Fiction

শেষ স্মৃতি

October 12, 2026

39 views
১১ অক্টোবর, ২০২৬।

রাশেদের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মাথার চুলে পাক ধরেছে, চোখে চশমা, আর গলার স্বরটা এমন ভারী যে কথা বললে মানুষ সাধারণত একটু মন দিয়ে শোনে। পেশায় সে একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। মৃতদেহ পরীক্ষা করে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ, আঘাতের ধরন, মৃত্যুর সময় এবং ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা ক্ষুদ্রতম আলামত থেকে সে পুলিশের তদন্তে সাহায্য করে।

রাশেদের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। কোনো ঘটনা শুনেই সে সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না। লাশের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যরা যখন সম্ভাব্য খুনির নাম নিয়ে আলোচনা করে, সে তখন জুতার নিচে লেগে থাকা মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলে শুধু আঘাতটা কোথায়, তা দেখে না। কেন সেখানে আঘাত, কী দিয়ে করা হয়েছে, আঘাতের পর মানুষটা কতক্ষণ বেঁচে ছিল, সেগুলোও বোঝার চেষ্টা করে। একটা রিপোর্টে ছোট্ট অসংগতি পেলে সে পুরো রিপোর্ট আবার পড়ে।

তার সহকর্মীরা মাঝেমধ্যে বিরক্ত হয়ে বলে, রাশেদ ভাই, আপনি একটা পিনের জন্যও মানুষকে ঘুমাতে দেবেন না।

রাশেদ হেসে বলে, পিনটা যদি খুনিকে চিনে থাকে, তাহলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।

কাজের জায়গায় রাশেদ যতটা গম্ভীর, বাড়িতে সে ঠিক ততটাই আলাদা। দুই মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কটা বন্ধুর মতো। মেয়েরা কোনো প্রশ্ন করলে সে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করে। উত্তর না জানলে বানিয়ে বলে না। বরং স্বীকার করে, এটা আমি জানি না, খুঁজে দেখে তোমাকে বলব। ছোট মেয়েটা তার পেটের ওপর উঠে বসে গল্প শোনে, বড় মেয়েটা মাঝেমধ্যে বাবার চশমা পরে তাকে নকল করে। রাশেদ ভান করে খুব রাগ হয়েছে, তারপর দুজনকে ধরে এমনভাবে সুড়সুড়ি দেয় যে পাশের ঘর থেকেও হাসির শব্দ শোনা যায়।

মৃত মানুষের শরীর নিয়ে সারাদিন কাজ করা লোকটার জীবনের সবচেয়ে জীবন্ত অংশ ছিল এই বাড়িটা।

কিন্তু ২০২০ সালে একটা দুর্ঘটনা তার জীবন বদলে দেয়।

কোভিডের সেই সময়। এক রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পায় রাশেদ। প্রায় এক মাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। জ্ঞান ফিরেছিল, শরীর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়েছিল, কিন্তু স্মৃতির কিছু অংশ আর ঠিকমতো ফিরে আসেনি। হাসপাতালে কাটানো দিনগুলোর বেশির ভাগই তার কাছে কুয়াশার মতো। পরিচিত মানুষের মুখ মনে পড়ত, অথচ তাদের সঙ্গে কী কথা হয়েছিল, তা মনে পড়ত না। কোনো কোনো ঘটনার কথা অন্যের মুখে শুনে নিজের জীবন সম্পর্কে নতুন করে জানতে হয়েছে তাকে।

কাজে ফেরার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ সে আগের মতোই দায়িত্ব পালন করেছে। মৃতদেহ পরীক্ষা, রিপোর্ট লেখা, তদন্তকারীদের সঙ্গে কথা বলা। তারপর একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটল, যার কোনো ব্যাখ্যা তার জানা ছিল না।

একটি অজ্ঞাতপরিচয় পুরুষের লাশ এসেছিল মর্গে। বয়স ত্রিশের মতো। শরীরে একাধিক আঘাত, মৃত্যুর কারণ নিয়ে কিছু প্রশ্ন ছিল। রাশেদ নিয়মমাফিক পরীক্ষা করছিল। শেষে মাথার চুল সরিয়ে আঘাতের জায়গাটা দেখতে গিয়ে সে মৃত লোকটার মাথায় হাত রাখে।

