২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ সাল।
কলকাতার একটি সেমিনারে গিয়ে ফিরতি পথে আকিবের সাথে যে এমন একটা বিপত্তি ঘটবে, তা সে ঘুনাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি। ঢাকা ফেরার জন্য আকিব খুলনা এসে ঢাকাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনটা ধরেছিলো। সারাদিনের ক্লান্তি আর সেমিনারের গুরুগম্ভীর আলোচনা, সবমিলিয়ে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলো। তার গন্তব্য ছিলো যশোর জংশন, আর সেখান থেকে ঢাকা। কিন্তু ঘুম ভাঙলো সম্পূর্ণ অপরিচিত এক ভূতুড়ে স্টেশনে! কানে বাজছিলো সুদূর থেকে ভেসে আসা একটা ট্রেনের ঘর্ষণের শব্দ। প্ল্যাটফর্মে নেমে যখন সে চারপাশে তাকালো, তখন শীতের এক হিমেল স্রোত যেন তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল।
এটা যশোর জংশন নয়। প্ল্যাটফর্মটা একেবারেই নির্জন, মানুষজন নেই। প্ল্যাটফর্মের নামফলকটা আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে, তাতে লেখা রয়েছে "শিরিষপুর জংশন"। নামফলকের অক্ষরগুলো ইংরেজ আমলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো; বহু পুরোনো আর মরিচা পড়া। স্টেশনের টিমটিমে লন্ঠনের একফালি আলোয় অন্ধকারটা যেনো আরও ঘন হয়ে চারপাশের গাছপালা আর আগাছায় জমাট বেঁধে ছিলো। প্ল্যাটফর্মের গা ঘেঁষে একটি ভাঙা বেঞ্চ, আর তার খানিকটা দূরে, স্তম্ভের উপর একটি পুরনো ঘড়ি। ঘড়ির কাঁটা দুটো সেখানে নেই, কিন্তু তার ভেতর থেকে অবিরাম এক ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে, “টিক... টিক…”, “টিক… টিক…”!
আকিবের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। এই স্টেশনটা এতো নির্জন কেন? এত রাতে একটা জংশন স্টেশন কিভাবে এমন জনশূন্য থাকতে পারে? মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলো ফোনের চার্জ প্রায় শেষের দিকে। বুকটা দুরুদুরু করে উঠলো তার। মাঝরাতে, তাও একটি পরিত্যক্ত স্টেশনে সে সম্পূর্ণ একা! বাইরে গা হিম করা শীতল বাতাস বইছিলো। বাতাসে অস্বস্তিকর ছাতাপড়া একটা গন্ধ। দূরে, খুব দূরে কোথাও থেকে একটা শিয়াল ডেকে উঠলো। আকিবের মনে হলো, সে যেন বাস্তবের ক্যানভাস ছিঁড়ে কোনো এক টাইম-লুপ এর ফাঁদে পড়েছে! আকিব কাঁধে ব্যাগ নিয়ে একবার প্ল্যাটফর্মের এপাশ থেকে ওপাশ হেঁটে গেল। রেললাইনের কিছু জায়গায় ঘাস আর আগাছা এতটাই বেড়েছে যে লাইনগুলো প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। স্টেশনের প্রধান ভবনটা পুরনো ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্য। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েই আবছা অন্ধকারে সে দেখতে পেলো নিঃসঙ্গ ভবনটা, জানালার ভেঙে ঝুলে থাকা কপাট। পরিত্যক্ত! স্টেশনটা পরিত্যক্ত! কিন্তু যদি পরিত্যক্তই হয়, তবে ট্রেন এখানে থামলো কেন? কেনই বা সে এখানে নামলো? তার মনে পড়ে গেল, ট্রেন থেমে যেতেই তার ঘুম ভেঙে যায়। আর ঘোরের মধ্যেই সে নেমে পড়ে, ভেবেছিল সে যশোরে পৌঁছে গেছে। কিন্তু সে ভেবে পেলো না এরকম একটা গাধার মতো কাজ সে কি করে করলো! এই নির্জন প্ল্যাটফর্মে ঘড়িটার টিক টিক শব্দ যেনো কানে হাতুড়ির বাড়ির মতো আঘাত করছিলো। এক গা ছমছমে অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিলো আকিব।
হটাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে আসা হালকা আলো দেখতে পেলো আকিব। মৃদু কম্পন টের পাওয়া যাচ্ছে। আরেকটা ট্রেন আসছে! আকিবের বুকে এবার একটু আশার সঞ্চার হলো। যাক, তাহলে সে আর একা নয়। এই রাতটা তাকে এই ভৌতিক স্টেশনে কাটাতে হবে না। সে প্ল্যাটফর্মের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালো আর তাকিয়ে থাকলো অন্ধকারের দিকে ...
