Story

পরীক্ষার রাত

October 6, 2026

47 views

পরীক্ষা—ছোটবেলায় এই শব্দটার মধ্যেই যেন একটা অদ্ভুত ভয় লুকিয়ে ছিল। বই খুললেই মনে হতো, সবকিছু ভুলে যাচ্ছি। খাতা সামনে এলেই হাত কাঁপত। শিক্ষক বলতেন, “ভালো করে পড়াশোনা করো, সামনে পরীক্ষা।” আর আমি মনে মনে ভাবতাম, পরীক্ষাটা যদি কোনোভাবে না থাকত! কিন্তু বাবা পরীক্ষাকে কখনো ভয় পাওয়ার বিষয় হিসেবে দেখতেন না। তাঁর কাছে পরীক্ষা ছিল শুধু বইয়ের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় নয়; বরং নিজের চেষ্টা, ধৈর্য আর দায়িত্ববোধ যাচাই করার একটা সুযোগ।

পরীক্ষার কয়েক দিন আগে থেকেই বাবা আমার পড়াশোনার খোঁজ নিতেন। সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে ক্লান্ত শরীরে বসে বলতেন, “আজ কী পড়েছিস?” আমি কখনো বলতাম, “অনেক পড়েছি।” বাবা বই খুলে দু-একটা প্রশ্ন করলেই বোঝা যেত, আমার “অনেক পড়া” আসলে কতটুকু। তখন আমি বিরক্ত হয়ে বলতাম, “বাবা, তুমি সবসময় পড়া নিয়ে বসো কেন?” বাবা হেসে বলতেন, “কারণ আমি চাই, পরীক্ষা শেষ হলে যেন তুই নিজের ওপর রাগ না করিস।”

তখন তাঁর কথার মানে বুঝতাম না। মনে হতো, বাবা শুধু নম্বর চান। ভালো ফল না করলে হয়তো তিনি রাগ করবেন, অন্যদের সঙ্গে তুলনা করবেন। কিন্তু বাবা কখনো আমাকে শুধু নম্বর দিয়ে বিচার করেননি। তিনি সবসময় জানতে চাইতেন, “তুই নিজের সেরাটা দিয়েছিস তো?” এই প্রশ্নটার উত্তরই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

পরীক্ষার আগের রাতগুলো ছিল আমাদের বাড়ির অন্যরকম রাত। অন্যদিন রাত একটু গভীর হলেই বাবা বলতেন, “এবার ঘুমিয়ে পড়।” কিন্তু পরীক্ষার আগের রাতে তিনি নিজেই আমার পাশে বসে থাকতেন। টেবিলের ওপর বই, খাতা, পেন্সিল, স্কেল—সব গুছিয়ে রাখা থাকত। মা মাঝেমধ্যে এসে বলতেন, “ওকে বেশি রাত পর্যন্ত পড়িয়ো না। সকালে আবার পরীক্ষা।” বাবা মাথা নেড়ে বলতেন, “আর একটু পড়ুক, তারপর ঘুমাবে।”

একবার গণিত পরীক্ষার আগের রাতে আমি একটি অধ্যায় কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। যতবার চেষ্টা করছি, ততবার ভুল হচ্ছে। একটা সময় রাগে খাতাটা বন্ধ করে বলেছিলাম, “আমি পারব না। কাল পরীক্ষায় আমি খারাপ করব।” বাবা তখন আমার পাশে বসে ছিলেন। তিনি খাতাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর বললেন, “একটা অঙ্ক না পারলেই মানুষ হেরে যায় না।”

আমি চুপ করে ছিলাম। বাবা আবার বললেন, “দেখ, জীবনে অনেক অঙ্ক আসবে যেগুলোর উত্তর তুই প্রথমবারেই পাবি না। তাই বলে কি চেষ্টা বন্ধ করে দিবি?”

