তথ্যসূত্র: বিডিনিউজ২৪.কম, ডেইলি স্টার ও সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদন (২০১১)। তথ্যসূত্র লিঙ্ক কমেন্টে পিন করে দেওয়া হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যারা নিজেদের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন, তাদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক।
রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে বিদেশে গিয়ে একজন বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত যদি অন্য দেশের জাতীয় পতাকা নিজের গাড়িতে ব্যবহার করেন, সেটি কি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে?
বাংলাদেশের একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ও নেপালের জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি ভারতের জাতীয় সংগীত বাজানোর নির্দেশ দেওয়া হলে সেটি কি কেবল ‘ভারতের প্রতি বন্ধুত্ব’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায়?
নিমচন্দ্র ভৌমিকের ক্ষেত্রে এগুলো নিছক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বানানো গল্প নয়। ২০১১ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে.এফ.আর. জ্যাকবের সঙ্গে কয়েকটি বৈঠকে নিমচন্দ্র তাঁর গাড়িতে ভারতের পতাকা উড়িয়ে গিয়েছিলেন। একই তদন্তে তাঁর কূটনৈতিক আচরণকে অপেশাদার বলা হয় এবং নেপালে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
আরও গুরুতর বিষয় হলো—তৎকালীন প্রতিবেদনে তদন্তে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘুষ/আর্থিক অনিয়ম, ভিসা দিতে হয়রানি, নারীসংক্রান্ত অভিযোগ এবং নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠে আসে। দ্বিতীয় দফার তদন্তে তাঁর বক্তব্যও নেওয়া হয়েছিল।
২০১১ সালের প্রথম তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে পরবর্তী প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে অন্তত ১৮টি ঘটনার বর্ণনা ছিল এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন ও আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে পুরো সরকারি প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে না থাকায় ১৮টি ঘটনাকে আমি নিজে থেকে ১৮টি পৃথক ‘প্রমাণিত অভিযোগ’ হিসেবে সাজাচ্ছি না।
এখানে আমার প্রশ্ন অন্য জায়গায়—
যদি একজন রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় তদন্তে এত গুরুতর বিষয় উঠে আসে, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কিংবা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা—এসব কি তাঁকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নিয়ে যাবে?
মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সম্মানের। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় কোনো আজীবন দায়মুক্তির সনদ নয়।
একইভাবে, কেউ মুসলিম হলেই তাকে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলা যেমন ইতিহাসের প্রতি অপমান, তেমনি কোনো মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘ভারতের দালাল’ বলে চূড়ান্ত রায় দিয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীল ইতিহাসচর্চা নয়।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—একদিকে কিছু মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে সাধারণ মুসলমানকে বংশপরিচয় ধরে গালি দেন, অন্যদিকে নিজেদের রাজনৈতিক শিবিরের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে একই কঠোরতার ধারেকাছেও যান না।
এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধেই আমার আপত্তি।
যে মানুষ একজন সাধারণ নাগরিককে শুধু মত, পরিচয় বা ধর্মের কারণে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে অপমান করেন, তাঁর নিজের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানও প্রশ্নের বাইরে থাকতে পারে না।
ইতিহাস যদি সত্যিই আমাদের কাছে পবিত্র হয়, তাহলে একই মাপকাঠি সবার জন্য হতে হবে। ভারতের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব অপরাধ নয়। ভারতের মুক্তিযুদ্ধকালীন সহযোগিতাকে অস্বীকার করাও ইতিহাস নয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পদে থেকে অন্য দেশের প্রতীক ব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তার ব্যাখ্যা চাইতে হবে। কারো দ্বারা অভিযোগ প্রমাণিত হলে মুক্তিযোদ্ধা বলে হালকা করে দেখারও সুযোগ নেই। সেসময় কেউ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থাকায় তারা রাজাকার হলে এসময় দেশের সার্বভৌমত্বে কালি লেপনকারী কী হবে সেটা বিবেকের প্রশ্ন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং নিজের দেশের সার্বভৌম মর্যাদা, মানুষের অধিকার এবং সত্য বলার সাহস।
আর তাই অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত যে—
যে-ই হোক, যে দলেরই হোক, যে ধর্মেরই হোক, যে পরিচয়ের হোক—অভিযোগের বিচার একই মাপকাঠিতে হতে হবে।
• কেউ মুক্তিযোদ্ধা বলে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না। প্রমাণিত অপরাধ ভুলে নমনীয় আচরণ দেখানো যাবে না।
• কেউ মুসলমান বলেই রাজাকার বলা যাবে না
• কেউ হিন্দু বলে ভারতের এজেন্ট হয়ে যায় না।
• কেউ আওয়ামী লীগ করে বলে দেশদ্রোহী নয়।
• কেউ বিএনপি করে বলে চাঁদাবাজ নয়।
অভিযোগের জবাব প্রমাণে দিতে হবে, গালিতে নয়।
কারণ, ইতিহাসের সাথে প্রতারণা শুধু মিথ্যা নথিভূক্তকরণে নয়।— বরং ইতিহাসকে নিজের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য বেছে বেছে ব্যবহার করাও ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা।
#মতামত #মুক্তিযুদ্ধের_চেতনা #জবাবদিহিতা #সার্বভৌমত্ব #ইতিহাসComments
Be this story’s first reader
+40 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.