অধ্যাপক অতনু সেনগুপ্ত ছিলেন প্রাচীন ইতিহাসের গবেষক।
জীবনটা তার কাটছিল ধুলোবালি-মাখা পুঁথি, পুরোনো শিলালিপি আর একঘেয়ে লাইব্রেরির নিশ্চুপ আবহে।
প্রেম বা রোমান্স—এসব তার কাছে ছিল অন্য কোনো জগতের বিষয়।
কিন্তু একদিন কলকাতার এক ভাঙা জমিদার বাড়ির ধুলোমাখা আস্তাকুঁড়ে একটি অজানা, জীর্ণ ডায়েরি খুঁজে পাওয়ার পর তার চেনা পৃথিবীটা অদ্ভুতভাবে বদলে যেতে শুরু করল।
ডায়েরিটি ছিল আঠারো শতকের কোনো এক রহস্যময়ী নারীর।
পাতায় পাতায় লেখা ছিল এক গভীর, বিষণ্ণ আর নিষিদ্ধ ভালোবাসার রূপকথা। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো—
লেখকের কোনো নাম ছিল না,
শুধু প্রতিটা পাতায় ছিল কালো কজলে আঁকা একজোড়া গভীর চোখের বর্ণনা।
ডায়েরির সেই প্রেমিকা তার ভালোবাসার মানুষকে ডাকতেন—‘কাজল চোখের মেয়ে’।
ডায়েরির একেবারে শেষ পাতায় রক্তবর্ণের কালিতে লেখা ছিল একটি লাইন:
“যদি কোনোদিন আমার কাজল চোখের জাদুতে ভুলতে পারো, তবে আমার নাম উচ্চারণ করো। আমি আসব।”
অতনু হেসে উঠেছিলেন।
একজন যুক্তিবাদী ইতিহাসবিদের পক্ষে এসব অলৌকিক কথায় বিশ্বাস করা অসম্ভব।
কিন্তু সেদিন রাত থেকেই ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিতে শুরু করে।
নির্জন ঘরে তার মনে হতো কেউ একজন ফিসফিস করে কথা বলছে, অচেনা এক সুবাস ভিড়ে যেত বাতাসে।
এক রাতে ডায়েরিটা বন্ধ করার সময় সেই অদ্ভুত কথাটি অতনুর মনে বারবার বেজে উঠল। কৌতুহলের বশে মনে মনে ভাবলেন—‘যদি আসো, তবে আমায় খুঁজে নিও।’
ঠিক তখনই ঘরের আলো নিভে গেল।
শীতল এক হাওয়া ঘরের ভেতরের পরিবেশ বদলে দিল।
অতনু স্তব্ধ হয়ে দেখলেন, ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছেন এক অপরূপা নারী—পরনে প্রাচীন লাল শাড়ি, কপালে বড় লাল টিপ আর চোখে টানা কাজল।
মেয়েটির দিকে তাকিয়ে অতনু বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।
মেয়েটি অতনুর কাছে এসে মৃদু হেসে বলল, “আমার কাজল চোখে তুমি হারাবে না?”
পরবর্তী দিনগুলো অতনুর জন্য এক অদ্ভুত আবেশের মতো ছিল। মেয়েটি প্রতি রাতে আসত, তাদের অতীত ভালোবাসার গল্প বলত।
অতনু ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলেন, তিনি ডায়েরির পৃষ্ঠার প্রেমিকের মতো করেই এই রহস্যময়ী নারীর গভীর কাজল চোখের মায়ায় আটকে গেছেন।
তিনি তার প্রেমে পড়ে গেছেন।
কিন্তু একদিন রাতে মেয়েটি বিষণ্ণ গলায় বলল, “তোমাকে আমার আসল নামটা উচ্চারণ করতে হবে অতনু, তবেই আমি চিরতরে তোমার হতে পারব।”
কিন্তু ডায়েরিতে তো কোনো নাম লেখা ছিল না!
অতনু উন্মাদের মতো হাজার বছর আগের নথি, পুরনো রেকর্ড আর বংশতালিকা খুঁজতে লাগলেন।
কোথাও তার নাম নেই।
অবশেষে ক্লান্ত অতনু ডায়েরির সেই শেষ লাইনটি আবার পাঠ করলেন।
তখন হঠাৎ তার উপলব্ধি হলো—নামটা তো হারিয়ে যায়নি, নামটা ভালোবাসার মাঝে লুকিয়ে ছিল।
তিনি মেয়েটির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গভীরভাবে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমিই আমার কাজল!”
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের বাতাস স্থির হয়ে গেল।
মেয়েটির মুখে ফুটে উঠল অপরূপ এক হাসি।
প্রথমবারের মতো অতনু তার হাত স্পর্শ করতে পারলেন—সেটা আর হাওয়া নয়, এক রক্ত-মাংসের উষ্ণ অনুভূতির ছোঁয়া।
পরদিন সকালে অতনুর ঘুম ভাঙল লাইব্রেরির টেবিলে।
চারপাশ শান্ত, সূর্য উঠছে।
অতনুর মনে হলো তিনি এক দীর্ঘ স্বপ্ন দেখলেন।
কিন্তু পাশে তাকিয়েই তার বুকটা কেঁপে উঠল।
টেবিলে রাখা সেই পুরনো ডায়েরিটির প্রথম পাতায় এখন অতনুর নিজের হস্তাক্ষর।
আর ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা নতুন একটি লাইন:
“যে গল্পের শেষ তুমি খুঁজছিলে অতনু, তা কোনো অতীতের গল্প নয়। বহু জন্ম আগে তুমিই আমাকে এই কাজল পরিয়েছিলে, আর আজ আবার আমাকে খুঁজে নিলে।”
অতনু আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
আয়নার কাচে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—তার নিজের চোখের কোণেই লেগে আছে হালকা কালচে ছোপ, যেন কেউ খুব যত্ন করে একটু আগেই তাকে কাজল ছুঁইয়ে দিয়ে গেছে।
সমাপ্ত।
লেখানী- রেজেকা লিস্পা।