দুই.
ট্রেনটা ধীরে ধীরে আকিবের দৃষ্টিগোচর হলো। ট্রেনের হেডলাইটটা অদ্ভুতরকম ঘোলাটে, পুরানো দিনের ট্রেনের মতো। ইঞ্জিনের শব্দটা ভারী, ক্লান্ত। ট্রেনটা যখন আরও কাছে এলো, গা ছমছমে অনুভূতিটা যেনো জেঁকে বসলো। হটাৎ মনে হলো অশুভ কিছু একটা এগিয়ে আসছে। ট্রেনটা যেন সময়ের ওপার থেকে ভেসে এসেছে। এর রং ফিকে হয়ে গেছে, যেন বহু বছর ধরে রোদে-বৃষ্টিতে পুড়ে তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে। ভাঙাচোরা বগিগুলো পুরোনো মডেলের, জানালার কাঁচগুলো ঘোলাটে, আবার কোনোটা ভাঙা। যেনো একটা ভূতুড়ে ট্রেন!
ট্রেনটা ধীরগতিতে শিরিষপুর জংশনের প্ল্যাটফর্মে এসে থামলো। হুইসেল বাজলো না, ব্রেক কষার তীব্র শব্দও হলো না। আকিব অবাক হয়ে দেখলো, এই শীতের মধ্যেও ট্রেনের দরজা আর জানালা খোলা! যাত্রী শূন্য কামরাগুলোর অন্ধকারে পাক খেয়ে ঘুরছে সাদাটে ঘন কুয়াশা। আবারও নিস্তব্ধতা গ্রাস করলো স্টেশনটাকে।
আকিব ভয়ে কাঠ হয়ে গেল। তাহলে এই স্টেশনে কি কেবল এমন ভূতুড়ে ট্রেনই চলাচল করে! তার কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে গেল এই দৃশ্য। সে বিশ্বাস করতে পারছিলো না, তার চোখ যা দেখছে। সে নিজের হাতে জোরে চিমটি কাটলো, নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে সে স্বপ্ন দেখছে না। না, এটা স্বপ্ন নয়, হাড় হিম করা বাস্তব!
অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসতেই আকিবের চোখ গেলো কামরার এক কোণে, সে একটি ছেলেকে বসে থাকতে দেখলো। ছেলেটি চুপচাপ আকিবের দিকেই তাকিয়ে আছে, নিষ্প্রাণ সে দৃষ্টি। তার পরনে পুরনো দিনের পোশাক। ছেলেটি দেখতে ভীষণ রোগা। তার গাল দুটো ভেঙে গেছে, চেহারাটা মলিন, যেন জীবনের সব আনন্দ-উৎসব তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
আকিবের মনে হলো, সে যেন এই ছেলেটিকে চেনে, বহু যুগ ধরে সে যেন এই মুখটা দেখে আসছে। ছেলেটি ধীরে ধীরে তার হাত তুলল। শীর্ণ আঙুলগুলো দিয়ে সে আকিবকে কামরার ভেতরে ডাকছে, ইশারায়। আকিবের পা দুটো পাথরের মতো হয়ে গেছে, সে নড়তে পারছেনা। তার মস্তিষ্ক কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা। এই ছেলেটি কে? সে কেন তাকে ডাকছে?
