সম্প্রতি এক জামায়াত সমর্থক 'মহাজ্ঞানী'র সঙ্গে চা পান করতে করতে ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনীতি নিয়ে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হলো। সেই গল্পটাই শেয়ার করছি-
আমি: আপনি কি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিশ্বাস করেন?
তিনি: না, এটা তো ভারতের ষড়যন্ত্র!
আমি: তাহলে আপনার পরিচয় কী? আপনি কি বাঙালি, নাকি বাংলাদেশি, নাকি নিজেকে পাকিস্তানি ভাবেন?
তিনি: আমি মুসলমান!
আমি: ধর্মে আপনি অবশ্যই মুসলমান, কিন্তু আপনার নৃগোষ্ঠী বা জাতি তো 'বাঙালি' এবং জাতীয়তা 'বাংলাদেশি'।
তিনি: (বিরক্ত হয়ে) এই শেখ মুজিবুরের কারণেই তো এত সুন্দর মুসলমানদের দেশটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল!
আমি: শেখ মুজিবের কারণে দেশ ভাঙলে আপনারা আবার জিয়াউর রহমানকে ‘মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক’ দাবি করেন কেন?
তিনি: জিয়া তো রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা দিছিলেন!
আমি: তাহলে তো আপনার যুক্তি অনুযায়ী দেশ ভাঙার দায় জিয়ার ওপর পড়ে, শেখ মুজিবের নয়! কিন্তু তিনি এটা স্বীকার করতে নারাজ।
এখানে তিনি প্রথমবার চুপ হয়ে গেলেন। কোনো উত্তর না পেয়ে কথা ঘুরিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন।
তিনি: এই যে এখন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এত মাতামাতি হচ্ছে- রবীন্দ্রনাথ তো বাংলাদেশের জন্মই চায়নি!
আমি: রবীন্দ্রনাথ কবে মারা গেছেন জানেন?
তিনি: না, জানি না।
আমি: রবীন্দ্রনাথ মারা গেছেন ১৯৪১ সালে। তাঁর মৃত্যুর ৬ বছর পর ভারত-পাকিস্তান ভাগ হয়, আর ৩০ বছর পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। যিনি ১৯৪৭ বা ১৯৭১ সালটাই দেখে যাননি, তিনি বাংলাদেশের জন্ম কীভাবে আটকাবেন?
তিনি: (পুনরায় চুপ থেকে) রবীন্দ্রনাথ তো ব্রিটিশদের দালাল ছিল!
আমি: 'আমার সোনার বাংলা', 'তোমার তরে ঠেকাই মাথা'-র মতো ৩০টিরও বেশি ব্রিটিশবিরোধী গান, কবিতা ও প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশদের দেওয়া 'নাইটহুড' উপাধিও বর্জন করেছিলেন। তাহলে তিনি ব্রিটিশদের দালাল হলেন কীভাবে?
এবারও কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। আবার কথা পাল্টালেন।
তিনি: তুমি জানো না, রবীন্দ্রনাথ নজরুলের কবিতা চুরি করে নোবেল পাইছে!
আমি: রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পান ১৯১৩ সালে। তখন কাজী নজরুলের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বা ১৪ বছর! একজন কিশোরের কবিতা চুরি করে বিশ্বমঞ্চে নোবেল পাওয়া সম্ভব?
তিনি: তুমি তো আসল ঘটনা জানোই না! নজরুলের স্ত্রী ছিল রবীন্দ্রনাথের ভাইয়ের মেয়ে (ভাতিজি)। সেই ভাতিজি নজরুলের কবিতা চুরি করে তার কাকা রবীন্দ্রনাথকে দিত, আর কাকা নিজের নামে চালাতেন!
আমি: কবি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী প্রমীলা দেবীর বাড়ি কুমিল্লায়। আর রবীন্দ্রনাথের আদি পৈত্রিক ভিটা খুলনায়, আর বড় হয়েছেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। তাহলে প্রমীলা দেবী কীভাবে রবীন্দ্রনাথের ভাইয়ের মেয়ে হলেন? আর নজরুলের সাথে প্রমীলা দেবীর বিয়ে হয় ১৯২৪ সালে-অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়ার ১১ বছর পর!
