ডিমকাহন
মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
দামে কম। সহজলভ্য। পুষ্টিকর। এমন যত খাবার আছে, তার মধ্যে ডিম অন্যতম। হতে পারে সেটা হাঁস কিংবা মুরগির ডিম। ডিম পছন্দ করে না, এমন মানুষ কমই আছে। কিন্তু আমাদের দেশে একজন মানুষ বছরে যতটি ডিম খাওয়া দরকার, ততটি খাই না। ডিমের প্রতি এক ধরনের অবহেলা-অনাদর চলে। বাসায় মাছ-মাংস নেই, তখন ডিম রান্না করো। কিন্তু ডিম যে সকালের নাস্তায় থাকা জরুরি, সেটা আমরা অনেকেই ভুলে যাই।
বাংলাদেশে ডিমের উৎপাদন অবশ্য দিন দিন বাড়ছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৪৪০ কোটি ৬৫ লাখটি। এ সময়ে জনপ্রতি ডিমের প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে বছরে ১৩৭ দশমিক ১৯টি। ২০১০–১১ অর্থবছরে যেখানে ডিম উৎপাদন ছিল ৬০৭ কোটি ৮৫ লাখটি, সেখানে ১৪ বছরে উৎপাদন প্রায় চার গুণ হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়। ডিম নিয়ে আছে ব্যাপক ভুল ধারণা। অনেকেই কুসুম ফেলে শুধু ডিমের সাদা অংশ খাচ্ছেন। একটা চাপা ভয় কাজ করে—ডিমে তো অনেক ফ্যাট। খেলে কী জানি কী হয়? ডিমের প্রায় সব ভিটামিন, খনিজ ও প্রোটিন থাকে কুসুমে। কুসুমই যদি ফেলে দিলেন, তাহলে আর ডিম খাওয়ার দরকার কী?
এক. ডিমে ভিটামিন সি বাদে সব উপকারী ভিটামিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়োডিন, কোলিন, সেলেনিয়াম আছে।
দুই. প্রতিদিন একটি ডিম, একটি কলা কোনোভাবেই ডায়েটে ক্ষতি করে না। এমনকি হৃদ্রোগের রোগীও একটি ডিম খেতে পারেন। ডিম এলডিএল বা মন্দ কোলেস্টেরল কমায়। একটি ডিমে ৬.৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে। একটি ডিমে ২০০ মিলিগ্রামের মতো কোলেস্টেরল আছে। একজন স্বাভাবিক মানুষ দৈনিক ৩০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল গ্রহণ করতে পারে। ডিমের কুসুমে আছে বেটাইন, যা রক্তে হোমোসিস্টেইনের মাত্রা কমায়। রক্তে হোমোসিস্টেইনের মাত্রা বেশি হলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
তিন. ডিমে যে চর্বি আছে, তার তিন-চতুর্থাংশ হার্ট ও রক্তনালির জন্য উপকারী অসম্পৃক্ত চর্বি। ডিমে আছে হার্টের জন্য উপকারী ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।
চার. ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশন আগে সাত দিনে তিনটি ডিম খাওয়ার কথা বললেও এখন তারা সে অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তারা ডিম খেতে মানুষকে উৎসাহিত করছে। চিকিৎসকেরা প্রতিদিন একটি ডিম খেতে বলেন।
একটি বড় ডিমে রান্নার ধরন অনুযায়ী ক্যালরির সামান্য পার্থক্য হয়। সিদ্ধ ডিমে প্রায় ৭৮ ক্যালরি, পোচ ডিমে প্রায় ৭২ ক্যালরি এবং তেলে ভাজা ডিমে প্রায় ৯০ ক্যালরি থাকে; তবে ভাজার সময় তেল বেশি ব্যবহার করলে ক্যালরি আরও বাড়ে। তাই ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে পোচ বা সিদ্ধ ডিম ভালো পছন্দ, আর ভাজা ডিম খেলে অল্প পরিমাণ স্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করা ভালো। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনও রান্নায় অতিরিক্ত চর্বি কমানোর এবং ভাজার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ তেল ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।
ডিমের খোসার দুই ধরনের রং হয়। এটা কিন্তু ডিমের খোসার রং পুষ্টির পার্থক্য বোঝায় না। সাদা ও বাদামি ডিমের পুষ্টিমান সাধারণত কাছাকাছি; পার্থক্য মূলত মুরগির জাতের কারণে।
ডিমের কুসুমের রং মুরগির খাবারের ওপর নির্ভর করে। খাবারে ক্যারোটিনয়েড বেশি থাকলে কুসুম বেশি হলুদ বা কমলা হতে পারে।
ডিমের ভেতরের বাতাসের কুঠুরি বয়সের সঙ্গে বড় হয়। ডিম পুরোনো হলে খোসার ভেতরের এই ছোট বাতাসের জায়গাটি ধীরে ধীরে বড় হয়।
ডিম পানিতে ভাসলে সেটি পুরোনো হওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। সময়ের সঙ্গে ডিমের ভেতরের বাতাসের কুঠুরি বড় হওয়ায় ডিম বেশি ভাসতে পারে। তবে ভাসা একাই ডিম নিরাপদ কি না—তার চূড়ান্ত পরীক্ষা নয়।
কুসুমের চারপাশে স্বচ্ছ সাদা অংশটি শুধু ‘সাদা অংশ’ নয়। ডিমের সাদা অংশে বিভিন্ন স্তর থাকে এবং কুসুমকে মাঝামাঝি ধরে রাখার জন্য বিশেষ পাকানো অংশ থাকে।
ডিমের সাদা অংশ রান্না করলে সাদা হয়ে যায় কেন? তাপে প্রোটিনের গঠন বদলে যায় এবং আলো অন্যভাবে ছড়িয়ে পড়ে—তাই স্বচ্ছ অংশটি সাদা দেখায়।
কাঁচা ডিম কি নিরাপদ? একেবারেই ঝুঁকিমুক্ত নয়। কাঁচা বা আধাসেদ্ধ ডিমে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। এ ব্যাকটেরিয়া খাদ্যে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে ডায়রিয়া, পেটব্যথা, জ্বর ও বমির মতো উপসর্গ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, তাদের ঝুঁকি বেশি। তাই ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম শক্ত হওয়া পর্যন্ত ভালোভাবে রান্না করে খাওয়াই নিরাপদ।
সব ডিম থেকেই বাচ্চা হয় না। বাচ্চা হওয়ার জন্য ডিমটি নিষিক্ত হতে হয় এবং উপযুক্ত তাপমাত্রা ও অন্যান্য পরিবেশ দরকার।
৯ অক্টোবর। বিশ্ব ডিম দিবস। ১৯৯৬ সালে ভিয়েনায় বিশ্ব ডিম দিবসের সূচনা হয়। প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শুক্রবার দিবসটি পালিত হয়। ২০২৬ সালে ৯ অক্টোবর শুক্রবার বিশ্ব ডিম দিবস পালিত হবে।
তাই আসুন, ডিমকে খাদ্যতালিকায় প্রাধান্য দিই। প্রতিদিন অন্তত একটি ডিম খাই।