পরের মুহূর্তে সে আর মর্গে ছিল না।

সে দেখল একটা সরু গলি। বৃষ্টির পানি জমে আছে রাস্তার পাশে। কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। সামনে কেউ দ্রুত হাঁটছে। লোকটার বুকের ভেতর অস্বাভাবিক ধুকপুকানি। পেছন থেকে ভারী পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে। তারপর একটা ধাক্কা, মাথার ভেতর তীব্র ব্যথা, চোখের সামনে আলো ছড়িয়ে পড়া। কেউ কিছু বলছে, কিন্তু কথাগুলো স্পষ্ট নয়। শুধু ভয়টা স্পষ্ট। এমন ভয়, যেন লোকটা জানে তার সঙ্গে কী হতে যাচ্ছে, অথচ পালানোর সময় আর নেই।

রাশেদ হাত সরিয়ে নিল।

মর্গের ঘড়িতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড পেরিয়েছে। অথচ তার মনে হয়েছিল সে অনেকক্ষণ ওই গলিতে ছিল। কপাল ঘামে ভিজে গেছে, বুকের ভেতর ধুকপুকানি। সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, মাথার আঘাতের পর হয়তো কোনো ধরনের স্নায়বিক সমস্যা হয়েছে। অতিরিক্ত কাজ, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ। মানুষের মস্তিষ্ক অনেক কিছুই তৈরি করতে পারে।

কিন্তু কয়েক দিন পর একই ঘটনা আবার ঘটল।

একজন মৃত নারীর মাথায় হাত রাখতেই রাশেদ অনুভব করল ভেজা কাপড়ের গন্ধ, রান্নাঘরের এক কোণে রাখা ভাঙা কাপ, আর কারও গুনগুন করে গান গাওয়ার শব্দ। তারপর একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেল। স্মৃতিটা এত সাধারণ ছিল যে তদন্তে তার কোনো কাজে লাগল না। তবু অভিজ্ঞতাটা বাস্তবের মতোই তীব্র ছিল।

এরপর থেকে ঘটনাটা বারবার ঘটতে লাগল। মৃত মানুষের মাথায় হাত রাখলে কখনো কখনো তাদের জীবনের শেষ মুহূর্তের কিছু বিচ্ছিন্ন স্মৃতি তার মধ্যে ভেসে উঠত।

সব মৃত মানুষের ক্ষেত্রে নয়। প্রতিবারও নয়। কখনো কোনো শব্দ, কখনো একটা গন্ধ, কখনো কারও হাত, কখনো দৌড়ে পালানোর অনুভূতি। মুখ দেখা গেলেও স্পষ্ট নয়। সময়ের ক্রম এলোমেলো। সে চাইলে কোনো দৃশ্য থামাতে পারে না, পেছনে ফিরতে পারে না, প্রশ্ন করতে পারে না। স্মৃতির ভেতরে যা আছে, শুধু সেটুকুই আসে। কখনো তারও কম।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, কোনো স্মৃতির ফাঁকা জায়গাগুলো তার মস্তিষ্ক নিজে থেকে পূরণ করতে চায়। অস্পষ্ট মুখকে পরিচিত কারও মুখ মনে হয়। অর্ধেক শোনা কথার বাকিটা সে নিজেই কল্পনা করে নেয়। পরে বুঝতে পারে, তার দেখা আর তার বোঝা এক জিনিস নয়।

একবার এক মৃত ব্যক্তির স্মৃতিতে সে দেখেছিল সবুজ রঙের একটা দরজা, টেবিলে চায়ের কাপ, আঙুলে আংটি পরা একজন মানুষ এবং তার গালে কালচে একটা দাগ। রাশেদ প্রথমে সন্দেহ করেছিল পরিচিত এক ব্যক্তিকে। কিন্তু পুলিশি তদন্তে সেই সন্দেহের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেল না। বরং আলামতগুলো অন্য দিকে ইঙ্গিত করল। পরে রাশেদ বুঝেছিল, স্মৃতির কয়েকটা বিচ্ছিন্ন অংশকে জোড়া লাগিয়ে তার নিজের মস্তিষ্ক একটা গল্প বানিয়ে ফেলেছিল।

সেদিন রাতে সে একটা খাতা খুলে কয়েকটা নিয়ম লিখেছিল।

স্মৃতি প্রমাণ নয়, তদন্তের সূত্র মাত্র।

যা দেখা যায়নি, তা কল্পনা দিয়ে পূরণ করা যাবে না।

মুখ স্পষ্ট না দেখলে কাউকে শনাক্ত করা যাবে না।

প্রতিটি তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে।

তারপর থেকে সে নিজের অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতাকে কখনো তদন্তের বিকল্প হতে দেয়নি। কোনো স্মৃতি তাকে একটা দিকে ইঙ্গিত করলে সে আলামত খুঁজেছে। আলামত না মিললে নিজের ধারণা বাদ দিয়েছে।

তবু ভয়টা কাটেনি। দুর্ঘটনার পর নিজের জীবন থেকেই তো কিছু স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছে সে। নিজের মস্তিষ্কের ওপরই যেখানে পুরোপুরি ভরসা করতে পারে না, সেখানে মৃত মানুষের স্মৃতি দেখে পাওয়া অনুভূতিকে কতটা বিশ্বাস করবে?

