শেকড়ের সন্ধানে সাহিত্যের আলোকবর্তিকা
একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তিপ্রস্তর প্রোথিত থাকে তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীরে। যে জাতি তার অতীত ঐতিহ্য, আত্মত্যাগ এবং উত্থান-পতনের সত্য ঘটনাপ্রবাহ ভুলে যায়, সেই জাতির বর্তমান দুর্বল ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে বাধ্য। বাংলা সাহিত্যের সুবিশাল ভাণ্ডারে কবিতা, ছোটগল্প কিংবা সমাজবাস্তবতাবাদী উপন্যাসের প্রাচুর্য থাকলেও ইতিহাসের পটভূমিকায় মহাকাব্যিক আখ্যান রচনার ধারাটি সর্বদা এক দুর্গম পথ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ইতিহাসকে উপন্যাসের ফ্রেমে বাঁধতে প্রয়োজন গভীর ঐতিহাসিক প্রজ্ঞা, নির্মোহ গবেষণা, ভৌগোলিক জ্ঞান এবং সর্বোপরি ইতিহাস ও সাহিত্যের সুষম মেলবন্ধন ঘটানোর অনন্য শৈল্পিক সামর্থ্য।
আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যে এই কঠিন ব্রতকে যিনি জীবনের প্রধান তপস্যা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, তিনি কথাসাহিত্যিক শফীউদ্দীন সরদার (১ মে ১৯৩৫ – ফেব্রুয়ারি ২০১৯)। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ও একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে যখন বাংলা সাহিত্যে নিরেট রোমান্টিক কিংবা নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠেছিল, তখন শফীউদ্দীন সরদার বাংলার তরুণ ও সাধারণ পাঠককে নিয়ে গিয়েছিলেন বারো শ শতাব্দী থেকে শুরু করে পলাশী, তিতুমীরের লড়াই এবং সাতচল্লিশের দেশভাগের সুদূর প্রান্তরে। তিনি বাংলার হারিয়ে যাওয়া শৌর্য, মুসলিম শাসনব্যবস্থার সাংস্কৃতিক বিকাশ, বারো ভূঁইয়াদের অদম্য স্বাধিকার চেতনা এবং ইংরেজ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে গণমানুষের রক্তের অক্ষরে লেখা প্রতিরোধকে সজীব উপন্যাসের রূপ দিয়েছেন। বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় তাঁর এই নিরলস সাহিত্যসাধনা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁকে এক স্বতন্ত্র ও অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
জন্ম, পটভূমি ও মানস গঠন: বরেন্দ্র ও চলনবিলের উত্তরাধিকার:
শফীউদ্দীন সরদারের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ মে নাটোর জেলার চলনবিল বিধৌত এক ঐতিহ্যবাহী জনপদে। উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রাচীন মাটির রূপ, পদ্মার অববাহিকা, আত্রাই ও চলনবিলের নিসর্গ তাঁর শৈশব-কৈশোরের মানস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বরেন্দ্র অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় রাজনৈতিক উত্থান-পতনের এক প্রধান সাক্ষী। সেন রাজাদের পতন, বখতিয়ারের আগমন, গৌড় ও পাণ্ডুয়ার স্বাধীন সুলতানি আমল সবকিছুর স্মারক এই অঞ্চলের ধূলিকণায় লুকিয়ে ছিল।
