মেঘনা নদীর পললমাটিতে গড়ে ওঠা শান্ত এক আধা-শহুরে জনপদ,চর-কালিন্দী। এখানে নদীমাতৃক বাংলার চিরায়ত শান্ত প্রকৃতির পাশাপাশি গড়ে উঠেছে আধুনিক নানা স্কুল-কলেজ। নদীর হাওয়া যেখানে মেঠোপথ ছুঁয়ে যায়, সেখানেই বাস করত তেরো বছরের এক কিশোর, নাবিল। নাবিল সেন্ট্রাল আইডিয়াল হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। তার মাথাটা ছিল ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের নানা যন্ত্রপাতিতে ভরপুর। পুরোনো ট্রানজিস্টার খোলা, ভাঙা রিমোট দিয়ে ছোট ফ্যান বানানো কিংবা ইউটিউব দেখে ছোটখাটো সার্কিট বানাতে তার দারুণ আগ্রহ। কিন্তু এই উজ্জ্বল গুণের আড়ালে নাবিলের ভেতরে বাসা বেঁধেছিল এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক অসুখ,মিথ্যা বলা আর বড়াই করা।
নাবিল নিজের সাধারণ কাজগুলোকে বাড়িয়ে বলত। তার কোনো প্রজেক্ট অর্ধেক সম্পন্ন হলেও সে বন্ধুদের কাছে দাবি করত, সে নাকি একাই বিশ্বমানের রোবট বানিয়ে ফেলেছে। কোনোদিন স্কুলের হোমওয়ার্ক ভুলে ফেলে এলে সে বানিয়ে বলত, "জানিস, আমাদের এলাকায় কাল রাতে ট্রান্সফরমার ব্লাস্ট হয়ে পুরো বাড়ির ওয়্যারিং পুড়ে গিয়েছিল, তাই খাতা পুড়ে গেছে!" শুরুতে বন্ধুরা তার এই অতিরঞ্জিত কথাকে নিছক গল্প ভেবে হেসে উড়িয়ে দিত। কিন্তু ধীরে ধীরে নাবিল বুঝতে পারল, সাধারণ সত্য কথা বললে ক্লাসে কেউ তাকে বিশেষ পাত্তা দেয় না; কিন্তু অদ্ভুত কোনো কাল্পনিক মিথ্যে বললে বন্ধুরা গোল হয়ে তার কথা শোনে, তাকে স্কুলের ‘সুপার জিনিয়াস’ ভাবে। এই ক্ষণিকের হাততালি আর গুরুত্ব পাওয়ার লোভেই নাবিল একের পর এক মিথ্যার জাল বুনতে শুরু করল।
তার বাবা জামিল সাহেব ছিলেন স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। তিনি একদিন ছেলেকে ডেকে পরম স্নেহে বললেন, "নাবিল, বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রথম শর্ত হলো সততা। একটি ভুল সমীকরণ দিয়ে যেমন মহাকাশযান চাঁদে পাঠানো যায় না, তেমনি মিথ্যার ওপর কোনো মানুষের চরিত্র দাঁড়াতে পারে না। মিথ্যা হলো ফাঁপা বাঁশের মতো,বাইরে দেখতে শক্ত, ভেতরে সম্পূর্ণ ফাঁকা।" নাবিলের মা শায়লা বেগমও প্রায়ই বলতেন, "যে মুখ দিয়ে মিথ্যা বের হয়, সেই মুখ সত্যের আলো হারায়। মানুষ তোমাকে একদিন চিনে ফেলবে, তখন বিপদে পড়লে কেউ তোমার হাত ধরবে না।" কিন্তু নাবিল ভাবত, বাবা-মা বড্ড সেকেলে। আজকের যুগে নিজেকে জাহির করতে হলে একটু বাড়িয়ে বলতেই হয়!
