Story

আত্মাদের ট্রেন

October 5, 2026

19 views

আত্মাদের ট্রেন

পর্ব–১: শেষ ট্রেন

রাত তখন ১২টা ৪৮ মিনিট।

শহরের ব্যস্ততা অনেক আগেই থেমে গেছে।

রাস্তার দুপাশের দোকানগুলো বন্ধ। মাঝে মাঝে দূরে কোনো গাড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছে, তারপর আবার চারপাশ নিস্তব্ধ।

কিন্তু শহর থেকে একটু দূরে, পুরোনো রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চাঁদপুরা রেলস্টেশনটা যেন অন্য একটা পৃথিবী।

স্টেশনটা ছোট।

মাত্র দুইটা প্ল্যাটফর্ম।

একটা পুরোনো টিকিট কাউন্টার।

একটা ভাঙা চায়ের দোকান।

আর প্ল্যাটফর্মের মাথায় একটা বিশাল ঘড়ি, যেটা বহু বছর ধরে ঠিকমতো চলে না।

লোকজন বলে—

রাত ১১টার পর এই স্টেশনে থাকা উচিত নয়।

কারণ ওই সময়ের পর নাকি কখনো কখনো এমন একটা ট্রেন আসে—

যে ট্রেনের কোনো নম্বর নেই।

কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—

ওই ট্রেনের যাত্রীরা কখনো টিকিট কাটে না।

কথাগুলোকে আরিয়ান কখনো বিশ্বাস করেনি।

তার কাছে এগুলো ছিল গ্রামের মানুষের বানানো পুরোনো ভয় দেখানোর গল্প।

কিন্তু সেই রাতে...

সে নিজেই বুঝতে যাচ্ছিল, কিছু গল্প মানুষ বানায় না।

কিছু গল্প—

মানুষ শুধু দেখে।


আরিয়ানের বয়স বাইশ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে সে ঢাকায় একটা ছোট চাকরি করছিল।

সেদিন অফিসে কাজের চাপ বেশি থাকায় বের হতে রাত হয়ে যায়।

তার ওপর ফোনের ব্যাটারিও প্রায় শেষ।

বাড়িতে ফেরার জন্য সে প্রথমে একটা বাস ধরেছিল।

কিন্তু মাঝপথে বাস নষ্ট হয়ে যায়।

সবাই নেমে গেল।

আরিয়ানও নামল।

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও আর কোনো গাড়ি পেল না।

শেষ পর্যন্ত একজন রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করেছিল,

“ভাই, চাঁদপুরা স্টেশন পর্যন্ত যাবেন?”

রিকশাওয়ালা মাথা নেড়ে বলেছিল,

“না।”

“কেন?”

লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,

“ওদিকে এখন যাব না।”

আরিয়ান হেসেছিল।

“এত ভয় কিসের?”

রিকশাওয়ালা এবার তার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়েছিল।

“ভয় আমার না।”

“তাহলে?”

“যারা ওখানে অপেক্ষা করে... ভয় তাদের।”

আরিয়ান কথাটা বুঝতে পারেনি।

তবুও হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনে চলে এসেছিল।


স্টেশনে পৌঁছে সে প্রথম যে জিনিসটা লক্ষ্য করল—

পুরো স্টেশন ফাঁকা।

একজন মানুষও নেই।

টিকিট কাউন্টার বন্ধ।

চায়ের দোকানের শাটার নামানো।

প্ল্যাটফর্মের বাতিগুলোও ঠিকমতো জ্বলছে না।

একটা বাতি জ্বলছে।

পরেরটা নিভে আছে।

তারপর আরেকটা জ্বলছে।

আলো-অন্ধকারের একটা অদ্ভুত ছন্দ তৈরি হয়েছে।

আরিয়ান ফোন বের করল।

ব্যাটারি—

৭%

সে মাকে ফোন করতে চাইল।

কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই।

“দারুণ...”

সে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল।

তারপর স্টেশনের ঘড়ির দিকে তাকাল।

১২:৫৪।

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আর দশ-পনেরো মিনিট বসি। তারপর কোনোভাবে বের হব।”

ঠিক তখন—

টিং...

