Story

তুমি আমার গোপন অপরাধ

October 7, 2026

43 views

বৃষ্টির রাতগুলোতে পুরনো ঢাকার এই নির্জন ফ্ল্যাটটা কেমন যেন শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে ওঠে। বারান্দার গ্রিলে বৃষ্টির ছাঁট আছড়ে পড়ছে। টেবিল ল্যাম্পের মৃদু হলদেটে আলোয় লাল কালির দাগ দেওয়া একটা মামলার ফাইল মেলে বসে ছিল ইরফান। ইরফান চৌধুরী, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একজন দক্ষ ও ঠান্ডা মাথার ইনস্পেক্টর। যে কোনো জটিল অপরাধের জট ছাড়াতে তার জুড়ি নেই। কিন্তু আজ তার চোখের দৃষ্টি ফাইলের পাতায় স্থির নেই; তার দৃষ্টি আটকে আছে ঘরের এক কোণে রাখা ইজেলের ওপর। সেখানে ক্যানভাসে জলরঙে আঁকা এক জোড়া চোখ, যে চোখদুটো সে গত তিন বছর ধরে প্রতি রাতে নিজের বুকের ভেতর ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।

দরজায় মৃদু নক হলো। খুব আলতো, চেনা এক খসখসে শব্দ। ইরফান ফাইলটা বন্ধ করার আগেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল শিঞ্জিনী। পরনে কালচে সবুজ সুতির শাড়ি, ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে আলগা করে জড়ানো। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি। শিঞ্জিনী নিঃশব্দ পদক্ষেপে হেঁটে এসে কাপটা টেবিলের একপাশে রাখল। তারপর ইরফানের পেছনে এসে দাঁড়াল, তার ঠান্ডা হাত দুটো রাখল ইরফানের চওড়া কাঁধের ওপর। "রাত দুটো বাজে, ইরফান। আর কতদিন এই এক ফাইলে নিজের ঘুম বিসর্জন দেবে?" শিঞ্জিনীর কণ্ঠস্বর বাঁশির মতো নরম, অথচ তার ভেতরে এক অদ্ভুত শীতলতা।

ইরফান হাত বাড়িয়ে শিঞ্জিনীর বরফশীতল আঙুলগুলো ছুঁয়ে দিল। "এটা শুধু একটা ফাইল নয় শিঞ্জিনী। এটা আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় কাঁটা। 'দ্য স্পেকটার মার্ডার কেস'। শহরের ক্ষমতাশালী তিনজন মাদক ব্যবসায়ী আর সিন্ডিকেট গডফাদারকে মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে এমন নিখুঁতভাবে শেষ করে দেওয়া হয়েছে যে ফরেনসিক ল্যাবও কোনো ক্লু পায়নি। কোনো ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেই, কোনো ডিএনএ নেই। শুধু প্রতিটা লাশের গলার কাছে একটা অদ্ভুত সূক্ষ্ম কাটিং মার্ক, যেন কোনো দক্ষ শিল্পী সার্জিক্যাল ব্লেড দিয়ে ক্যানভাস কেটেছে।" শিঞ্জিনী সামান্য হাসল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময় বক্ররেখা। সে ইরফানের ঘাড়ে মুখ গুঁজে ফিসফিস করল, "হয়তো তারা বেঁচে থাকার যোগ্য ছিল না, ইরফান। যারা শত শত তরুণের জীবন শেষ করে দিয়েছে, তাদের শেষ করে দেওয়া কি আসলেই অপরাধ?"

ইরফান ফিরে তাকাল। শিঞ্জিনীর চোখের গভীরে এক মুহূর্তের জন্য যেন বিদ্যুৎ চমকে গেল। ইরফান তার কোমর জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নিল। "আইনের চোখে এটা ঠান্ডা মাথার খুন, শিঞ্জিনী। আর আমার চোখে... যে এই কাজটা করেছে, সে এক অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান ছায়া। কিন্তু আমি শপথ করেছি, ওকে আমি খুঁজে বের করবই।" শিঞ্জিনী কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু তার নরম ঠোঁটদুটো ছুঁইয়ে দিল ইরফানের কপালে। তার নিঃশ্বাসে ছিল বুনো অর্কিডের সেই চিরচেনা সুবাস, যে সুবাসে গত তিন বছর ধরে ইরফান নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে রেখেছে। কিন্তু ইরফান জানত না, ক্যানভাসের নিচে লুকিয়ে থাকা রক্তের রঙ কোনোদিন চিরতরে মুছে যায় না।

