ছোটবেলায় আমি বহুবার দাদার মুখ থেকে এই ঘটনা শুনেছি৷ গ্রামীণ পরিবেশে বিদ্যুৎ তখনো সবার ঘরে ঘরে পৌছায় নি। তাই সন্ধ্যা হলেই চারপাশের পরিবেশে গ্রাস করত গাঢ় অন্ধকার। অমাবস্যার রাতে দূর থেকে শোনা যেত ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, রাতের নিস্তব্ধ পরিবেশে মাঝে মাঝে জলাশয় থেকে ভেসে আসতো ব্যাঙের ঘ্যাঙানি হাঁক। আর বাতাসের শো শো শব্দে নিরব পরিবেশ যেন ক্রমশ ভারী হয়ে উঠত। এই ছিল তখনকার ঘটনা। আমার দাদুর তখনো ভরা যৌবন। নতুন বিবাহিত জীবন দাদুর অথচ সংসারের ব্যস্ততা এখনো তার মাথায় চেপে বসেনি। তখন লোকসংগীতের প্রতি দাদুর ছিল ভীষণ জোঁক। তাই সময় পেলেই গুণগুণ শব্দে লোকসংগীত চর্চা করতেন।
অপরদিকে দাদুর বাবা করিম আলীর যাকে আমি বড় বাবা বলে ডাকি। তার ছিল বিশাল এক পানা পুকুর। পুকুরে প্রচুর মাছ উঠতো৷ মাছ বিক্রি করেই পরিবারের অর্ধেক খরচ মিটে যেত। একদিন রাতে শান্ত, নিরব পরিবেশে একটি কুপি বাতির মৃদু আলোর নিচে বসে দাদু তার একতারা হাতে নিয়ে লোকসংগীতের চর্চা করছিলেন। আর ঠিক তখনি দাদু শুনতে পেলেন বাইরে থেকে ভেসে আসা তার বাবার কণ্ঠস্বর।
সোবহান! ও সোবহান!
"জি বাবা।"
"বাড়ির পশ্চিম পাশে জাল ফালাইছি। চল, মাছগুলো ধরে নিয়ে আসি।
সকালে বিক্রি করতে হইবো তো"
বড় বাবার কথা শুনে দাদু আর দেরি করলেন না। ঘরের দরজা খুলে বাইরে উঠানে এসে বড় বাবা কে বললেন
"বাবা চল যাওয়া যাক। আজ এমনিতেই অমাবস্যার রাত, বেশি দেরি করলে আরও রাইত হইয়া যাইবো। বেশি রাইত গভীর হওনের আগেই মাছ লইয়া আমরা বাড়ি ফিরে আসবো।"
আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকটা ছিল কিছুটা নির্জন। আর পুকুরের তিন সেন্টিমিটার দূরেই ছিল গ্রামের একটি প্রাচীন দীঘি। দীঘির চারপাশেই প্রাচীন বটগাছ দিয়ে ভরা। লোকমুখে প্রচলিত ছিল, সেই দীঘির গভীরে বাস করে এক অশুভ শক্তি। সেই ভয়ে বহু বছর আগেই মানুষ দীঘিটিতে যাওয়া-আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। ধীরে ধীরে দীঘিটি পরিণত হয়েছিল এক নিষিদ্ধ স্থানে, যেখানে দিনের আলোতেও কেউ পা রাখতে সাহস করত না।দিনের বেলাতেই সেই দীঘির পাশ টা থমথমে ও স্তব্ধ থাকত৷ সেই অমাবস্যার রাতে পুকুর পাড়ে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য আমার দাদু বড় বাবার পেছনে পেছনে হাঁটছিলেন৷ কিছুটা পথ যাওয়ার পরেই দাদুর হঠাৎ মনে হল কিছু একটা ঠিক নেই৷ বড় বাবার হাঁটার ধরনটা একেবারেই অন্যরকম লাগছে। পা যেন ঠিকমতো মাটিতেই পড়ছে না, অদ্ভুত ভঙ্গিতে বড় বাবা সামনে এগিয়ে চলেছেন। দাদু একটু দ্রুত পা চালিয়ে ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বড় বাবা ঠিক আগের মতই নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই হেঁটে চলছেন।
পিছনে থেকে দাদু বড় বাবাকে ডেকে উঠলেন,
"বাবা, একটু আস্তে হাঁটো তো"
কিন্ত সামনের মানুষটার কাছ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। সে অল্পের জন্যও থামল না। কেবল অন্ধকারের বুক চিরে বড় বাবা আগের মতোই এগিয়ে চলতে লাগলেন। কিছুদূর যাওয়ার পর দাদু ও বড় বাবা এসে পৌঁছাল বিশাল এক পুকুর পাড়ে। পুকুরের চারদিকে তাকিয়ে দাদু জাল খুঁজতে লাগলেন, কিন্তু কোথাও জালের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই। দাদু অবাক হয়ে এবার বড় বাবা কে জিজ্ঞেস করলেন,
"বাবা, জাল কই? এইহানে তো কোনো জাল দেখতাছি না!"