দূরে কোথাও ধাতব কিছু পড়ার শব্দ হলো।

আরিয়ান মাথা তুলল।

কেউ নেই।

“বিড়াল হবে।”

সে আবার ফোনের দিকে তাকাল।

স্ক্রিনে হঠাৎ একটা নোটিফিকেশন এল।

১টি নতুন ভয়েস মেসেজ।

প্রেরক—

Unknown

আরিয়ান অবাক হলো।

“আমাকে আবার কে ভয়েস মেসেজ পাঠাবে?”

সে মেসেজটা খুলল।

প্রথমে শুধু বাতাসের শব্দ।

তারপর খুব নিচু একটা কণ্ঠ—

“যদি ট্রেন আসে...”

একটু বিরতি।

“উঠবেন না।”

তারপর মেসেজ শেষ।

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে থাকল।

তারপর হেসে ফেলল।

“কেউ মজা করছে।”

কিন্তু কে?

তার নম্বর তো খুব বেশি মানুষের কাছে নেই।

সে মেসেজটা আবার শুনতে গেল।

ঠিক তখনই—

দূর থেকে একটা শব্দ এল।

কু-উ-উ-উ-উ...

আরিয়ানের হাসি থেমে গেল।

ট্রেনের হর্ন।

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“এখানে?”

স্টেশন ঘোষণার কোনো শব্দ নেই।

কোনো আলো নেই।

কোনো সিগন্যালও দেখা যাচ্ছে না।

তবুও রেললাইনের অনেক দূরে একটা আলো দেখা গেল।

প্রথমে ছোট।

তারপর বড়।

আরও বড়।

আরও কাছে।

কু-উ-উ-উ...

রেললাইন কাঁপতে শুরু করল।

আরিয়ান এক পা পিছিয়ে গেল।

তারপর কুয়াশার ভেতর থেকে ট্রেনটা বেরিয়ে এল।


ট্রেনটা দেখে প্রথমেই তার মনে হলো—

এটা খুব পুরোনো।

বগিগুলো কালচে।

জানালার কাচগুলো ধুলোয় ঢাকা।

কোনো বগির গায়ে ট্রেনের নাম নেই।

কোনো নম্বর নেই।

কোনো রুট নেই।

শুধু প্রতিটি বগির ওপর ছোট একটা সাদা সংখ্যা লেখা।

১

২

৩

৪

আরিয়ান অবাক হয়ে গুনতে লাগল।

একটা...

দুইটা...

তিনটা...

চারটা...

পাঁচটা...

ছয়টা...

তারপর আরও বগি।

সে গুনতে গুনতে থেমে গেল।

কারণ শেষ বগিটা দেখতে পাচ্ছে না।

ট্রেন যেন অন্ধকারের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসছে।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার—

ট্রেনটা কোনো শব্দ না করে এসে থামল।

না ব্রেকের শব্দ।

না চাকায় ঘর্ষণের শব্দ।

শুধু—

ঠাস।

শেষ বগিটা প্ল্যাটফর্মের সামনে এসে থেমে গেল।

আরিয়ান তাকিয়ে রইল।

কোনো দরজা খুলল না।

একটাও না।

তারপর—

ক্যাঁচ...

শেষ বগির একটা দরজা নিজে থেকেই খুলে গেল।

ভেতরটা সম্পূর্ণ অন্ধকার।

আরিয়ান নড়ল না।

ঠিক তখন ট্রেনের ভেতর থেকে একটা বৃদ্ধ লোক বেরিয়ে এল।

বয়স প্রায় সত্তর।

গায়ে ধূসর পাঞ্জাবি।

মাথায় পুরোনো টুপি।

হাতে একটা ছোট ব্যাগ।

লোকটা আরিয়ানের দিকে তাকাল।

তারপর চারপাশে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল,

“আপনি এখানে একা?”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

“জি।”

বৃদ্ধ লোকটা অদ্ভুতভাবে ভয় পেল।

“তাহলে চলে যান।”

“কেন?”

“ট্রেনটা চলে যাওয়ার আগেই।”

আরিয়ান বলল,

“এই ট্রেনটা কোথায় যাবে?”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“যেখানে আপনাকে নিয়ে যেতে হবে।”

আরিয়ান হেসে ফেলল।

“মানে?”