কোথায় জানি তীব্র স্বরে একটা পেঁচা ডেকে উঠলো। আকিব চমকে উঠলো। আবারও এক ভয়ের তীব্র স্রোত তার মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেলো। যখন সে দেখলো বসে থাকা ছেলেটা আর কেউ নয়, সে নিজেই! একই মুখ, একই চোখ, একই শারীরিক গঠন। শুধু বসে থাকা ছেলেটির প্রাণ নেই। সেই চোখে কেবল এক অনন্ত শূন্যতা আর অব্যক্ত কষ্ট।
আকিবের নিঃশ্বাস আটকে গেল। সে কি কোনো দুঃস্বপ্নে আটকে পড়েছে? নাকি সে তার নিজেরই কোনো প্রতিবিম্বের মুখোমুখি হয়েছে, যা শুধু এই ভৌতিক স্টেশনই দেখাতে পারে?
প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়ে আকিবের মন দ্রুত চিন্তা করতে শুরু করল। যদি সে ভেতরে বসে থাকে, তাহলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আকিব কে? আর যদি সে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে ভেতরে বসে থাকা আকিব-ই বা কে? এটা কেমন ধরনের ধাঁধা?
আকিবের মন তাকে ট্রেনের দিকে না নিয়ে স্টেশনের অপর পাশে, পুরনো স্টেশন ভবনটার দিকে ঠেলে দিল। হয়তো সেখানেই সে কোনো উত্তর খুঁজে পাবে। সে কোনো মতে ভবনটির দিকে এগিয়ে চলল। তার পেছনে, ট্রেনের খোলা দরজার ওপাশ থেকে সেই বসে থাকা আকিবের নিষ্প্রাণ চাহনি যেনো অনুসরণ করছিল তাকে।
স্টেশন ভবনের প্রবেশ করার রাস্তায় থাকা ভাঙা কাঠের দরজাটা ঠেলতেই সেটা একটা কর্কশ শব্দ করে খুলে গেল। ভেতরে জমাট অন্ধকারের মাঝে আকিব তার ফোনের শেষ আলোটুকু জ্বালিয়ে ধরল। ফোনের আলোতে দেখা গেল এক সময়ের জমজমাট টিকিট কাউন্টার, এখন ধুলোর পুরু আস্তরণে ঢাকা। ভাঙা টেবিল, ছেঁড়া কাগজপত্র, আর পুরনো দিনের দেয়াল লিখন। আকিব প্রতিটি কক্ষ মনোযোগ দিয়ে দেখলো। ওয়েটিং রুম, স্টেশন মাস্টারের কক্ষ, গুদামঘর... সব জায়গায় পরিত্যক্ততার চিহ্ন। মাটির স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, বাদুড়ের বিষ্ঠা, আর ইঁদুরের আনাগোনা। আকিবের মনে হলো, সে যেন বহু বছর আগের এক সময়কালের মধ্যে হেঁটে চলেছে।
স্টেশন মাস্টারের কক্ষে ঢুকে আকিব একটি পুরনো আলমারি দেখতে পেল। আলমারির পাল্লাটা ভাঙা। ভেতরে কিছু ধুলো পড়া ফাইল, পুরনো খাতা আর কিছু ভাঙাচোরা জিনিসপত্র পড়ে আছে। আকিব সাবধানে ফাইলগুলো ঘাঁটতে লাগল। হাতে যা এলো, তা দেখে তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।
একটি পুরনো বাংলা খবরের কাগজের ছেঁড়া অংশ। তারিখটা অস্পষ্ট হলেও সালটা স্পষ্ট ১৯৪৬। দেশভাগের ঠিক এক বছর আগের ঘটনা। শিরোনামটা অস্পষ্ট, তবে কয়েকটি শব্দ আকিবের চোখ টেনে ধরল: " কপোতোক্ষ নদীর বুকে ট্রেনের সলিল সমাধি", "শত শত প্রাণহানি", "শিরিষপুর জংশনে বিভীষিকাময় রাত"।
জানা গেল, শিরিষপুর জংশন একসময় একটি ব্যস্ত স্টেশন ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে, এটি কলকাতা রেলওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল ছিল। এখানে মূলত পাট, চা, শাকসবজি এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য যশোর থেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হতো। পাশাপাশি, যাত্রী পরিবহনেরও এটি এক অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। বিশেষ করে, অবিভক্ত বাংলার যাত্রীরা এই লাইনে ঢাকা-খুলনা বা কলকাতা রুটে যাতায়াত করত। এখানকার স্টেশন ভবনটি ১৯০০ সালের প্রথম দশকে নির্মিত হয়েছিল, যা এখনও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