তিন বছর আগে এক ঝড়ের রাতে শিঞ্জিনীর সাথে ইরফানের প্রথম দেখা। ধানমন্ডি লেকের নির্জন ব্রিজের ওপর রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল মেয়েটি। কেউ একজন তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার চেষ্টা করেছিল, তার জামার হাতা ছিল ছেঁড়া, হাতে গভীর ক্ষতের দাগ। ঠিক সেই মুহূর্তে টহল গাড়িতে থাকা ইরফান এসে তাকে উদ্ধার করে। থানায় না গিয়ে মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, নিজের দায়িত্বে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দেয়। সেদিন থেকে শুরু। শিঞ্জিনী ছিল চারুকলা থেকে পাস করা এক নিঃসঙ্গ চিত্রশিল্পী। তার পরিবার বলতে কেউ ছিল না; এক ছোট বোন ছিল, যে বছর দুয়েক আগে অতিরিক্ত ড্রাগ ওভারডোজে এক নামকরা রিসোর্টের পার্টিতে রহস্যজনকভাবে মারা যায়। সেই ক্ষতের কথা শিঞ্জিনী খুব বেশি বলত না। শুধু বলত, "জীবন আমাকে সব কিছু কেড়ে নিয়ে একা করে দিয়েছে, ইরফান।"

ইরফান নিজের সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে শিঞ্জিনীকে ঘিরে রেখেছিল। কঠোর, কর্কশ গোয়েন্দা জীবনের একমাত্র শান্ত সৈকত ছিল শিঞ্জিনী। যে মেয়েটি একটা পিঁপড়ে মরলেও আঁতকে ওঠে, যে ক্যানভাসে রঙের প্রলেপ দিতে গিয়ে নিজের আঙুল কেটে ফেললে শিশুর মতো কেঁদে ফেলে, সেই মেয়েটিই ছিল ইরফানের জীবনের ধ্রুবতারা। কিন্তু আজ সকালে সিআইডি হেডকোয়ার্টার্স থেকে আসা একটি রিপোর্ট ইরফানের সাজানো পৃথিবীকে গোড়া থেকে নাড়িয়ে দিল। ল্যাব প্রধান ডক্টর রাশেদ গম্ভীর মুখে ইরফানের সামনে তিনটি ছবি মেলে ধরলেন। "ইরফান, সর্বশেষ যে ভিকটিম, ব্যবসায়ী নাদিম কবীর, তার নখের ভেতর থেকে পাওয়া স্কিন টিস্যু আর মাইক্রো-ফাইবারের রিপোর্ট চলে এসেছে।" ইরফান ঝুঁকে পড়ল। "কী পাওয়া গেছে স্যার?"

"খুনির বাম হাতের অনামিকায় একটা গভীর পোড়া দাগ ছিল, যার ছাপ নাদিমের কলারের বোতামে লেগে থাকা ঘামে আর চামড়ায় পাওয়া গেছে। আর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়, নাদিমের ফ্ল্যাটে পাওয়া তরল বিষাক্ত পদার্থটি কোনো সাধারণ বিষ নয়। ওটা এক বিশেষ ধরনের দুর্লভ উদ্ভিদের নির্যাস, যা সাধারণত অয়েল পেইন্টিংয়ের পুরোনো রঙ মুছতে ও ডাইলুট করতে ব্যবহৃত হয়। কেমিস্ট্রি ল্যাব বলছে, এই কাজ কোনো ভাড়াটে খুনির নয়; এটা করেছে এমন কেউ যে রঙের রসায়ন খুব ভালো বোঝে।"

ডক্টর রাশেদের কথাগুলো ইরফানের মাথায় যেন হাতুড়ির মতো আঘাত করল। বামের অনামিকায় পোড়া দাগ... অয়েল পেইন্টিংয়ের কেমিক্যাল... ইরফানের মস্তিষ্কের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য হিমশীতল শূন্যতা নেমে এলো। শিঞ্জিনীর বাম হাতের অনামিকায় ঠিক একই রকম একটা গোলাকার পোড়া দাগ আছে। শিঞ্জিনী বলেছিল, ছোটবেলায় প্রদীপের শিখায় অসাবধানতাবশত তার হাত পুড়ে গিয়েছিল। আর শিঞ্জিনী ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিজের স্টুডিওতে একা বসে সেই বিশেষ প্ল্যান্ট-এক্সট্র্যাক্ট দ্রবণ দিয়ে পুরোনো ক্যানভাস পরিষ্কার করে।

