সকালে ঘুম থেকে উঠে রাফি মেয়ের ঘরে ঢুকল। জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে বিছানার একপাশে পড়েছে। মেয়েটা কুঁকড়ে শুয়ে আছে। একটা পা কম্বলের বাইরে। রাফি পা দুটো আলতো করে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। মেয়েটার চুল মুখের ওপর এসে পড়েছে। হাত দিয়ে সরিয়ে কপালে একটা চুমু দিল। মেয়েটা চোখ না খুলেই মুখটা একটু কুঁচকে আবার ঘুমিয়ে গেল।
রাফি হেসে বেরিয়ে এল।
রান্নাঘরে তার স্ত্রী ডিম ভাজছে। টেবিলের ওপর দুটো স্কুলব্যাগ। একটা পানির বোতল উল্টো করে রাখা। ছেলেটা চেয়ারে বসে জুতার ফিতা নিয়ে যুদ্ধ করছে। ফিতাটা বারবার খুলে যাচ্ছে। রাফি হাঁটু গেড়ে বসে ফিতাটা বেঁধে দিল। ছেলেটা পা তুলে দেখে খুশি হলো।
সকালের এইসব ছোট ছোট কাজের মধ্যে দিয়ে তাদের দিন শুরু হয়। মেয়ের চুল আঁচড়ানো, ছেলের জামার কলার ঠিক করা, স্কুলব্যাগে টিফিন ঢোকানো, দরজা বন্ধ করার আগে গ্যাস বন্ধ আছে কি না দেখে নেওয়া। তারপর গাড়িতে দুটো বাচ্চা। পেছনের সিটে বসে তারা ঝগড়া করছে কে জানালার পাশে বসবে সেটা নিয়ে। রাফি আয়নায় তাকিয়ে হাসে।
স্কুলের সামনে মেয়েটা নামার সময় বাবার হাত ধরে একটু ঝুলে থাকে। তারপর ছুটে যায়। ছেলেটা দুবার ফিরে তাকায়। শেষবার রাফি হাত নাড়লে ছেলেটাও হাত নাড়ে।
বিকেলে মেয়েটা বাবার হাত ধরে হাঁটছিল। রাস্তার পাশে একটা জুতার দোকানের সামনে এসে হঠাৎ থেমে গেল। কাঁচের ভেতর গোলাপি একটা জুতা। সামনের দিকে ছোট সাদা ফুল।
মেয়েটা কাঁচে নাক ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রাফি ঘড়ির দিকে তাকাল। দোকান বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে গেছে। মেয়েটার হাত ধরে বলল, কাল আসব।
মেয়েটা জুতার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
বাসায় ফিরে রাতে সে মেয়েকে কোলে নিয়ে গল্প বলল। গল্পের মাঝখানে মেয়েটা ঘুমিয়ে গেল। রাফি গল্প থামাল না। ঘুমন্ত মেয়ের মাথা তার বুকের ওপর। রাফি নিচু গলায় গল্পটা শেষ করল।
তারপর অনেকক্ষণ মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বসে রইল।
রাত গভীর হলে তাকে বিছানায় রেখে আলো নিভিয়ে বের হয়ে গেল।
সকালে আবার মেয়ের ঘরে ঢুকল রাফি।
জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে বিছানার একপাশে পড়েছে।
মেয়েটা কুঁকড়ে শুয়ে আছে।
একটা পা কম্বলের বাইরে।
রাফি পা দুটো আলতো করে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ তার মনে হলো, মেয়েটাকে কালও ঠিক এইভাবে দেখেছিল।
কতক্ষণ আগে?
মনে করতে গিয়ে মাথার ভেতরটা ফাঁকা পেল।
তারপর রান্নাঘর থেকে স্ত্রী ডাকল।
রাফি বেরিয়ে গেল।
টেবিলের ওপর দুটো স্কুলব্যাগ।
একটা পানির বোতল উল্টো করে রাখা.....
