Article

ডিমের সাদা অংশ নাকি কুসুম—কোনটিতে পুষ্টি বেশি?

October 19, 2026

15 views

ডিম আমাদের পরিচিত ও সহজলভ্য পুষ্টিকর খাবার। এতে রয়েছে প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজসহ শরীরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান। তবে অনেকেই ওজন কমানোর জন্য শুধু ডিমের সাদা অংশ খান এবং কুসুম বাদ দেন। আবার অনেকে কুসুমে কোলেস্টেরল থাকার কারণে ডিম খেতে ভয় পান।

আসলে ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম—দুটিই পুষ্টিকর। তবে পুষ্টি উপাদানের ধরন ও পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে।

 ডিমের সাদা অংশে কী কী পুষ্টি আছে?

একটি বড় ডিমের সাদা অংশে আনুমানিক ১৭ ক্যালরি ও ৩.৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এতে প্রোটিন, রিবোফ্লাভিন বা ভিটামিন B2, সেলেনিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদান রয়েছে। প্রোটিন পেশি গঠন ও শরীরের কোষ মেরামতে সাহায্য করে, ভিটামিন B2 শরীরের শক্তি উৎপাদনে ভূমিকা রাখে, সেলেনিয়াম শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে এবং পটাশিয়াম পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাদা অংশে চর্বি ও ক্যালরি খুব কম থাকায় ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কম ক্যালরিতে প্রোটিন গ্রহণের জন্য এটি একটি ভালো খাবার।

ডিমের কুসুমে কী কী পুষ্টি আছে?

একটি বড় ডিমের কুসুমে আনুমানিক ৫৫ ক্যালরি ও ২.৭ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এতে ভিটামিন A, D ও B12, কোলিন, আয়রন, লুটিন, জিয়াজ্যানথিন এবং ফ্যাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ভিটামিন A চোখ ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে, ভিটামিন D ক্যালসিয়াম শোষণ ও হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে, ভিটামিন B12 স্নায়ু ও লোহিত রক্তকণিকার স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রয়োজন এবং কোলিন মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আয়রন হিমোগ্লোবিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে, আর লুটিন ও জিয়াজ্যানথিন চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। কুসুমের ফ্যাট শরীরে শক্তি জোগায় এবং চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিন শোষণে সাহায্য করে। তবে এতে খাদ্যজাত কোলেস্টেরলও রয়েছে; একটি বড় ডিমের কুসুমে আনুমানিক ১৮০–২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকতে পারে।

ডিমের সাদা অংশে প্রোটিন বেশি এবং ক্যালরি ও চর্বি খুব কম। অন্যদিকে, কুসুমে প্রোটিনের পাশাপাশি তুলনামূলক বেশি ক্যালরি ও চর্বি থাকে। ভিটামিন A, ভিটামিন D, ভিটামিন B12, কোলিন, লুটিন ও জিয়াজ্যানথিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান মূলত কুসুমে পাওয়া যায়। এ ছাড়া কুসুমে কোলেস্টেরল থাকে, তবে সাদা অংশে কোলেস্টেরল নেই। তাই শুধু প্রোটিন পেতে চাইলে ডিমের সাদা অংশ ভালো, আর ডিমের পূর্ণ পুষ্টি পেতে চাইলে সাদা অংশ ও কুসুম দুটিই খাওয়া উপকারী।সুতরাং, সাদা অংশে প্রোটিনের ঘনত্ব বেশি হলেও কুসুমে ভিটামিন, কোলিন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান বেশি। পুরো ডিম খেলে উভয় অংশের পুষ্টি পাওয়া যায়।

ডিমের কুসুমে থাকা কোলেস্টেরল পুরোপুরি ভালো বা মন্দ—কোনোটিই নয়। কোলেস্টেরল শরীরের কোষ গঠন, হরমোন তৈরি ও ভিটামিন D উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে খাবারের মাধ্যমে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল গ্রহণ করলে কিছু মানুষের রক্তে LDL বা খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়তে পারে, যা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই যাঁদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি বা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের ডিমের কুসুম খাওয়ার পরিমাণ চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে পুরো ডিম খাওয়া যেতে পারে।

কাদের ডিমের কুসুম খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন?

সবার জন্য ডিমের কুসুম নিষিদ্ধ নয়, তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন হতে পারে। যাঁদের রক্তে LDL বা খারাপ কোলেস্টেরল বেশি, তাঁদের খাদ্যতালিকায় কোলেস্টেরল ও সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বিবেচনা করা জরুরি। হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যাবস্থা অনুযায়ী ডিম খাওয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত। একইভাবে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কোলেস্টেরল ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তবে শুধু কুসুমে কোলেস্টেরল রয়েছে বলে সবাইকে এটি বাদ দিতে হবে, এমন নয়। বরং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে ডিমের কুসুম খাওয়ার পরিমাণ ঠিক করা উচিত।

একজন সুস্থ মানুষ দিনে কয়টি ডিম খেতে পারেন?