মাঝেমধ্যে তার মনে হয়, এই ক্ষমতা কোনো উপহার নয়। বরং এমন এক দরজা, যেটা একবার খুলে গেলে আর বন্ধ করা যায় না।

তার প্রথম বড় পরীক্ষাটা এসেছিল আনিসুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায়।

নীল বালতি

আনিসুর রহমানের বয়স আটচল্লিশ। নভেরা নিউট্রিফুডস নামের একটি বড় খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে স্টোর ইনচার্জ হিসেবে কাজ করতেন। এক সকালে কারখানার গুদামসংলগ্ন জায়গা থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। শরীরের আঘাতগুলো দেখে প্রথমে দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না। তবে আঘাতের ধরন আর ঘটনাস্থলের কিছু অসংগতি দেখে তদন্তকারীদের সন্দেহ হয়।

রাশেদ যখন মর্গে আনিসুরের মৃতদেহ পরীক্ষা করছিল, তখন তার চোখে পড়ে ডান কানের পেছনে ছোট্ট একটা আঘাত। মাথায় হাত রাখার পর পরিচিত সেই অস্বাভাবিক অনুভূতিটা ফিরে এল।

সে দেখল একটা নীল প্লাস্টিকের বালতি। বালতির পাশে কয়েকটা কাগজ ছড়ানো। একটা ফাইলে লাল সিল। কেউ কাগজগুলো তাড়াহুড়ো করে গুছিয়ে নিচ্ছে। দূরে যন্ত্রের একটানা শব্দ। তারপর একটা পুরুষ কণ্ঠ।

তোমার এত কিছু জানার দরকার কী?

আনিসুর কিছু বলতে চাইছিলেন। কিন্তু তার গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিল না। দৃশ্যটা বদলে গেল। এবার দেখা গেল অন্ধকার একটা জায়গা, ধাতব দরজার শব্দ, তারপর প্রচণ্ড আঘাত। সবকিছু থেমে গেল।

রাশেদ হাত সরিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

নীল বালতি, লাল সিল দেওয়া ফাইল, কাগজপত্র আর একটা হুমকির মতো শোনানো বাক্য। এর বেশি কিছু নয়। কণ্ঠটা কার, লোকটা দেখতে কেমন, আনিসুর কোথায় ছিলেন, কিছুই নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়নি।

সে তদন্ত কর্মকর্তা নাবিলকে ডেকে তার পর্যবেক্ষণ জানাল। তবে শুরুতেই সতর্ক করল, এগুলো কোনো ফরেনসিক প্রমাণ নয়। তদন্তে অন্য কোনো সূত্র পাওয়া গেলে তবেই এগুলোর মূল্য আছে।

নাবিল প্রথমে কথাগুলো শুনে চুপ করে ছিল। পরে বলেছিল, রাশেদ ভাই, আপনার এই অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা আমি জানি না। কিন্তু আপনি যা বলছেন, সেগুলোর সঙ্গে যদি বাস্তবের কিছু মেলে, তাহলে খুঁজে দেখা যায়।

তদন্ত শুরু হলো।

কারখানার রেকর্ডে রাসায়নিকের হিসাব নিয়ে বেশ কিছু অসংগতি পাওয়া গেল। কিছু কাঁচামাল কেনা হয়েছিল, কিন্তু উৎপাদনের নথিতে তার ব্যবহার ঠিকমতো দেখানো হয়নি। আবার কয়েকটি ব্যাচে এমন রাসায়নিক ব্যবহারের ইঙ্গিত ছিল, যেগুলো অনুমোদিত মাত্রায় ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা জরুরি। কাগজে পরিমাণ এক রকম, গুদামের মজুতের হিসাব আরেক রকম।

আনিসুর এই হিসাবের দায়িত্বে ছিলেন। তার কম্পিউটার থেকে পাওয়া কিছু নোটে কয়েকটি ব্যাচ নম্বর এবং মজুতের অমিল নিয়ে প্রশ্ন ছিল। একটি ফাইলের অংশ মুছে ফেলা হয়েছিল। গুদামের সিসিটিভি ফুটেজেও নির্দিষ্ট সময়ের একটি অংশ পাওয়া গেল না।

