আমারে আর খোঁজেনা খেয়াঘাটের বাঁশিওয়ালা।
নদীর ঘাটে এখন আর আগের মতো সাঁঝ নামে না,
পানি ছুঁয়ে যাওয়া বাতাসটাও কেমন জরাগ্রস্ত, ভারি।
যে বাঁশির সুরে একদিন চরের বালিতে ফুটত কদম ফুল,
সে বাঁশি এখন আর ডাক পাঠায় না এই নিঝুমপাড়ে।
হিজল গাছের ছায়াটায় কত রূপকথা জমা ছিল,
পাড়ের ভেজা মাটিতে কত মনছবি আঁকা হইতো।
উজান ঠেইলা যখন তার ডিঙিটা ভিড়ত ঘাটে,
আমার বুকের ভিতর তখন উথালপাথাল মেঘের আওয়াজ।
কলসি ভরার ছলে শতবার গেছি নদীর কূলে,
কেবল তার ওই উদাসী সুরটুকু মনে বাঁধবার তরে।
তখন বৈশাখী মেঘের মতো তাহার চোখে ছিল মাতলামি,
আমারে দেইখ্যাই সুরের গাঙ্গে বান ডাকাইতো সে।
কত কথা বলত না কথা, শুধু ফুঁয়ের টানে,
যাতনা যত ছিল, তা যেন কোন দূর পরবাসে ভাসাইয়া দিত।
আমার কানের কূলে ধানের শিষ গুইজা দিয়া বলত,
তুই তো কূলভাঙা নদীর মতো রে, তোর প্রেমে ডুবলে আর তরী কূলে ভিড়ে না।
হায় রে পোড়া কপাল!
আইজ সেই বাঁশি নিঝুম হইয়া পইড়া আছে কোন অচিন পুরে।
আমি বাঁশের সাঁকো পার হইয়া রোজ থমকাইয়া দাঁড়াই,
চোখ জোড়া খোঁচায় পলিমাটির ধুলো আর বিষাদের বালি।
নদীর বুক চিইড়া কত নৌকা চইলা যায়,
আমার খেয়ার মাঝি আর আসে না, তরীও ভিড়ে না।
ঘাটের পথটায় এখন আগাছা গজাইছে,
বুকের ভেতরটা স্যাঁতসেঁতে কালচে দেয়ালের মতো খাঁ খাঁ করে।
আমারে ভুইলা সে হয়তো অন্য কোন ঘাটে সুর বিলায়,
অন্য কোন রূপসীর খোঁপায় গুঁইজা দেয় বুনো ফুল।
অথচ আমার আঁচলে এখনো সেই পলিমাটির গন্ধ লেগে আছে,
আমার কানের লতিতে এখনো বাজে সেই পুরান বাঁশির সুর।
রোজ সাঁঝের বাতিটা জ্বালানির কালে বুকের বাঁধ ভেঙে যায়,
চোখের জলে কূল ভাসে, কিন্তু সে তো আইসা চোখ মোছে না।
আমার এই নিঝুম অঙ্গনে কেবলই পইড়া থাকে আঁধার,
আর এক সমুদ্র ব্যাকুলতা, যা নদীর জলে মিশে ছাই হইয়া যায়।
আইজও আমি থাইকা থাইকা ঘাটের দিকে চাইয়া থাকি,
ভুল কোইরা ভাবি, ঐ বুঝি ডাহুক পাখির সুরের সাথে ভাসাইয়া দিল আমার নাম!
কিন্তু না, বাতাস খালি দীর্ঘশ্বাসের সুর।
সে আর ফিরব না রে, সে আর আমারে খুঁজব না।
অভিমানের অতল জলে আমার যুবতী বেলা তলাইয়া গেল,
প্রেমের জোয়ার থাইমা গিয়া পইড়া রইল বিষাদের এক শুকনা চর।
আমি তো তার সেই ভেজা চোখের চাহনিতেই বাইচা ছিলাম,
তার সুরের ছায়াতেই আমার সমস্ত ঘরকন্যা পাতা ছিল।
এখন বাঁশিও নীরব, নাওয়ের দাঁড়ও ভাঙা,
আমি একলা নদীর কূলে পইড়া থাকা অলক্ষ্মী ছায়া।
আমারে আর খোঁজেনা খেয়াঘাটের বাঁশিওয়ালা,
আমার বিরহ এখন নদীর বুক জুইড়া কেবলই হাহাকার।