সবসময় মোবাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি করাই হাবিবের একমাত্র বদভ্যাস। এজন্য বাড়িতে নিজের স্ত্রীর কাছেও মাঝে মাঝে গালমন্দ খেতে হয়। অফিসের কলিগরা এবং বসেরও ঐ একটাই অভিযোগ। হাবিব মোবাইলে, বিশেষ করে ফেসবুকে আসক্ত। একদিনতো তার বস তাকে ডেকে বলেই দিলো, সে যেন একজন সাইকোলজিষ্টের সাথে কনসাল্ট করে নেয়।
পকেটে টানা ১৫ সেকেন্ডও মোবাইল রাখতে পারে না সে। মিনিটে পাঁচ/ছয়বার মোবাইল দেখতে হয় তার। মোবাইলে কিছু একটা পোস্ট করে রাত জেগে বসে থাকে, একটু পর পর সেই পোস্ট দেখে; কটা লাইক কমেন্ট পড়লো।
একদিন রাতে হাবিব বিছানায় শুয়ে মোবাইল স্ক্রল করতে করতে দেখলো, এক বন্ধু রাকিব নিজের গাওয়া গান পোস্ট করেছে। সেখানে কমেন্টের বন্যা, লাইক ঝড়ের মতো। পরদিন সকালে অফিস যাবার পথে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে নিজেই মোবাইলে রেকর্ড করে ফেললো একটা রবীন্দ্রসংগীত।
পোস্ট দেয়ার দুই ঘণ্টা পরেও মাত্র লাইক ৭টা। কমেন্ট ২টা, তার মধ্যে একটা তার মায়ের: “খুব ভালো গাইছিস, বাবা।”
মাথার ভেতর কুয়াশার মতো জমে ওঠে কিছু গুঞ্জন — আমি তাহলে কে? আমার কণ্ঠ কি কিছুই না? মানুষ আমাকে বোঝে না কেন? আমিতো খুব ভালো গান গাইলাম। মনের ভেতরের হতাশার মেঘ জমতে শুরু করে তার।
এরপর শুরু হলো কবিতা লেখার পালা। কারণ কয়েকজন বন্ধু এখন নিয়মিত কবিতা লিখে ফেসবুকে পোস্ট করছে। হাবিবও লিখে ফেললো,
একটা চাঁদ ফেলে এসেছি পুরনো শহরে,
যার আলো এখন কেবল স্মৃতিতে।”
শুরুতে ১৫টা লাইক, তার মধ্যে ৯টা নিজের পরিচিতদের। কিন্তু পোস্ট করে সে বারবার ঘড়ি দেখে — ১০ মিনিট পর রিফ্রেশ, ২০ মিনিট পর আবার। এক ঘন্টা পর আর কোন লাইক কমেন্ট না দেখে পোস্টটা নিজেই ডিলিট করে দেয়।
এক রাতে হঠাৎ ওয়াশরুমের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে হাবিব চিৎকার করে ওঠে,
আমি কি কেউ না? আমি কি সত্যিই মূল্যহীন? কেউ আমাকে বোঝে না। আমার মেধা মানুষ বুঝতে পারে না। পৃথিবীর মানুষ প্রশংসা করতে এত দ্বিধায় থাকে কেন? মানুষ কেন বোঝে না, আমি এতো ভালো মানুষ!
ততদিনে তার এক বন্ধু যখন ইউটিউবে ভিডিও বানানো শুরু করলো, তখন হাবিন সিদ্ধান্ত নিলো, এবার সে মোটিভেশনাল স্পিকার হবে।
ড্রয়িংরুমে বসে মোবাইল সেট করে নিজেকে ভিডিও করতে করতে বলতে থাকে,
তোমার ভেতরেই আছে সম্ভাবনার বীজ। শুধু সাহস করে নিজেকে বিশ্বাস করো...।
ভিডিওটিতে ৫টা ভিউ, তার মধ্যে ৩টা নিজে দিয়েছে। একটাই কমেন্ট — তার নিজের অন্য আইডি
থেকে: ভাই, আপনি অনন্য!
তবে সবচেয়ে ভয়ংকর ঘটনা ঘটলো একদিন, সেদিন সে নিজের একটা ছবি পোস্ট করলো। তার চোখের নিচে কালি, মুখে ক্লান্তি। সেটির সাথে লিখলো-
সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না।
তবে এটা ছিল নাটক, শুধু মানুষের সাড়া পাবার আশায়। কিন্তু বাস্তবতা তার নাটককেও ছাড়িয়ে গেলো। পোস্ট দেয়ার পাঁচ ঘণ্টা পরও কেউ কোনো কমেন্ট করলো না। ইনবক্সে কেউ জানতেও চাইলো না, কী হয়েছে!
তখন সত্যি সত্যি তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তার শুধু মনে হলো, এত অকেজো আমি?
রাতের বেলা সে মন খারাপ করে শুয়ে থাকে। ঘরের দেয়ালগুলো যেন তার দিকে তাকিয়ে হাসছে,
তুই তো কিছু না। তুই তো শুধু মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে যাচ্ছিস। হা হা হা।
এরপর হাবিব শুরু করলো, অন্যদের কমেন্টে গিয়ে “ভালোলাগা” লিখে আসা, যেন তারা বিনিময়ে তার পোস্টেও কিছু লেখে।
নিজের পোস্টে ৫টা ছদ্মপ্রোফাইল থেকে লাইক দেয়, কমেন্ট করে, অসাধারণ!
একদিন ভুল করে এক প্রোফাইল থেকে লিখে ফেলে, ভাই, আপনার মতো কেউ নেই!
তখন এক বন্ধু স্ক্রিনশট দিয়ে পাঠালো,
ভাই, তুমি নিজেকেই প্রশংসা করছো নাকি? এটাতো তোমারই আরেক প্রোফাইল।
তারপর ইনবক্স নিস্তব্ধ।
বহুদিন ধরে কেউ তার কোনো পোস্টে কিছু লিখে না, সেও লিখে না। হাবিবের মুঠোফোন ঘাঁটার অভ্যাসটা চলে গেছে।
সে রাতে বসে বসে ডায়েরিতে লিখলো,
আমি কি মানুষ? আমাকে কেউ বুঝলো না।
আয়নার সামনে দাঁড়াই, কিন্তু সেও আমাকে দেখে হাসে।
আমি কিছু হতে চাইনি, শুধু প্রশংসার মানুষ হতে চেয়েছিলাম। সবাই আমাকে ভালো বলুক, এটুকুই চেয়েছিলাম।
মাসখানেক পর একদিন, হঠাৎই সে ফেসবুকে পোস্ট করলো,
আমি চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছি। আমার সমস্যাকে নারসিসিস্টিক পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার বলেছে। এখন আমি অনেক ভালো আছি।এটা একটা মানসিক রোগ, আমি জানতাম না। যদি কেউ এই পোস্টটি দেখে থাকো, দয়া করে সত্যিকারের ভালোবাসা খোঁজো, আয়নার প্রতিফলন নয়।
সেদিন সে আয়নায় নিজের মুখটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। ক্লান্ত, একা, ভেঙে যাওয়া; তার নিজের মুখ।
আর ঠিক তখনই কেন যেন তার মধ্যে একটা প্রাপ্তির আনন্দ এলো। সে আনন্দের কারণ অন্য কেউ নয়, সে নিজেই।
মানুষ জানেই না, নিজের বিবেকের কাছ থেকে নিজের প্রশংসা শোনার চেয়ে বড় কিছুই হতে পারে না।
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.