১৯৪৬ সালের সেই ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল দেশভাগের আগেই। তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তীব্র আকারে ধারণ করছিল, বহু মানুষ দেশান্তরী হওয়ার জন্য ট্রেনে চেপে বসছিল। সেই রাতে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন কলকাতা থেকে যশোরের দিকে যাচ্ছিল, যেটি শিরিষপুর জংশন হয়ে কপোতোক্ষ নদীর উপরে নির্মিত পুরনো লোহার সেতুটি পার হচ্ছিল। ট্রেনটি ছিল অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, ছাদের ওপরেও মানুষ গাদাগাদি করে বসেছিল। রাত তখন গভীর, চারপাশে ঘন কুয়াশা, সঙ্গে প্রবল ঝড়ো হাওয়া বইছিল।
লগবুক অনুযায়ী, স্টেশনটি মূলত কপোতোক্ষ নদীর তীর ঘেষে অবস্থিত। সেদিন রাতে ট্রেনের গতি বেশি থাকায় খুব দ্রুত ট্রেনটি সীমা অতিক্রম করে সেতুতে উঠে যায়। নদীর ওপর দিয়ে যেতে যেতে সেতুর মাঝামাঝি পৌঁছাতেই একটি বিকট শব্দ করে ট্রেনটির কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়। পুরনো জীর্ণ সেতুটি ভেঙে গিয়ে ট্রেনের বেশিরভাগ বগিই কপোতোক্ষ নদীর গভীর পানিতে তলিয়ে যায়। ট্র্যাজেডির কারণ হিসেবে বলা হয়, সেতুর লোহার কাঠামোগত দুর্বলতার জন্যই এই দূর্ঘটনা। ট্রেনে থাকা শত শত যাত্রীরা মুহূর্তেই সলিল সমাধি লাভ করে। এদের অনেকের দেহই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি, নদীতে ভেসে গেছে। শিরিষপুর জংশন পরিণত হয় একটি গণকবরে। স্থানীয় গ্রামবাসী ও রেলকর্মীরা দ্রুত ছুটে এলেও এত মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়নি। সেই রাত ছিল শিরিষপুর জংশনের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই স্টেশনটি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, মানুষ এই পথে যেতে চাইতো না, তারা স্টেশনটিকে অভিশপ্ত মনে করতো। আকিবের হাত থেকে কাগজ গুলো খসে পড়ল। তার রক্ত হিম হয়ে গেল। তার মনে পড়ল সেই বসে থাকা ছেলেটির কথা, তার পরনের পুরনো পোশাকের কথা, তার শূন্য দৃষ্টির কথা। তারা কি সেই ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া যাত্রীদের কেউ? কিন্তু যদি তাই হয়, তবে কেন সেই ছেলেটির চেহারা অবিকল আকিবের চেহারার মতো দেখতে?
আকিবের মন এক গভীর অতৃপ্তির গল্প শুনতে পাচ্ছিল। এই স্টেশনের আনাচে-কানাচে যেন এখনো সেই পুরনো দিনের বাতাস বয়ে চলেছে, যেখানে কান পাতলে শোনা যায় যাত্রীদের আর্তনাদ, শিশুদের কান্না, আর স্বজন হারানোর শোক। সে যেন দেখতে পাচ্ছে, অন্ধকার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন বহু অতৃপ্ত আত্মা, যারা আজও তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছেন! যেন এই স্টেশন আর এই পরিত্যক্ত ট্রেনের মধ্যে এক অনন্ত যাত্রার প্রতীক্ষায় তাঁরা আটকে রয়েছেন!