ক্যামেরার সিস্টেমে কারা প্রবেশ করতে পারত, তার লগ পরীক্ষা করে তদন্তকারীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেল। কিছু রেকর্ড পরিবর্তন করা হয়েছিল। তবে কে করেছে, তা নিশ্চিত করতে আরও প্রমাণ দরকার ছিল।

নভেরা নিউট্রিফুডসের কর্তৃপক্ষ প্রথমে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও পরে কিছু নথি দিতে দেরি করতে শুরু করে। একজন কর্মকর্তা দাবি করলেন, আনিসুরের সঙ্গে কারও ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল না। অন্য একজন বললেন, তিনি নাকি কাজের চাপে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। কিন্তু তাদের বক্তব্যের সঙ্গে নথির কয়েকটি তথ্য মিলছিল না।

এদিকে আনিসুরের সহকর্মী মাহবুবের বক্তব্যেও অসংগতি দেখা গেল। ঘটনার রাতে সে কোথায় ছিল, সে বিষয়ে প্রথমে এক কথা বলেছিল, পরে আরেক কথা। কিছু প্রবেশের রেকর্ড এবং অন্যান্য আলামত তার বক্তব্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল।

রাশেদ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাল না। সে শুধু নাবিলকে বলল, আনিসুর যে কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে, আর কারা এর পেছনে আছে, সেটা প্রমাণ ছাড়া বলা যাবে না।

মাহবুবকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। পরে পাওয়া আলামত, বক্তব্যের অসংগতি এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে তদন্তকারীরা তার বিরুদ্ধে আনিসুরকে হত্যার অভিযোগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পেলেন। তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। তবে রাসায়নিকের হিসাব নিয়ে কারা কারা জড়িত ছিল, কারখানার উচ্চপর্যায়ে কেউ বিষয়টি জানত কি না, আর খাদ্যপণ্যে অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগ কতটা সত্য, সেসব প্রশ্নের উত্তর তখনও পাওয়া যায়নি।

মামলাটা সেখানেই শেষ হলো না। বরং তদন্ত যত এগোল, ততই বড় হয়ে উঠল।

এর কয়েক দিন পর রাতে রাশেদের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।

কণ্ঠটা নিচু, ঠান্ডা।

আনিসুরের ব্যাপারটা নিয়ে আর এগোবেন না।

রাশেদ জিজ্ঞেস করল, আপনি কে?

ওপাশ থেকে উত্তর এল, সব মৃত মানুষের শেষ কথা শোনার দরকার নেই। কিছু কথা মাটির নিচেই থাকুক।

কল কেটে গেল।

রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে নাবিলকে বিষয়টা জানাল। নম্বরটি শনাক্ত করার চেষ্টা শুরু হলো। নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও সে সতর্ক হলো। মেয়েদের স্কুলে যাতায়াতের ব্যবস্থা বদলাল, পরিচিতদের বাইরে কারও সঙ্গে তাদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য ভাগ না করতে বলল। বাড়িতে স্ত্রীকে সব খুলে বলল, যদিও নিজের অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার সবটা সে এখনও কাউকে বোঝাতে পারেনি।

এই হুমকির সঙ্গে আনিসুরের মামলার সম্পর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু কে হুমকি দিচ্ছে, সে একা কাজ করছে নাকি আরও কেউ জড়িত, কিছুই নিশ্চিত ছিল না।

রাশেদ জানত, এই তদন্ত থেকে সরে দাঁড়ানো সহজ। কিন্তু আনিসুরের নোটে যে হিসাবের অমিল ছিল, তার উত্তর না খুঁজে ফাইল বন্ধ করে দেওয়াও তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তবু সে একটা বিষয় মনে রাখল। হুমকিটা তার কাছে এসেছিল তদন্ত থামানোর জন্য। মৃত মানুষের স্মৃতি তাকে অপরাধীর নাম বলে দেয়নি। আর কোনো অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা কাউকে আইনের চোখে অপরাধী বানাতে পারে না।

বন্ধ দরজার ওপাশে

আনিসুরের মামলার তদন্ত চলছিল। এর মধ্যেই নাবিল আরেকটি ঘটনায় রাশেদের সাহায্য চাইল।

সাত বছরের একটি মেয়ে, নাম মায়া। এক বিকেলে বাড়ির কাছ থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর রাতে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে বোঝা যাচ্ছিল, পরিচিত পরিবেশের মধ্যেই কোনো এক সময়ে তাকে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কে নিয়ে গিয়েছিল, সেটা তখনও পরিষ্কার ছিল না।

