসেনি কখনো। এই চরের চারদিকে নদী থাকায় পাকিস্তানি হানাদারেরা এখানে নামার সাহস পায় নি। কারণ,এখানে নামলে কোন ভাবে যদি এলাকার লোকজন তাদের জাহাজ ভাসিয়ে দেয় বা ডুবিয়ে দেয়, তাহলে মৃত্যু ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই এখান থেকে বের হওয়ার। আর গ্রামরক্ষা বাহিনী নদীর পাড়ে গর্ত করে দিনে রাতে পালা করে পাহারা দিত, যার নেতৃত্ব দিতেন মেম্বার সাহেব নিজে। যার ফলে কালাপাহাড় চরে গন্ডগোলের বছরেও কোন যুদ্ধ বা ক্ষয়ক্ষতি হয় নি। তবে, যে সতেরজন কদমিরচর থেকে যুদ্ধে গিয়েছে, তাদেরনয়জন ফিরে এসেছিল যুদ্ধ শেষে, আর আট জন্য শহীদ হয়েছে বিভিন্ন জায়গার যুদ্ধে। 

যে নয়জন বীর যোদ্ধা দেশ স্বাধীন করে ফিরে এসেছিল কদমিরচর গ্রামে, তাদের মধ্যে মাত্র দুইজন বেচে আছে এখন। রমজান আলী তাদের একজন। রমজান আলী এই গ্রামের গর্ব, অহংকার। যে শুধু মুক্তিযোদ্ধাই নয়, তার চেয়ে তার বড় পরিচয় হল সে একজনবড় মনের মানুষ। মুক্তিযুদ্ধ শেষে এই রমজান আলীশুধু একটা স্বাধীন দেশ নিয়েই ঘরে ফিরেনি, সাথে নিয়ে ফিরেছে সালেহা নামের এক বীরাঙ্গনা নারীকে যার বাড়ি ছিল কুমিল্লার কোন এক প্রত্যন্ত গ্রামে। সেই বীরাঙ্গনাকে সে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে। তাকে বিয়ে করে রমজান আলী যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তা শুধু কালাপাহাড় চরে না, সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছিল। সমাজের চোখে যে পরিত্যাক্তা, ধর্মের চোখে যে অপবিত্র সেই সালেহাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে যে সাহসী আর বড় মনের পরিচয় দিয়েছিল রমজান আলী তা বিরল। 

কিন্তু, সমস্যা বাধলদেশ স্বাধীনের আট মাস পরে যখল তাদের প্রথম সন্তানজমির আলীর জন্ম হয়। তখন এলাকায় সোরগোল পরে যায়, ‘এটা রমজানের পোলা তো?’ নানা জায়গায় নানা কানাঘুষা চলতে থাকে। সেদিনও রমজান আলী বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়েছিল সালেহার পাশে, বলেছিল, সালেহাকে আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য দেশ স্বাধীনের দুই মাস আগেতাকে বিয়ে করে রমজান।জমির তারই সন্তান। এভাবে, বুক দিয়ে আগলে রাখে সালেহা আর জমিরকে। কিন্তু,এরপরে তাদের আর কোন সন্তান হয়নি। জমিরের বয়স যখন চার বছর তখন মারা যায় সালেহা। এরপর, নিজের হাতে কত কষ্ট করে যে রমজান আলী বড় করেছে এই জমিরকে তা সবারই জানা। 

সব ঘটনা ভাসতে থাকে মেম্বার সাহেবের মনে। আর সব কথা সারকথা যেন এক জায়গায় গিয়েই শেষ হয়, আসলেই কি সময়ের দোষ, নাকি রক্তের দোষ? একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের শরীরে কিভাবে ধর্ষকের রক্ত টগবগ করে? জমির কি আসলেই মুক্তিযোদ্ধা রমজানের সন্তান নাকি সালেহার গর্ভে জন্ম নেয়াকোন পাকিস্তানি ধর্ষকের ঐরসজাত সন্তান? কার রক্ত এই ধর্ষকের শিরা ধমনীতে?- এই প্রশ্নের উত্তর রমজান ছাড়া আর কেউ জানে না। হয়তো রমজান নিজেও জানে না। 

মসজিদে এশার আযান পড়ে। মেম্বার সাহেব উঠে দাঁড়ান তার লাঠিতে ভর দিয়ে। চশমটা হাতরে বেড়ান বিছানায়। তার ন্যাংটা নাতি সেটা লুকিয়ে রাখে বালিশের নিচে। মেম্বার সাহেবঝাপসা চোখে সবাইরে বিদায় দেন, ‘তোমরা যাও সবতে, দেহি চিন্তা কইরা, কি করণ যায়?’মতিনকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘মাইয়াডার খোঁজ খবর ন্যাও, নজরুলরে বইলো আমার লগে একটু দেহা করতে। আর জমির আলীরে খোঁজ কর। আযান পইড়া গেছে, যাও অহন, বাড়ি যাও’। 

এই বলে সামনের দিকে পা বাড়ান মেম্বার সাহেব। সবাই ঘর হতে বের হতে থাকে। ঘর লোকশূন্য হয়ে যায়। শুধু রমজান আলী ঘরের কোণে যেভাবে বসেছিল সেভাবেই বসে থাকে। নিজেকে এতো ক্ষুদ্র মনে হয় নিজের কাছে যেন তার থাকা আর না থাকা, ঘরের এই কোণটার জন্য দুটোই সমান।

Comments

    Please login to post comment. Login