শৈশব থেকেই শফীউদ্দীন সরদার গভীর কৌতূহলে প্রত্যক্ষ করেছেন মাটির নিচের প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ, প্রাচীন দীঘি, ভাঙা মসজিদ ও মন্দিরের তোরণ। পারিবারিক ও গ্রামীণ পরিমণ্ডলে প্রচলিত লোকগাথা, পুঁথিপাঠ এবং দাদামশাইদের মুখে শোনা অতীতের গল্পগুলো তাঁর কল্পনার জগৎকে প্রসারিত করেছিল। পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হলেও তাঁর ভেতরের মূল সত্তাটি ছিল একজন ইতিহাসসন্ধানী গবেষকের। পুঁথি, প্রাচীন ফারসি ও আরবি ঐতিহাসিক দলিলের বাংলা অনুবাদ, ব্রিটিশ ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার এবং ঐতিহাসিকদের মূল্যায়ন তিনি বছরের পর বছর ধরে নিবিষ্ট চিত্তে পাঠ করেছেন। ফলে সাহিত্যের আসরে যখন তাঁর আবির্ভাব ঘটল, তখন তিনি কোনো শূন্য হাত নিয়ে আসেননি; এসেছিলেন ইতিহাসের সমৃদ্ধ রত্নভাণ্ডার সাথে নিয়ে।
ইতিহাস ও কথাসাহিত্যের মেলবন্ধন: শফীউদ্দীন সরদারের রচনাশৈলী:
ইতিহাস ও কথাসাহিত্য এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা সাহিত্যিকের জন্য অত্যন্ত দুরূহ এক কাজ। ইতিহাস হলো বাস্তব ও তথ্যের নির্মোহ দলিল, আর উপন্যাস হলো কল্পনার স্বাধীনতা। উপন্যাসে ইতিহাসের তথ্যের আধিক্য ঘটলে তা নীরস পাঠ্যবই বা গবেষণাপত্রে পরিণত হয়; আবার কল্পনার আতিশয্য ঘটলে তা বিকৃত ইতিহাসের রূপ নেয়।
শফীউদ্দীন সরদারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এই দুই বিপরীত স্রোতের মাঝে এক নান্দনিক ভারসাম্য রক্ষা করা। তিনি ইতিহাসের মূল কাঠামো, ঐতিহাসিক চরিত্রের জন্ম-মৃত্যু, যুদ্ধের তারিখ এবং রাজনৈতিক ফলাফলের ক্ষেত্রে কোনো মনগড়া বিকৃতি ঘটাননি। কিন্তু সেই ইতিহাসের কঙ্কালের ওপর তিনি পরিয়ে দিয়েছেন রক্ত-মাংসের জীবন্ত শরীর। তিনি ইতিহাসের প্রধান চরিত্রের পাশাপাশি সমান্তরালভাবে এঁকেছেন কাল্পনিক সাধারণ মানুষ—এক নিঃস্ব সৈনিক, একজন গ্রামীণ কুমারী, কোনো চটিঘরের সরাইওয়ালা কিংবা নদীপথের মাঝির চরিত্র। এর ফলে তাঁর উপন্যাসের পাতা উল্টাতে উল্টাতে পাঠক নিজেকে সরাসরি মধ্যযুগীয় বাংলার নদীমাতৃক মেঠোপথ কিংবা সুবেদারি রাজপ্রাসাদের করিডোরে আবিষ্কার করে। তাঁর ভাষারীতি ছিল প্রাঞ্জল, গতিশীল এবং রোমাঞ্চকর। তিনি জটিল সংস্কৃতায়িত বা অতিভারাক্রান্ত তৎসম শব্দের চেয়ে সেই সময়ের আবহ ফুটিয়ে তোলার মতো আরবি, ফারসি ও দেশজ বাংলা শব্দের নিখুঁত সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনায় যুদ্ধক্ষেত্রের তরবারির ঝনঝনানি যেমন জীবন্ত হয়ে উঠত, তেমনি নদীকূলের শান্ত প্রকৃতি ও প্রণয়াকাঙ্ক্ষী হৃদয়ের বিষাদও এক অপরূপ কাব্যিক রূপ ধারণ করত।
জাতীয় চেতনা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ঐতিহ্যবোধের পুনর্জাগরণ:
শফীউদ্দীন সরদারের সাহিত্যকর্ম কেবল অতীতচারী রোমন্থন নয়; এটি ছিল এক শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী ও আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রয়াস। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা ও পরবর্তীকালের বহু ইতিহাসচর্চায় বাংলাকে বহুবার এক চির-পদানত, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল জাতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। শফীউদ্দীন সরদার তাঁর উপন্যাসের মাধ্যমে এই হীনমন্যতার মূলে কুঠারাঘাত করেন। তিনি সগৌরবে দেখিয়েছেন, দিল্লি বা আগ্রার ক্ষমতার দাপট বাংলার বুক পর্যন্ত পৌঁছাতে বারবার থমকে গেছে। বারো ভূঁইয়ারা ভাটি অঞ্চলকে দুর্গ বানিয়ে মুঘলদের অপরাজেয় নৌবাহিনীকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। বাংলার সাধারণ কৃষক ও তাঁতিরা যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।