মর্গে মেয়েটির ছোট্ট শরীরটা দেখে রাশেদ অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। নিজের মেয়েদের কথা মনে পড়েছিল তার। সে জানত, কাজের সময় ব্যক্তিগত অনুভূতিকে আলাদা রাখতে হয়। কিন্তু সাত বছরের একটা শিশুর সামনে পৃথিবীটা কতটা বড় আর কতটা নিরাপদ মনে হয়, সেটা ভুলে থাকা কঠিন।

পরীক্ষার কাজ শেষ করে সে মায়ার মাথায় হাত রাখল।

কিছুক্ষণের মধ্যে একটা অস্পষ্ট দৃশ্য ভেসে উঠল।

একটা পরিচিত কণ্ঠ তাকে ডাকছে। মায়া ভয় পাচ্ছে না। সে বিশ্বাস করে সামনে যে আছে, তাকে চেনে। ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তারপর একটা দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ঘরের ভেতর অন্ধকার। মেয়েটা কাঁদছে।

আম্মু, আমি বাসায় যাব।

তারপর শুধু কান্না। দরজার ওপাশে কোনো শব্দ নেই।

রাশেদ হাত সরিয়ে নিল। তার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। খাতায় সে লিখল, শেষ স্মৃতি: মায়ের কাছে ফিরতে চাওয়া।

এই স্মৃতি তাকে কোনো খুনির মুখ দেখায়নি। কণ্ঠটা কার, সেটাও নিশ্চিত করা যায়নি। কিন্তু মায়া হয়তো এমন কাউকে বিশ্বাস করেছিল, যার সঙ্গে তার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। এই সম্ভাবনাটা নাবিলকে জানানো হলো।

তদন্তকারীরা এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করলেন। দোকানদার, প্রতিবেশী, বাড়ির আশপাশে থাকা মানুষদের বক্তব্য নেওয়া হলো। একাধিক বক্তব্য মিলিয়ে দেখা গেল, ঘটনার আগে মায়াকে এক যুবকের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। যুবকটির নাম সোহেল। সে এলাকার পরিচিত মুখ হলেও প্রথমে নিজেকে ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে দাবি করেছিল।

কিন্তু ক্যামেরার ফুটেজ, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত তার বক্তব্যের সঙ্গে মিলল না। তদন্তে আরও কিছু তথ্য পাওয়া গেল, যা সোহেলের সংশ্লিষ্টতার পক্ষে গেল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেপ্তার করা হলো। পরে সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম এগোতে থাকল।

মায়ার শেষ স্মৃতি অপরাধীকে শনাক্ত করেনি। তদন্তকারীদের কাজ করেছে বাস্তবের আলামত। রাশেদ শুধু একটা সম্ভাব্য দিক দেখেছিল, যা অন্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে কাজে লেগেছিল।

মামলাটি আনিসুরের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। কোনো রাসায়নিক কারখানা, কোনো গোপন ফাইল, কোনো করপোরেট ষড়যন্ত্র এখানে ছিল না। একটি শিশুর জীবন শেষ হয়েছিল, আর তার হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে পুলিশ আলাদা তদন্ত চালিয়েছিল।

মায়ার মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় রাশেদ কোনো সান্ত্বনার কথা খুঁজে পায়নি। মানুষ যখন এমন শোকের সামনে দাঁড়ায়, তখন বড় বড় বাক্য খুব নিষ্ঠুর শোনায়। সে শুধু চুপচাপ বসেছিল। মহিলা একসময় জিজ্ঞেস করেছিলেন, শেষ মুহূর্তে ও কি আমাকে খুঁজছিল?

রাশেদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেছিল, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারব না। মহিলা মুখে আঁচল চেপে বসে রইলেন।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে রাশেদ নিজের দুই মেয়ের ঘরের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। ছোট মেয়েটার একটা হাত কম্বলের বাইরে পড়ে ছিল। সে হাতটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। তারপর দরজাটা টেনে দিল আলতো করে।

সেই রাতে তার মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ দৃশ্যগুলোই আসলে সবচেয়ে মূল্যবান। একটা শিশু ঘুমাচ্ছে। তার মা বাবা পাশের ঘরে আছে। সকালে ঘুম ভাঙলে সে কাউকে ডাকতে পারবে। অথচ এই নিশ্চয়তাটুকুও সবার ভাগ্যে জোটে না।

শেষ অবস্থান

নীরার বয়স চৌদ্দ। কক্সবাজার থেকে বাসে করে ফেরার পথে রাতে সে একটি জায়গায় নেমেছিল। রাত প্রায় দেড়টা। ফোনে বাবাকে নিজের অবস্থান পাঠিয়ে লিখেছিল, আমাকে নিতে আসো।