সেই বছর জেলা পর্যায়ে এক সুবিশাল আন্তঃস্কুল রোবোটিক্স ও উদ্ভাবনী মেলা আয়োজনের ঘোষণা হলো। বিজয়ী প্রজেক্টকে জাতীয় পর্যায়ের বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে পাঠানো হবে এবং বিজয়ী পাবে আধুনিক একটি কম্পিউটার ল্যাব প্যাকেজ ও দশ হাজার টাকার মেধাবৃত্তি। নাবিলের ক্লাসের সবচেয়ে শান্ত, লাজুক ও দরিদ্র সহপাঠী ছিল শুভ। শুভর বাবা একটি সাইকেলের গ্যারেজে কাজ করতেন। অভাবের কারণে শুভ খুব দামি পার্টস কিনতে পারত না; কিন্তু মেধা ও একাগ্রতায় সে ছিল অসাধারণ। শুভ প্রায় ছয় মাস ধরে ভাঙা সিডি ড্রাইভের মোটর, সাইকেলের ক্লাচের তার, নষ্ট মোবাইল ফোনের ব্যাটারি আর একটি পুরোনো আরডুইনো ন্যানো চিপ জোড়াতালি দিয়ে একটি ‘স্মার্ট রেসকিউ রোবট’ তৈরি করছিল,যা মাটির নিচে গ্যাস লিকেজ শনাক্ত করতে পারে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে মানুষ থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত পাঠাতে পারে। শুভ পরম ভালোবাসায় সেই রোবটটির নাম দিয়েছিল ‘দুর্বার-১’।
নাবিলও প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছিল। কিন্তু সে সারাবছর বন্ধুদের সাথে গল্প ও ভিডিও গেম খেলে সময় নষ্ট করেছিল। মেলা শুরুর মাত্র তিন দিন আগে সে একটি সাধারণ প্লাস্টিকের খেলনা গাড়ির ওপর কিছু রঙিন এলইডি লাইট আর স্পিকার লাগিয়ে নাম দিল ‘ভয়েস কন্ট্রোল ফাইটার’। কিন্তু সে ভালো করেই বুঝতে পারছিল, শুভর কাজের তুলনায় তার কাজটা কিছুই না। শুভর রোবট বিচারকদের নজর কাড়বেই।
ঈর্ষা ও অপমানের ভয় নাবিলকে অন্ধ করে দিল। সে ভাবল, শুভ প্রথম হলে স্কুলের সবাই তাকে ভুলে যাবে!
মেলার আগের দিন বিকেলে সমস্ত স্কুলের প্রজেক্ট বিজ্ঞান ল্যাবে জমা রাখা হচ্ছিল। সন্ধ্যায় যখন ল্যাব সহকারী রমেশ কাকা তালা মারার জন্য অন্য রুমে গেলেন, নাবিল চুপিসারে শুভর লকারের কাছে গেল। সে এক টুকরো তার দিয়ে লকারের ড্রয়ারের লক ফাঁক করে শুভর রোবটের ভেতরের প্রধান কন্ট্রোল চিপের কোডিং তারটি এমনভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিল, যা বাইরে থেকে বোঝা যাবে না,কিন্তু সুইচ অন করলে রোবটের মাদারবোর্ড শর্টসার্কিট হয়ে জ্বলে উঠবে।
তারপর নাবিল বাড়ি ফিরে এলো। সে নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য বন্ধুদের মেসেঞ্জার গ্রুপে লিখে পাঠাল: "আজ ল্যাবে শুভর প্রজেক্টে ধোঁয়া উঠতে দেখেছি। ও মনে হয় নিম্নমানের তার ব্যবহার করেছিল। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দোষ ওর নিজেরই!"
