পর্ব–৩: শেষ যাত্রী
রাফি কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।
পুরোনো গ্যারেজের অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই রিকশাটার দিকে সে তাকিয়ে ছিল।
রিকশার পেছনের সিটে একজন বসে আছে।
সাদা পাঞ্জাবি।
মাথা একটু নিচু।
মুখটা ছায়ায় ঢাকা।
কিন্তু সেই কণ্ঠ—
“রাফি... তুই এখানে কেন এসেছিস?”
রাফির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“বাবা...?”
লোকটা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
হ্যাঁ।
এটা তার বাবা।
যে মানুষটা আট বছর আগে মারা গেছে।
রাফি এক পা পিছিয়ে গেল।
“এটা হতে পারে না...”
লোকটা শান্ত গলায় বলল,
“তুই আমার কথা শুনিসনি।”
“কী কথা?”
“কাদেরকে বিশ্বাস করিস না।”
রাফির চোখ চলে গেল রিকশার সামনে।
কাদের মিয়া দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু এবার তার মুখে সেই আগের শান্ত ভাব নেই।
সে শুধু তাকিয়ে আছে রাফির দিকে।
তারপর বলল—
“আপনার বাবা সত্যিটা জানতেন।”
রাফি চিৎকার করে উঠল,
“সত্যিটা কী?!”
কাদের কোনো উত্তর দিল না।
হঠাৎ রিকশার ঘণ্টা বাজল।
টিং...
পুরো গ্যারেজ কেঁপে উঠল।
রাফির বাবা বললেন,
“সতেরো বছর আগে এই রিকশায় তিনজন মানুষ উঠেছিল।”
রাফি থমকে গেল।
“তিনজন?”
“আমি... একজন যাত্রী... আর তোর বাবা।”
কাদের মাথা নিচু করল।
তারপর রাফির বাবা বলতে শুরু করলেন—
“সেদিন রাত ১২টা ০৩ মিনিটে তোর বাবা আমার রিকশায় উঠেছিল।”
“তারপর?”
“কিছুক্ষণ পর রাস্তার পাশে একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিল।”
কাদের ধীরে ধীরে বলল,
“লোকটা আমাকে থামিয়ে বলেছিল—‘শিমুলতলা রোডের শেষ মাথায় যাব।’”
“আমি তাকে উঠিয়ে নিই।”
রাফি ফিসফিস করে বলল,
“তাহলে তিনজন?”
“হ্যাঁ।”
কাদের বলল,
“আমি চালাচ্ছিলাম। সামনে তোর বাবা। আর পেছনে সেই অচেনা লোক।”
গ্যারেজের বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তারপর ১২টা ১৭ মিনিটে...”
কাদের থেমে গেল।
রাফির বাবা বললেন,
“দুর্ঘটনা হয়েছিল।”
রাফির চোখে পানি চলে এল।
“কিন্তু বাবা... তুমি তো বলেছিলে তুমি সেদিন রাতে বাসায় ছিলে!”
তার বাবা নিচু গলায় বললেন,
“আমি মিথ্যা বলেছিলাম।”
রাফি চুপ করে গেল।
“কেন?”
“কারণ আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
“কিসের ভয়?”
তার বাবা রাফির দিকে তাকালেন।
“যে লোকটা আমাদের সঙ্গে ছিল... সে মানুষ ছিল না।”
চারপাশ নিস্তব্ধ।
রাফি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“কী বলছ?”
কাদের এবার বলল,
“দুর্ঘটনার কয়েক মিনিট আগে আমি আয়নায় তাকিয়েছিলাম।”
“আর?”
“পেছনে দুইজন মানুষ বসে ছিল।”
রাফি বলল,
“তোমার তো একজন যাত্রী আর আমার বাবা ছিল!”
কাদের মাথা তুলল।
“না।”
“পেছনে তিনজন ছিল।”
রাফির শরীর শিউরে উঠল।
“তৃতীয়জন কে?”
কাদের কোনো উত্তর দিল না।
শুধু গ্যারেজের অন্ধকার কোণের দিকে তাকাল।
রাফিও তাকাল।
সেখানে কিছুই নেই।
কিন্তু হঠাৎ—
টিং...
রিকশার ঘণ্টা আবার বাজল।
এবার শব্দটা গ্যারেজের ভেতর থেকে নয়।
রাফির ঠিক পেছন থেকে।
সে ঘুরতে যাচ্ছিল।
তার বাবা চিৎকার করে বললেন,
“পেছনে তাকাস না!”
রাফি স্থির হয়ে গেল।
তার ঘাড়ের কাছে যেন কারও নিঃশ্বাসের শব্দ।
খুব ধীরে কেউ বলল—
“রাফি...”
রাফির শরীর জমে গেল।
কণ্ঠটা তার নিজের বাবার নয়।
কাদেরেরও নয়।
এটা সেই অচেনা কণ্ঠ—
যেটা আগের রাতে ফোনে শুনেছিল।
“শেষ যাত্রী এখনো নামেনি।”
রাফি চোখ বন্ধ করে ফেলল।
তার বাবা বললেন,
“দৌড়!”
রাফি আর কিছু না ভেবে গ্যারেজের দরজার দিকে ছুটল।
পেছন থেকে একসঙ্গে কয়েকটা রিকশার ঘণ্টা বাজতে লাগল।
টিং... টিং... টিং...