বাবা তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। সকালে উঠে বার্তাটি দেখেন।

কিন্তু তার আগেই নীরার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে কুমিল্লার লালমাই এলাকায় ধানখেতের ভেতর তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। কাছাকাছি একটি পরিত্যক্ত সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া যায়। রাতের অন্ধকারে কী ঘটেছিল, নীরা কোথা থেকে কোথায় গিয়েছিল, আর তার সঙ্গে কে ছিল, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল পুলিশ।

নাবিল এবারও রাশেদকে ডাকল।

মর্গে নীরার মাথায় হাত রাখার পর রাশেদ যে স্মৃতির ভেতর ঢুকে পড়ল, তা আগের ঘটনাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি তীব্র ছিল।

রাস্তার আলো। অন্ধকারের মধ্যে একটা গাড়ি। দরজা খোলার শব্দ। নীরা দৌড়াচ্ছে। পায়ের নিচে কাদা, ধানগাছের পাতা শরীরে লাগছে। পেছনে কেউ আছে। তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে যাচ্ছে। একবার পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে সে। হাঁটুতে ব্যথা, পায়ে কাদা, বুকের ভেতর দম আটকে আসছে।

তারপর একটা মুহূর্তে সে থেমে পেছনে তাকাল।

রাশেদ মুখটা দেখতে পেল না। শুধু অনুভব করল, মেয়েটা বাঁচতে চাইছে। খুব সাধারণ একটা ইচ্ছা। সে বাড়ি ফিরতে চায়। বাবার কাছে যেতে চায়। মায়ের মুখ দেখতে চায়। ছোট ভাই বা বোন থাকলে তাকে জড়িয়ে ধরতে চায়। সে জানে না সামনে কী আছে, শুধু জানে পেছনে থাকলে বিপদ।

দৌড়াতে দৌড়াতে নীরা যেন নিজের মনেই বলছে, আব্বু, তুমি আসো না কেন?

স্মৃতিটা ভেঙে গেল।

রাশেদ হাত সরিয়ে কয়েক মুহূর্ত বসে রইল। তার মাথার ভেতর এখনও দৌড়ানোর অনুভূতি। বুকের ভেতর অস্বাভাবিক চাপ। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা থেকে সে কাউকে শনাক্ত করতে পারল না। কোনো মুখ নেই, কোনো স্পষ্ট নাম নেই। রাস্তার আলো আর ধানখেতের দৃশ্যও এমন কিছু নয়, যা একা অপরাধীকে চিহ্নিত করতে পারে।

সে নাবিলকে সব বলল। সঙ্গে এটাও জানাল, স্মৃতির প্রতিটি অংশ সত্য কি না, সেটাও সে নিশ্চিত করতে পারবে না। তদন্তের ভিত্তি হতে হবে নীরার ফোন, যাতায়াতের তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শী, সিসিটিভি এবং শারীরিক আলামত।

নাবিলের দল প্রথমে নীরার ফোনের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করল। সেসব তথ্য থেকে সম্ভাব্য যাত্রাপথের একটা ধারণা পাওয়া গেল, যদিও ফোনের অবস্থান সবসময় একজন মানুষের সঠিক অবস্থান প্রমাণ করে না। বাসের যাত্রী, চালক, সহকারী এবং আশপাশের দোকানের লোকজনের বক্তব্য সংগ্রহ করা হলো। রাস্তার কয়েকটি ক্যামেরায় পাওয়া ফুটেজ মিলিয়ে দেখা হলো। পরিত্যক্ত সিএনজি অটোরিকশাটির মালিকানা ও চলাচলের তথ্য ধরে তদন্তকারীরা এক যুবকের কাছে পৌঁছালেন। তার নাম জুবায়ের।

প্রথমে সে দাবি করেছিল, নীরার সঙ্গে তার কোনো পরিচয় নেই। কিন্তু ফোনের তথ্য, যাতায়াতের সময়, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য আলামত একত্রে তার বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করল। তদন্ত যত এগোল, তার দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার অসংগতি তত স্পষ্ট হলো। শেষ পর্যন্ত জুবায়েরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া তখনও চলমান ছিল। পুলিশ সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনাটির পূর্ণ বিবরণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছিল।

নীরার স্মৃতি থেকে পাওয়া দৃশ্যগুলো কোনো আদালতের প্রমাণ ছিল না। সেগুলো দিয়ে খুনির পরিচয় নির্ধারণ করা যায়নি। বাস্তবের সূত্রগুলোই তদন্তকে সামনে নিয়ে গিয়েছিল।