পরদিন সকালের রোদে স্কুলের প্রাঙ্গণ উৎসবমুখর। জেলা প্রশাসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা বিচারক হিসেবে হাজির। যখন শুভর পালা এলো, শুভ কাঁপতে কাঁপতে তার ‘দুর্বার-১’-এর সুইচ অন করল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে চিপ থেকে নীল ধোঁয়া বের হয়ে রোবটটি নিথর হয়ে গেল। শুভর মাসের পর মাসের পরিশ্রম চোখের পলকে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। শুভ কান্নায় ভেঙে পড়ল। বিচারকেরা হতাশ হয়ে মাথা নাড়লেন। ঠিক তখনই হেডস্যার এগিয়ে এসে বললেন, "নাবিল আগেই বলেছিল শুভর তারে গলদ ছিল। শুভর প্রজেক্ট বাতিল করা হলো।"
এরপর এলো নাবিলের পালা। নাবিল অত্যন্ত সাবলীল মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোনে বলল, "মাননীয় বিচারকমণ্ডলী, আমার এই ডিভাইসটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে চলে। এটা যেকোনো নির্দেশ নিজের থেকে বুঝে কাজ করে!" আসলে সে গোপনে পকেটে হাত দিয়ে রিমোটের বোতাম চেপে খেলনা গাড়িটি চালাচ্ছিল।
বিচারকেরা একজন সপ্তম শ্রেণির ছাত্রের মুখে এআই ও সেন্সরের মুখস্থ বুলি শুনে বিভ্রান্ত হলেন। তারা নাবিলকে প্রথম পুরস্কার,সেই স্বর্ণপদক আর ক্রেস্ট তুলে দিলেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন শত শত মানুষের হাততালি শুনছিল, নাবিল এক মুহূর্তের জন্য অডিটোরিয়ামের শেষ প্রান্তে চোখ রাখল। সেখানে এক কোণে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছিল শুভ। তার সারা শরীরে দারিদ্র্যের পোশাক, আর মুখে সততার এক অপরিসীম যন্ত্রণা।
নাবিল ঘরে ফিরে ক্রেস্টটি পড়ার টেবিলে সাজিয়ে রাখল। কিন্তু সেই কাচ আর সোনার রঙের ক্রেস্টটি যেন অন্ধকার রাতে বিদ্রূপ করে হাসত। সে রাতে নাবিল ঘুমাতে পারল না। তার বুক বারবার ভারী হয়ে আসছিল। কিন্তু সে নিজেকে সান্ত্বনা দিল,"যুদ্ধে জিততে হলে ছলচাতুরী করতেই হয়!"
বিজ্ঞান মেলার ঘটনার পর নাবিলের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল বহুগুণে। সে ভাবল, মানুষ বড়ই বোকা; তাদের যা বোঝানো যায়, তারা তা-ই বিশ্বাস করে। সে স্কুলে আরও বেশি করে বানিয়ে কথা বলতে শুরু করল। একদিন সে অঙ্কের শিক্ষক কায়কোবাদ স্যারকে বলল, "স্যার, শুভ ক্লাসের পর আপনার ব্যাগে ঢিল ছুড়েছিল।" স্যার বিশ্বাস করে শুভকে সারা ক্লাসের সামনে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। আর একদিন নাবিল স্কুলের ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে বলল, "ফারহান আমাকে পাঁচশত টাকার একটি জাল নোট দিয়ে নাস্তা কিনে দিতে বলেছে।" ফলে নিরীহ ফারহানকে প্রধান শিক্ষকের ঘরে গিয়ে কান্নাকাটি করে কৈফিয়ত দিতে হয়েছিল।
কিন্তু মিথ্যা কখনো চিরকাল লুকিয়ে থাকে না। ধীরে ধীরে স্কুলের সিসিটিভি ফুটেজে এবং বন্ধুদের নিজস্ব তদন্তে প্রকাশ পেল,নাবিল ক্লাসের বিভিন্ন ঘটনায় কীভাবে বানোয়াট গল্প ফেঁদেছে। সেই জাল নোটের ঘটনাটিও ছিল পুরোপুরি নাবিলের সাজানো ড্রামা। এমনকি বিজ্ঞান ল্যাবের পেছনের জানালার গ্রিলের সাথে নাবিলের স্কুল ব্যাগের একটি বিশেষ ব্যাজ আটকে থাকতে দেখে রমেশ কাকা হেডস্যারকে জানিয়েছিলেন।
প্রমাণ শতভাগ না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ হয়তো তাকে বহিষ্কার করেনি, কিন্তু স্কুলের প্রতিটি ছাত্র, শিক্ষক এবং কর্মচারী নাবিলকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করল। তার ক্লাসের বেঞ্চে কেউ বসত না। টিফিনের সময় সে একা বসে থাকত। তার সাথে কেউ খেলত না। সে যখন কোনো সত্য কথাও বলতে যেত,যেমন "আজ বিকেলে বৃষ্টি হতে পারে" কিংবা "স্যার, আজ তো তৃতীয় পিরিয়ডে বাংলা ক্লাস হওয়ার কথা",সবাই একযোগে বলে উঠত, "চুপ কর মিথ্যুক! তোর একটা কথাও কেউ বিশ্বাস করে না!" নাবিল নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল। তার তৈরি মিথ্যার দেওয়াল তাকে পুরো সমাজ থেকে একঘরে করে দিল। কিন্তু সে তখনও বুঝতে পারেনি, এই মিথ্যার চূড়ান্ত শাস্তি প্রকৃতি কীভাবে প্রস্তুত করে রেখেছে।
আষাঢ়ের এক ঘোর অমাবস্যার রাত। দিনভর একটানা মুষলধারে বৃষ্টির পর মেঘনা নদী যেন এক উন্মত্ত রাক্ষসীর রূপ ধারণ করেছে। বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় আশি কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। কালিন্দী চরের মেঠোপথগুলোতে হাঁটু সমান কাদা আর জল। নাবিলদের বাড়িটি ছিল চরের একেবারে প্রান্তসীমায়, নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের ঠিক তিনশত হাত দূরে। নদীর তীব্র গর্জন ঘরের ভেতর থেকেও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল,গুড়গুড়... হুশশশ!