তাঁর উপন্যাসের আরও একটি উজ্জ্বল দিক হলো গভীর অসাম্প্রদায়িক ও সমন্বিত মানবিক চেতনা। তিনি ইতিহাসের মুসলিম বীরদের যেমন শ্রদ্ধাভরে চিত্রিত করেছেন, তেমনি বাংলার সাধারণ হিন্দু প্রজা, কারিগর ও স্বদেশপ্রেমী চরিত্রগুলোকে দিয়েছেন পরম মমতা ও মর্যাদা। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোতে ধর্ম কোনো অন্ধ হিংসার বাহন নয়; বরং তা আত্মশুদ্ধি, ন্যায়ের পক্ষে লড়াই এবং আর্তমানবতার সেবার এক পরম উৎস। বাংলার প্রকৃতি, নদী, মেঠোপথ আর হাজার বছরের যৌথ লোকসংস্কৃতি তাঁর রচনার ছত্রে ছত্রে গান হয়ে বেজেছে।
উত্তরপ্রজন্মের পাঠাভ্যাস ও ঐতিহাসিক সচেতনতায় অবদান:
বিংশ শতাব্দীর আশির ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে যখন টিভি বা ইন্টারনেটের এমন সর্বগ্রাসী আগ্রাসন ছিল না, তখন তরুণ সমাজের একটি বিশাল অংশ বইয়ের পাতায় নিমগ্ন থাকত। সেই প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে সহজবোধ্য ও জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে শফীউদ্দীন সরদারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইতিহাসের নিরস পৃষ্ঠা ও সন-তারিখ মুখস্থ করতে গিয়ে যে কিশোর বা তরুণ ভয় পেত, সে-ই শফীউদ্দীন সরদারের বখতিয়ারের তলোয়ার কিংবা বারো ভূঁইয়ার উপাখ্যান হাতে নিয়ে এক বসায় শেষ করত। তিনি ঘরের গৃহকোণে বসে থাকা কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইতিহাসের মূল ধারার সাথে সংযুক্ত করেছিলেন। ইতিহাসপ্রেমী এক বিশাল পাঠকশ্রেণি তৈরির পেছনে তাঁর এই নীরব অবদান যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাডেমিক উদ্যোগের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। ১৯৮৭ সালে কথাসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি সম্মানজনক বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।
শফীউদ্দীন সরদারের গ্রন্থপঞ্জি ও সাহিত্যসম্ভার:
শফীউদ্দীন সরদার তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে ইতিহাসভিত্তিক কালজয়ী আখ্যানের পাশাপাশি সামাজিক উপন্যাস, মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান, কিশোর সাহিত্য ও নাট্যরচনায় অসামান্য স্বাক্ষর রেখেছেন। নিচে তাঁর রচিত গ্রন্থাবলির বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:
১. ঐতিহাসিক উপন্যাস:
বাংলার মধ্যযুগ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত বিস্তৃত পটভূমিতে রচিত তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ:
বখতিয়ারের তলোয়ার (ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজির নদীয়া ও বাংলা বিজয়ের ঐতিহাসিক মহাকাব্য)
বখতিয়ারের তিন ইয়ার (বখতিয়ার খলজির সহযোদ্ধা ও সেনাপতিদের বীরত্বগাথা)
গৌড় থেকে সোনারগাঁ (বাংলায় স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা ও সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের সময়কাল)
বারো ভূঁইয়ার উপাখ্যান (মুঘল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঈসা খাঁর নেতৃত্বে বারো ভূঁইয়াদের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ)
