Story

মৃত রিকশাওয়ালা

October 2, 2026

17 views

পর্ব–১

রাত ১২টা ১৭ মিনিটের রিকশা

ঢাকার শহর কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।

কোথাও গাড়ির শব্দ।

কোথাও মানুষের হাঁটাচলা।

কোথাও দোকানের শেষ শাটার নামছে।

কিন্তু শহরের এক প্রান্তে একটা রাস্তা ছিল—

যে রাস্তা রাত বারোটার পর অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ হয়ে যেত।

রাস্তার দুপাশে পুরোনো গাছ।

এক পাশে পরিত্যক্ত একটা সিনেমা হল।

অন্য পাশে বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটা গ্যারেজ।

আর রাস্তার একদম শেষ মাথায়—

একটা ভাঙা স্ট্রিটলাইট।

সেটা কখনো জ্বলত।

কখনো নিভে যেত।

লোকজন রাস্তার নাম জানত।

শিমুলতলা রোড।

কিন্তু এলাকার মানুষ রাতের বেলা রাস্তার নাম মুখে নিত না।

তারা শুধু বলত—

“ওই রাস্তা দিয়ে রাত বারোটার পর যেও না।”

কেন?

তার উত্তর কেউ পরিষ্কার করে বলত না।

কেউ বলত—

“পুরোনো ব্যাপার।”

কেউ বলত—

“ওখানে আগে একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল।”

আবার কেউ শুধু চুপ করে যেত।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত কথাটা ছিল—

রাত ১২টা ১৭ মিনিটে নাকি ওই রাস্তায় একটা রিকশা দেখা যায়।

রিকশাটা ধীরে ধীরে আসে।

তারপর রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যায়।

রিকশাওয়ালা মাথা নিচু করে বসে থাকে।

যদি কেউ তাকে ডাকে—

সে শুধু একটা কথাই বলে,

“কোথায় যাবেন?”


রাত তখন ১১টা ৫২ মিনিট।

রাফি অফিস থেকে বের হলো।

তার বয়স চব্বিশ।

সেদিন তাকে একটু বেশি সময় কাজ করতে হয়েছিল।

ফোনের চার্জ মাত্র ৬ শতাংশ।

বাড়ি যেতে হলে তাকে একটা রিকশা নিতে হবে।

কিন্তু বাইরে বের হয়েই সে বুঝল—

আজ রাস্তা অন্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি ফাঁকা।

দোকানগুলো বন্ধ।

চায়ের দোকানের বেঞ্চগুলো খালি।

একটা কুকুর রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

রাফি ফোন বের করে সময় দেখল।

১১:৫৬।

সে একটা রিকশা খুঁজতে লাগল।

দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো রিকশা পেল না।

ঠিক তখনই দূর থেকে—

ট্রিং... ট্রিং...

রিকশার ঘণ্টার শব্দ শোনা গেল।

রাফি রাস্তার দিকে তাকাল।

দূরে একটা রিকশা আসছে।

একটা পুরোনো কালো রিকশা।

সামনের বাতিটা খুব ম্লান।

রিকশাটা এত ধীরে আসছিল যে মনে হচ্ছিল—

চালক যেন রিকশা চালাচ্ছে না।

রিকশাটা নিজেই এগিয়ে আসছে।

রাফি হাত তুলল।

রিকশাটা তার সামনে এসে থামল।

চালক মাথা নিচু করে বসে আছে।

গায়ে ধূসর রঙের পুরোনো শার্ট।

মাথায় একটা ময়লা টুপি।

রাফি বলল,

— “ভাই, যাবেন?”

চালক কোনো উত্তর দিল না।

রাফি আবার বলল,

— “ভাই?”

ধীরে ধীরে লোকটা মাথা তুলল।

তার মুখটা রাস্তার অন্ধকারে ঠিকমতো দেখা গেল না।

শুধু দুটো চোখ দেখা গেল।

স্থির।

অস্বাভাবিকভাবে স্থির।

লোকটা বলল,

— “কোথায় যাবেন?”