সব তথ্যের সামনে পরাস্ত হয়ে তিনি এবার তাঁর মূল ক্ষোভ ও বিদ্বেষের আসল কারণটি প্রকাশ করে ফেললেন-
তিনি: তুমি জানো রবীন্দ্রনাথ একজন হিন্দু? সে মুসলমানদের নিয়ে কোনো লেখাই লেখেনি।
আমি: প্রথাগত সনাতন হিন্দু ধর্ম আর রবীন্দ্রনাথের ধর্ম এক নয়। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন 'ব্রাহ্ম' ধর্মের অনুসারী, আর ব্রাহ্ম সমাজ নিরাকার একত্ববাদে বিশ্বাসী। আর 'মুসলমানদের নিয়ে লেখেননি' কথাটাও সম্পূর্ণ মিথ্যা! মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রশংসা ও বন্দনা করে ১৯৩৪ সালে ফতেহাদোয়াজদহম (মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাত দিবস) উপলক্ষে পয়গম্বর দিবসের বাণী প্রেরণ করেন এই শিরোনামে- "বিশ্বের মহত্তমদের একজন ও পবিত্র পয়গম্বর"। এ ছাড়া মুসলিম সমাজ ও ঐতিহ্য নিয়ে তিনি একাধিক প্রবন্ধ ও সাহিত্য রচনা করেছেন।
কথাটা শেষ করে তাকে আরও একটি ঐতিহাসিক উদাহরণ দিলাম-
আমি: দেখুন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম অসংখ্য 'শ্যামাসংগীত' ও হিন্দু ভজন রচনা করেছেন। আজ পর্যন্ত ভারতের কোণায় কোণায় হিন্দু সম্প্রদায় নজরুলের রচিত ভজন ও গান গেয়েই তাদের জন্মাষ্টমী, ঝুলন যাত্রা, রাস উৎসব, শারদীয়া দুর্গোৎসব, কালীপূজা, রথযাত্রা, রামনবমী ধর্মীয় উৎসবে দেব-দেবীর পূজা শুরু করে।
কিন্তু তারা তো কখনো বলেনি- 'এটা তো একজন মুসলমানের লেখা, আমরা এই ভজন গেয়ে পূজা করব না!' সাহিত্য ও শিল্পের সৌন্দর্যকে তারা সম্মান করতে পেরেছে, যা আপনারা পারেন না। কেন?
এবার আর কোনো যুক্তি বা ভিত্তিহীন গল্প বানানোর মতো অবস্থা ছিল না। চরম পরাস্ত হয়ে তিনি তার শেষ অমোঘ অস্ত্রটি ছাড়লেন-
তিনি: "তুমি আসলে ভারতের দালাল!"
আমাদের সমাজের একাংশের চরম সত্য এটাই। তথ্য, প্রমাণ ও নির্ভেজাল ইতিহাস দিয়ে যখনই এদের প্রোপাগান্ডার উপযুক্ত জবাব দেবেন- তখনই তাদের কাছে আপনি হয়ে যাবেন 'ভারতের দালাল' কিংবা 'নাস্তিক'।
তারা নিজে যে মনগড়া গল্পগুলো ছড়ায়, তার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই; অথচ তাদের অলীক রূপকথাই নাকি চরম সত্য! এরা নিজের ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতে শেখায়। বিশ্বের আর কোনো দেশে নিজ মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে এভাবে ঘৃণা করতে দেখা যায় না, যা দেখা যায় আমাদের দেশের এই স্বাধীনতা বিরোধী ও উগ্রতাবাদী গোষ্ঠীর মধ্যে।
জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির মূল ভিত্তি এবং তাদের প্রচার করা ইতিহাস নিয়ে আজ সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর জন্ম ভারতের আওরঙ্গবাদে। ধর্মের দোহাই দিয়ে অখণ্ড ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনি সর্বপ্রথম 'জামায়াতে ইসলামী হিন্দ' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেশভাগের কড়া বিরোধিতা করেও যখন কোনো লাভ হয়নি, তখন ভারত ভাগের পর তিনি পাকিস্তানে গিয়ে বসতি গড়েন- এগুলো ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতে প্রমাণিত সত্য। আপনারা এগুলো জানেন, কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে মানতে চান না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতে জন্ম নেওয়া এবং পাকিস্তানে জীবন কাটানো একজন ব্যক্তির প্রতিষ্ঠিত দল স্বাধীন বাংলাদেশে কেন রাজনীতি করবে?