ঈসা খাঁ (ভাটি অঞ্চলের অধিপতি ও বীর স্বাধীনতাকামী ঈসা খাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনভিত্তিক আখ্যান)
বিদ্রোহী জাতক (সুলতানি আমলের অভ্যন্তরীণ সংকট ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন)
যায় বেলা অবেলায় (সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের সুবর্ণ শাসনকাল ও পারস্যের কবি হাফিজের প্রসঙ্গ)
রাজবিহঙ্গ (সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের রাজত্ব ও বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির মিলনমেলা)
শেষ প্রহরী (আফগান কররানী বংশের পতন ও বাংলার স্বাধীনতার শেষ রক্ষকদের সংগ্রাম)
বিপন্ন প্রহর (নবাব আলীবর্দী খানের শাসনকাল, মারাঠা বর্গীদের নির্মম আক্রমণ ও প্রতিরোধ)
সূর্যাস্ত (পলাশীর যুদ্ধ, নবাব সিরাজউদ্দৌলার মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি ও মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা)
পথহারা পাখী (ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমি ও বীর গেরিলা নেতা ফকির মজনু শাহ)
বৈরী বসতি (শহীদ তিতুমীর, বাঁশের কেল্লার লড়াই ও নীলকর-জমিদার বিরোধী ঐতিহাসিক কৃষক বিদ্রোহ)
প্রেম ও পূর্ণিমা (সুবেদার শায়েস্তা খানের স্বর্ণযুগ ও মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের দমন)
যমুনা যখন ডাক দিল (ঐতিহাসিক নদীর পটভূমিতে স্বাধীনতাকামী মানুষের জীবনসংগ্রাম)
ঝড়ের খেয়া (বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাঙাগড়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট)
রণতরী (মধ্যযুগীয় বাংলার নদীপথের নৌযুদ্ধ ও সামরিক শৌর্য)
দ্বীপান্তরের বৃত্তান্ত (ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আন্দামানের সেলুলার জেলে নির্বাসনের রক্তাক্ত দলিল)
রূপনগরী (বাংলার প্রাচীন নগর ও প্রাসাদ রাজনীতির আখ্যান)
দখল (ভূমি, ক্ষমতা ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণের ঐতিহাসিক ভিত্তি)
২. সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস:
ইতিহাসের পাশাপাশি সমকালীন সমাজবাস্তবতা, মানুষের প্রেম-বিরহ এবং মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সংকট নিয়ে তিনি রচনা করেছেন বহু উপন্যাস:
অপূর্ব অপেরা (লোকসংস্কৃতি, যাত্রা ও নাট্যদলের সাথে যুক্ত মানুষের জীবনসংগ্রাম)
খোঁজ (সামাজিক টানাপোড়েন ও মানব চরিত্রের আত্মানুসন্ধান)
ঠিকানা (১৯৪৭ সালের দেশভাগের ট্র্যাজেডি, উদ্বাস্তু সংকট ও শেকড় হারানোর হাহাকার)
গুনাহগার (মানুষের পাপ-পুণ্য, অনুশোচনা ও ধর্মীয়-সামাজিক নীতিবোধের আখ্যান)
লাওয়ারিশ (সমাজের অবহেলিত, পরিচয়হীন মানুষের বেঁচে থাকার নির্মম লড়াই)
অবৈধ অরণ্য (মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সামাজিক অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র)
চোখের বালি (পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার রূপায়ণ)
বুনোফুল (গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল প্রেম ও সংঘাতের আখ্যান)
ভাঙা নদী (নদীভাঙন ও উপকূলের বাস্তুহারা মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম)
