-এতোক্ষণ তোমার কথা শুনে যা বুঝলাম, তোমার মেজাজ দেখি একশো একশো।
-এই ছাতা বুঝার আবার কি আছে? ওরা কি রাগ না হবার মতো কোনো কাজ করেছে? ধ্যাত, আমার সাথেই এমন কেন হয়? বিদ্যুৎ ও নাই ছাতার মাথা!
মেয়েটার চোখে পানি চলে এসেছে, পলিশড মার্বেলের ওপর আলো পড়লে যেমন জ্বল জ্বল করে, ওর চোখ অমন জ্বলছে। চোখের পলক ফেললেই পানি পড়ে যাবে। প্রাণপণ চেষ্টা করছে চোখের পলক না ফেলার। এইযুগের মেয়েরা ছ্যাত ছ্যাত করে কান্নাকাটির পক্ষে না বলে মনে হয়। অন্য কেউ চোখে পানি দেখে ফেলা ভীষণ লজ্জার ব্যাপার। এতোদিন শুনেছি প্রচন্ড রাগ হলে অনেক মেয়ে নাকি কেঁদে দেয়। আজ প্রথম দেখতে যাচ্ছি মনে হয়।
নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, "রাত হচ্ছে। থাকো, উঠি।"
-থেকে গেলে আর কবে আমার সাথে? চলেই তো যাবা তোমার এসি ওয়ালা বাসায়। এই গরমে একটু বসে যাও আমার সাথে।
- সস্তা মশকরা করবা না। মশকরার মুডে নাই আমি।
-আরে রাগো কেন? আমি কি করসি আবার?
-তোমার এই "আমি কি করসি" শুনলেই শরীর জ্বলে যায়। তোমাদের ছেলেদের সমস্যা কি?
শিফার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এই বুঝি চোখ দুটো কোটর থেকে বের হয়ে আসবে রাগের প্রতাপে। এই মুহূর্তে খুব সাবধানে কথা বলতে হবে। হুট হাট কোনো কথা বললে উঠে চলে যাবে। এবং কয়েকদিন ঠিক মতো কথা বলবেনা। এতো বছরের অভিজ্ঞতায় এটুকু শিখেছি।
-এতো সুন্দর একটা মেয়ের চেহারায় কি এতো রাগ মানায়, শিফু? এতো রাগ নিয়ে জীবন চলবে?
জাজমেন্টাল একটা চাহুনি দিয়ে দেখলাম ওর চেহারা স্থির হয়ে গেল। বললো, "রাগ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।"
-অবশ্যই। তবে বাঁচার মতো বাঁচিয়ে রাখে আশা। তুমি যেমন আমাদের আশা।
-'আমাদের?'
-আসলে তুমি এতো বেশি প্রিটি যে এই সৌন্দর্য কে শুধু নিজের বলে দাবি করার মতো সাহস পাইনা। নিজের কেন, কারোর ই না। তুমি হলে কোহিনূর হীরার মতো। কোহিনূর যার কাছেই থাকুক না কেন, ওর ওপর অধিকার ফলানো যায়না, দাম বসানো যায়না, একান্তই নিজের বলে দাবি করা যায়না। কোহিনূর হয় পুরো একটা জাতির অহংকার, কোহিনূর কেউ ছুয়ে দেখতে পারেনা, দূর থেকে দেখে আর বলে "খোদার কি সৃষ্টি!"
অদ্রি একটু হেসে দিয়ে বললো, "হইসে হইসে, আর ফ্লার্ট করতে হবেনা। কি গরম পড়েছে! একটু বাতাস ও নাই।"
শিফা কে ভালোবেসে আমি অদ্রি বলে ডাকি। অদ্রি শব্দের অর্থ সূর্য; মেয়েটা খুব সুন্দর হাসে। সব মেয়ে হাসলে সুন্দর লাগেনা। যে মেয়ের দাঁত সুন্দর, তাদের হাসি দেখলে পরাণ জুড়িয়ে যায়। শিফা অমন একজন।
-বাতাস বওয়া শুরু হবে এখনি। তোমার রাগের তীক্ষ্ণতায় পরিবেশ গরম ছিল। আর দুই একবার হাসলে দেখবে তোমার হাসির ঝলকে প্রকৃতি বাতাস দিতে শুরু করবে।
ও আবার হেসে দিয়ে আমার হাত ধরে কাধে মাথা দিয়ে বললো, "পাগল!"
আসলেই বাতাস লাগতে শুরু হলো। ঘামে আঠা আঠা হয়ে যাওয়া চামড়ায় বাতাস লেগে পরাণ টা জুড়িয়ে গেল। আমি মাঝে মাঝে এমন আন্দাজে কথা বললে লেগে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় বলে কো-ইন্সিডেন্স। আরো এক্সপ্লেনেশ আছে যদিও!
সমস্যা হচ্ছে, ঘুমের ভেতর গরমে ঘেমে গেলে হুট করে ফ্যান এর বাতাস শরীরে লাগার পরে এক পলকের জন্য ঘুম ভেঙে যায়। এরপরে আমরা দীর্ঘ একটা শান্তির নিশ্বাস নিয়ে আবার ঘুমোতে যাই। তবে সে রাতে আর ঘুম আসলো না। শেষ ওর সাথে দেখা হয়েছে অনেক বছর আগে। কেমন আছে কে জানে! ভালোই থাকার কথা, পৃথিবী নিষ্ঠুর। পৃথিবী শুধুমাত্র সকল সুন্দর সৃষ্টিকে ভালো রাখে। শিফার সাথে আমার হাজারবার ঝগড়া হয়েছ। কান্নাকাটি করতে দেখেছি আরো বেশি। খুব একটা ভালো রাখতে পারিনি কখনোই। তবে যখন ই ওর কথা মনে পড়ে, শুধু সুন্দর স্মৃতি গুলোই ভেসে আসে। আমার স্বপ্নে শিফা আর আমি চিরকাল সুখী! রাগ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। আশাও মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। তবে, মানুষ বাঁচে মূলত স্বপ্নে। স্বপ্ন ভেঙে যায়। কবি বলেছিলেন,
"পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা হয়ে যায় ক্ষয়,
প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়,
হয় নাকি?’