"না, এটা অসম্ভব," ইরফান নিজের মনেই গর্জে উঠল। সে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। "এটা কাকতালীয়। হাজার হাজার চিত্রশিল্পী আছে এই শহরে।"

"তুমি ঠিক আছো তো ইরফান?" ডক্টর রাশেদ অবাক হয়ে তাকালেন।

"হ্যাঁ স্যার। আমি... আমি এই লিডটা ফলো করছি।"

ইরফান প্রায় টলতে টলতে অফিস থেকে বের হয়ে এলো। তার হৃৎপিণ্ড এমনভাবে লাফাচ্ছিল যেন পাঁজরের হাড় ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসবে। সন্ধ্যায় যখন ইরফান ফ্ল্যাটে ফিরল, ঘরে কোনো বাতি জ্বলছিল না। শুধু বেলকনির দিক থেকে হালকা একটা ধূপের গন্ধ ভেসে আসছিল। শিঞ্জিনী স্টুডিও রুমের দরজা খোলা রেখে ভেতরে কাজ করছিল। একটি বিশাল ক্যানভাসে ছবি আঁকা হচ্ছে।ইরফান নিঃশব্দে দরজার চৌকাঠে গিয়ে দাঁড়াল। তার পিস্তলের হোলস্টারটা কোমরে ভারী হয়ে ঝুলছে। ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে একটি মুখ। এক বিকৃত, রক্তাক্ত মানুষের মুখচ্ছবি, যে ছটফট করছে মৃত্যুর শেষ মুহূর্তে। ছবির রঙের ব্যবহার এত জীবন্ত আর নারকীয় যে দেখলে গা শিউরে ওঠে। "তোমার ড্রয়িংয়ে সাধারণত তো এমন রক্ত থাকে না, শিঞ্জিনী।" ইরফানের কণ্ঠস্বর ভারী শোনাল।

শিঞ্জিনী তুলিটা নামিয়ে রাখল না। ক্যানভাসে এক ফোঁটা লাল রঙ টানতে টানতে সে শান্ত গলায় বলল, "আজকাল আমার রাতে দুঃস্বপ্ন আসে ইরফান। মনে হয়, প্রতিশোধের কোনো রঙ যদি থাকত, তবে তা হতো ঠিক এই লাল।" ইরফান ধীরপায়ে এগিয়ে গেল। সে শিঞ্জিনীর পেছনে এসে দাঁড়াল। তারপর খুব সাবধানে, প্রায় কাঁপাকাঁপা হাতে শিঞ্জিনীর বাম হাতটা নিজের মুঠোয় তুলে নিল। তার বুড়ো আঙুল গিয়ে ঠেকল শিঞ্জিনীর অনামিকার সেই মসৃণ, গোল পোড়া দাগটির ওপর।

শিঞ্জিনী হাত সরিয়ে নিল না। সে তুলি ধরা হাতটি স্থির রেখে আয়নায় ইরফানের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো ভীতি ছিল না, কোনো অপরাধবোধ ছিল না; ছিল এক সীমাহীন, অগাধ বিষাদ।

"নাদিম কবীরকে তুমি কীভাবে চিনতে শিঞ্জিনী?" ইরফানের গলা দিয়ে শব্দটা বের হতে চাইল না, যেন প্রতিটি অক্ষর তার গলায় আটকে যাচ্ছিল।

ঘরটিতে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। বাইরে একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।শিঞ্জিনী আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াল। সে ইরফানের চোখের দিকে সোজা তাকাল।

"নাদিম কবীর ছিল সেই চারজনের শেষ জন, ইরফান। যারা তিন বছর আগে এক জন্মদিনের পার্টিতে আমার ছোট বোন তিতলিকে মাদক খাইয়ে... অচেতন করে... ভিডিও করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করেছিল। তিতলি যখন আমার কাছে সব বলে ফেলেছিল, ওরা ওকে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দিয়ে সেটাকে 'ড্রাগ ওভারডোজ' বলে চালিয়ে দিয়েছিল।"

শিঞ্জিনীর চোখ দিয়ে এক ফোঁটাও জল পড়ল না। তার কণ্ঠস্বর ছিল সম্পূর্ণ পাথুরে। "পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম আমি। তোমার এই আইনের রক্ষকদের কাছে। ওরা আমাকে বলেছিল, প্রভাবশালী পরিবার, কোনো প্রমাণ নেই, মামলা করলে আমার বোনের চরিত্র নিয়েই টানাটানি হবে। সমাজ আমাকেই উল্টো পতিতা বানিয়ে দেবে।" শিঞ্জিনী এক পা এগিয়ে এলো। "আইন যখন অন্ধ হয়ে টাকার কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করে দেয়, তখন কাউকে না কাউকে ঈশ্বর হতে হয়, ইরফান। অথবা শয়তান।" ইরফানের পায়ের নিচের মেঝে যেন দুলছিল। তার চোখের সামনে নিজের এত বছরের শপথ, তার পুলিশি আদর্শ, তার আইনের বই, সব ধুলোয় মিশে যাচ্ছিল।

"তাহলে... ওই তিনজন? শাহরিয়ার, আরমান আর নাদিম?"