ছেলেটা জুতার ফিতা নিয়ে যুদ্ধ করছে। রাফি হাঁটু গেড়ে বসে ফিতাটা বেঁধে দিল। ছেলেটা পা তুলে দেখে খুশি হলো। দিনটা আবার শুরু হলো। ছেলেটা স্কুল থেকে বের হয়েছিল দুপুরের পর। স্কুলের গেটের বাইরে অনেক বাচ্চা। অভিভাবকরা দাঁড়িয়ে। গাড়ি আসছে, যাচ্ছে। একজন বাদাম বিক্রি করছে। একটা কুকুর গেটের পাশে বসে আছে। ছেলেটা ব্যাগটা এক কাঁধে তুলে রাস্তার দিকে হাঁটল।
সেদিন তাকে আর কেউ দেখেনি।
বিকেল চারটার দিকে মা প্রথম ফোন করেছিল। ফোন বন্ধ। পাঁচটায় স্কুলে ফোন দিলো। স্কুল বলল, সে অনেক আগেই বের হয়েছে।
ছয়টার দিকে রাফি রাস্তায় বের হলো। ছেলের ছবি ফোনে খুলে একজন রিকশাওয়ালাকে দেখাল। রিকশাওয়ালা ছবিটা দেখে মাথা নাড়ল।
আরেকজন দোকানদার একটু কাছে এসে দেখল। বলল, মনে হয় দেখেছি। তারপর আবার বলল, না, নিশ্চিত না।
রাত নামল। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠল। রাফি এক রাস্তা থেকে আরেক রাস্তায় হাঁটতে লাগল। ছেলের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে গলা বসে গেল। একসময় সে রাস্তার মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। ছবিটা দুই হাতে ধরে সামনে তুলে ধরল।
কেউ থামল
কেউ তাকাল
কেউ মোবাইলে ছবি তুলল
একজন পানি এগিয়ে দিল
তারপর সবাই চলে গেল
রাত আরও গভীর হলো
মা ছেলের বিছানায় বসে ছিল।বালিশের পাশে একটা খেলনা গাড়ি।
সে গাড়িটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, জানে না। সকালে ঘুম ভেঙে সে রান্নাঘরে গিয়ে স্বামীকে বলল,
আজ ওকে স্কুলে দিতে হবে না? স্বামী চুপ করে তাকিয়ে রইল।টেবিলের ওপর একটা স্কুলব্যাগ ছিল। মা ব্যাগটার দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
এটা কার?
________
মেয়েটা হারিয়ে যাওয়ার দিন বিকেলে বৃষ্টি হয়েছিল। স্কুল থেকে ফেরার পথে তার চুল ভিজে গিয়েছিল। হাতে ছিল একটা ছোট ছাতা। ছাতাটা পরে পাওয়া গিয়েছিল রাস্তার পাশে।
তারপর তিন দিন কেউ তাকে খুঁজে পায়নি। তিন দিন পর শহরের অন্য প্রান্তে একটা নির্জন জায়গায় তার লাশ পাওয়া গেল। খবরটা যখন বাড়িতে বাড়িতে শহরে শহরে পৌঁছাল, মেয়েটার মা দরজার কাছে বসে পড়েছিল। কারও মুখের দিকে তাকাচ্ছিল না। তার সামনে ফোনে মেয়ের একটা ছবি খোলা।
ছবিতে মেয়েটা হাসছে
দুই পাশে চুল বাঁধা
হলুদ জামা
একটা দাঁত সামনের দিকে একটু বাঁকা
মা ছবিটা আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দিল। তারপর হঠাৎ কেঁদে উঠল। কেন কাঁদছে, সেটা সে জানে না। শুধু ছবিটা দেখলেই বুকের মধ্যে একটা জায়গা ব্যথা করছে। মেয়েটার বাবা বারবার ফোনের ছবিটা বড় করে দেখছিল।
মুখটা চেনা
খুব চেনা
কিন্তু মুখটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দিনগুলো কোথায় যেন নেই। রাতে মা মেয়ের ঘরে ঢুকল। বিছানার ওপর একটা পুতুল। টেবিলে রঙ পেন্সিল।দেয়ালে কাগজে আঁকা একটা বাড়ি। দরজার সামনে চারজন মানুষ।
মা ছবিটা হাতে নিল। চারজন কারা?
সে জানে না। একজন হয়তো সে। একজন হয়তো মেয়ের বাবা।
আর দুজন?
মা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর ছবিটা আবার টেবিলে রেখে দিল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সে প্রথমে রান্নাঘরে গেল। তারপর হঠাৎ মেয়ের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল।
দরজা খোলা
ঘর খালি
সে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর স্বামীকে ডাকল।
আমাদের কি একটা মেয়ে ছিল?
___________________________
বাড়িটা ছিল খুব সুন্দর। দুজন মানুষ থাকত সেখানে।
দুজনেরই ভালো চাকরি। ঘর পরিষ্কার। দেয়ালে বিদেশের ছবি। ফ্রিজের ওপর কয়েকটা ম্যাগনেট। শেলফে সাজানো বই, যেগুলোর বেশিরভাগই কেউ পড়েনি। তারা খুব একটা বাইরে যেত না। প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা হলে হাসত। তারপর দরজা বন্ধ করত। একদিন পাশের ফ্ল্যাটের লোকের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল। করিডোরে অনেকক্ষণ চিৎকার হয়েছিল। দরজা বন্ধ করে তারা টিভির শব্দ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আরেকদিন নিচের দোকানের ছেলেটাকে কয়েকজন মারছিল। বারান্দা থেকে মেয়েটা দেখেছিল।
ছেলেটা বলেছিল, পুলিশ আসবে। মেয়েটা পর্দা টেনে দিয়েছিল। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে তারা একটা দুর্ঘটনা দেখেছিল।
গাড়ি থামায়নি। তাদের নিজেদের জীবন ছিল। জীবনটা খারাপ ছিল না।
বরং বেশ ভালোই ছিল।
ছুটিতে পাহাড়ে যেত
সমুদ্র দেখতে যেত
ভালো রেস্টুরেন্টে খেত
ছবি তুলত
ফিরে এসে ছবিগুলো সাজিয়ে রাখত।
তারপর এক রাতে তাদের নিজেদের গাড়িটা দুর্ঘটনায় পড়ল। রাস্তাটা ফাঁকা ছিল। গাড়ি উল্টে গিয়ে একপাশে আটকে রইল। কাচ ভেঙে মেয়েটার কপাল কেটে গেল।ছেলেটার পা আটকে গেল নিচে। বাইরে লোকজন জড়ো হলো।
কেউ গাড়ির জানালায় হাতুড়ি মারল। কেউ পুলিশে ফোন করল।
কেউ দূরে দাঁড়িয়ে ভিডিও করল।ঘণ্টাখানেক পরও তারা বের হতে পারল না। মেয়েটা ছেলেটার হাত ধরে ছিল। তার আঙুল ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল।
আমাদের কেউ চেনে?