বৃদ্ধ আর কিছু বলল না।

হঠাৎ তার চোখ চলে গেল ট্রেনের ভেতরের দিকে।

তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“না...”

“কী হলো?”

বৃদ্ধ পিছিয়ে গেল।

“ওরা জেগে গেছে।”

আরিয়ান ট্রেনের ভেতরের দিকে তাকাল।

কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

“কারা?”

বৃদ্ধ এবার তার কাঁধ চেপে ধরল।

“যদি ট্রেনে ওঠেন...”

তার গলা কেঁপে উঠল।

“কাউকে নিজের নাম বলবেন না।”

“কেন?”

“কারণ ওরা একবার আপনার নাম জেনে গেলে...”

বৃদ্ধ থেমে গেল।

“তারপর?”

বৃদ্ধের চোখে আতঙ্ক।

“তারপর ট্রেন আপনাকে আর নামতে দেবে না।”

হঠাৎ ভেতর থেকে একটা ঘণ্টা বাজল।

টিং...

বৃদ্ধ লোকটা চমকে উঠল।

সে দ্রুত ট্রেনের ভেতরে ঢুকে গেল।

আর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

ধাম!

আরিয়ান কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নিজেকে বোঝাল—

“লোকটা পাগল।”

সে প্ল্যাটফর্মের অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করল।

কিন্তু তিন পা যাওয়ার পর থেমে গেল।

কারণ—

ট্রেনটা এখনও দাঁড়িয়ে।

আর তার সবগুলো জানালায় এখন মানুষ বসে আছে।


আরিয়ান ধীরে ধীরে একটা জানালার কাছে গেল।

ভেতরে একজন মহিলা বসে আছে।

বয়স প্রায় ত্রিশ।

সাদা শাড়ি।

চুল সামনে ঝুলে আছে।

মহিলাটি জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।

আরিয়ান কাচের দিকে একটু ঝুঁকে তাকাল।

মহিলাটি নড়ছে না।

একদম স্থির।

আরিয়ান পাশের জানালায় গেল।

একজন মধ্যবয়সী পুরুষ।

তারপর আরেকটা জানালা।

একজন ছোট ছেলে।

তারপর আরেকটা।

একজন বৃদ্ধা।

সবাই বসে আছে।

কেউ কথা বলছে না।

কেউ একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছে না।

শুধু—

সবাই সামনে তাকিয়ে আছে।

আরিয়ান তখন একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করল।

ট্রেনের প্রতিটি জানালায় বসা মানুষের পোশাক আলাদা।

কেউ আধুনিক।

কেউ পুরোনো।

কেউ এমন পোশাক পরে আছে যেটা সে বহু বছর আগের ছবিতে দেখেছে।

একজনের হাতে পুরোনো রেডিও।

একজনের কোলে একটা ছোট স্যুটকেস।

একজনের হাতে কাগজের টিকিট।

আর এক ছোট ছেলে জানালার কাচে আঙুল দিয়ে কিছু লিখছে।

আরিয়ান কাছে গেল।

ছেলেটা কাচে লিখল—

“যেও না।”

আরিয়ান পিছিয়ে গেল।

তার বুক ধক করে উঠল।

ছেলেটা এবার মাথা তুলল।

প্রথমবার তাদের চোখাচোখি হলো।

ছেলেটার চোখে কোনো ভয় নেই।

শুধু অদ্ভুত একটা দুঃখ।

সে আবার কাচে লিখল—

“তুমি ভুল ট্রেনে দাঁড়িয়ে আছো।”

আরিয়ান এক পা পিছিয়ে গেল।

তারপর—

ছেলেটা হঠাৎ হাসল।

আর কাচে লিখল—

“কারণ এই ট্রেনটা তোমার জন্য আসেনি।”

আরিয়ান বুঝতে পারল না।

“তাহলে কার জন্য?”

ছেলেটা এবার কাচে আরেকটা শব্দ লিখল।

“ওর জন্য।”

আরিয়ান চারপাশে তাকাল।

কেউ নেই।

“কে?”

ছেলেটা ধীরে ধীরে তার আঙুলটা জানালার বাইরে তুলল।

আরিয়ানের পেছনে।

আরিয়ান ঘুরতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখন—

টিং...