"হ্যাঁ।" শিঞ্জিনী দ্বিধাহীনভাবে স্বীকার করল। "আমি ওদের একজন একজন করে খুঁজে বের করেছি। যে রঙের তেল দিয়ে আমি ক্যানভাস আঁকি, সেই তেলের সাথে নির্দিষ্ট মাত্রার বিষাক্ত অ্যাকোনাইট মিশিয়ে ওদের পানীয়তে দিয়েছি। আর সার্জিক্যাল ব্লেড দিয়ে ওদের কন্ঠনালীর ক্যারোটিড আর্টারি কেটেছি—যাতে মৃত্যুর সময় ওদের চোখ দিয়ে সেই একই আতঙ্ক ঝরে পড়ে, যা আমার তিতলির চোখে ছিল।"

শিঞ্জিনী তার দুটো হাত তুলে ইরফানের বুকের ওপর রাখল। "আমি তোমাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম ইরফান। ভেবেছিলাম, একজন ডিটেকটিভের ছায়ায় থাকলে আমার ওপর কোনোদিন সন্দেহ আসবে না। আমি তোমার জীবনে এসেছিলাম আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে।" শিঞ্জিনী এক মুহূর্ত থামল। তার চোখের পাথুরে ভাবটা ভেঙে গিয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গালে।

"কিন্তু আমি হেরে গেছি। আমি ভাবিনি যে আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলব। আমি ভাবিনি যে এক রক্তপিপাসু খুনি কোনো এক দেবদূতের ভালোবাসায় বন্দি হয়ে যাবে।"

ইরফান স্তব্ধ হয়ে নিজের পিস্তলের দিকে তাকাল। তার দায়িত্ব, তার পোশাক, তার সংবিধান তাকে বলছে, এই মুহূর্তে এই নারীকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলতে হবে। পুরো শহর জানবে সে এক কুখ্যাত সিরিয়াল কিলারকে ধরেছে। কাল সকালে সংবাদপত্রের শিরোনামে তার বীরত্বগাথা ছাপা হবে। পদোন্নতি হবে, মেডেল মিলবে। কিন্তু তার বুকের ভেতর যে হৃদপিণ্ডটা স্পন্দিত হচ্ছে, তা তো এই নারীটির নিঃশ্বাসে বেঁচে আছে। যে হাত দিয়ে সে অপরাধীদের হত্যা করেছে, সেই হাতই প্রতি রাতে পরম মমতায় ইরফানের কপালের ক্লান্তি মুছে দিয়েছে।

ইরফান কাঁপতে কাঁপতে কোমর থেকে পিস্তলটা বের করল। ধাতব অস্ত্রটা টেবিলের ওপর সশব্দে রাখল সে। শিঞ্জিনী চোখ বন্ধ করল। "গুলি করো ইরফান। তোমার হাতে মরলে আমার কোনো আফসোস থাকবে না। আমার সব হিসেব শেষ। তিতলির ঋণ আমি শোধ করেছি।" ইরফান এগিয়ে গেল। কিন্তু সে পিস্তল তুলল না।

সে দুই হাতে শিঞ্জিনীর মুখটা আঁকড়ে ধরল। পাগলের মতো সে শিঞ্জিনীর ঠোঁটে, কপালে, চোখের জলে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। এক তীব্র, যন্ত্রণাদগ্ধ চুম্বনে সে নিজের সমস্ত অস্তিত্বকে দুমড়ে-মুচড়ে দিল।

"কেন শিঞ্জিনী? কেন তুমি আমাকে দিয়ে এই কাজ করালে না?" ইরফানের চোখ ফেটে জল নামল। "আমি তো তোমার জন্য নিজের জীবনও দিতে পারতাম!"