তিনি খুব ধীরে ধীরে অঙ্কটা বুঝিয়ে দিলেন। আমি আবার করলাম। ভুল হলো। আবার করলাম। এবারও ভুল। বাবা বিরক্ত হলেন না। তৃতীয়বার করলাম। এবার ঠিক হলো। আমি আনন্দে বললাম, “হয়ে গেছে!” বাবা হেসে বললেন, “দেখলি? তুই পারিস। শুধু তুই নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলি।”

সেদিন অঙ্কের উত্তরটা হয়তো আমি শিখেছিলাম, কিন্তু তার চেয়েও বড় একটা শিক্ষা পেয়েছিলাম—কোনো কিছু না পারা আর কোনো কিছু কখনোই পারব না, এই দুটো কথা এক নয়।

পরীক্ষার রাতে বাবার নিজের ঘুমও যেন কমে যেত। আমি পড়ার টেবিলে বসে থাকতাম, আর তিনি কিছু দূরে বসে নিজের কাজ করতেন। মাঝে মাঝে ঘড়ির দিকে তাকাতেন। কখনো পানি এনে দিতেন। কখনো বলতেন, “চোখে পানি দে।” কখনো বলতেন, “অনেক হয়েছে, এবার ঘুম।” তাঁর নিজের পরদিন হয়তো সকালেই কাজে যেতে হতো। তবু সন্তানের পরীক্ষার রাতে বাবার ক্লান্তির হিসাব যেন আলাদা হয়ে যেত।

এক রাতে পড়তে পড়তে আমার চোখ লেগে গিয়েছিল। ঘুমের মধ্যে শুনেছিলাম বাবা মাকে বলছেন, “ওকে আর ডাকো না। অনেক পড়েছে। সকালে একটু আগে উঠিয়ে দেব।” মা বলেছিলেন, “তুমিও তো সারাদিন কাজ করেছ।” বাবা মৃদুস্বরে বলেছিলেন, “ওর পরীক্ষা তো। আমি থাকলে ওর সাহস হয়।”

আমি তখন আধো ঘুমে কথাগুলো শুনেছিলাম। পুরোপুরি বুঝিনি। কিন্তু সেই কথাগুলো কোথাও গিয়ে আমার মনে জমা হয়ে ছিল।

পরদিন পরীক্ষার হলে যাওয়ার সময় বাবা আমার ব্যাগটা দেখে বললেন, “কলম নিয়েছিস?” আমি বললাম, “হ্যাঁ।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “অতিরিক্ত একটা আছে?” আমি বললাম, “না।” বাবা নিজের পকেট থেকে একটা কলম বের করে দিয়ে বললেন, “এটা রাখ। দরকার হতে পারে।”

পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে তিনি শুধু বলেছিলেন, “প্রশ্ন কঠিন হলে ভয় পাবি না। আগে যেগুলো পারিস সেগুলো করবি। সময় নিয়ে চিন্তা করবি না। আর একটা কথা—অন্য কারও খাতা দেখবি না।”

আমি হেসে বলেছিলাম, “বাবা, আমি কি নকল করব?”

বাবা বলেছিলেন, “আমি জানি তুই করবি না। তবু মনে করিয়ে দিলাম। কারণ জীবনে কেউ না দেখলেও নিজের বিবেক সবসময় দেখে।”

সেদিন পরীক্ষার প্রশ্ন সত্যিই কঠিন হয়েছিল। কয়েকটা প্রশ্ন দেখে আমার মাথা ঘুরে গেল। মনে হলো, বাবা যে কথাটা বলেছিলেন—“ভয় পাবি না”—সেটাই মনে রাখতে হবে। আমি আগে সহজ প্রশ্নগুলো করলাম। তারপর ধীরে ধীরে কঠিন প্রশ্নে গেলাম। পরীক্ষা শেষে বের হয়ে দেখি বাবা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমি দূর থেকেই বললাম, “বাবা, পরীক্ষা ভালো হয়নি।”

তিনি বললেন, “কত নম্বর পাবি?”

আমি বললাম, “জানি না।”

বাবা হেসে বললেন, “তাহলে পরীক্ষা ভালো হয়নি কীভাবে বুঝলি?”

আমি চুপ করে গেলাম।

তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “যেটুকু পারিস করেছিস তো?”

আমি মাথা নেড়ে বললাম, “হ্যাঁ।”

“তাহলে চিন্তা করিস না।”

এই “চিন্তা করিস না” কথাটা বাবারা কত সহজে বলে ফেলেন! অথচ সন্তানের চিন্তা নিয়ে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি চিন্তা করেন।

ফলাফল প্রকাশের দিন আমার প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর এসেছিল। আমি ভেবেছিলাম বাবা খুব রাগ করবেন। সারাদিন বুকের ভেতর একটা ভয় কাজ করছিল। ফলাফল হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। বাবা কাগজটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর বললেন, “খারাপ হয়েছে?”

আমি মাথা নিচু করে বললাম, “হ্যাঁ।”

বাবা বললেন, “তুই কি চেষ্টা করেছিলি?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ।”

তিনি বললেন, “তাহলে এবার ভুলটা কোথায় হয়েছে সেটা দেখ।”

আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালাম। বললাম, “তুমি রাগ করনি?”

