শফিকুর রহমান
করিম ভোররাতে ঘুম থেকে ওঠেন। চারদিকে শুনশান নীরবতা। তাঁর বউ, মেয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। আস্তে করে ওয়াশরুমে গিয়ে তিনি ওজু করলেন, যেন শব্দ কম হয়। এরপর ড্রয়িংরুমে গিয়ে জায়নামাজ পেতে বসলেন। তাঁর মন-প্রাণ সব নামাজমুখী। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার এক প্রবল আকুতি। আবার কেমন যেন গা ছমছম করা ভাব।
ডিম লাইটের মৃদু আলো। মাঝে মাঝে শব্দ হচ্ছে। হয়তো ইঁদুর কিছু ফেলে দিচ্ছে। বাসায় প্রচুর ইঁদুরের উপদ্রব। মনে হচ্ছে কোথাও পানি পড়ছে। বাথরুমের কল তো করিম বন্ধ করে এসেছেন। তাহলে পানির শব্দ কোথা থেকে আসে? আবার টিনের চালে মনে হয় কেঊ হাটছে।
গা ছমছম করা পরিবেশ। করিম নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়েন না। এর আগে যখন পড়েছেন, তখন এমন পরিবেশের দেখা পাননি। আজ কেমন যেন সবকিছু অন্য রকম লাগছে। করিম জাগতিক এসব চিন্তা ছুড়ে ফেলে দিলেন। যার আল্লাহ আছেন, তাঁর কিসের ভয়? ভয় তো আল্লাহকেই পেতে হবে। এমন ভেবে আল্লাহু আকবার বলে হাত বাঁধলেন। চোখ বন্ধ। শব্দ করে কোরআন পড়লেন। সূরা ফাতিহা পড়া শেষ। আমিন বললেন।
কিছুটা চমকে উঠলেন এবার। তাঁর সঙ্গে আরও অনেকের আমিন বলার শব্দ। দুই রাকাত করে মোট চার রাকাত নামাজের তিন রাকাত তখন। করিম চোখ খুললেন। মনে হলো, তাঁর পেছনে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সামনে অনেকগুলো লম্বা ছায়া পড়েছে। ছায়াগুলো বড়ই অদ্ভুত।
করিমের নাকে অনেক সুন্দর ঘ্রাণ এসে লাগল। এমন ঘ্রাণ করিম এর আগে পাননি। এ রকম ঘ্রাণের আতর, সেন্ট—কোনো কিছুই তাঁর বাসায় নেই। এত সুন্দর ঘ্রাণ! মুগ্ধতায় মন ভরে গেল।
ওই দিনের মতো নামাজ শেষ করে ঘুমিয়ে পড়লেন। কিন্তু লম্বা ছায়া, সুন্দর ঘ্রাণ, আমিন বলার শব্দ—এসব কিছু ভুলতে পারলেন না।
মসজিদের হুজুরের কাছে গেলেন। সব খুলে বললেন। হুজুর শুধু বললেন, ‘কখনো পেছন ফিরে তাকাবে না। যা কিছুই হোক। তোমার তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।’
করিম কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললেন, ‘জি না, হুজুর।’
এরপর থেকে করিম যেদিনই তাহাজ্জুদ পড়েন, সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। করিমের এখন সয়ে গেছে। এখন আর তিনি ভয় পান না। বউকে এই ঘটনা তিনি বলেন না।
কিন্তু এক রাতে ঘটল এক বিপত্তি। করিমের বউয়ের ঘুম ভেঙে যায়। পাশে স্বামীকে দেখতে না পেয়ে তিনি উঠে বসেন। চোখ মুছতে মুছতে বলে ওঠেন, ‘মেহজাবীনের আব্বু, তুমি কোথায় গেলে?’
কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি সামনে এগোন। ড্রয়িংরুমের মৃদু আলোয় চোখ পড়তেই আতকে উঠলেন তিনি। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন দেখলেন করিম তাঁর পাশে বসে আছেন।
‘তোমার সঙ্গে এরা কারা? কোথা থেকে এলো? এত লম্বা কেন?’
