Story

মৃত রিকশাওয়ালা পর্ব–২

October 3, 2026

65 views

মৃত রিকশাওয়ালা

পর্ব–২

কাদেরের অসমাপ্ত যাত্রা

রাফি নড়তে পারছিল না।

তার ঠিক পেছনে কেউ নেই।

তবুও সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল—

ট্রিং...

রিকশার ঘণ্টা।

আবার—

ট্রিং... ট্রিং...

শব্দটা এত কাছে যে মনে হচ্ছিল, কেউ তার কানের পাশেই ঘণ্টা বাজাচ্ছে।

ফোনের স্ক্রিনে তখনও সেই শেষ মেসেজটা জ্বলছে—

“এটা আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।”

রাফির হাত কাঁপছিল।

সে জানত না কী করবে।

পেছনে তাকাবে?

নাকি সামনে দৌড়াবে?

তার পা যেন মাটির সঙ্গে আটকে গেছে।

হঠাৎ তার কানে খুব আস্তে একটা শব্দ এল—

“রাফি...”

সে জমে গেল।

কারণ সেই কণ্ঠটা তার পরিচিত।

এটা কাদেরের কণ্ঠ নয়।

এটা তার মায়ের কণ্ঠ।

— “রাফি... পেছনে তাকাস না।”

রাফির চোখে পানি চলে এল।

— “মা?”

কেউ উত্তর দিল না।

আবার—

ট্রিং...

রাফি চোখ বন্ধ করে ফেলল।

ঠিক তখনই তার ফোন বন্ধ হয়ে গেল।

চারপাশ অন্ধকার।

আর তারপর—

সবকিছু নিস্তব্ধ।


১

পরের দিন সকালে রাফি নিজের বিছানায় চোখ খুলল।

কিছুক্ষণ সে বুঝতেই পারল না সে কোথায়।

তারপর ধীরে ধীরে আগের রাতের কথা মনে পড়ল।

রিকশা।

কাদের।

১২টা ১৭ মিনিট।

মেসেজ।

সে হঠাৎ উঠে বসল।

— “আমি এখানে এলাম কীভাবে?”

ঘড়ির দিকে তাকাল।

সকাল ৮টা ৪২।

তার জামাকাপড় বদলানো হয়নি।

জুতায় শুকনো কাদা।

আর পকেটে হাত দিতেই সে একটা জিনিস অনুভব করল।

একটা ছোট্ট ধাতব বস্তু।

সে বের করল।

একটা পুরোনো রিকশার ঘণ্টা।

রাফির বুক ধক করে উঠল।

সে ঘণ্টাটা টেবিলের ওপর রাখল।

নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—

“হয়তো কোথাও পড়ে ছিল।”

কিন্তু সে জানত—

এটা সত্যি নয়।

কারণ ঘণ্টাটার নিচে কালো দাগে একটা সংখ্যা খোদাই করা।

১৭

ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।

একটা অচেনা নম্বর।

রাফি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কল ধরল।

ওপাশে কোনো কথা নেই।

— “হ্যালো?”

নীরবতা।

— “কে?”

তারপর খুব নিচু একটা কণ্ঠ—

“গতরাতে আপনি আমাকে দেখেছিলেন।”

রাফির শরীর শিউরে উঠল।

— “কাদের?”

ওপাশে উত্তর এল—

“আজ রাতে আবার আসবেন।”

কল কেটে গেল।


২

রাফি সারাদিন স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল।

কাজে গেল।

সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলল।

কম্পিউটারে বসে কাজ করল।

কিন্তু বারবার তার চোখ ঘড়ির দিকে চলে যাচ্ছিল।

সন্ধ্যা ৭টা।

৮টা।

৯টা।

তারপর রাত ১০টা।

একসময় সে নিজের ডেস্কের ড্রয়ার খুলল।

সেখানে গত রাতের সেই পুরোনো ঘণ্টাটা রাখা।

সে ঘণ্টাটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল।

তারপর গুগলে শিমুলতলা রোডের নাম লিখে খুঁজতে শুরু করল।

একটা পুরোনো সংবাদ প্রতিবেদন সামনে এল।

তারিখ—

১৭ বছর আগের।

শিরোনাম:

