ফরিদপুরের সালথা থানার অজপাড়াগাঁও বালিয়াচর। পদ্মার শাখা কুমার নদ গাঁয়ের পাশ দিয়া এঁকেবেঁকে বইয়া গেছে। আষাঢ়ের মাঝামাঝি সময়। নদের পানি থৈ থৈ করতাছে। চারিপাশে সবুজ পাটক্ষেতের ডগায় বাতাস লাইগা মৃদু ঢেউ খেলতাছে। পশ্চিমের আসমানে তখন সিঁদুরে মেঘের খেলা। সূর্যের লাল আভাটা কুমার নদের কালচে পানির উপর পইড়া চিকচিক করতাছে। নদের দক্ষিণ পাড়ে বুড়ো পাকুড় গাছের তলায় মাটির কলসি কাঁখে নিয়া থমমারে খাড়াইয়া আছিল ময়না।
বয়স তার এই আঠারো কি উনিশ। শ্যামলা বরণ মুখখানি তার যেমন মায়াবী, তেমনই টানা টানা ডাগর চোখ দুটি। গায়ের রঙ রোদে পোড়া তামার মতো চকচকে, কিন্তু সেই চেহারায় এমন এক নিষ্পাপ সৌন্দর্য আছে যা দেখলে চোখ জুড়াইয়া যায়। ময়নার পরনে একটা সাদামাটা সুতি শাড়ি, আঁচলটা কোমরে জড়ানো। সে উতালা চোখে পাটক্ষেতের আইলের দিকে চাইয়া আছিল।
খানিক বাদেই পাটগাছের পাতা সরাইয়া আইলের পথ দিয়া এক যুবক তরতর কইরা নাইমা এলো। গায়ে একটা ঘামে ভেজা হাফ হাতা গেঞ্জি, পরনে নীল লুঙ্গি মালকোঁচা মারা। হাতে মাছ ধরার একটা ছোট পোলো আর কাঁধে গামছা। নাম তার মেহেদী। মেহেদী এই গাঁয়েরই করিম শেখের পোলা। করিম শেখ গত হইছে বছর তিনেক আগে। তারপর থেইকা সংসারের হাল মেহেদীর কাঁধেই। নিজের বলতে বিঘে দুয়েক নিচু জমি আর একখান ভাঙাচোরা টিনের চালা। কিন্তু মেহনতি মেহেদীর শরীরের পেশিগুলো লোহার মতো শক্ত, মনটা কুমার নদের পানির মতোই খাঁটি আর চকচকে।
ঘাটের কাছে আইসা মেহেদী চারিপাশে চোখ বুলাইয়া নিল। কাউরে না দেইখা ফিসফিস কইরা কলো, "ময়না! দেরি কইরা ফেলাইলাম রে। ওই গেরামের মাতব্বর বাড়ির সামনের জমি নিড়াইতি আছিলাম। বড় মাতব্বর জব্বার শিকদার আজ সকাল থেইকা কেমন জানি খ্যাঁকখ্যাঁক করতাছে। ক্যামনে যে জান বাঁচাইয়া ছুটি পাইছি, আমিই জানি।"
ময়না কলসিটা শানবাঁধানো ভাঙা পাড়ে নামাইয়া রাখল। তার চোখে একরাশ অভিমান আর ডর জড়াইয়া গেল। সে কাঁপা গলায় কইল, "মেহেদী ভাই, আমার পরাণডা আইজ সকাল থেইকা কেবল কু ডাকতাছে। তুমি আর এই চরে আইসো না। মাতব্বরের ছোট ভাই আক্কাশ কাল সাঁঝে আমাগো বাড়ির পেছনে ঘুরঘুর করতাছিল। আমারে দেইখা কেমন জানি বিশ্রী হাসলো। আমার ডর করে রে মেহেদী!"