অনেক প্রশ্ন।
করিম বললেন, ‘একদম চুপ। ওনারা যারাই হোক, আমাদের ক্ষতি করবেন না। তুমি আর কখনো নামাজের সময় ওদিকে যাবে না। কাউকে কিছু বলবে না।’
এরপর সবকিছু স্বাভাবিক। করিম তাহাজ্জুদ পড়েন। ওনারাও পড়েন।
কিন্তু কিছুদিন পর এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। যখন করিম খুব অভাবে পড়েন, বাজার করার মতো টাকা থাকে না, তখন তাহাজ্জুদে বসে কান্নাকাটি করেন। তারপরের দিনই পকেটে হাত দিলে ঠিক ততটা টাকা পান, যতটা তাঁর দরকার। এক টাকা কমও না, বেশিও না।
এবার করিমের কেমন যেন লাগে। শুধু হুজুরকে জানান। হুজুর বললেন, ‘ভয়ের কিছু নেই। ওনারা তোমার ওপর খুশি।’
এরপর থেকে করিমের অভাবের দিনগুলোতে আর তেমন দুশ্চিন্তা হতো না। যখনই টাকার প্রয়োজন পড়ত, কোনো না কোনোভাবে ঠিক প্রয়োজনীয় টাকাটা পেয়ে যেতেন। তিনি মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন।
এক রাতে তাহাজ্জুদ পড়তে গিয়ে করিমের মনে হলো, আজ পেছনের মানুষগুলোর উপস্থিতি যেন অন্য দিনের চেয়ে বেশি। আমিন বলার শব্দও যেন একটু জোরে শোনা যাচ্ছে। নামাজ শেষে তিনি মোনাজাতে বসলেন। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। মনে মনে বললেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি আমাকে যেভাবে সাহায্য করছ, সেভাবেই আমার পরিবারকে আগলে রেখো।’
হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘আমিন।’
করিমের বুকটা কেঁপে উঠল। এত দিন অনেকের মুখে আমিন শুনেছেন, কিন্তু আজকের কণ্ঠটা যেন অন্য রকম। খুব পরিচিত। কোথায় যেন শুনেছেন এই কণ্ঠ!
নামাজ শেষ করে ঘরে ফিরে দেখলেন, তাঁর স্ত্রী বিছানায় বসে আছেন।
স্ত্রী বললেন, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’
‘কী কথা?’
‘তুমি যখন নামাজ পড়ো, তখন কি আমার মেহজাবীনও তোমার সঙ্গে থাকে?’
করিম থমকে গেলেন।
‘কী বলছ এসব? মেহজাবীন তো ঘুমায়।’
স্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘গত রাতে স্বপ্নে দেখলাম, মেহজাবীন তোমার পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছে। তুমি মোনাজাত করছ, আর সে তোমার সঙ্গে আমিন বলছে।’
করিমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। তিনি আর কোনো কথা বললেন না।
পরদিন সকালে মেহজাবীনের ঘুম ভাঙার পর করিম তাকে কাছে ডাকলেন।
‘মা, রাতে কোনো স্বপ্ন দেখেছিস?’
মেহজাবীন কিছুক্ষণ বাবার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ, আব্বু। একটা কথা বলব?’
‘বল।’
‘তুমি রাতে যখন নামাজ পড়ো, তখন তোমার পেছনে যারা দাঁড়িয়ে থাকে, তারা কি তোমার বন্ধু?’
করিমের মুখ শুকিয়ে গেল।
মেহজাবীন আবার বলল, ‘তারা আমাকে তোমার কাছে যেতে নিষেধ করেছে। বলেছে, এখনো সময় হয়নি।’
করিম কিছু বলতে পারলেন না।
সেদিন রাতে তাহাজ্জুদের জন্য ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখলেন, ড্রয়িংরুমে আগেই জায়নামাজ পাতা। অথচ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি জায়নামাজটি ভাঁজ করে রেখেছিলেন।
ঘরে সেই পরিচিত সুগন্ধ।
করিম ধীরে ধীরে জায়নামাজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। পেছনে কারা যেন দাঁড়িয়ে আছে, টের পেলেন। এবার আর ভয় হলো না। শুধু মনে হলো, আজ কেউ একজন তাঁর অপেক্ষায় আছে।
তিনি হাত বাঁধলেন।
‘আল্লাহু আকবার।’
পেছন থেকে একসঙ্গে অনেক কণ্ঠ ভেসে এল—
‘আল্লাহু আকবার।’
আর ঠিক তখনই পাশের ঘর থেকে মেহজাবীনের কণ্ঠ শোনা গেল—
‘আব্বু, আজ আমাকে তোমার সঙ্গে নামাজ পড়তে দেবে?’