বাবা একটু হেসে বললেন, “রাগ করলে কি নম্বর বেড়ে যাবে?”

আমি চুপ।

তিনি আবার বললেন, “ভুল থেকে শিখলে নম্বর না বাড়লেও মানুষটা বড় হয়।”

সেদিন প্রথমবার বুঝেছিলাম, বাবা আমার ফলাফলের চেয়ে আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তা করেন।

সময় পেরিয়ে আমি বড় হলাম। পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ল, পড়াশোনা কঠিন হলো, জীবনের পরীক্ষাও শুরু হলো। স্কুলের পরীক্ষার বদলে চাকরির পরীক্ষা, কাজের চাপ, মানুষের বিচার, ব্যর্থতা, দায়িত্ব—সবকিছু মিলিয়ে জীবনের প্রশ্নগুলো আরও কঠিন হয়ে উঠল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, প্রতিবার কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লে বাবার সেই পুরোনো কথাগুলো মনে পড়ত।

“আগে যেটা পারিস সেটা কর।”

“ভয় পাস না।”

“নিজের ওপর বিশ্বাস রাখ।”

“অন্যায় করে জিতিস না।”

“চেষ্টা করেছিস তো?”

তখন বুঝলাম, বাবা আমাকে শুধু স্কুলের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করেননি। তিনি আমাকে জীবনের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করছিলেন।

একদিন অনেক বছর পর পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি পুরোনো খাতা পেলাম। খাতার ভেতরে আমার স্কুলের পরীক্ষার কয়েকটি ফলাফল, কিছু ছোট্ট নোট আর কয়েকটি তারিখ লেখা ছিল। আমি অবাক হয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এগুলো তুমি রেখেছ?”

বাবা বললেন, “হ্যাঁ।”

আমি বললাম, “এত পুরোনো জিনিস এখনো রেখেছ কেন?”

তিনি বললেন, “তোর জীবনের কোনো সময়কে আমি পুরোনো মনে করি না।”

আমি খাতাটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম।

তখন মনে হলো, আমি যে পরীক্ষার ফলাফল ভুলে গেছি, বাবা সেগুলোও ভুলে যাননি। আমি যে রাতগুলোকে সাধারণ রাত ভেবেছিলাম, বাবা সেগুলোকে নিজের জীবনের স্মৃতি করে রেখেছেন। আমি যে নম্বরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করিনি, বাবা সেই নম্বরের চেয়েও বেশি যত্ন করে রেখেছেন আমার চেষ্টা, আমার ভয়, আমার ছোট ছোট সাফল্য আর ব্যর্থতার গল্প।

আজ বুঝি, জীবনে যত পরীক্ষা এসেছে, তার আগে হয়তো বাবার পাশে বসে আর পড়া হয়নি। কিন্তু তাঁর শেখানো সাহসটা আমার সঙ্গে ছিল। অনেক কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, বাবা পাশে থাকলে বলতেন—“ভয় পাবি না, আগে যেটা পারিস সেটা কর।”

বাবারা সব পরীক্ষার উত্তর বলে দেন না। তাঁরা শুধু এমনভাবে সন্তানকে তৈরি করেন, যাতে সন্তান একদিন নিজের উত্তর নিজেই খুঁজে নিতে পারে।

আর জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায়—যখন আমরা নিজের কাছে প্রশ্ন করি, “আমি কি সত্যিই ভালো মানুষ হতে পেরেছি?”—তখন হয়তো বাবার মুখটাই সবচেয়ে আগে মনে পড়ে।

কারণ বাবা কখনো বলেননি, “শুধু বড় কিছু হবি।”

তিনি বলেছিলেন, “মানুষ হবি।”

আজও জীবনের কঠিন কোনো রাতে সেই কথাটাই আমার সবচেয়ে বড় উত্তর।

Picked up where you left off

Comments

Borhan Mahmud was this story’s first reader

+25 XP

    Please login to post comment. Login

  • Borhan Mahmud 2 weeks ago First reader

    জীবনের পাঠ এর শিক্ষা শুরু হয় বাবাদের হাতেই। এই যে বললেন, তুই পারিস। শুধু তুই নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলি; এটাই মূল প্রেষণা। সকল বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা। ভালো লেগেছে লেখাটি। শুভেচ্ছা জানবেন।