ঠিক সেই মুহূর্তে সামনের মানুষটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে লাগলো। তারপর পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াল অস্পষ্ট আলোয় ভেসে উঠল তার মুখ খানা। নিস্তব্ধ রাতে তার হাতের আঙুলগুলো যেন একে অপরের সাথে ঘষা খেয়ে খসখসে শব্দ করছিল। শরীরের চামড়াগুলো ঝুলে পড়েছে। আর চোখদুটো পাথরের মতো স্থির হয়ে দাদুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে৷ দাদু বুঝতে পারল দেখতে বড় বাবার মতো হলেও আসলে সেটা বড় বাবার রূপ ধরে আসা এক অশুভ শক্তি। ভীতিকর সেই মুহূর্তে মৃদু ভয় পেলেও দাদু পুরোপুরি তার হিতাহিত জ্ঞান শক্তি হারাল না।
দাদু কিছু করার আগেই সেটি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক ঝটকায় দাদুর ঘাড় ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল তিন সেন্টিমিটার দূরের সেই নিষিদ্ধ দীঘির সামনে৷ দীঘির পানি ঘুটঘুটে কালো হয়ে আছে৷ যার থেকে ভেসে আসছে দুর্গন্ধ। চারিদিকে ভয়ংকর শব্দ হচ্ছে। তারপর ঝপাং করে সে দাদুর মাথাটা সোজা চুবিয়ে দিল দীঘির পঁচা দুর্গন্ধ যুক্ত গভীর কালো পানির নিচে। দাদুর নাক-মুখ দিয়ে হু হু করে ডুকে যেতে লাগলো দীঘির নোংরা পানি। হাত-পা ছুড়ে নিজেকে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করলেন দাদু। কিন্তু সেই অশুভ শক্তির কাছে যেন দাদুর শক্তি যেন টিকছিলই না। দাদু তখনও বেশ শক্তসমর্থ আর সাহসী একজন যুবক ছিলেন। দাদুর ভেতর জেদ চেপে গেল নিজের শক্তি দিয়ে তিনি সেই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। মৃত্যুকে সামনে দেখে দাদুর তার সমস্ত শক্তি উজাড় করে দিয়ে আরো জোরালো করলেন। পানি আর কাঁদার ভেতর শুরু হলো দুইপক্ষের মধ্যে প্রচুর ধস্তাধস্তি। তাদের ধস্তাধস্তি তে জলের গভীর থেকে কখনো বুদবুদ হয়ে ভেসে উঠছিল, আবার কখনো পাড়ের মাটি খসে পড়ছিল।
শেষ পর্যন্ত নিজের সর্বশক্তি প্রয়োগ করে দাদু সেই অশুভ শক্তির হাত থেকে কোনরকমে নিজেকে ছাড়াতে সক্ষম হলেন। তারপর দীঘির পাড়ে উঠে পিছনের দিকে আর এক মুহূর্তও না তাকিয়ে তিনি সোজা বাড়ির দিকে দৌঁড়াতে লাগলেন। কীভাবে যে দাদু সেদিন বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিলেন, তা তার নিজেরও ঠিক মনে ছিল না।
আর এদিকে আমাদের বাড়িতে দাদুকে না পেয়ে হুলুস্থুল কাণ্ড বেঁধে গিয়েছে। এত রাতে মানুষটা গেল কোথায়? অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন দাদুকে বাড়ির দরজার সামনেই পাওয়া গেল, তখন তাকে দেখে সবাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল৷ কারণ পুরো শরীর জুড়ে কাঁদা আর নোংরা পানিতে ভেজা দাদুর সারা শরীর ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছে। কাঁদার জন্য দাদুকে চেনাই যাচ্ছিল না। আর সবচেয়ে আজব ব্যাপার হলো দাদুর সারা শরীর থেকে ভেসে আসছিল পঁচা মাছের তীব্র দুর্গন্ধ! এমন গন্ধ, যেন তাকে বহুদিনের পচে যাওয়া কোনো জলাশয়ের অতলে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। তখন কোনো কিছু চিন্তা না করে দাদুকে সবাই ধরাধরি করে ভেতরে নিয়ে যায়৷ পরে দাদুর জ্ঞান ফিরলে পরিবারের সবাই এই ব্যাপারে দাদু কে জিজ্ঞাসা করে। দাদু ও সেদিনকার পুরো ঘটনা পরিবারের সবার কাছে খুলে বলেন। দাদুর কথা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়। সবাই বুঝতে পারে, সেদিন রাতে বড় বাবার রূপ ধরে ওই নির্জন দীঘির পাড়ে দাদুকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল মূলত এক অশুভ শক্তি।
সেই ঘটনার পর থেকে দাদু আর কোনোদিন সন্ধ্যার পর একা বাড়ির বাইরে বের হননি। এমনকি সেই ঘটনার বছর পার হয়ে গেলেও আজও অমাবস্যার রাতে বাইরে বের হলেই তিনি শুনতে পান ঠিক সেই কণ্ঠস্বর তাকে ডাকছে।
সমাপ্ত