রাতের আহার শেষ হতে হতে এগারোটা বাজল। এরপর পরিবারের সবার সাথে চলল অন্তহীন আড্ডা। মা, বাবা, দিদি আর আমি—এই চারজনের ছোট সংসারে সুখের মুহূর্তগুলো যেন ঘড়ির কাঁটার চেয়েও দ্রুত ছোটে। যখন আড্ডা থামল, ঘড়িতে তখন দেড়টা। বিছানায় গা এলিয়ে দিতে দিতে রাত দুটো বেজে গেল।
শরীরে ক্লান্তি থাকলেও দু'চোখে ঘুম নেই। হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে দরজায় মৃদু করাঘাত— খট্ খট্ খট্!
আমি মুচকি হাসলাম। জানি এ কে। এই গভীর রাতে যার নিমন্ত্রণ ছাড়াই আসার অধিকার আছে, সে আমার প্রিয় রাতের সঙ্গী— 'বিলাস'।
আমি অনুচ্চস্বরে বললাম, "আসছি গো বাবা, আসছি! আজ এত দেরি হলো কেন তোমার? ছিলে কোথায়?"
বিলাস দরজার ওপাশ থেকে বিনম্র স্বরে বলল, "ঠিক সময়েই তো এসেছিলাম বাবু, কিন্তু আপনার ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছিলাম না।"
"কেন?"
"আপনি পরিবারের সবার সাথে হাসিমুখে গল্প করছিলেন। সেই আনন্দের মাঝে আমার মতো এক বিষণ্ণ সত্তার প্রবেশ কি ঠিক হতো? তাই আপনাকে বিরক্ত করিনি।"
আমি দরজা খুলে তাকে ভেতরে আসার ইশারা করলাম। "যাই হোক, দাঁড়িয়ে থেকো না, বসো। দিনকাল কেমন যাচ্ছে তোমার?"
বিলাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "এই তো বাবু, কোনোমতে কেটে যাচ্ছে। আচ্ছা বাবু, একটা কথা বলি? আপনার মতো আমাকে কেউ ভালোবাসে না।"
আমি অবাক হয়ে তাকালাম। "হঠাৎ এ কথা কেন?"
বিলাস ম্লান হেসে বলতে শুরু করল, "আজ দু'জন মানুষের কাছে গিয়েছিলাম, দেখতে চেয়েছিলাম তারা আমাকে কতটা আপন করে নেয়। প্রথমজন ছিলেন এক অতি ধনাঢ্য ব্যক্তি। ঢাকার বুকে তার মস্ত অট্টালিকা। আমি সেখানে তার পাঁচ বছরের ছোট্ট ছেলেটার হাতে একটা 'ফোঁড়া' হয়ে আশ্রয় নিলাম। কিন্তু বাবু, সেই বাবা আমাকে মুহূর্তকাল সহ্য করলেন না। বড় বড় ডাক্তার আর দামি সব মলম দিয়ে আমাকে এক রাতেই বিদায় করে দিলেন। আমার ভালোবাসার কোনো মূল্যই দিলেন না তারা।"
আমি ব্যথিত হয়ে বললাম, "আহা বিলাস! ওইটুকু শিশুকে তুমি ব্যথা দিতে গেলে কেন?"
বিলাস শান্ত গলায় উত্তর দিল, "আমি তো শুধু তাদের ধৈর্য আর ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে চেয়েছিলাম বাবু।"
সে আবার বলতে শুরু করল, "এরপর গিয়েছিলাম এক অপূর্ব সুন্দরীর কাছে। যার রূপ দেখে মনে হয় সে যেন স্বর্গচ্যুত কোনো অপ্সরা। আমি গ্রীষ্মের 'তীব্র রোদ' হয়ে তার জানালার পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু সে আমাকে দেখা মাত্রই জানালার ভারী পর্দা টেনে দিয়ে নিজেকে আড়াল করে নিল। এক ফোঁটা জায়গা দিল না তার ঘরে।"
বিলাসের চোখে তখন অদ্ভুত এক মায়া। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "অথচ দেখুন বাবু, আপনি আমাকে নিয়ে সারা রাত জেগে থাকেন। আমার এই কষ্টমাখা অস্তিত্বকে ঘৃণা না করে বরং পরম মমতায় গল্প করেন। আপনি ছাড়া আমাকে আর কে বুঝবে বলুন?"
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের প্রথম আলো এসে ঘরে উঁকি দিল। আমি বিড়বিড় করে বললাম, "থামো বিলাস, ওই যে ভোরের আলো ফুটেছে..."
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই বিলাস অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়িয়ে মিলিয়ে গেল ঘরের ছায়াগুলোর সাথে। আর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে আমি তলিয়ে গেলাম গভীর নিদ্রায়।