মেহেদী এক পা আগাইয়া এলো। ময়নার হাতখানা নিজের খসখসে মেহনতি হাতের তালুতে তুলে নিল। রক্তের ভেতর এক অজানা কাঁপন দিয়া গেল দুজনেরই।
"ডরালে কি পিরীত বাঁচে ময়না?" মেহেদী শান্ত কিন্তু গভীর গলায় কলো। "আমি তোরে ভালোবাসি রে ময়না। এই কুমার নদের পানি যত দিন বইব, তত দিন এই মেহেদীর জানের ভেতর তুই থাকবি। আমি দিনরাত খাটি ক্যান ক তো? সামনের অঘ্রানে নতুন ধান উঠলে মাতব্বরের কাছে গিয়া হাত পাতমু। তোর বাবারে কইয়া নিকাহর কথা তুলমু। তুই শুধু আমার উপর ভরসা রাখ।"
ময়নার চোখের পাতা ভিইজা এক ফোঁটা নোনা পানি কপোল বাইয়া টুপ কইরা পড়ল মেহেদীর হাতের উপর। সে দীর্ঘশ্বাস ফেইলা কলো, "ভরসা তো তোমারে অন্ধের মতো করি রে। কিন্তু তুমি আমাগো গেরামের মাতব্বরগো চেনো না। ওগো চোখে গরিবের মুখের হাসিও একখান অপরাধ। আমাগো এই চাওয়া যে ওগো বিচারে পাপ হয়া যাইব!"
বাতাসে তখন পাটপাতার শনশনানি আরও বাড়ল। দূর থেইকা ভেসে এলো মাগরিবের আজানের ধ্বনি। ময়না তড়িঘড়ি কইরা কলসিতে পানি ভইরা নিল। মেহেদীর মুখের পানে শেষবারের মতো এক আকুল চাহনি দিয়া সে মেঠোপথ ধইরা বাড়ির দিকে পা বাড়াইল।
মেহেদী ঠায় দাঁড়াইয়া রইল সেই পাকুড় তলায়। সে খেয়াল করল না, ঘাটের অদূরে ঘন কাশঝোপের আড়াল থেইকা দুটি কুটিল চোখ তাদের প্রতিটি নড়াচড়া সাপের মতো গিলতাছিল। সেই চোখজোড়া ছিল মাতব্বর জব্বার শিকদারের বিশ্বস্ত চামচা কদমালীর।
বালিয়াচর গ্রামে আইনের কোনো থানা-পুলিশ খাটে না। এই তল্লাটের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হলেন আলহাজ্ব জব্বার শিকদার। বয়স ষাটের কোঠায়। মাথায় সাদা জালি টুপি, পরনে মিহি খদ্দরের পাঞ্জাবি, আর চোখের নিচে ঝুলন্ত মাংসপিণ্ড। মুখে এক গাল মেহেদি দেওয়া লাল দাড়ি। জব্বার শিকদার এই এলাকার বড় জোতদার। হাজার বিঘে জমির মালিক, গাঁয়ের সুদ-দাদন, হাট-বাজার সবকিছু তাঁর আঙুলের ইশারায় চলে। কেউ তাঁর কথার উপর কথা কইলে তার ভিটেমাটি নদে ভাইসা যায়। তাঁর সাথে দোসর হইয়া থাকে গাঁয়ের মুরুব্বি ও সালিশদাররা, যেমন মকবুল মোল্লা আর খালেক মাতব্বর।
সেদিন রাতে জব্বার শিকদারের বিশাল কাচারি ঘরে তামাকের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকাইয়া উঠতাছিল। পিতলের হুঁকোয় টান দিয়া জব্বার শিকদার গম্ভীর মুখে বইসা আছিলেন। সামনে মোড়ার উপর বসা তাঁর খালাতো ভাই আক্কাশ শিকদার, গাঁয়ের বখাটে ও সুযোগসন্ধানী লোক।
কদমালী হাঁপাইতে হাঁপাইতে কাচারি ঘরে ঢুইকা মাটিতে বইসা পড়ল।
"কর্তা! মোক্ষম খবর আনছি!" কদমালী দাঁত কেলাইয়া কলো।
জব্বার শিকদার হুঁকোর নল মুখ থেইকা সরাইয়া চোখ ছোট কইরা তাকাইলেন। "কী দেখলি কদমালী? ঠিকঠাক খবর তো?"