“শিমুলতলা রোডে ভয়াবহ রিকশা দুর্ঘটনা”

রাফি প্রতিবেদনটা পড়তে লাগল।

রাত ১২টা ১৭ মিনিটে একটি রিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের পুরোনো গ্যারেজের সামনে দুর্ঘটনার শিকার হয়।

রিকশাচালকের নাম—

কাদের মিয়া।

বয়স—

৩৮।

রাফির বুকের ভেতর কেমন যেন হয়ে গেল।

আরও পড়ল।

কাদের সেদিন একজন যাত্রীকে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু—

যাত্রীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

রাফি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

“যাত্রীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।”

এই লাইনটা তার মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল।

হঠাৎ সে নিচে আরও একটা তথ্য দেখতে পেল।

দুর্ঘটনার পর কাদেরের রিকশাটাও পাওয়া যায়নি।

রাফি চেয়ারে হেলান দিল।

তার মাথায় একটা প্রশ্ন এল—

“তাহলে গত রাতে আমি যে রিকশায় উঠেছিলাম, সেটা কোথা থেকে এল?”


৩

রাত ১১টা ৪০।

রাফি অফিস থেকে বের হলো।

সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—

আজ সে যাবে না।

কিন্তু রাস্তার মোড়ে পৌঁছাতেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।

একটা ছোট্ট ছেলে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

ছেলেটার হাতে একটা পুরোনো প্লাস্টিকের ব্যাগ।

সে বলল,

— “ভাইয়া।”

রাফি থামল।

— “কী?”

ছেলেটা একটা কাগজ এগিয়ে দিল।

— “আপনার জন্য।”

রাফি অবাক।

— “কে দিয়েছে?”

ছেলেটা রাস্তার দিকে আঙুল দেখাল।

— “ওই চাচা।”

রাফি তাকাল।

রাস্তা ফাঁকা।

কেউ নেই।

সে কাগজটা খুলল।

মাত্র একটা লাইন—

“আজ ১২টা ১৭ মিনিটে পুরোনো গ্যারেজে আসুন।”

রাফির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল,

— “চাচাটা কোথায়?”

ছেলেটা বলল,

— “ওই তো।”

রাফি যেদিকে তাকাল—

সেখানে একটা পুরোনো রিকশা দাঁড়িয়ে।

কিন্তু রিকশায় কেউ নেই।

সে আবার ছেলেটার দিকে তাকাল।

ছেলেটা নেই।


৪

রাফি জানত তার সেখানে যাওয়া উচিত নয়।

কিন্তু তার মাথায় একটা কথাই ঘুরছিল—

“যাত্রীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।”

সে জানতে চাইল—

সেই যাত্রী কে ছিল?

আর কাদের কেন তাকে আবার ডাকছে?

রাত ১২টা ১০ মিনিটে রাফি শিমুলতলা রোডে পৌঁছাল।

রাস্তা আগের মতোই ফাঁকা।

স্ট্রিটলাইটটা জ্বলছে।

তারপর নিভে গেল।

আবার জ্বলল।

রাফি পুরোনো গ্যারেজটার সামনে দাঁড়াল।

গ্যারেজটা বাইরে থেকে বন্ধ।

দরজায় মরিচা।

দেয়ালে পুরোনো পোস্টার।

একটা পোস্টারে ধুলো জমে গেছে।

রাফি হাত দিয়ে ধুলো সরাল।

তার বুক কেঁপে উঠল।

পোস্টারে লেখা—

“কাদের মিয়া — নিখোঁজ রিকশাচালক”

নিখোঁজ?

কিন্তু সংবাদে তো লেখা ছিল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।

রাফি পোস্টারের নিচে তারিখ দেখল।

১৮ বছর আগের।

সে পেছনে সরে এল।

ঠিক তখন—

ট্রিং...