ট্রেনের সব দরজা একসঙ্গে খুলে গেল।


ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এল।

এত ঠান্ডা যে আরিয়ানের নিঃশ্বাস সাদা হয়ে গেল।

সে পিছিয়ে গেল।

তার ফোন বেজে উঠল।

UNKNOWN NUMBER

এইবার সে কল ধরল।

“হ্যালো?”

কোনো উত্তর নেই।

শুধু দূরে একটা শিশুর কান্নার মতো শব্দ।

তারপর একটা মহিলা কণ্ঠ—

“আপনি এখনও প্ল্যাটফর্মে আছেন?”

আরিয়ান বলল,

“জি।”

“তাহলে ভালো।”

“আপনি কে?”

“আমি আপনাকে আগে থেকেই সতর্ক করেছিলাম।”

আরিয়ান থেমে গেল।

“আপনি সেই ভয়েস মেসেজটা পাঠিয়েছিলেন?”

ওপাশে নীরবতা।

তারপর—

“হ্যাঁ।”

“আপনি কে?”

মহিলাটি বলল,

“আমি এই ট্রেনে উঠেছিলাম।”

আরিয়ান অবাক।

“কবে?”

ওপাশ থেকে উত্তর এল—

“সতেরো বছর আগে।”

আরিয়ান চুপ।

“আপনি এখনও ট্রেনে?”

“হ্যাঁ।”

“কেন নামেননি?”

কণ্ঠটা এবার খুব নিচু।

“কারণ ট্রেনটা এখনও আমার গন্তব্যে পৌঁছায়নি।”

আরিয়ান বলল,

“আপনার গন্তব্য কোথায়?”

ওপাশ থেকে অনেকক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

তারপর—

“চাঁদপুরা।”

আরিয়ান চারপাশে তাকাল।

“কিন্তু আমরা তো চাঁদপুরাতেই আছি!”

মহিলাটি খুব ধীরে বলল—

“না।”

“কী?”

“আপনি যে জায়গাটাকে চাঁদপুরা ভাবছেন...”

একটু বিরতি।

“সেটা আসল চাঁদপুরা নয়।”

কল কেটে গেল।


আরিয়ান ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

ব্যাটারি—

৩%

তার মাথা ঘুরছিল।

সে স্টেশনের দিকে তাকাল।

এখন প্ল্যাটফর্মটা আগের মতো মনে হচ্ছে না।

চায়ের দোকানটা কোথায়?

টিকিট কাউন্টারটা কোথায়?

স্টেশনের নামের বোর্ডটা?

সব আছে।

কিন্তু—

সবকিছু যেন অনেক পুরোনো।

দেয়ালের রং উঠে গেছে।

বাতিগুলো হলুদ।

প্ল্যাটফর্মে কুয়াশা।

আর সবচেয়ে ভয়ংকর—

স্টেশনের ঘড়ি।

কিছুক্ষণ আগেও সেখানে সময় ছিল ১২:৫৪।

এখন ঘড়িতে—

১:১৩

আর কাঁটাগুলো নড়ছে না।

আরিয়ান নিজের ঘড়ি দেখল।

১:১৩।

ফোনের সময়—

১:১৩।

সবকিছু যেন থেমে গেছে।

ঠিক তখন ট্রেনের দরজার কাছে একজন কন্ডাক্টর এসে দাঁড়াল।

কালো পোশাক।

হাতে পুরোনো টিকিট কাটার মেশিন।

সে বলল,

“টিকিট।”

আরিয়ান মাথা নাড়ল।

“আমার টিকিট নেই।”

কন্ডাক্টর বলল,

“আছে।”

“না, নেই।”

“আপনার পকেট দেখুন।”

আরিয়ান নিজের পকেটে হাত দিল।

তার আঙুল একটা কাগজে লাগল।

সে বের করল।

একটা পুরোনো ট্রেনের টিকিট।

কাগজটা হলুদ হয়ে গেছে।

তার ওপর লেখা—

যাত্রী: আরিয়ান

তারিখ: ১৭ বছর আগে

আরিয়ান জমে গেল।

“এটা কীভাবে...?”