সে দৌড়ে রাস্তার ওপর উঠে এল।
রাস্তা ফাঁকা।
কোনো মানুষ নেই।
কোনো গাড়ি নেই।
কোনো রিকশা নেই।
শুধু দূরে একটা স্ট্রিটলাইট জ্বলছে।
রাফি হাঁপাতে হাঁপাতে ফোন বের করল।
সময়—
১২:১৬ AM
সে অবাক হয়ে গেল।
“এতক্ষণ তাহলে...?”
তার মনে হলো, সে যেন কয়েক ঘণ্টা গ্যারেজে ছিল।
কিন্তু ঘড়িতে মাত্র এক মিনিট বাকি।
১২টা ১৭ মিনিট।
রাফি রাস্তার দিকে তাকাল।
দূরে একটা রিকশা আসছে।
ধীরে ধীরে।
তারপর আলোতে রিকশাটা পরিষ্কার হলো।
কালো পুরোনো রিকশা।
সামনে বসে আছে কাদের।
রাফির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
কাদের রিকশা থামাল।
তারপর শান্ত গলায় বলল—
“কোথায় যাবেন?”
রাফি পিছিয়ে গেল।
“কোথাও না।”
কাদের মৃদু হাসল।
“সবাই প্রথমে এটাই বলে।”
ঘড়িতে তখন—
১২:১৭ AM।
রাস্তার সব আলো একসঙ্গে নিভে গেল।
এক সেকেন্ড।
দুই সেকেন্ড।
তারপর আবার আলো জ্বলে উঠল।
রিকশাটা নেই।
কাদের নেই।
কেউ নেই।
শুধু রাস্তায় পড়ে আছে একটা পুরোনো ডায়েরি।
রাফি কাঁপা হাতে ডায়েরিটা তুলে নিল।
শেষ পাতাটা খোলা।
সেখানে লেখা—
“১৭ বছর আগে যে যাত্রী নামতে পারেনি, সে আজও তার গন্তব্য খুঁজছে।”
তার নিচে আরেকটা লাইন—
“আর তার গন্তব্যের নাম—রাফি।”
রাফির হাত থেকে ডায়েরিটা পড়ে গেল।
ঠিক তখন তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে কোনো নম্বর নেই।
শুধু লেখা—
UNKNOWN
রাফি কলটা ধরল না।
ফোন নিজে থেকেই রিসিভ হয়ে গেল।
ওপাশ থেকে খুব ধীরে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
“রাফি...”
সে কোনো উত্তর দিল না।
“তুই ভাবছিস সব শেষ?”
রাফির বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“এখনও তো শেষ যাত্রী ওঠেনি।”
কল কেটে গেল।
রাফি ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ স্ক্রিনে একটা নতুন ছবি ভেসে উঠল।
ছবিটা পুরোনো।
সতেরো বছর আগের।
একটা রিকশা।
সামনে কাদের।
সামনে বসে রাফির বাবা।
পেছনে একজন অচেনা লোক।
কিন্তু ছবিটা দেখে রাফির শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
কারণ ছবির একেবারে পেছনে—
আরেকজন দাঁড়িয়ে ছিল।
একজন কিশোর।
তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
রাফি ছবিটা জুম করল।
তারপর নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না।
ছবির সেই কিশোরটি—
রাফি নিজেই।
তার বয়স তখন প্রায় সাত বছর।
কিন্তু তার বাবা তো কখনো বলেনি যে রাফি সেদিন তাদের সঙ্গে ছিল।
রাফি পিছনে তাকাল।
রাস্তা ফাঁকা।
কিন্তু দূরে কোথাও একটা রিকশার ঘণ্টা বাজল।
টিং...
তারপর আরেকবার।
টিং...
তারপর খুব কাছে—
টিং...
রাফি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তার সামনে সেই কালো রিকশা দাঁড়িয়ে।
কাদের চালকের আসনে নেই।
সামনের সিট খালি।
পেছনের সিটও খালি।
শুধু রিকশার ওপর একটা ছোট কাগজ রাখা।
রাফি কাগজটা তুলে নিল।
সেখানে লেখা—
“এবার আপনি চালাবেন।”
রাফির হাত কাঁপতে লাগল।
সে কাগজটা ফেলে দিল।
ঠিক তখন রিকশার ঘণ্টা নিজে থেকেই বাজল।
টিং...
আর রাফি বুঝতে পারল—
সতেরো বছর আগে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল,
সেটা কাদেরের সঙ্গে শেষ হয়নি।
কারণ—
শেষ যাত্রী ছিল রাফি নিজেই।
সেই রাতের পর শিমুলতলা রোডে আর কেউ কাদেরকে দেখেনি।
কেউ আর সেই কালো রিকশাটাকেও দেখেনি।
কিন্তু স্থানীয় লোকজন একটা অদ্ভুত কথা বলে—
প্রতি বছর একই তারিখে,
রাত ঠিক ১২টা ১৭ মিনিটে,
শিমুলতলা রোডের পুরোনো গ্যারেজের সামনে একটা রিকশার ঘণ্টা শোনা যায়।
কেউ রিকশাটা দেখতে পায় না।
শুধু ঘণ্টার শব্দ।
টিং...
টিং...
আর মাঝে মাঝে—
একটা কণ্ঠ শোনা যায়।
খুব শান্ত কণ্ঠ।
খুব পরিচিত কণ্ঠ।
“কোথায় যাবেন?”
সমাপ্ত।