রাফি ধীরে ধীরে ঘুরল।

একটা রিকশা দাঁড়িয়ে।

কাদের সামনে বসে আছে।

আজ তার মুখটা আরও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।

সে বলল,

— “আপনি এসেছেন।”

রাফি বলল,

— “আপনি আমাকে এখানে কেন ডেকেছেন?”

কাদের কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

— “কারণ আমার যাত্রা এখনো শেষ হয়নি।”


৫

রাফি বলল,

— “আপনি তো মারা গেছেন।”

কাদের মাথা নিচু করল।

— “হ্যাঁ।”

— “তাহলে আপনি এখানে কেন?”

কাদের কোনো উত্তর দিল না।

সে রিকশার পেছনের সিটে হাত রাখল।

— “বসুন।”

রাফি বসতে চাইল না।

কাদের বলল,

— “ভয় পাবেন না।”

রাফি কাঁপা গলায় বলল,

— “আপনি যদি সত্যিই মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে আমি কেন আপনাকে দেখতে পাচ্ছি?”

কাদের ধীরে বলল,

— “কারণ আপনি সেই মানুষটাকে খুঁজছেন, যাকে আমি সেদিন বাড়ি পৌঁছে দিতে পারিনি।”

রাফি থমকে গেল।

— “সে কে?”

কাদের বলল,

— “আমি জানি না।”

— “তাহলে আমাকে কেন?”

কাদের এবার প্রথমবারের মতো সরাসরি রাফির চোখের দিকে তাকাল।

— “কারণ আপনার কাছে তার একটা জিনিস আছে।”

রাফির বুক ধক করে উঠল।

— “আমার কাছে?”

— “হ্যাঁ।”

— “কী?”

কাদের বলল—

“একটা পুরোনো ছবি।”

রাফি সঙ্গে সঙ্গে তার পকেট হাতড়াল।

তার নিজের কোনো পুরোনো ছবি নেই।

কাদের বলল,

— “গতরাতে আপনি যখন আমার রিকশায় উঠেছিলেন, তখন আপনার পকেটে একটা ছবি ছিল।”

রাফি হতভম্ব।

সে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল।

ভেতরে নিজের পরিবারের ছবি।

তার বাবা-মা।

ছোটবেলার রাফি।

কাদের ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল—

— “এই মানুষটাকে আমি চিনি।”

রাফির হাত কেঁপে উঠল।

ছবিতে তার বাবার দিকে কাদের তাকিয়ে আছে।


৬

রাফির বাবা মারা গেছেন আট বছর আগে।

তিনি ছিলেন একজন ছোট ব্যবসায়ী।

রাফির শৈশবের বেশিরভাগ স্মৃতি বাবাকে ঘিরে।

কিন্তু বাবা কখনো শিমুলতলা রোডের কথা বলেননি।

রাফি কাদেরকে জিজ্ঞেস করল,

— “আপনি আমার বাবাকে কীভাবে চিনতেন?”

কাদের চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

— “আপনার বাবা সেদিন আমার রিকশায় উঠেছিলেন।”

রাফির নিঃশ্বাস আটকে গেল।

— “কী?”

— “সতেরো বছর আগে।”

— “কিন্তু আমার বাবা তো তখন—”

রাফি থেমে গেল।

তার বাবার বয়স তখন মাত্র ত্রিশের কাছাকাছি।

কাদের বলল,

— “তিনি একা ছিলেন না।”

রাফি ফিসফিস করে বলল,

— “তার সঙ্গে কে ছিল?”

কাদের উত্তর দিল না।

শুধু রিকশার সামনের ঘণ্টাটা হাতে নিল।

ট্রিং...

তারপর বলল—

— “যে মানুষটা আমার রিকশায় উঠেছিল, সে নিজের নাম বলেছিল ‘রহমান’।”

রাফির চোখ বড় হয়ে গেল।

কারণ তার বাবার নাম—

রহমান হোসেন।


৭

হঠাৎ বাতাস জোরে বইতে শুরু করল।

পুরোনো গ্যারেজের দরজা কাঁপতে লাগল।

ঠক... ঠক... ঠক...