কন্ডাক্টর বলল,

“আপনার সিট নম্বর ১৭।”

“আমি এই ট্রেনে উঠব না।”

কন্ডাক্টর এবার প্রথমবার হাসল।

“আপনাকে উঠতে হবে না।”

আরিয়ান অবাক।

“মানে?”

কন্ডাক্টর তার দিকে তাকিয়ে বলল—

“আপনি তো ইতিমধ্যেই উঠে গেছেন।”

আরিয়ান পেছনে তাকাল।

প্ল্যাটফর্ম নেই।

তার পায়ের নিচে ট্রেনের মেঝে।

সে চিৎকার করে উঠল—

“না!”

কন্ডাক্টর শান্তভাবে বলল,

“ভয় পাবেন না।”

“আমাকে নামতে দিন!”

“কোথায় নামবেন?”

“এই স্টেশনে!”

কন্ডাক্টর মাথা নাড়ল।

“এই স্টেশনে কেউ নামে না।”

“কেন?”

কন্ডাক্টর সামনে তাকাল।

তারপর বলল—

“কারণ এই স্টেশনটা তৈরি হয়েছিল তাদের জন্য...”

সে একটু থামল।

“যারা নিজেদের শেষ যাত্রা শেষ করতে পারেনি।”


আরিয়ান দৌড়ে ট্রেনের দরজার দিকে গেল।

একটা দরজা।

দুটো।

তিনটা।

সব দরজা বন্ধ।

সে একটা দরজায় ধাক্কা দিল।

কোনো লাভ হলো না।

“দরজা খোল!”

কেউ উত্তর দিল না।

সে জানালার দিকে তাকাল।

সব যাত্রী আগের মতো বসে আছে।

কিন্তু এবার—

সবাই তার দিকে তাকিয়ে।

মহিলা।

বৃদ্ধ।

ছোট ছেলে।

পুরুষ।

সবাই।

একসঙ্গে।

তারপর ছোট ছেলেটা ধীরে ধীরে হাত তুলল।

সে নিজের আসনের পাশের খালি জায়গাটা দেখাল।

তারপর কাচে আঙুল দিয়ে লিখল—

১৭

আরিয়ান বুঝতে পারল—

এটাই তার সিট।

সে ধীরে ধীরে পেছাতে লাগল।

ঠিক তখন ট্রেনের ভেতরের আলো নিভে গেল।

এক মুহূর্তে সম্পূর্ণ অন্ধকার।

তারপর—

একটা একটা করে সিটের ওপরে ছোট লাল বাতি জ্বলে উঠল।

১

২

৩

৪

...

১৭

লাল বাতিটা জ্বলে উঠতেই একটা কণ্ঠ শোনা গেল।

একেবারে তার কানের কাছে।

“আপনার সিট প্রস্তুত।”

আরিয়ান ঘুরে দাঁড়াল।

কেউ নেই।

কিন্তু তার সামনে—

সিট নম্বর ১৭।

আর সিটের ওপর রাখা একটা ছোট ব্যাগ।

সে ব্যাগটা চিনতে পারল।

এটা তার নিজের ব্যাগ।

কিন্তু তার আসল ব্যাগ তো তার কাঁধেই আছে।

সে ধীরে ধীরে ব্যাগটা খুলল।

ভেতরে একটা পুরোনো ছবি।

ছবিটা হাতে নিয়ে তার বুকের ভেতরটা থেমে গেল।

ছবিতে একটা রেলস্টেশন।

একটা পুরোনো ট্রেন।

আর সামনে দাঁড়িয়ে আছে—

একজন ছোট ছেলে।

বয়স পাঁচ কি ছয়।

তার পাশে একজন পুরুষ।

আরিয়ানের বাবা।

ছবির পেছনে লেখা—

“চাঁদপুরা স্টেশন — ১৭ বছর আগে।”

আর ছবির নিচে একটা নাম—

আরিয়ান।

তার হাত কাঁপতে লাগল।

“আমি... এখানে ছিলাম?”

হঠাৎ পেছন থেকে সেই বৃদ্ধ লোকের কণ্ঠ—

“হ্যাঁ।”

আরিয়ান ঘুরল।

বৃদ্ধ লোকটা দাঁড়িয়ে।

“আপনি তখন ছয় বছরের।”

“কিন্তু আমি তো মনে করতে পারি না!”