ছেলেটা মাথা নাড়ল।
কেউ না। মেয়েটা চোখ বন্ধ করল।
কিছুক্ষণ পর বলল,আমরা কাউকে চিনতাম?
ছেলেটা একটু ভেবে বলল,
না।
তারপর দুজনেই চুপ করে রইল। বাইরে অনেক মানুষ ছিল।কিন্তু তাদের জন্য কোনো মানুষ ছিল না।রাতের শেষ দিকে মেয়েটা খুব আস্তে বলল,
আমরা তো শুধু নিজেদের নিয়েই ছিলাম।
ছেলেটা কিছু বলল না।
খারাপ তো ছিলাম না।
কিছুক্ষণ পর আবার বলল,
শুধু কারো ব্যাপারে মাথা ঘামাইনি।
বাইরে তখন একজন লোক আরেকজনকে বলছিল, দেখেন, ওদের কেউ চিনে কি না।
কেউ চিনত না।
_____________
সকালে রাফি আবার মেয়ের ঘরে ঢুকল।জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে বিছানার একপাশে পড়েছে।মেয়েটা কুঁকড়ে শুয়ে আছে।একটা পা কম্বলের বাইরে।রাফি পা দুটো ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।
মেয়েটা চোখ খুলে তাকাল।
বাবা।
হুম?
আজ স্কুলে যাব না।
রাফি হাসল।
কেন?
ভালো লাগে না।
রাফি তাকে কোলে তুলে নিল।মেয়েটা বাবার গলায় মুখ গুঁজে দিল।
রাফির মনে হলো, এই মুহূর্তটা সে খুব চেনে।কিন্তু কোথা থেকে চেনে, মনে করতে পারল না। তার বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত একটা শূন্যতা হলো।
সে মেয়েকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
রান্নাঘর থেকে তার স্ত্রী বলল,আজ বিকেলে কোথাও যাবে?
রাফি বলল,যাব।
কোথায় যাবে, সে জানে না। কেন যাবে, সেটাও জানে না। শুধু মনে হলো, আজকের দিনটা ভালো হওয়া দরকার।
________________________________
উপরে, অনেক উপরে, একজন চুপচাপ সব দেখছিলেন।
তিনি দেখলেন, মানুষ কাঁদছে। কেউ সন্তান হারিয়ে, কেউ প্রিয় মানুষ হারিয়ে, কেউ অন্যায়ের শিকার হয়ে, কেউ নিজের ভুলের ভারে। তিনি চাইলে হয়তো অনেক কিছুই বদলে দিতে পারতেন। কিন্তু সব কষ্টের ভেতর হাত বাড়িয়ে মানুষকে বাঁচিয়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই অসহায়ত্বটাই তার সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত।
একদিন তিনি একটা অদ্ভুত উপায় বের করলেন।
মানুষের কষ্ট তিনি মুছে দিলেন না। শুধু ঘুম পর্যন্ত সরিয়ে রাখলেন।
রাত নামলেই মানুষ তার দুঃখ নিয়ে ঘুমাবে। কাঁদবে। হারানো মানুষকে মনে করবে। বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো নিয়ে এপাশ ওপাশ করবে।
তারপর ঘুমিয়ে পড়বে।
সকালে উঠে কিছুই মনে থাকবে না। শুধু কোথাও খুব গভীরে একটা ছায়া থেকে যাবে।
তাই সকাল সকাল শহরের রাস্তাগুলোতে মানুষ বের হয়। কেউ অফিসে যায়, কেউ স্কুলে, কেউ বাজারে। সবাই যার যার কাজে ছুটছে। খুব গভীরভাবে তাকালে শুধু দেখা যায়, তাদের চোখে সামান্য একটা বিভ্রান্তি। যেন ঘুম থেকে উঠে তারা সবাই কিছু একটা খুঁজছে। কী হারিয়েছে, কেউ জানে না।
শুধু উপরে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তিনি জানেন।
তিনি চুপ করে দেখেন।
আর প্রতিটি রাতের শেষে আবার তাদের মাথায় হাত রেখে দেন।
কারণ তিনি জানেন, মানুষকে সবসময় সুখী করে রাখা সম্ভব নয়। কখনো কখনো শুধু এতটুকুই করা যায়, যাতে তারা পরদিন সকালে আবার উঠে দাঁড়াতে পারে।