রাত তখন আনুমানিক দুটো। নাবিলের ঘুম ভেঙে গেল ঘরের মাটির মেঝেতে বরফশীতল জলের স্পর্শে। সে চমকে বিছানা থেকে নেমে টর্চ জ্বালাল। মেঝের ওপর বইয়ের খাতা, জুতো সব ভাসছে। নদীর কালো জল দরজার তলা দিয়ে গলগল করে ঘরে ঢুকছে! নাবিলের বাবা জামিল সাহেব তখন ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় অচেতনপ্রায়। মা একা বাবাকে ধরে ওষুধ খাওয়াচ্ছিলেন।
নাবিল জানালার ভারী কাঠের কপাট খুলে বাইরে আলো ফেলল। আর আলো ফেলতেই তার হৃৎপিণ্ড এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল! নদীর সেই বিশালাকার মাটির প্রতিরক্ষা বাঁধের উত্তর কোণে অন্তত ত্রিশ হাত জায়গা ধসে গিয়ে ফাটল ধরেছে! বাঁধের মাটি ভেঙে বিশালাকার জলপ্রপাতের মতো মেঘনার প্রমত্ত জল ঢুকছে চরের দিকে। আর সেই জলের সরাসরি গতিপথ নাবিলদের নিচু বাড়িটির দিকে! যদি আগামী আধ ঘণ্টার মধ্যে পুরো বাঁধ ধসে যায়, তবে চরের অন্তত পঞ্চাশটি পরিবার এবং তাদের গবাদিপশু ঘুমের ঘোরেই অতল জলে ভেসে যাবে!
"সর্বনাশ!" নাবিলের মা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন। "নাবিল! দৌড়ে গ্রামে যা! বাঁধে মানুষ ডাক! তোর বাবার এই অবস্থায় আমরা ওকে নিয়ে হাঁটতে পারব না!"
নাবিল এক সেকেন্ডও নষ্ট করল না। সে লুঙ্গি মালকোঁচা মেরে, মাথায় গামছা বেঁধে ঝড়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
হাঁটু সমান জল আর কাদা ভেঙে, ঝোড়ো বাতাসের চাবুক সহ্য করে নাবিল দৌড়াতে দৌড়াতে চর-কালিন্দীর মূল বাজার আর আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে পৌঁছাল। সেখানে পাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় গ্রামের মাতব্বর রশিদ শিকদার, ক্লাবের বড় ভাইয়েরা এবং শুভসহ গ্রামের অনেকেই জেগে বসে ছিল নদীর খবর নেওয়ার জন্য। নাবিল হাঁপাতে হাঁপাতে বারান্দায় আছড়ে পড়ল। তার সারা শরীর কাদায় মাখামাখি, কপাল কেটে রক্ত পড়ছে, চোখে তীব্র আতঙ্ক।
সে চিৎকার করে হাতজোড় করে বলল, "রশিদ কাকা! ও শুভ ভাই... রফিক ভাই! দৌড়ান! বাঁধ ভেঙে গেছে! উত্তর ধারের বাঁধ ভেঙে জল ঢুকছে! আমাদের বাড়ি ভেসে যাচ্ছে, বাবা বিছানা থেকে উঠতে পারছে না! আপনারা বাঁশের খাঁচা আর বালুর বস্তা নিয়ে চলুন, নইলে পুরো চর আজ রাতে কবরে পরিণত হবে! বাঁচান আমাদের!"
