হিজরতের পর মদিনায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই রাসুলুল্লাহ ﷺ কুরাইশদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং মক্কার সঙ্গে মদিনার মধ্যবর্তী অঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য সাহাবিদের বিভিন্ন ছোট সামরিক দলে পাঠাতে থাকেন। এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ছিল আবদুল্লাহ ইবন জাহশ (রা.)-এর নেতৃত্বাধীন সারিয়্যাহ। এই অভিযানটি ইসলামের প্রাথমিক সামরিক ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এর সঙ্গে পরবর্তীকালে যুদ্ধের অনুমতি, রজব মাসের পবিত্রতা এবং কুরাইশদের সঙ্গে মুসলমানদের সংঘাতের নতুন পর্যায়ের সম্পর্ক রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ আবদুল্লাহ ইবন জাহশ (রা.)-কে কয়েকজন মুহাজির সাহাবির নেতৃত্ব দিয়ে একটি অভিযানে পাঠান। তাঁকে একটি লিখিত নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেটি খুলে না দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে সীরাতের বর্ণনায় পাওয়া যায়। নির্দেশনা পড়ার পর তিনি জানতে পারেন যে তাঁকে মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়ে কুরাইশদের একটি কাফেলার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এই অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রাচীন সীরাতের বর্ণনায় বিভিন্ন বিবরণ রয়েছে, তাই প্রতিটি বিস্তারিত তথ্যকে একই মাত্রায় নিশ্চিত বলে গ্রহণ করা উচিত নয়।
আবদুল্লাহ ইবন জাহশ (রা.)-এর দল নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছে কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফেলার সন্ধান পায়। কাফেলাটি সিরিয়া থেকে মক্কার দিকে ফিরছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। মুসলিম দলের সামনে তখন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত তৈরি হয়। তারা যদি কাফেলাটির ওপর আক্রমণ করে, তাহলে তা পবিত্র রজব মাসে সংঘটিত হবে; আর যদি তারা অপেক্ষা করে, তাহলে কাফেলাটি তাদের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষ ঘটে এবং কাফেলার একজন ব্যক্তি নিহত হয়, দুজনকে বন্দি করা হয় এবং বাণিজ্যপণ্য মুসলিম দলের হাতে আসে। এই ঘটনার পর মুসলমানদের মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়, কারণ রজব মাসে যুদ্ধ করা নিয়ে আরব সমাজে প্রচলিত পবিত্রতার ধারণা ছিল।
আবদুল্লাহ ইবন জাহশ (রা.)-এর দল যখন মদিনায় ফিরে আসে, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘটনাটি শুনে তাৎক্ষণিকভাবে আনন্দ প্রকাশ করেননি। বরং পবিত্র মাসে যুদ্ধের বিষয়টি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত বন্দি ও মালামাল গ্রহণের ব্যাপারে তিনি অবস্থান নেননি—এমন বর্ণনা সীরাতগ্রন্থে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে কুরআনে পবিত্র মাসে যুদ্ধ সম্পর্কে নির্দেশনা নাজিল হয়। সেখানে বলা হয় যে পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা গুরুতর বিষয়, তবে আল্লাহর পথে বাধা দেওয়া, মানুষকে মসজিদুল হারাম থেকে বিরত রাখা এবং মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালানোও অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এই ঘটনার মাধ্যমে মুসলিম সমাজের যুদ্ধ ও শান্তি সম্পর্কিত নীতিগত অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় তৈরি হয়।
এই অভিযানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই যে, এটি শুধু একটি ছোট সামরিক অভিযান ছিল না; বরং মক্কা ও মদিনার মধ্যকার সংঘাতকে আরও তীব্র করে তোলে। এর পর কুরাইশদের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত বদর যুদ্ধের দিকে পরিস্থিতি এগিয়ে যায়। তবে এই ঘটনাকে সরাসরি বদর যুদ্ধের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বদরের পেছনে মুসলমানদের মক্কা থেকে বিতাড়ন, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়া, কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলা এবং মদিনায় মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ একাধিক কারণ কাজ করেছিল।
আবদুল্লাহ ইবন জাহশ (রা.)-এর এই সারিয়্যাহর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি মদিনা-পর্বে মুসলিম নেতৃত্বের গোয়েন্দা ও সামরিক কার্যক্রমের বিকাশকে তুলে ধরে। প্রাথমিক পর্যায়ের এসব অভিযান থেকে বোঝা যায় যে মুসলমানরা কেবল আত্মরক্ষামূলকভাবে বসে ছিল না; বরং তারা আশপাশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল এবং সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিল। একই সঙ্গে এই ঘটনাটি দেখায় যে সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইসলামে সময়, স্থান, চুক্তি, পবিত্রতা এবং বৃহত্তর নৈতিক-আইনি প্রশ্নগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এই অভিযানের তারিখ নিয়ে সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক বর্ণনা এটিকে হিজরতের পর দ্বিতীয় হিজরি সালের রজব মাসের সঙ্গে সম্পর্কিত করে। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ও কিছু আনুষঙ্গিক বিবরণেও সূত্রভেদে পার্থক্য রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা বা প্রতিটি ঘটনার খুঁটিনাটি বলার সময় প্রাচীন সূত্রের পার্থক্য মাথায় রাখা জরুরি। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এটি ছিল রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সময়কার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক সারিয়্যাহ এবং এর সঙ্গে পবিত্র মাসে সংঘর্ষের প্রশ্নটি বিশেষভাবে জড়িত ছিল।
এই ঘটনার পর ইসলামের সামরিক ইতিহাস দ্রুত একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। মুসলমান ও কুরাইশদের মধ্যে ছোট ছোট অভিযান থেকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বৃহত্তর সামরিক সংঘর্ষের দিকে অগ্রসর হয়। এর অল্প সময় পরই বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যা ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বড় আকারের সামরিক বিজয় হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। তাই আবদুল্লাহ ইবন জাহশ (রা.)-এর সারিয়্যাহকে বদরের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ও সামরিক ঘটনাপ্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তথ্যসূত্র হিসেবে প্রধানত ইবন হিশামের সীরাত গ্রন্থ, ইবন সা‘দের আত-তাবাকাতুল কুবরা, আল-ওয়াকিদির মাগাজি, ইবন কাসিরের আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া এবং সংশ্লিষ্ট কুরআনের আয়াতের তাফসিরসমূহ উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে পবিত্র মাসে যুদ্ধের প্রসঙ্গে সূরা আল-বাকারার ২১৭ নম্বর আয়াত এই ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন সীরাতগ্রন্থগুলোর মধ্যে বর্ণনাগত পার্থক্য থাকায় এই ঘটনাকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যেখানে মতভেদ রয়েছে, সেখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।