শহরটা কখনো ঘুমায় না।
রাত যত গভীর হয়, শহরের ব্যস্ততা তত নিঃশব্দ হয়ে আসে। উঁচু দালানের জানালাগুলো একে একে অন্ধকার হয়, রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমে যায়, কিন্তু ফুটপাতে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর রাত তখনও শেষ হয় না।
রাত দুটো।
রায়হান অফিস থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছিল। সারাদিনের কাজের ক্লান্তি তার চোখে-মুখে স্পষ্ট। হাতে একটি কালো ব্যাগ, পকেটে অফিসের পরিচয়পত্র, আর মাথার ভেতর হাজারো চিন্তা।
হঠাৎ রাস্তার পাশে একটি ছোট ছেলে তার চোখে পড়ল।
ছেলেটার বয়স দশ কি এগারো হবে। পুরোনো একটি শার্ট গায়ে, হাতে কয়েকটি ফুল। রাস্তার বাতির নিচে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করছে।
রায়হান থেমে গেল।
— “এত রাতে এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
ছেলেটা মাথা তুলে তাকাল।
— “ফুল বিক্রি করি।”
— “বাসায় যাবে না?”
ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর আস্তে বলল,
— “বাসা নেই।”
কথাটা খুব ছোট ছিল।
কিন্তু রায়হানের বুকের ভেতর যেন হঠাৎ অনেক বড় একটা শব্দ হলো।
সে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকল। এতদিন সে ভেবেছিল, জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা তার নিজের—বেতন কম, কাজের চাপ বেশি, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না।
আজ প্রথমবার বুঝল—
মানুষের কষ্টেরও স্তর আছে।
কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত,
আর কেউ আজ রাতটা কোথায় কাটাবে—সেটা নিয়েই চিন্তিত।
রায়হান ছেলেটার সব ফুল কিনে নিল।
তারপর জিজ্ঞেস করল,
— “তোমার নাম কী?”
ছেলেটা হাসল।
— “আমার নাম আকাশ।”
রায়হান অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকাল।
শহরের কালো আকাশে তখন একটি মাত্র তারা দেখা যাচ্ছিল।
সে মনে মনে বলল—
“হয়তো এই শহরের সবচেয়ে অন্ধকার রাতেও কোনো না কোনো আকাশ লুকিয়ে থাকে।”