রাফি পেছনে তাকাল।

গ্যারেজের দরজা ধীরে ধীরে একটু খুলে গেল।

ভেতরে অন্ধকার।

কাদের বলল,

— “ওখানে যান।”

রাফি বলল,

— “আমি একা?”

— “না।”

— “তাহলে কে আছে?”

কাদের কোনো উত্তর দিল না।

রাফি ধীরে ধীরে গ্যারেজের ভেতরে ঢুকল।

ভেতরে পুরোনো যন্ত্রপাতি।

ভাঙা চেয়ার।

মরিচা ধরা লোহার অংশ।

এক কোণে একটা কাঠের বাক্স।

রাফি বাক্সটার কাছে গেল।

তার ওপর ধুলো জমে আছে।

কিন্তু ধুলোর ওপর আঙুল দিয়ে কেউ যেন সদ্য লিখেছে—

“রাফি”

রাফির গলা শুকিয়ে গেল।

সে বাক্সটা খুলল।

ভেতরে একটা পুরোনো ডায়েরি।

আর একটা ছবি।

ছবিটা হাতে নিয়ে সে স্থির হয়ে গেল।

ছবিতে তার বাবা।

তার পাশে কাদের।

আর তাদের সঙ্গে—

একজন অচেনা মানুষ।

ছবির পেছনে লেখা—

“১২টা ১৭ মিনিটের আগে সত্যিটা জানাতে হবে।”

রাফি ডায়েরিটা খুলল।

প্রথম পাতায় লেখা—

“যদি এই ডায়েরি কেউ পায়, তাহলে বুঝতে হবে আমি আর ফিরে আসিনি।”

রাফির হাত কাঁপতে লাগল।

সে পরের পাতা খুলল।

সেখানে মাত্র একটি বাক্য—

“কাদেরকে বিশ্বাস করো না।”

রাফির বুকের ভেতর যেন সবকিছু থেমে গেল।

সে ধীরে ধীরে পেছনে তাকাল।

গ্যারেজের দরজায় কাদের দাঁড়িয়ে।

কিন্তু এবার তার মুখে সেই শান্ত ভাব নেই।

সে শুধু বলল—

“ডায়েরিটা বন্ধ করুন।”

রাফি নড়ল না।

কাদের এক পা এগিয়ে এল।

— “আমি বলেছি, ডায়েরিটা বন্ধ করুন।”

ঠিক তখন রাফির ফোন বেজে উঠল।

স্ক্রিনে কল আসছে—

“বাবা”

রাফি জমে গেল।

তার বাবা তো আট বছর আগে মারা গেছেন।

কলটা আবার এল।

“বাবা”

রাফির আঙুল কাঁপতে কাঁপতে কল রিসিভ করল।

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ নেই।

তারপর খুব নিচু একটা কণ্ঠ—

“রাফি... কাদেরকে বিশ্বাস করিস না।”

কল কেটে গেল।

রাফি মাথা তুলে কাদেরের দিকে তাকাল।

কাদের তখন আর গ্যারেজের দরজায় নেই।

সে কোথায় গেল?

রাফি চারদিকে তাকাল।

কেউ নেই।

তারপর তার পেছনে—

ট্রিং...

একটা রিকশার ঘণ্টা।

রাফি ধীরে ধীরে ঘুরল।

গ্যারেজের ভেতরে একটা রিকশা দাঁড়িয়ে।

আর তার সিটে বসে আছে—

রাফির বাবা।

রাফির মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।

তার বাবা ধীরে মাথা তুললেন।

আর বললেন—

“বাবা, তুই এখানে কেন এসেছিস?”

চলবে...

🌑 পর্ব–৩....

“শেষ যাত্রী”

যেখানে জানা যাবে—সতেরো বছর আগে আসলে কী ঘটেছিল, কাদেরের রিকশায় কে উঠেছিল, আর রাফির বাবার মৃত্যুর সঙ্গে সেই রাতের সম্পর্ক কী।

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login