নীরার বাবার পাঠানো সেই বার্তাটা রাশেদের মাথা থেকে যাচ্ছিল না। রাত দেড়টায় একটি মেয়ে বাবাকে লিখেছিল, আমাকে নিতে আসো। বার্তাটি পৌঁছেছিল। কিন্তু মানুষটা তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। সকালে উঠে তিনি মেয়ের খোঁজে বের হয়েছিলেন, যখন আর কিছু করার ছিল না।

এটা তার অপরাধ ছিল না। একজন বাবা সবসময় জেগে থাকতে পারেন না, সব বিপদ আগে থেকে বুঝতে পারেন না। তবু শোকের মধ্যে যুক্তির জায়গা খুব ছোট হয়ে যায়। সেখানে শুধু একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে, আর পাঁচ মিনিট আগে যদি জানতাম?

রাশেদ সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারত না।

নীরার ঘটনাটিও ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। মায়ার সঙ্গে তার কোনো যোগ ছিল না। আনিসুরের কারখানার তদন্তের সঙ্গেও নয়। তিনটি মৃত্যু, তিনটি পৃথক তদন্ত, তিনটি ভিন্ন অপরাধ। কেবল মৃত মানুষের শেষ স্মৃতির সামনে দাঁড়িয়েছিল একই মানুষ।

আর প্রতিবারই রাশেদকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কোনো মানুষের শেষ মুহূর্ত জানা আর তাকে বাঁচাতে পারা এক জিনিস নয়।

যে হুমকির পরিচয় নেই

আনিসুরের মামলার তদন্ত চলতে থাকল। মাহবুব গ্রেপ্তার হয়েছে, কিন্তু রাসায়নিকের হিসাবের অসংগতি, মুছে যাওয়া নথি, সিসিটিভির অনুপস্থিত অংশ এবং কোম্পানির উচ্চপর্যায়ের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।

নাবিলের দল নথি সংগ্রহ করছিল। কিছু কর্মী গোপনে তথ্য দিতে রাজি হয়েছিল, আবার কেউ কেউ কথা বলতে ভয় পাচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে। কিন্তু হিসাবের অমিলগুলো ব্যাখ্যা করার মতো যথেষ্ট নথি তখনও পাওয়া যায়নি।

রাশেদের ফোনে অচেনা নম্বর থেকে আসা হুমকির পর আরেকটি বার্তা এসেছিল।

আপনি যা দেখেছেন, তার সবকিছুর মানে আপনি জানেন না।

বার্তাটির সঙ্গে কোনো নাম ছিল না। নম্বরটিও পরে বন্ধ পাওয়া গেল।

রাশেদ বার্তাটা নাবিলকে পাঠিয়ে দিল। তদন্তকারীরা এটাকে সম্ভাব্য ভয় দেখানোর চেষ্টা হিসেবে দেখলেন এবং উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন। কে পাঠিয়েছে, তা নিশ্চিত করা গেল না।

রাশেদ জানত, এই হুমকির উৎস খুঁজে বের করা জরুরি। কিন্তু তার কাছে আসা প্রতিটি অচেনা বার্তাকে সে নিজের অস্বাভাবিক ক্ষমতার সঙ্গে জুড়ে দেখতে চাইল না। হুমকিগুলোর সময় আর ভাষা আনিসুরের তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। মায়া বা নীরার ঘটনার সঙ্গে এমন কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

তিনটি মামলার মধ্যে একমাত্র আনিসুরের তদন্তই এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বার্থ, নথি গোপন করার অভিযোগ এবং রাসায়নিক ব্যবহারের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। রাশেদ বুঝতে পারছিল, এখানে একজনকে গ্রেপ্তার করলেই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না।

কখনো কখনো রাতে তার মনে হতো, সে কি নিজের ক্ষমতার কারণে বিপদে পড়েছে, নাকি এমন একটা সত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যেটা কেউ প্রকাশ হতে দিতে চায় না?

উত্তর ছিল না।

আর সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটা ছিল অন্য জায়গায়। ২০২০ সালের দুর্ঘটনার পর তার স্মৃতির যে অংশ হারিয়ে গেছে, সেখানে কী আছে? সে কেন মৃত মানুষের শেষ স্মৃতি দেখতে পায়? এই ক্ষমতার শুরু কি সত্যিই দুর্ঘটনার পর, নাকি দুর্ঘটনাটা শুধু এমন কিছু সামনে এনেছে, যা তার মধ্যে আগে থেকেই ছিল?