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, সুস্থ ব্যক্তির স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন একটি সম্পূর্ণ ডিম রাখা যেতে পারে। তবে সবার জন্য একই সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। দৈনিক প্রোটিনের প্রয়োজন, অন্যান্য খাবার, কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করতে হবে। প্রোটিন বাড়াতে চাইলে একটি সম্পূর্ণ ডিমের সঙ্গে অতিরিক্ত সাদা অংশ খাওয়া যেতে পারে। এতে কুসুমের ক্যালরি ও কোলেস্টেরল না বাড়িয়ে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব।

ডিম কীভাবে খেলে ভালো—সেদ্ধ, পোচ নাকি ভাজা?

সেদ্ধ ডিম

পানি দিয়ে সেদ্ধ করলে বাড়তি তেল লাগে না। তাই ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি খুব ভালো বিকল্প।

পোচ ডিম

অল্প তেল বা তেল ছাড়া পরিষ্কার পানিতে পোচ করলে এটিও স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি হতে পারে। তবে রান্নার সময় ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম ভালোভাবে সিদ্ধ করা উচিত।

ভাজা ডিম

ভাজার সময় ব্যবহৃত তেল বা মাখনের কারণে ক্যালরি বেড়ে যায়। বেশি তেল ব্যবহার না করলে ভাজা ডিমও সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। সিদ্ধান্ত: ওজন কমানোর লক্ষ্য থাকলে সেদ্ধ ডিম সবচেয়ে সহজ ও সুবিধাজনক বিকল্প। তবে রান্নার পদ্ধতির পাশাপাশি তেলের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ।

 দিনের কোন সময়ে ডিম খাওয়া ভালো?

ডিম খাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বাধ্যতামূলক সময় নেই। সকালে নাশতায়, দুপুরে খাবারের সঙ্গে কিংবা বিকেলে হালকা নাশতা হিসেবে ডিম খাওয়া যায়। সকালে ডিম খেলে প্রোটিনসমৃদ্ধ নাশতা হয়, যা পেট ভরা রাখতে এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে শুধু সকালে ডিম খেলেই বেশি পুষ্টি পাওয়া যায়, এমন নয়। দিনের যেকোনো সময় ডিম খাওয়া যেতে পারে; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুষম খাদ্যতালিকায় ডিম অন্তর্ভুক্ত করা।

সাদা ও গোলাপি বা বাদামি ডিমের পুষ্টিগুণে কি পার্থক্য আছে?

ডিমের খোসার রং সাধারণত মুরগির জাত ও জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে। সাদা ও বাদামি বা গোলাপি খোসার ডিমের মধ্যে শুধু খোসার রঙের কারণে উল্লেখযোগ্য পুষ্টিগত পার্থক্য হয় না। তবে মুরগির খাবার, ডিমের আকার ও উৎপাদনপদ্ধতির কারণে পুষ্টির পরিমাণে কিছু পার্থক্য হতে পারে। তাই বাদামি বা গোলাপি ডিম মানেই বেশি পুষ্টিকর—এমন ধারণা সঠিক নয়। ডিম কেনার সময় খোসা অক্ষত আছে কি না, ডিম টাটকা কি না এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম—দুটিই পুষ্টিকর। সাদা অংশ কম ক্যালরিতে প্রোটিন দেয়, আর কুসুমে রয়েছে বিভিন্ন ভিটামিন, কোলিন, উপকারী পুষ্টি উপাদান ও চর্বি। যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁরা একটি সম্পূর্ণ সেদ্ধ ডিমের সঙ্গে অতিরিক্ত সাদা অংশ খেতে পারেন। আর যাঁদের কোলেস্টেরল বেশি বা হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যাবস্থা অনুযায়ী ডিমের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত। মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মানে শুধু একটি খাবারের ভালো-মন্দ বিচার নয়; বরং প্রতিদিনের সম্পূর্ণ খাদ্যতালিকায় পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখা।

 

Picked up where you left off

Comments

Shahzadi Nasrin was this story’s first reader

+20 XP

    Please login to post comment. Login

  • Shahzadi Nasrin 11 hours ago First reader

    ধন্যবাদ এ বিষয়ে লেখার জন্য। ডিম খাওয়া নিয়ে বয়স্করা কনফিউজড থাকেন। তথ্যসূত্র উল্লেখ করলে আরো ভালো হতো।