আকিবের মনে হলো, সে আর একা নেই। স্টেশন ভবনের প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি কোণ থেকে যেন অজস্র চোখ তাকে দেখছে। মৃদু গুঞ্জন, ফিসফিসানি, শুকনো পাতার মর্মরধ্বনির মতো শব্দ শুনতে পেল সে। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে সে কাউকেই দেখতে পেল না।
"যাও আকিব... ভেতরে যাও..." "তোমার যাত্রা কিন্তু এখনই শেষ হয়নি.." "আমাদের সাথে এসো..."
এগুলো কি তার মনের ভ্রম? নাকি সত্যিই অতৃপ্ত আত্মারা তাকে কিছু বলতে চাইছে? আকিবের শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, এখানকার বাতাস, এখানকার মাটি, সব কিছুতেই যেন সেই রাতের ট্র্যাজেডির শোক আর হাহাকার মিশে আছে। আর এই ট্রেনটা, এই ভূতুড়ে ট্রেনটা, সেই অভিশপ্ত ট্র্যাজেডিরই প্রতিচ্ছবি।
সে দ্রুত স্টেশন মাস্টারের কক্ষ থেকে বেরিয়ে প্ল্যাটফর্মে ফিরে এল। সেই ট্রেনটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে আকিবের জন্যই অপেক্ষা করছে। আর তার ভেতরে বসে থাকা সেই ছেলেটি তার হাতছানি আরও স্পষ্ট, আরও জোরালো মনে হচ্ছে। সেই চোখের শূন্যতা যেন তাকে প্রশ্ন করছে, "কেন তুমি এখনও বাইরে দাঁড়িয়ে আছো? তুমি তো আমাদেরই একজন, চলে এসো।"
আকিবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করলো। এই বসে থাকা আকিব কি তার নিজেরই কোনো পূর্বপুরুষ, যিনি সেই অভিশপ্ত ট্রেনে প্রাণ হারিয়েছিলেন? নাকি সে তার ভেতরের সত্তা, যা এই পৃথিবীতে আজও মুক্তি খুঁজে ফেরে? নাকি, আরও ভয়াবহ কিছু, সে নিজেই সেই ট্রেনের একজন যাত্রী ছিল, যারা আজও পথ খুঁজে ফিরছে?
বসে থাকা আকিবের দৃষ্টিতে এবার আকুতি। সে হাতছানি না দিয়ে এবার কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তার চোখ যেন বলছে, 'এসো, তোমার জায়গা এখানে। আমাদের সাথে তোমার যাত্রা সম্পূর্ণ করো।'
আকিবের ঘোর লাগছিল। সে যেন দুটো বাস্তবতার মধ্যে আটকে গেছে তার জীবিত সচেতনতা, আর শিরিষপুর জংশনের অতৃপ্ত আত্মাদের জগৎ। ঘড়িটার টিক টিক শব্দ এবার যেন তার হৃদপিণ্ড থেকে সরাসরি কানে এসে বাজছে। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কিসের সময়? ট্রেনের আবার চলে যাওয়ার সময়? নাকি তার নিজের অস্তিত্বের?
তিন.
এইসব ভাবতে ভাবেতেই হঠাৎ করে স্টেশনের এক কোণ থেকে একটি মেয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। আকিব চমকে উঠল। সেদিকে তাকিয়ে দেখল, আবছা অন্ধকারে একজন মেয়ে বসে আছেন, তার পরনে সাদা শাড়ি, চুলগুলো পরিপাটি করে বাঁধা। তিনি এতক্ষণ সেখানে ছিলেন, কিন্তু আকিব তাকে দেখতে পায়নি।
"আকিব, তুমি কি জানো, যে তোমাকে ডাকছে সে তোমার অতীত আর তুমি তার ভবিষ্যৎ!”
মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আমি সায়রিন। এই স্টেশনের সিগন্যালম্যানের মেয়ে।। আমিও এই স্টেশনের সাথে বন্দী।"
আকিবের কপালে আবারো বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারল, এই খেলাটা তার জীবন নিয়ে। সায়রিন বললেন, "তুমি ভেবো না এখানে শুধু তুমি একা। শত শত আত্মারা এখানে আটকে আছে। কিন্তু তোমার মতো সাহস করে এর আগে কেউ কখনো এখানে আসেনি। তোমার প্রতিচ্ছবি তোমাকে ডাকছে, কারণ সে জানে তোমার অস্তিত্বের আলোই তাকে মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু এর জন্য তোমাকে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।"
আকিব জিজ্ঞেস করল, "কি ত্যাগ করতে হবে?"
সায়রিন বললেন, "তোমাকে এই স্টেশন থেকে জীবিত অবস্থায় মুক্তি পেতে হলে, তোমার সেই সত্তাকে জানান দিতে হবে, যে সে একা নয়। তার শূন্যতা পূরণ করতে হবে তোমার জীবনের কোনো একটি অংশ দিয়ে।"
আকিবের মনে এক তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হলো। একদিক তাকে কেউ ট্রেনের ভেতর থেকে ডাকছে, যে কিনা তার নিজেরই প্রতিচ্ছবি! অন্যদিক কেউ একজন তাকে পালাতে বলছে, নিজেকে রক্ষা করতে বলছে। ঘড়িটার টিক টিক শব্দ ক্রমশ দ্রুত হতে লাগল, যেন একটি টাইমার চলছে।
ট্রেন থেকে হঠাৎ একটি পুরনো দিনের বাদ্যযন্ত্রের অস্পষ্ট সুর ভেসে এলো, যেন কেউ সেতার বা স্যাক্সোফোন বাজাচ্ছে, কিন্তু যন্ত্রটা বহু পুরনো মনে হচ্ছে, সেটির সুর ভাঙা ভাঙা, করুণ একটি সুর। এ যেন বিদায়ী সুর, যা আত্মাদের চিরতরে এই পৃথিবীতেও বেঁধে রাখে।
আকিব দেখল, প্ল্যাটফর্মে আবছা ছায়ার মতো কিছু অবয়ব এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা রেলওয়ে কর্মীর পোশাক পরিহিত, কিছু সাধারণ যাত্রী, কিছু শিশু। তাদের দেখতে অস্পষ্ট লাগছে, তাদের আকৃতি বাতাসের ঝাপটার সাথে সাথে দুলে উঠছে। কিন্তু বসে থাকা আকিব? সে এখনো শুধু আকিবের দিকেই তাকিয়ে আছে।
আকিব এবার সরাসরি ট্রেনের দিকে এগিয়ে গেল। এবার আর ভয় নয়। তার মনে হয়েছে, তাকে এই রহস্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। সে ট্রেনের দরজার সামনে এলো। ভেতরে বসে থাকা আকিবের দিকে তাকাল। তার মুখটা এবার আরও স্পষ্ট। সেই শূন্যতা, সেই ক্লেশ, সেই অনন্ত প্রতীক্ষা।
"কে তুমি?" আকিবের গলা কেঁপে উঠলো, "কেন তুমি আমাকে ডাকছো?"