পথের বাঁকে (জীবনের অনিশ্চিত যাত্রা ও নিয়তির খেলা)
আকাশ কুসুম (মধ্যবিত্তের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ব্যর্থতার টানাপোড়েন)
৩. কিশোর সাহিত্য ও রোমাঞ্চকর আখ্যান
কিশোরদের মধ্যে ঐতিহাসিক কৌতূহল, নৈতিক সাহস ও অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়তা গড়ে তুলতে তিনি রচনা করেছেন বেশ কিছু জনপ্রিয় বই:
চলনবিলের রূপকথা (চলনবিল অঞ্চলের লোকগাথা ও উপকথার পুনর্নির্মাণ)
সোনার হরিণ (কিশোর রোমাঞ্চ ও অ্যাডভেঞ্চারভিত্তিক কাহিনি)
অচিন দ্বীপের রাজকন্যা (রূপকথা ও কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক কিশোর গল্প)
গুপ্তধনের সন্ধানে (ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ ও রহস্যভিত্তিক কিশোর উপন্যাস)
ছোটদের বখতিয়ার খলজি (কিশোরদের উপযোগী করে রচিত ঐতিহাসিক বিজয়গাঁথা)
ছোটদের ঈসা খাঁ (বারো ভূঁইয়া প্রধান ঈসা খাঁর জীবন ও বীরত্বগাথা)
৪. নাটক ও অন্যান্য রচনা:
মঞ্চ ও বেতার নাটকের ক্ষেত্রেও তাঁর স্বচ্ছন্দ পদচারণা ছিল। তাঁর রচিত নাটকগুলো গ্রামীণ সমাজ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল:
জাগো বাহে (ঐতিহাসিক কৃষক জাগরণ ও প্রতিরোধের প্রেক্ষাপটে রচিত নাটক)
মহল্লার বিচার (সামাজিক কুসংস্কার ও পঞ্চায়েতি বিচারব্যবস্থার অসঙ্গতি নিয়ে নাটক)
ইতিহাসের পাতায় বাংলা (প্রবন্ধ ও ঐতিহাসিক গবেষণামূলক সংকলন)
মূল্যায়ন ও উত্তরপ্রজন্মের দায়:
কোনো লেখককে তাঁর সমকালের বিচারে নয়, বরং মহাকালের আয়নায় পরিমাপ করতে হয়। শফীউদ্দীন সরদার হয়তো তথাকথিত নাগরিক বুদ্ধিজীবীদের অভিজাত সাহিত্যসভায় সর্বদা খুব বেশি আলোচিত হননি; কিন্তু তিনি পেয়েছিলেন সর্বস্তরের সাধারণ পাঠকের অকৃত্রিম ভালোবাসা। তাঁর সহজ-সরল জীবনযাপন, প্রচারবিমুখতা এবং ইতিহাসের সত্যকে সমুন্নত রাখার অবিচল নিষ্ঠা তাঁকে এক নির্মোহ সাধকের মর্যাদা দিয়েছে। আজকের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল বিশ্বে, যখন বহিরাগত সংস্কৃতির বন্যায় নিজস্ব শেকড় ও ইতিহাস বিস্মৃত হওয়ার উপক্রম, তখন শফীউদ্দীন সরদারের সাহিত্যকর্ম আমাদের জন্য এক শক্ত বাতিঘর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন—আমরা কোনো শিকড়হীন জাতি নই; আমাদের পূর্বপুরুষরা রক্তের দামে এই মাটির স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা রক্ষা করেছিলেন।
উপসংহার:
কথাসাহিত্যিক শফীউদ্দীন সরদার ছিলেন বাংলার সাহিত্যাকাশের সেই নিঃসঙ্গ অশ্বারোহী, যিনি ইতিহাসের ধূসর মরুপথ মাড়িয়ে তুলে এনেছিলেন আত্মমর্যাদার মুক্তো। তিনি ইতিহাসের ধুলোমাখা পাণ্ডুলিপিগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে। বাংলার নদ-নদী, ভাটি অঞ্চল, বিল-হাওর আর ঐতিহাসিক কেল্লাগুলো যতদিন থাকবে, ততদিন কথাসাহিত্যিক শফীউদ্দীন সরদারের নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে। তিনি কেবল একজন ঔপন্যাসিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শাশ্বত সংস্কৃতির এক অতন্দ্র ও বিশ্বস্ত প্রহরী। তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্ম উত্তরপ্রজন্মকে অনন্তকাল ধরে নিজ শেকড়ের সন্ধানে এবং সত্য ও ন্যায়ের লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করে যাবে।