রাফি জায়গার নাম বলল।

চালক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

— “উঠেন।”

রাফি উঠে বসল।

রিকশা চলতে শুরু করল।


প্রথম পাঁচ মিনিট সবকিছু স্বাভাবিক ছিল।

রিকশার চাকা রাস্তার ওপর ঘুরছে।

দূরে কয়েকটা গাড়ির আলো।

গাছের পাতার শব্দ।

রাফি ফোন বের করল।

১২:০৪।

সে অবাক হলো।

এত দ্রুত সময় চলে গেল?

তারপর খেয়াল করল—

রিকশাওয়ালা কোনো কথা বলছে না।

রাফি জিজ্ঞেস করল,

— “ভাই, এই রাস্তা দিয়ে গেলে দ্রুত হবে?”

কোনো উত্তর নেই।

— “ভাই?”

চালক চুপ।

রাফি একটু বিরক্ত হয়ে সামনে তাকাল।

তারপর হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল রিকশার পেছনের ছোট্ট ধাতব প্লেটে।

সেখানে একটা নম্বর লেখা।

ঢাকা মেট্রো–গ ১৭–৪১৭২

রাফি নম্বরটা দেখে কেন জানি অস্বস্তি পেল।

কোথায় যেন এই নম্বরটা সে আগে দেখেছে।

কিন্তু মনে করতে পারল না।


রিকশা একটা মোড় পার হলো।

তারপর আরও একটা।

তারপর—

রাফি বুঝতে পারল, তারা যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে সেটা সে চেনে না।

সে বলল,

— “ভাই, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”

চালক এবারও কোনো উত্তর দিল না।

রাফি একটু জোরে বলল,

— “ভাই!”

চালক ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাল।

তারপর বলল,

— “আপনি তো বলেছিলেন, বাড়ি যাবেন।”

রাফি বলল,

— “হ্যাঁ। কিন্তু এটা তো আমার রাস্তা না।”

চালক আবার সামনে তাকাল।

— “সবাই প্রথমে এটাই বলে।”

রাফির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

— “মানে?”

কোনো উত্তর নেই।

শুধু রিকশার ঘণ্টা—

ট্রিং...

কিছুক্ষণ পর আবার—

ট্রিং...

তারপর—

ট্রিং...

একই ব্যবধানে।

রাফি ফোন বের করল।

সময়—

১২:১৭।

সে অবাক হয়ে গেল।

ঠিক তখনই রিকশাটা থেমে গেল।

সামনে সেই ভাঙা স্ট্রিটলাইট।

একটা পুরোনো গাছ।

রাস্তার পাশে বন্ধ গ্যারেজ।

রাফির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

কারণ সে বুঝতে পারল—

এই জায়গাটা সে কিছুক্ষণ আগেই পার হয়েছে।

কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?


রাফি রিকশা থেকে নামতে চাইল।

— “ভাই, থামান।”

চালক নড়ল না।

— “আমি বলছি থামান!”

চালক এবার খুব আস্তে বলল,

— “এখানেই তো নামবেন।”

রাফি চারপাশে তাকাল।

রাস্তা ফাঁকা।

কেউ নেই।

কোনো দোকান নেই।

কোনো বাড়ির আলো নেই।

শুধু একটা পুরোনো দেয়াল।

দেয়ালের ওপর সাদা রঙে লেখা—

“দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা। সাবধানে চলুন।”

তার নিচে কারও হাতে লেখা আরেকটা বাক্য।

কালো রঙে।

“১২:১৭-এর পর থামবেন না।”

রাফির গলা শুকিয়ে গেল।

সে চালকের দিকে তাকাল।

— “এই লেখা কে দিয়েছে?”

চালক চুপ।

রাফি আবার বলল,

— “ভাই?”

কোনো উত্তর নেই।

হঠাৎ রিকশার আয়নায় রাফির চোখ গেল।

সে দেখল—

আয়নায় রিকশাওয়ালার মুখ দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু...