ভেতরে বসে থাকা ছেলেটা কোনো উত্তর দিল না। কেবল তার ঠোঁটের কোণে এক ম্লান হাসি দেখা দিল, যা তার শূন্য চোখগুলোকে আরও ভয়াবহ করে তুলল।
হঠাৎ করেই আকিব উপলব্ধি করতে পারলো বসে থাকা আকিব ত তারই সেই সত্তা, যা হয়তো সেই অভিশপ্ত রাতে এই ট্রেন দুর্ঘটনায় হারিয়ে গিয়েছিল। এই পৃথিবীতে সেই আকিবের কোনো দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়নি, তার কবর হয়নি। তার আত্মা মুক্তি পায়নি, সে এই শিরিষপুর জংশনের সাথে চিরতরে বাঁধা পড়ে আছে। আর এই দাঁড়িয়ে থাকা আকিব, এটি তার সেই সত্তা, যা বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছে। বসে থাকা আকিব তাকে ডাকছে, কারণ সে চায় এই দুই সত্তা এক হোক, হয়তো তাতে তার আত্মা মুক্তি পাবে, অথবা দাঁড়িয়ে থাকা আকিবও তার মতো চিরতরে এই অভিশপ্ত যাত্রায় যোগ দেবে।
এই ভাবনাটা আকিবের মেরুদণ্ড বেয়ে এক হিমশীতল আতঙ্ক ছড়িয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, এই খেলাটা তার জীবন নিয়ে।
আকিবের ভেতরে এক তীব্র প্রতিরোধ জেগে উঠল। সে এই অনন্ত যাত্রার অংশ হতে চায় না। সে মুক্তি চায়, জীবন চায়।
সায়রিনের চোখে হটাৎ পবিত্র আলো জ্বলে উঠল। তিনি আকিবকে একপাশে সরে দাঁড়াতে ইশারা করলেন। ঠিক তখনই, দূরে, আবার একটি নতুন ট্রেনের শব্দ শোনা গেল। এবার শব্দটা অনেক পরিচিত মনে হচ্ছে। ইঞ্জিনের শক্তিশালী হুইসেল, ধাতব ঘর্ষণ শব্দ।
বসে থাকা আকিবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। তার চোখে এক হতাশার ছায়া নেমে এল। সে যেন বুঝতে পারল যে তার সময় শেষ।
ঘড়িটার টিক টিক শব্দ থেমে গেল।
ভূতুরে ট্রেনটা হঠাৎ করে এক অদ্ভুত শব্দ করে নড়তে শুরু করল। তার দরজাগুলো একে একে সব বন্ধ হয়ে গেল। ভেতরে বসে থাকা আকিবের অবয়ব ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে তার শূন্য চোখে শেষবারের মতো আকিবের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টি যেন বলছে, "তুমি পালাতে পারবে না। একদিন তোমাকেও ফিরতে হবে এই যাত্রায়।"
ধীরে ধীরে, অদ্ভুত নীরবতায়, ট্রেনটা শিরিষপুর জংশন ছেড়ে চলে গেল, যেমনটা এসেছিল। আবছা হেডলাইটটা মিলিয়ে গেল অন্ধকারের গভীরে।
ট্রেনটা চলে যাওয়ার সাথে সাথে শিরিষপুর জংশন আবার গভীর নীরবতায় ডুবে গেল। সেই ফিসফিসানি, সেই ছায়াগুলো, সবকিছু যেন হটাৎ করে উধাও হয়ে গেল। কেবল সেই পুরনো ভাঙা ঘড়িটা নীরবে দাঁড়িয়ে রইল, টিক টিক শব্দ থেমে গেছে, কিন্তু তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে এক অনন্তকালের প্রতীক্ষার।
আকিবের পা দুটো কাঁপছিল, কিন্তু তার শরীরটা যেন সম্পূর্ণ শক্তি ফিরে পেয়েছে। সে জানে, সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিল। সে বেঁচে আছে। সে পঁচা মাটির গন্ধ, শ্যাওলার গন্ধ, আর সেই অজানা গা ছমছমে গন্ধের পরিবর্তে, এবার এক নতুন গন্ধ পাচ্ছে, ভোরের হাওয়ার গন্ধ।
দূরে, পূর্বাকাশে ভোরের প্রথম আলো উঁকি দিতে শুরু করেছে। হালকা কমলা আভা রাতের অন্ধকারকে গ্রাস করছে। আর ঠিক তখনই, সেই ট্রেনটা, যেটা আসার শব্দ আকিব শুনেছিল, সেটা প্ল্যাটফর্মে এসে থামল, হুইসেল বাজিয়ে, ব্রেক কষার শব্দ করে। ট্রেনের ভেতর থেকে মানুষের কথাবার্তা, কুলিদের হাঁকাহাঁকি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
আকিব অস্ফুটে একজন রেলকর্মীকে বলে উঠল, "এটা কি যশোর জংশন?"