নাবিল ভেবেছিল তার এই ভয়াল রূপ দেখে সবাই একযোগে কোদাল আর বল্লম নিয়ে ছুটবে। কিন্তু যা ঘটল, তা দেখে নাবিলের গলার রক্ত শুকিয়ে গেল। রশিদ শিকদার একমুখ তামাকের ধোঁয়া ছেড়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাসলেন। "কী রে নাবিল? নাটক করার আর সময় পেলি না? এই দুর্যোগের রাতেও তোর শয়তানি বুদ্ধি গেল না?"
নাবিল মাটিতে কপাল ঠুকে বলল, "আল্লাহর কসম কাকা! আমি এবার একটুও মিথ্যা বলছি না! সত্যিই বাঁধের ত্রিশ হাত ধসে গেছে! আমার বাবা মরে যাবে!" ক্লাবের বড় ভাই রফিক বিরক্ত হয়ে এক ধমক দিলেন, "চুপ কর ফাজিল ছেলে! গত মাসেও তুই মাঝরাতে চিৎকার করে বলেছিলি চরে ডাকাত পড়েছে, গ্রামের সব জোয়ান মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে তিন মাইল দৌড়ে গিয়ে দেখেছিল তুই ঘরে বসে হাসছিস! তোর বাবার জ্বর হয়েছে বলে তুই পুরো গ্রামকে মাঝরাতে জাগিয়ে তামাশা দেখবি?"
শুভ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এগিয়ে এসে খুব শীতল গলায় বলল, "নাবিল, যে মুখ দিয়ে তুই বিজ্ঞান মেলায় আমার ছয় মাসের স্বপ্নকে আগুন দিয়ে পুড়িয়েছিলি, যে মুখ দিয়ে তুই আমাকে চোর সাজিয়েছিলি,সেই মুখ দিয়ে তুই আর যা-ই বলিস, কোনো সত্য বের হতে পারে না। তুই এখন নাটক করছিস যাতে আমরা তোকে গুরুত্ব দিই।"
"শুভ! তুই বিশ্বাস কর! খোদার কসম শুভ!" নাবিল শুভর পা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে নাবিল তখন আর কোনো বিশ্বাসযোগ্য মানুষ নয়; সে এক প্রমাণিত, ধূর্ত প্রতারক। কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাল না। মাতব্বর বললেন, "যা, ঘরে গিয়ে ঘুমা। বাঁধের কোনো ক্ষতি হয়নি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোক বিকেলে দেখে গেছে।"
নাবিল চিৎকার করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সে বুঝতে পারল, তার অতীতের শত শত মিথ্যার পাপ আজ এক অভেদ্য লোহার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্য আজ তার মুখে উচ্চারিত হলেও তা মিথ্যার চেয়েও মূল্যহীন হয়ে গেছে! কোনো মানুষ আসবে না। কেউ তার কথায় বিশ্বাস করবে না। নাবিল নিজের চোখের জল মুছে একাকী অন্ধকারের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, এই বিপদের সৃষ্টি প্রকৃতি করলেও, এই অসহায়ত্বের সৃষ্টি তার নিজেরই হাতের তৈরি। যদি তার মিথ্যা বলার অতীত না থাকত, তবে এক ডাকে পুরো গ্রামের পঞ্চাশ জন মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ত তার পরিবারকে রক্ষা করতে।
"যদি আমার ভুলের কারণে আজ আমার বাবা-মা মারা যায়, তবে আমি আর বেঁচে থাকব না!" নাবিল দাঁতে দাঁত চেপে অন্ধকারের ভেতর আবার ছুটতে শুরু করল।
সে একাই সেই ভাঙা বাঁধের কাছে গিয়ে পৌঁছাল। জল তখন গর্জন করে ঢুকছে। মাটির বড় বড় চাঁই খসে পড়ছে। নাবিল নিজের দুর্বল কিশোর শরীর নিয়ে কাজে নেমে পড়ল। সে কাঁটার ঝোপ কেটে টেনে আনল, পাশের পরিত্যক্ত বাঁশঝাড় থেকে শুকনো বাঁশ এনে ভাঙা বাঁধের মুখে পুঁততে শুরু করল। নিজের পরনের গেঞ্জি খুলে মাটির বড় বড় চাপড়া বেঁধে সে ফেলল জলের ঘূর্ণিতে। কিন্তু জলের তোড়ে সব ভেসে যাচ্ছে। একটি বড় বাঁশের ডাল বসাতে গিয়ে বাঁশের চোখা প্রান্ত তার বাঁ হাতের তালু চিরে হাড় পর্যন্ত কেটে গেল।