রিকশার সিটে যে লোকটা বসে আছে, আয়নায় তার মুখটা অন্যরকম।

রাফি চোখ কচলাল।

আবার তাকাল।

এবার স্বাভাবিক।

সে নিজেকে বোঝাল—

অন্ধকারে ভুল দেখেছে।

কিন্তু ঠিক তখনই রিকশাওয়ালা বলল,

— “ভয় পেয়েছেন?”

রাফি চমকে উঠল।

— “না...”

চালক মৃদু হাসল।

— “ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”

কিছুক্ষণ থেমে বলল,

— “আমি তো অনেক আগেই ভয় পাওয়া শেষ করেছি।”


রিকশাটা আবার চলল।

রাফি এবার আর কথা বলল না।

সে শুধু ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল।

চার্জ—

২%

নেটওয়ার্ক—

নেই।

সে মাকে ফোন করতে চাইল।

কল গেল না।

বন্ধুকে ফোন করতে চাইল।

কল গেল না।

তারপর হঠাৎ ফোনের স্ক্রিন নিজে থেকেই জ্বলে উঠল।

একটা অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে।

মাত্র তিনটি শব্দ—

“নামবেন না এখন।”

রাফির হাত কেঁপে উঠল।

সে চালকের দিকে তাকাল।

চালক যেন কিছুই জানে না।

রাফি দ্রুত মেসেজের রিপ্লাই দিতে গেল।

ঠিক তখনই আরেকটা মেসেজ এল।

“ওকে দেখবেন না।”

রাফির বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

কে মেসেজ করছে?

কীভাবে জানে সে রিকশায়?

সে সাহস করে লিখল—

“কে আপনি?”

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল।

“যে আপনাকে এই রিকশায় উঠতে দেখেছিল।”

রাফির শরীর অবশ হয়ে গেল।

সে জানালার মতো পাশের ফাঁকা জায়গা দিয়ে বাইরে তাকাল।

কেউ নেই।

কোনো মানুষ নেই।

তাহলে তাকে কে দেখেছিল?


রিকশা এবার আরও নির্জন একটা রাস্তার দিকে ঢুকল।

রাফি বলল,

— “আমি এখানে নামব।”

চালক বলল,

— “এখন না।”

— “কেন?”

— “এখন নামলে ওরা আপনাকে দেখতে পাবে।”

রাফি আর কথা বলল না।

— “কারা?”

চালক কোনো উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই সামনে থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ এল।

ট্রিং...

আরেকটা রিকশার ঘণ্টা।

রাফি সামনে তাকাল।

দূরে একটা রিকশা দাঁড়িয়ে আছে।

তার পাশে আরেকটা।

তারপর আরও একটা।

রাফির বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।

কারণ সবগুলো রিকশাই দেখতে প্রায় একই রকম।

একই কালো কাঠামো।

একই ম্লান বাতি।

একই পুরোনো ঘণ্টা।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার—

প্রতিটা রিকশার সিটে একজন করে লোক বসে আছে।

আর সবাই মাথা নিচু করে আছে।

রাফি ফিসফিস করে বলল,

— “এরা কারা?”

তার রিকশাওয়ালা উত্তর দিল,

— “যারা বাড়ি ফিরতে পারেনি।”

রাফির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার মতো লাগল।


হঠাৎ তার ফোনে আবার মেসেজ এল।

এবার শুধু একটা ছবি।

রাফি ছবিটা খুলল।

ছবিটা দেখে তার হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে—

একটা পুরোনো রিকশা।

রাস্তার পাশে পড়ে আছে।

চারপাশে মানুষ।

আর উপরে লেখা—

“রাত ১২টা ১৭ মিনিট। শিমুলতলা রোডে রিকশা দুর্ঘটনা।”

ছবির নিচে তারিখ—

১৭ বছর আগের।

রাফি ছবিটা জুম করল।

তারপর তার বুক কেঁপে উঠল।

ছবির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের মুখ দেখা যাচ্ছে।

লোকটার গায়ে—

ধূসর শার্ট।

মাথায়—

পুরোনো টুপি।

রাফি ধীরে ধীরে সামনে বসা রিকশাওয়ালার দিকে তাকাল।

একই শার্ট।

একই টুপি।

একই গড়ন।

তার গলা শুকিয়ে গেল।

— “আপনি...”