রাশেদ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছিল। কিন্তু নিজের অতীতের কোনো নথি খুললেই কিছু ফাঁকা জায়গা সামনে এসে দাঁড়াত। হাসপাতালের কিছু রিপোর্ট ছিল, কিছু চিকিৎসার কাগজ ছিল, কয়েকজন চিকিৎসকের বক্তব্য ছিল। তবু দুর্ঘটনার আগের কয়েক ঘণ্টা এবং পরের কয়েক দিনের স্মৃতি যেন তার জীবন থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে।

তার মনে হতো, সে নিজের জীবনেরও একজন তদন্তকারী। পার্থক্য শুধু এই যে, এখানে মৃত মানুষটা সে নিজেই, আর সাক্ষীও সে নিজে। অথচ নিজের স্মৃতির ওপরই তার সবচেয়ে কম ভরসা।

শেষ স্মৃতি

সেদিন রাতে রাশেদ অনেকক্ষণ ঘুমাতে পারল না।

আনিসুরের মামলার নতুন রিপোর্টটা টেবিলে পড়ে ছিল। রাসায়নিকের হিসাবের গরমিল, গায়েব হয়ে যাওয়া সিসিটিভি ফুটেজ, অচেনা নম্বর থেকে আসা হুমকি। সবকিছু এখনও অসম্পূর্ণ। সে খাতাটা খুলে আগের নোটগুলো পড়ছিল, এমন সময় ফোনে একটা বার্তা এল।

কোনো নম্বর নেই। শুধু একটি ছবি।

ছবিটা দেখে রাশেদের হাত থেমে গেল।

একটা হাসপাতালের বেড। পাশে মনিটর। বালিশের ওপর ব্যান্ডেজ বাঁধা এক তরুণের মাথা। ছবিটা ঝাপসা, তবু মুখটা চিনতে তার অসুবিধা হলো না।

এটা তার নিজের ছবি।

২০২০ সালের দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে তোলা। সেই সময়ের ছবি, যার বেশির ভাগ দিন সে মনে করতে পারে না।

ছবির নিচে লেখা ছিল,

আপনি যেদিন প্রথম মৃত মানুষের শেষ স্মৃতি দেখেছিলেন, সেদিনই কি আপনার ক্ষমতা শুরু হয়েছিল?

রাশেদ স্থির হয়ে বসে রইল।

দুর্ঘটনার পর হাসপাতালের সেই মাসের অনেক কিছু তার মনে নেই। এত দিন সে ভেবেছে, দুর্ঘটনার পরেই এই অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা শুরু হয়েছিল। কিন্তু ছবিটা কে পাঠাল? তার চিকিৎসার নথি কার কাছে আছে? আর যে দিনটাকে সে নিজের ক্ষমতার শুরু বলে ধরে নিয়েছে, সত্যিই কি সেটাই শুরু ছিল?

আরেকটা বার্তা এল।

আনিসুরের ফাইল বন্ধ করুন। নইলে পরের শেষ স্মৃতিটা আপনার পরিচিত কারও হবে।

রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে নাবিলকে ফোন করতে গেল। কিন্তু কল যাওয়ার আগেই ফোনের পর্দায় তৃতীয় একটি বার্তা ভেসে উঠল।

এবার কোনো ছবি নেই। কোনো হুমকিও নেই।

শুধু একটা বাক্য।

আপনার মেয়েরা জানে না, দুর্ঘটনার দিন আপনি একা ছিলেন না।

রাশেদ ধীরে ধীরে মেয়েদের ঘরের দিকে তাকাল। দরজাটা আধখোলা। ভেতরে দুজনেই ঘুমিয়ে আছে। ছোট মেয়েটার মুখে চুল এসে পড়েছে। বড় মেয়েটা পাশ ফিরে শুয়ে আছে, একটা হাত বালিশের নিচে।

সে উঠে গিয়ে দরজার কাছে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ তাদের দেখল। তারপর ফিরে এসে হাসপাতালের ছবিটা আবার খুলল।

ছবির একেবারে পেছনে, দরজার কাচে প্রতিফলিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন মানুষ। মুখ দেখা যাচ্ছে না। শুধু ডান হাতটা স্পষ্ট। কবজিতে একটা ঘড়ি।

রাশেদ ছবিটা বড় করল।

ঘড়িটা সে চিনতে পারল।

দুর্ঘটনার আগের দিন নিজের হাতে সেই ঘড়িটা সে একজনকে উপহার দিয়েছিল।

একজন, যে তখনও বেঁচে ছিল।

আর এখন, রাশেদের মনে পড়ছে না, লোকটা কে!

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • Salam Khokon 1 day ago

    ঘটতেই থাকবে ....