তীব্র ব্যথায় সে চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কিন্তু সে থামল না। একহাতে মাটি আঁকড়ে ধরে সে জলের সামনে বুক পেতে শুয়ে পড়ল যাতে মাটির ক্ষরণ অন্তত এক মিনিট কমানো যায়। তার সারা শরীর ঠান্ডায় নীল হয়ে এলো, চোখের সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। ঠিক সেই মুহূর্তে, দূরের মেঠোপথ দিয়ে আলো নাচতে নাচতে এগিয়ে আসতে দেখা গেল।
আসলে স্কুলে নাবিল যখন শুভর পা ধরে কেঁদেছিল, শুভর মনে একটি সূক্ষ্ম খটকা লেগেছিল। শুভর বৈজ্ঞানিক মন বলছিল,নাবিল যতই মিথ্যা বলুক, মৃত্যুর এমন আদিম আতঙ্ক কোনো মানুষ একা অভিনয় করতে পারে না। শুভ চুপিসারে তার সাইকেল নিয়ে কাউকে কিছু না বলে বাঁধের দিকে ছুটে এসেছিল পরিস্থিতি দেখতে। বাঁধের কাছে এসে টর্চের আলো ফেলতেই শুভ স্তব্ধ হয়ে গেল।
বাঁধ সত্যি সত্যিই ভেঙে গেছে! আর সেই উন্মত্ত স্রোতের সামনে নিজের রক্তাক্ত শরীর দিয়ে মাটি আটকে একা পড়ে আছে নাবিল,অর্ধেক শরীর তার জলের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে! শুভ তার গলার সমস্ত শক্তি দিয়ে সাইকেলের বেল বাজিয়ে এবং পকেট থেকে সাইরেন হুইসেল বের করে পাগলের মতো সংকেত দিতে লাগল,টিইইইইট! টিইইইইট!
সেই সংকেতের শব্দে এবং শুভর আর্তচিৎকারে গ্রামের মানুষজন এবার সত্যি বিষয়টি বুঝতে পারল। কয়েক মিনিটের মধ্যে আলো, কোদাল আর বালুর বস্তা নিয়ে শত শত গ্রামবাসী ছুটে এলো বাঁধের দিকে। ঘণ্টাব্যাপী যুদ্ধের পর গ্রামবাসী বালুর বস্তা আর বাঁশের খাঁচা ফেলে কোনোমতে বাঁধটি রক্ষা করল। জামিল সাহেব এবং শায়লা বেগমকেও পানি বাড়ার আগেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হলো।
কিন্তু যখন বাঁধের মুখ থেকে নাবিলকে টেনে তোলা হলো, তখন সে সম্পূর্ণ অচেতন। তার হাত দিয়ে তখনো রক্ত ঝরছে, শরীরের তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে নেমে গেছে। পরদিন সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিছানায় যখন নাবিলের জ্ঞান ফিরল, তখন তার মাথার পাশে বসেছিলেন তার বাবা-মা এবং শিক্ষক কায়কোবাদ স্যার। আর তার বিছানার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল শুভ এবং ক্লাসের অন্যান্য বন্ধুরা।
নাবিল চোখ মেলে সবার দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো অহংকার নেই, কোনো মিথ্যার ছলচাতুরী নেই; কেবল উপচে পড়ছে এক সমুদ্র অনুশোচনা। সে ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতটি কোনোমতে তুলে শুভর হাত আঁকড়ে ধরল।
"শুভ..." নাবিলের কণ্ঠ দিয়ে কোনো স্পষ্ট স্বর বের হচ্ছিল না, কেবল কান্নার নোনা জল তার গাল বেয়ে বালিশে ঝরে পড়ছিল। "বিজ্ঞান মেলায় তোর রোবটের তারটা আমি কেটেছিলাম... কায়কোবাদ স্যারের ব্যাগে আমিই ঢিল ছুড়েছিলাম... আমি একটা জঘন্য অপরাধী! কাল রাতে আমি বুঝেছি শুভ... মানুষ যখন মিথ্যা বলে, তখন সে শুধু অন্যকে ঠকায় না, সে নিজের জন্য একটা জীবন্ত কবর খোঁড়ে। কাল রাতে তোরা কেউ আসিসনি, কারণ আমার মুখটাই ছিল একটা বিষাক্ত মিথ্যার কারখানা!"