চালক চুপ।

রাফি কাঁপা গলায় বলল,

— “আপনি কি... ওই দুর্ঘটনায় ছিলেন?”

রিকশাওয়ালা কোনো উত্তর দিল না।

শুধু রিকশার ঘণ্টা বাজাল।

ট্রিং...

তারপর বলল,

— “আজ অনেক বছর পর একজন যাত্রী নিজে থেকে প্রশ্ন করল।”

রাফি বলল,

— “আপনি কে?”

লোকটা ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল।

এবার প্রথমবারের মতো তার মুখটা পুরোপুরি দেখা গেল।

রাফি স্থির হয়ে গেল।

কারণ লোকটার মুখে কোনো রাগ ছিল না।

কোনো হাসিও ছিল না।

ছিল শুধু এক ধরনের গভীর ক্লান্তি।

সে বলল—

“আমার নাম কাদের।”

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“সতেরো বছর আগে আমি এই রাস্তায় মারা গিয়েছিলাম।”


রাফি মনে করল সে হয়তো স্বপ্ন দেখছে।

সে চোখ বন্ধ করল।

এক...

দুই...

তিন...

চোখ খুলল।

রিকশা চলছে।

কাদের সামনে বসে আছে।

সবকিছু আগের মতো।

রাফি নিজেকে বলল—

“এটা সত্যি হতে পারে না।”

ঠিক তখন কাদের বলল,

— “আপনি যদি এখন বিশ্বাস না করেন, সমস্যা নেই।”

রাফি তাকাল।

— “কী?”

— “কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন।”

রিকশা আবার থেমে গেল।

সামনে সেই একই ভাঙা স্ট্রিটলাইট।

সময়—

১২:১৭।

কাদের বলল,

— “এই সময়টা পার হওয়ার আগে আপনি যদি রিকশা থেকে নামেন...”

সে বাক্যটা শেষ করল না।

রাফি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,

— “তাহলে?”

কাদের তার দিকে তাকাল।

তারপর খুব আস্তে বলল—

“তাহলে আগামীকাল রাত ১২টা ১৭ মিনিটে এই রাস্তায় যে রিকশাটা আসবে...”

কাদের একটু থামল।

“সেটার চালক আপনি হবেন।”

রাফির বুকের ভেতর যেন কেউ বরফ ঢেলে দিল।

ঠিক তখনই—

দূরে একটা গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল।

এক মুহূর্তের জন্য পুরো রাস্তা আলোয় ভেসে গেল।

রাফি চোখ বন্ধ করল।

আলো চলে গেল।

সে চোখ খুলে সামনে তাকাল।

রিকশাওয়ালা নেই।

রিকশাও নেই।

সে একা দাঁড়িয়ে আছে সেই রাস্তার মাঝখানে।

ফোনের স্ক্রিনে সময়—

১২:১৮।

চারপাশে সম্পূর্ণ নীরবতা।

তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এল—

ট্রিং...

রাফি ধীরে ধীরে পিছনে তাকাল।

কেউ নেই।

আবার—

ট্রিং... ট্রিং...

এবার শব্দটা তার একেবারে পেছন থেকে।

সে ঘুরতে যাচ্ছিল—

ঠিক তখন ফোনে শেষ একটা মেসেজ এল।

“পেছনে তাকাবেন না।”

রাফির শরীর জমে গেল।

তারপর আরেকটা মেসেজ।

“কারণ এবার রিকশাটা আপনার জন্য থামেনি...”

কয়েক সেকেন্ড পর তৃতীয় মেসেজটি এল—

“এটা আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।”

চলবে...

🌑 পর্ব–২ আসছে........

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login