বৃদ্ধ বলল,

“মনে রাখার কথা নয়।”

“কেন?”

বৃদ্ধের চোখে ভয়।

“কারণ সেদিন রাতে...”

সে ধীরে ধীরে বলল—

“আপনাকে এই ট্রেন থেকে নামানো হয়েছিল।”

আরিয়ান স্তব্ধ।

“কে নামিয়েছিল?”

বৃদ্ধ উত্তর দিল না।

“বলুন!”

বৃদ্ধ এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল—

“আপনার বাবা।”

“তারপর?”

“আপনার বাবা আপনাকে নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমেছিলেন।”

“আর?”

বৃদ্ধের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“কিন্তু ট্রেন ছাড়ার আগে...”

সে থামল।

“আপনার বাবা আবার ট্রেনে উঠেছিলেন।”

আরিয়ানের চোখ বড় হয়ে গেল।

“কেন?”

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল—

“কারণ ট্রেনটা তখন একজন যাত্রীকে ডাকছিল।”

“কাকে?”

বৃদ্ধ আরিয়ানের দিকে তাকাল।

তারপর ফিসফিস করে বলল—

“আপনার বাবাকে।”

হঠাৎ ট্রেনের হর্ন বেজে উঠল।

কু-উ-উ-উ-উ...

সব যাত্রী একসঙ্গে মাথা তুলল।

কন্ডাক্টর দরজা বন্ধ করল।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

আরিয়ান জানালার বাইরে তাকাল।

প্ল্যাটফর্মটা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু প্ল্যাটফর্মে একজন দাঁড়িয়ে আছে।

একজন পুরুষ।

সাদা শার্ট।

হাতে একটা ছোট ব্যাগ।

আরিয়ান তাকে চিনতে পারল।

তার বাবা।

যে মানুষটা আট বছর আগে মারা গেছে।

বাবা জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন।

আরিয়ান চিৎকার করে উঠল—

“বাবা!”

তার বাবা হাত তুললেন।

কিন্তু বিদায় জানানোর জন্য নয়।

তিনি শুধু একটা কথা বললেন—

“আরিয়ান, পরের স্টেশনে নামবি না।”

ট্রেন দ্রুত অন্ধকারের দিকে চলে গেল।

আরিয়ানের ফোনের স্ক্রিন হঠাৎ জ্বলে উঠল।

ব্যাটারি—

০%

ফোন বন্ধ হওয়ার আগে স্ক্রিনে একটা শেষ মেসেজ ভেসে উঠল।

UNKNOWN:

“তুমি যে ট্রেনে উঠেছ, সেটি ১৭ বছর ধরে একই যাত্রায় আছে।

কিন্তু আজ প্রথমবার—

এর একজন যাত্রী জীবিত।”

ফোন নিভে গেল।

আরিয়ান ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

তার সামনে পুরো বগির সব যাত্রী দাঁড়িয়ে গেছে।

কেউ কথা বলছে না।

সবাই তার দিকে তাকিয়ে।

তারপর একসঙ্গে সবাই হাত তুলে—

ট্রেনের শেষ দরজার দিকে ইশারা করল।

সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন।

অন্ধকারের মধ্যে মুখ দেখা যাচ্ছে না।

কিন্তু কণ্ঠটা পরিষ্কার।

খুব পরিচিত।

“আরিয়ান...”

সে জমে গেল।

কণ্ঠটা আবার বলল—

“তুই এতদিন কোথায় ছিলি?”

আরিয়ান বুঝতে পারল—

এই ট্রেন তাকে প্রথমবার নিতে আসেনি।

ট্রেনটা সতেরো বছর আগে তাকে নিতে এসেছিল।

আর সেদিন—

কেউ একজন তাকে নামিয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু কেন?

আর সেই রাতে তার বাবা আসলে ট্রেনে কোথায় গিয়েছিল?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

ট্রেনের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা কে, যার কণ্ঠ আরিয়ানের নিজের বাবার মতো?

ট্রেন অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে গেল।

দূরে শুধু একটা শব্দ শোনা গেল—

কু-উ-উ-উ...

তারপর—

টিং...

টিং...

টিং...

🚆🌑 পর্ব–২আসছে.....

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login