নাবিল বিছানা থেকে নেমে কায়কোবাদ স্যার আর রশিদ মাতব্বরের পায়ে পড়তে গেল। কায়কোবাদ স্যার দ্রুত তাকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুইয়ে দিলেন। স্যারের নিজের চোখও তখন ভিজে উঠেছে।
"উঠে বসো নাবিল," কায়কোবাদ স্যার শান্ত গলায় বললেন। "তুমি কাল রাতে নিজের জীবন বাজি রেখে যে সাহস দেখিয়েছ, তাতে তোমার ভেতরের সব পাপ ধুয়ে গেছে। তবে একটা জিনিস তুমি সারা জীবন মনে রাখবে,মিথ্যা হলো এক মারাত্মক ঋণ। সাময়িকভাবে তা তোমাকে হয়তো জয়ী দেখাবে, কিন্তু যখন তার সুদ সমেত আসল ফেরত দেওয়ার সময় আসে, তখন মানুষের মান-সম্মান, বিশ্বাস এবং বেঁচে থাকার সব অধিকার নিঃস্ব হয়ে যায়।"
শুভ এগিয়ে এলো। সে নিজের পকেট থেকে একটি ছোট মেডেল বের করল,যা সে বিজ্ঞান মেলার দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিল। শুভ সেই মেডেলটি নাবিলের বালিশের পাশে রেখে একগাল হাসল।
"আমি তোকে ক্ষমা করে দিয়েছি নাবিল। কাল রাতে যদি তুই একা ওই বাঁধের মুখে নিজের শরীর পেতে না দিতিস, তবে পুরো কালিন্দী চর ভেসে যেত। তুই বিজ্ঞানী হতে পেরেছিস কি না জানি না, কিন্তু কাল রাতে তুই খাঁটি মানুষ হয়ে উঠেছিস।"
নাবিল কেঁদে ফেলল। সে সেই মেডেলটি নিজের বুকে চেপে ধরে মনে মনে এক চিরন্তন প্রতিজ্ঞা করল।
সেই দিনের পর থেকে চর-কালিন্দীর মানুষ আর কোনোদিন সেই পুরোনো নাবিলকে দেখেনি। সে তার পড়ার টেবিল থেকে সেই মিথ্যার সোনার ক্রেস্টটি নামিয়ে নদীতে বিসর্জন দিয়েছিল। সে আর কোনোদিন কোনো কথা বাড়িয়ে বলেনি, কোনো অজুহাত তৈরি করেনি।
নাবিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক সত্যটি নিজের হৃদয়ে লিখে নিয়েছিল,মিথ্যা সাময়িকভাবে হয়তো বাহবা আর ফাঁকা সম্মান এনে দিতে পারে, কিন্তু তার চূড়ান্ত পরিণতি হলো চরম নিঃসঙ্গতা ও বিশ্বাসহীনতার এক ভয়ংকর অন্ধকার। আর সত্য যতই কঠিন হোক না কেন, তা সবসময় মানুষকে মুক্তি, আত্মসম্মান এবং আলোকের অনন্ত পথে প্রতিষ্ঠিত করে।