"কারণ তুমি খাঁটি, ইরফান। আমি চাইনি আমার অন্ধকারের ছোঁয়া তোমার আলোতে লাগুক।" শিঞ্জিনী জড়িয়ে ধরল তাকে। বাইরে তখন পুলিশের সাইরেনের দূরবর্তী শব্দ। সিআইডি টিম হয়তো আর আধা ঘণ্টার মধ্যে এখানে পৌঁছাবে। ল্যাব রিপোর্ট পাওয়ার পর তারা শহরের সমস্ত চিত্রশিল্পীদের তালিকা মেলাচ্ছে, শিঞ্জিনীর নাম আসতে বেশি সময় লাগবে না। ইরফান নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তার চোখের দৃষ্টিতে তখন এক ভয়ংকর, বেপরোয়া রূপান্তরের ছায়া। সে আর ইনস্পেক্টর ইরফান চৌধুরী নেই; সে এখন শুধুই একজন অন্ধ প্রেমিক, যে নিজের ভালোবাসাকে বাঁচাতে যে কোনো নরকে যেতে প্রস্তুত। ইরফান ড্রয়ার খুলে শিঞ্জিনীর পাসপোর্ট, কিছু নগদ টাকা এবং গাড়ির চাবি বের করল।

"শোনো শিঞ্জিনী," ইরফানের কণ্ঠস্বরে অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা। "পদ্মা সেতু পার হয়ে সোজা মোংলা পোর্টের দিকে চলে যাও। আমার পুরোনো এক সোর্সের বোট কাল ভোরে সুন্দরবনের রুট দিয়ে খুলনার সীমান্ত পার করবে তোমাকে। সেখানে এক নিরাপদ ঠিকানা আছে।"

শিঞ্জিনী অবিশ্বাসে তাকাল। "আর তুমি? তুমি আইনের মানুষ ইরফান! তুমি একজন খুনিকে পালাতে সাহায্য করছ?" ইরফান তার টেবিলের ওপর রাখা কেস ফাইলটি তুলে নিল। লাইটার জ্বালিয়ে সে ফাইলে আগুন ধরিয়ে দিল।

নীলচে আগুনের শিখা গ্রাস করতে লাগল তিনটি খুনের সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আর স্কেচ। ইরফান আগুনে জ্বলতে থাকা ফাইলের দিকে তাকিয়ে বলল, "আইন আমাকে একজন ভালো অফিসার বানিয়েছে শিঞ্জিনী। কিন্তু তুমি আমাকে একজন জীবন্ত মানুষ বানিয়েছ। তুমি আমার প্রেম... আর আজ থেকে, তুমি আমার সারা জীবনের সবচেয়ে বড় গোপন অপরাধ।"

পুলিশের গাড়ি যখন ফ্ল্যাটের নিচে এসে সাইরেন বাজিয়ে থামল, ফ্ল্যাটের ভেতর তখন কেউ নেই। শুধু টেবিলের ওপর ছাই হয়ে যাওয়া কিছু কাগজের অবশিষ্টাংশ, আর ইজেলের ওপর অসমাপ্ত সেই ক্যানভাসটি।

রাত তিনটায় বুড়িগঙ্গার তীরের এক নির্জন চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে আছে ইরফান। বাতাসে তার ভেজা শার্ট উড়ছে। দূরে এক জোড়া লাল টেল-লাইট কুয়াশার চাদর চিরে হাইওয়ের দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে। ইরফান তার পকেট থেকে নিজের মেটাল ব্যাজটি বের করল। চকচকে পুলিশের প্রতীক। সে সেটা অনেকক্ষণ হাতের তালুতে ধরে রইল। তারপর খুব শান্ত ভঙ্গিতে ব্যাজটি ছুঁড়ে ফেলে দিল কালো জলের বুকে। একটি ছোট শব্দ হলো..'টুপ'। তারপর জল আবার স্থির হয়ে গেল। ইরফান জানে, কাল সকাল থেকে সে নিজেই হবে এক ফেরারি আসামির সঙ্গী। তার নিজের ডিপার্টমেন্ট হয়তো তাকে খুঁজবে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে। কিন্তু অন্ধকার দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ইরফান যখন এক গভীর নিঃশ্বাস নিল, তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদময় তৃপ্তির হাসি।

কিছু ভালোবাসা থাকে যা স্বর্গের আলোতে বাঁচে না; কিছু ভালোবাসাকে বেঁচে থাকতে হয় অন্ধকার, পাপ আর এক গোপন অপরাধের গভীর গুহায়, যেখানে কোনো বিচার নেই, শুধু আছে একে অপরকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেওয়ার এক অনন্ত তৃষ্ণা।

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login