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে আপনারা যে সমস্ত নেতিবাচক কথা ছড়ান, সেগুলো মূলত আপনাদের মনগড়া মিথ্যাচার। তৎকালীন সময়ের লিখিত কোনো ঐতিহাসিক দলিল আপনারা এসবের পক্ষে দেখাতে পারেন না। আপনারা যা বলেন তা হয় কারো কাছ থেকে শোনা কথা, না হয় আপনাদের দলের প্রোপাগান্ডা মাস্টারদের লেখা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বইয়ের কথা। ঐতিহাসিক সত্য এটাই যে, আপনারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইতিহাস নিয়ে মিথ্যাচার করেন।
আপনাদের মূল উদ্দেশ্য হলো ধর্মের দোহাই দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও শেখ মুজিব সম্পর্কে নানা ধরনের মিথ্যাচার ছড়িয়ে বাংলাদেশকে হেয় করা। কারণ ১৯৭১ সালে আপনারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন। বাংলাদেশ যেহেতু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েই গেল, তাই নিজেদের সেই অপরাধ ও দোষ ঢাকতে যুগের পর যুগ ধরে আপনারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে চরম মিথ্যাচার করে যাচ্ছেন।
রবীন্দ্রনাথের লেখা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পাল্টানোর জন্য আপনারা যে তৎপরতা দেখান, তা মূলত বাঙালি সংস্কৃতিকে মুছে ফেলার ঐতিহাসিক এক গভীর ষড়যন্ত্র। আজ জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের কথা বলছেন, আর কিছুদিন পর আবার ধর্মের দোহাই দিয়ে বলবেন বাংলা ভাষা হিন্দুদের ভাষা! বাংলা ভাষায় যতিচিহ্ন তথা দাড়ি-কমার আধুনিক ব্যবহার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর চালু করেছিলেন বলেই এই ভাষাকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা করবেন? ধর্মের ভয় দেখিয়ে সহজসরল ধর্ম বিশ্বাসীদের গোমরাহ করে এভাবে চালাতে চালাতে আপনারা একদিন উর্দু বা আরবি ভাষাকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করার ফতোয়া দেবেন।
যদি জামায়াত কখনো ক্ষমতায় আসে, তবে তারা জাতীয় সংগীত পাল্টাবে এবং ভাষা সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানবে- এই আশঙ্কা একেবারেই অমূলক নয়। কিন্তু আপনাদের কাছে প্রশ্ন- বাংলা ভাষা কি আল্লাহর সৃষ্টি, নাকি মনে করেন হিন্দুদের ভগবানের সৃষ্টি? আপনারা যদি বিশ্বাস করেন বাংলা ভাষা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের সৃষ্ট বস্তু, তবে তো আপনারা আল্লাহর সর্বজনীন ক্ষমতার সাথেই শিরক করছেন। কারণ পৃথিবীর প্রতিটি ভাষা ও সংস্কৃতি স্রষ্টারই দান। ইতিহাস কখনো আবেগ বা প্রোপাগান্ডায় বদলায় না; ইতিহাস টিকে থাকে সত্য ও দলিলের ওপর।
মূলত আপনারা, ধর্মের দোহাই দিয়ে বাংলা ভাষা, বাঙালী সংস্কৃতির ও বাঙালী জাতি উৎখাত করার যুগযুগ ধরে যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তা কখনো সফল হবে না। কারন আপনারা স্বয়ং আল্লাহ প্রদত্ত ভাষা ও সংস্কৃতির বিলুপ্ত করতে চাইছেন। আপনাদেরকে কি আল্লাহ কোনো লাইসেন্স দিয়েছে?
সবশেষে জিজ্ঞেস করতে চাই- পৃথিবীর ২০৯টা দেশে মুসলমানের বসবাস। এই সব মুসলমানরা তাদের জন্মভূমির বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে ধর্ম পালন করে। যেমন- সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান দেশ মালদ্বীপের রাষ্ট্র ভাষা হচ্ছে -'ধিবেহী', বর্ণমালার নাম 'তানাহ'। এই ভাষার উৎপত্তি হচ্ছে ইন্দো-আর্য থেকে। অপর দিকে শ্রীলঙ্কাে ভাষা 'সিনহালা''র মধ্যে ব্যপক বিদেশী শব্দ তথা আরবি ও ফারসি শব্দ রযেছে তাই বলে শ্রীলঙ্কান বা মালদ্বীপ তাদের মাতৃভাষা বর্জন করেছে?
ধর্মের নামে মিথ্যাচার করা বাংলাদেশ একটি উর্বর ভূমিতে রুপান্তর হয়েছে। যারা ভাষা ও সংস্কৃতির বিরোধিতা করে তারা মূলত পরোক্ষভাবে স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে অস্বীকার করে। এইসব ফেতনাবাজদের হাত থেকে আল্লাস সবার ঈমান রক্ষা করুন, আমীন।