Poetry

ডিমেনশিয়া অথবা হারিয়ে যাওয়ার ছায়ায়

October 15, 2026

10 views

সকালে ঘুম ভেঙে দেখি, ঘরটা আমার চেনা,
মানুষগুলো কেমন অচেনা ঠেকে।
ওরা বলে, আমি নাকি ওদেরই একজন।
যে মেয়েটি সকাল বেলা চা দেয়,
সে আমাকে ‘বাবা’ ডাকে, কার রাখি খোঁজ?
কবে আমি এত বড় মেয়ের বাবা হলাম!
আলমারির পাশের দেয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো ছবিতে এক যুবক দাঁড়ানো,
চোখে তার কী গভীর আত্মবিশ্বাস মেশানো।
সবাই বলে, লোকটা আমিই তো বটেই,
অথচ তাকে দেখলে কেন যেন বুক খালি হয়ে যায়!
নিজের নামটাও মাঝে মাঝে যেন ঠোঁট থেকে ফসকে পড়ে,
অথবা ঠোঁটের কাছে এসে থেমে থাকে।
মনে হয়, কোনো অচেনা স্টেশনে নেমে
ভুলে গেছি ফেরার ট্রেনের নাম একেকটি নিয়মে।
মায়ের শাড়ির গন্ধ, বাবার সাইকেলের ঘণ্টি,
বর্ষার দুপুরে বৃষ্টির শব্দ, সব যেন খুব স্পষ্ট!
তারপর হঠাৎ সব দরজা যায় বন্ধ হয়ে গেলো।
নির্বাসিত কি হচ্ছি আমি নিজেরই ঘর ছেড়ে?
এ শরীরটাই তো আমার বাড়ি, মস্তিষ্কটা ঘর,
সব চাবি হারিয়ে আজ সবাই হলো পর!
ওরা বলে, ভয় পেয়োনা, আমরা তো আছি পাশে,
তবু ভয় হয়, একদিন কি ওদের মুখের দিকে চেয়েও
বুঝব না কেন চোখ ভিজে ওঠে কারও ছোঁয়া পেয়ে।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে মনে হয়, কেউ যেন ধীরে
সরিয়ে নিচ্ছে আসবাবপত্র বুক চিরে!
পরিচিত টেবিল, পুরোনো আয়না, আর সেই জানালা,
যেখান থেকে পৃথিবী দেখতাম কত অবহেলা।
কথা বলতে চাই অনেক, জমে আছে যত জমানো কথা,
শব্দগুলো যেন ভেজা দেশলাই, জ্বলে না।
আমার নীরবতাকে ওরা ভুল করে অভিমান ভেবে নেয়,
আমি চেয়ে থাকি শুধু মেঘলা কোনো দিনের চনমনে রোদ গলে যায়।
কখনো রাগ হয়, কখনো কাঁদি, একই প্রশ্ন বারবার করি,
ওরা বিরক্ত হয় কি না জানি না, শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
একদিন যার আঙুল ধরে রাস্তা পার করিয়েছি আমি,
আজ সে আমার হাত ধরে চলে খুব সহজে।
সময়ের এই উল্টো স্রোতে লজ্জা পাই,
কাউকেই তো এই অসহায়তার কথা বলতে যে আর পারি না ভাই।
পকেটে এখনও একটা পুরোনো চিরুনি পড়ে আছে,
কেন রেখেছি মনে নেই, তবুও হাত তাকে ডাকে।
মনে হয়, চিরুনির দাঁতগুলোর ফাঁকে আজও আটকে আছে
আমার যৌবনের কোনো সকাল, ছায়া হয়ে কাছে।
সব স্মৃতি কি সত্যিই হারিয়ে যায় অতল গহ্বরে?
নাকি অন্ধকারে তারা বসে থাকে আপন ঘরে,
আমার একটি ডাকের অপেক্ষায়,
যেমন দূরের ঘরে মা অপেক্ষা করতেন, সন্ধ্যা নামে হারায়?
মাঝে মাঝে মেয়েটির মুখ দেখে বুক ভরে ওঠে ভালোবাসায়,
নামটা মনে পড়ে না, সম্পর্কটাও যেন হারিয়ে যায় কুয়াশায়।
তবু মনে হয়, এই মানুষটার জন্যই একদিন
পৃথিবী জয় করতে চেয়েছিলাম আমি স্বাধীন!
তখন তার হাত চেপে ধরি আমি পরম যত্নে,
সে হাসে, আমার চোখ মুছে দেয় অতি সাবধানে।
বুঝতে পারি না কেন তার চোখ ভিজে ওঠে,
আমি কি তাকে কাঁদিয়েছি কোনো ছলে?
নাকি সে দেখতে পাচ্ছে আমার হারিয়ে যাওয়া ধ্রুবতারা,
যে পথ হারাচ্ছে ধীরে ধীরে আজ দিশেহারা?
তবুও আমার ভেতরে একজন মানুষ তো এখনও জেগে রয়,
গান শুনলে যে চুপ করে থাকে।
জানালায় বৃষ্টি দেখলে দীর্ঘশ্বাস ফেলি গভীর রাতে,
স্নেহের স্পর্শ পেতে ইচ্ছে করে শিশুদের মতো।
যেদিন আমি কাউকেই চিনব না আর,
সেদিনও পাশে থেক তোমরা আমার এই জীবনে।
স্মৃতির পৃথিবী ভেঙে চুরমার হয়ে যদি যায় ঝরে,
তোমরা শুধু তোমাদের স্পর্শের নাগালে রেখো আমায়।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • Habiba Rozy 5 hours ago

    কবি নিজেকে অতিক্রম করে চলেছেন