মানুষ মাত্রই ভুল করে। কখনো জেনে, কখনো না বুঝে, কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায় মানুষ পাপের পথে পা বাড়ায়। কেউ নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়, আবার কেউ পাপের ভারে এতটাই ভেঙে পড়ে যে মনে করে, তার আর ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু আল্লাহর বাণী আমাদের জানিয়ে দেয়, এমন হতাশা মুমিনের পথ হতে পারে না। মানুষ যত বড় ভুলই করুক, আল্লাহর কাছে ফিরে আসার পথ তার জন্য খোলা রয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সূরা আয-যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “বলুন, হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
আয়াতটির দিকে গভীরভাবে তাকালে আল্লাহর অসীম দয়া ও ক্ষমার পরিচয় পাওয়া যায়। লক্ষ করার বিষয়, আল্লাহ পাপী মানুষকেও ‘আমার বান্দাগণ’ বলে সম্বোধন করেছেন। অর্থাৎ পাপের কারণে মানুষ ভুল পথে চলে গেলেও তার জন্য ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।
আল্লাহর দয়া মায়ের ভালোবাসার চেয়েও মহান
আল্লাহর অসীম দয়া সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হৃদয়স্পর্শী হাদিস বর্ণনা করেছেন। হজরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে কিছু বন্দি মানুষকে আনা হলো। তাদের মধ্যে এক নারী নিজের শিশুকে খুঁজে পেয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে দুধ পান করাচ্ছিলেন। এ দৃশ্য দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি মনে করো, এই নারী তার সন্তানকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারবেন? সাহাবিরা বললেন, না, যতক্ষণ তাঁর পক্ষে সন্তানকে রক্ষা করা সম্ভব। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি এই নারীর নিজের সন্তানের প্রতি ভালোবাসার চেয়েও বেশি দয়ালু।”— সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৯৯।
একজন মা যেমন নিজের সন্তানকে আগলে রাখেন, আল্লাহর রহমত তাঁর বান্দাদের জন্য তার চেয়েও মহান। তাই পাপ করে কেউ অনুতপ্ত হলে তাঁর উচিত আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হয়ে তাঁর কাছে ফিরে আসা। নিজের ভুলের জন্য অনুশোচনা করা এবং সংশোধনের চেষ্টা করাই হতে পারে নতুন জীবনের সূচনা।
বান্দার তওবায় আল্লাহ আনন্দিত হন
আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস রয়েছে। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ নির্জন মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া উট ফিরে পেলে যতটা আনন্দিত হয়, আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন।” — সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭৪৭।
একটি হারানো উট ফিরে পাওয়া মরুভূমিতে বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য যেমন বিরাট আনন্দের বিষয়, আল্লাহর কাছে বান্দার আন্তরিক তওবাও তেমনি অত্যন্ত প্রিয়। এই হাদিস আমাদের শেখায়, পাপের পর অনুশোচনা নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা কখনো অর্থহীন নয়। মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু ভুল বুঝতে পেরে তওবা করে সৎপথে ফিরে আসার সুযোগ তার সামনে রয়েছে।
অতীতের ভুলই জীবনের শেষ পরিচয় নয়
হয়তো জীবনে এমন কিছু পাপ করেছেন, যা মনে পড়লে আজও বুকটা ভারী হয়ে আসে। হয়তো রাতের নীরবতায় নিজের ভুলগুলোর কথা মনে করে চোখের পানি ফেলেন। মনে হয়, এত পাপ করেছি, আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন? হ্যাঁ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। আপনার অতীত যতই অন্ধকার হোক, ফিরে আসার পথ এখনো খোলা। চোখের পানি নিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, নিজের ভুলগুলো শুধরে নিন, নতুন করে শুরু করুন। মনে রাখবেন, অতীত বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু আজ থেকে নিজেকে বদলে ফেলা সম্ভব। তাই পাপের বোঝা বুকে নিয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকবেন না। যে আল্লাহর অবাধ্যতা করেছেন, সেই আল্লাহর কাছেই ফিরে যান। তাঁর কাছে নিজের কষ্টের কথা বলুন, ক্ষমা চান, তাঁর রহমতের আশা রাখুন। আপনার পাপ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। অতীতের ভুলই আপনার শেষ পরিচয় নয়। আজই ফিরে আসুন আপনার রবের কাছে—হয়তো এই ফিরে আসাই হয়ে উঠবে আপনার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়।
লেখক- ইসলামী গবেষক