"জ্বী ভাই, এটা যশোর জংশন।"
আকিব অবাক হয়ে চারপাশে তাকালো। স্টেশনের নামফলকটা এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে 'যশোর জংশন'। তার মানে, সে কি এতক্ষণ ভুল দেখছিল? এই পুরো ঘটনাটাই কি একটা বিভ্রম ছিল?
সে রেলকর্মীর দিকে তাকিয়ে বলল, "আমি একটু আগে শিরিষপুর জংশনে নেমেছিলাম!"
রেলকর্মী হেসে বলল, "শিরিষপুর জংশন? ওটা তো অনেক বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে, ভাই। ওদিকে এখন কোনো ট্রেন থামে না। মাঝে মাঝে মালবাহী ট্রেন যায় শুধু। আর শুনেছি ওটা নাকি এখন ভূতের আস্তানা…।"
আকিব আর কথা বলতে পারল না। মোবাইলটা চালু হয়েছে, চার্জে ছিল। সময় দেখাচ্ছে ভোর ৫.৩০।
আকিবের মন তাকে বলছে, সে আসলে শিরিষপুর জংশনেই নেমেছিল। সে নিজের চোখে তার সেই সত্তাকে দেখেছিল, যে আজও মুক্ত হতে পারেনি। এই যশোর জংশন, এই আলো, এই মানুষজন, এই সবকিছু তার কাছে যেন এক নতুন জীবন মনে হচ্ছে!
ট্রেনটা যশোর জংশন ছেড়ে ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করল। আকিব ট্রেনের জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল। সূর্যের আলোয় চারপাশের গ্রাম, ক্ষেত-খামারিগুলো আলোকিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু আকিবের মনে তখনও সেই অন্ধকার রাতের স্মৃতি, সেই ভাঙা ঘড়ির টিক… টিক… শব্দ, সেই ভূতুড়ে ট্রেনের নীরব আগমন, আর সবচেয়ে বেশি, সেই বসে থাকা আকিবের ফ্যালফ্যাল চাহনি ভেসে উঠছে।
সেই রাতে সে কেবল একটি স্টেশনেই নামেনি, সে নেমেছিল তার নিজেরই এক অজানা অতীতে, এক অভিশপ্ত ইতিহাসের মাঝে। বসে থাকা আকিব ছিল সেই সব হারিয়ে যাওয়া আত্মার প্রতিচ্ছবি, যারা আজও মুক্তি খুঁজে ফিরছে। আর দাঁড়িয়ে থাকা আকিব ছিল তার জীবিত সত্তা, যে সুযোগ পেয়েছিল সেই অতলের হাতছানি থেকে নিজেকে মুক্ত করার।
কিন্তু মুক্তি কি সে সত্যিই পেয়েছে? নাকি সেই শিরিষপুর জংশনের অভিশাপ তার জীবনের সাথে মিশে গেছে? তার মনে পড়ল বসে থাকা আকিবের শেষ হাসিটা, আর তার চোখের সেই শূন্যতা। সে হাসি যেন বলছিল, "আজ নয়তো কাল, তোমাকেও ফিরে আসতে হবে।"
আকিব জানালার বাইরে প্রসারিত দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে প্রশ্ন, শিরিষপুর জংশন কি সত্যিই পেছনে ফেলে এসেছে, নাকি তার আত্মার একটি অংশ আজও সেই ভাঙা ঘড়ি আর ভূতুড়ে ট্রেনের মাঝে আটকা পড়ে আছে, অনন্তকাল ধরে অপেক্ষা করছে, কখন তার অন্য সত্তা ফিরে আসবে, তার অসম্পূর্ণ যাত্রা সম্পূর্ণ করার জন্য?
বি:দ্র: গল্পের সাথে বাস্তবের কিছুই মিল নেই। সম্পূর্ণ কাল্পনিক।