"একদম জলজ্যান্ত সত্য কর্তা!" কদমালী হাত কচলানি দিয়া কলো, "মাগরিবের ঠিক আগে কুমার নদের পাকুড় তলায় করিম শেখের ছ্যাওড়া মেহেদী আর ওই রহম আলীর ছুড়ি ময়না হাত ধরাধরি কইরা ফিসফিসানি করতাছিল। ছুড়িডার ভাবসাব সুবিধার না। দুজনে পিরীতের শলা করতাছে।"
একথা শোনামাত্র একপাশে বসা বুড়ো হাজী শামসুদ্দিন নড়েচড়ে বসলেন। হাজী শামসুদ্দিনের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। চুল-দাড়ি সব সাদা হইয়া গেছে, দাঁত পড়েছে অর্ধেকের বেশি, চামড়ায় ভাঁজ পইড়া থলথলে অবস্থা। কিন্তু মেজাজটা এখনো লম্পট। গত বছর তার তৃতীয় স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই সে এক তরুণী রূপসী নারী ঘরে তোলার ফন্দি আঁটছিল। রহিম আলীর দেনার দায় ছিল শামসুদ্দিনের গদিতে।
শামসুদ্দিন তার খকখকে কাশিতে গলা পরিষ্কার কইরা কইল, "নাউজুবিল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! গাঁয়ের মায়াপোলারা এমন নাফরমানি কাম শুরু করছে? জব্বার ভাই, এই পাপ যদি গেরামে বাড়তে দেন, তয় আসমান থেইকা গজব নাজিল হইব! চরের মেয়েমানুষ এমনে ভিন পুরুষের হাত ধরে?"
জব্বার শিকদারের ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক ক্রূর হাসি ফুটা উঠল। তিনি আসলে সুযোগ খুঁজছিলেন। রহিম আলীর ভিটের সামনের এক একর নিচু জমির উপর শিকদারদের অনেক দিনের নজর। আর মেহেদী ছোকরাটা সোজা কথা কয়, খাজনা দিতে দুদিন দেরি হইলে চোখের দিকে চাইয়া কথা কয়, এই তেজ জব্বার শিকদারের সহ্য হচ্ছিল না।
"রহিম আলী তো শামসু ভাইর দেনাদার," জব্বার শিকদার শান্ত কিন্তু বিষাক্ত গলায় কইলেন। "আর ময়না মেয়েটা ডাগর হইছে। শামসু ভাই, তোমার একাকী সংসার। রহিমারে কইয়া ময়নারে তোমার ঘরে দিলে কেমন হয়? ঋণও শোধ হইব, আবার একখান অনাচার থেইকা গেরামটাও রক্ষা পাইব!"
হাজী শামসুদ্দিনের বুড়ো চোখ দুটো চকচক কইরা উঠল। সে হাতজোড় কইরা কইল, "জব্বার ভাই, আপনি যা ভালো বোঝেন। আমি তো শুধু ধর্মের হেফাজতের লাইগা রাজি আছি। সমাজডা তো বাঁচাতে হইব!"
জব্বার শিকদার সশব্দে তামাকের ধোঁয়া ছাইড়া হুকুম দিলেন, "কদমালী! কাল আসরের পর পঞ্চায়েত ডাকবি। বটের তলায় সালিশ বসবে। রহিমালী আর মেহেদী দুইটাকেই টাইন্যা হিঁচড়াইয়া হাজির করবি। গেরামের সালিশ কারে কয়, কাল ওই বাঘের বাচ্চারে বুঝাইয়া দিমু!"
পরদিন আসরের ওয়াক্ত পার হইয়া গেছে। বালিয়াচর প্রাইমারি স্কুলের পাশের শতবর্ষী বটগাছের নিচে তেরপল বিছানো হইছে। চরের শ'দুয়েক মানুষ গোল হইয়া জড়ো হইয়াছে। বাতাসে কেমন যেন এক থমথমে উত্তেজনা। সবাই জানে, মাতব্বরের সালিশ মানেই কারও না কারও সর্বনাশ। কিন্তু মুখ ফুটার সাহস কারোরই নাই। বটের মূলের কাছে বড় একখান কাঠের চেয়ারে বসছেন প্রধান সালিশদার জব্বার শিকদার। তাঁর ডানে মকবুল মোল্লা, বাঁয়ে লম্পট হাজী শামসুদ্দিন। চারিপাশে বাঁশের লাঠি হাতে খাড়াইয়া আছে শিকদার বাড়ির পনেরো-বিশজন তাগড়া লাঠিয়াল।
সালিশের ঠিক মাঝখানে ধুলোবালির ওপর মাথা নিচু কইরা বসাইয়া রাখা হইছে রহিম আলীকে। রহিম আলীর চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়তাছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে জড়সড় হয়ে কাঁপছিল ময়না। ময়নার মাথায় আধো ঘোমটা টানা, বুকটা যেন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করতাছিল। আর দশ হাত দূরে দুই লাঠিয়াল শক্ত কইরা ধইরা রাখছে মেহেদীকে। মেহেদীর পরনের গেঞ্জিটা ছেঁড়া, কপালে চোটের দাগ। সকালে তাকে মাঠ থেইকা মারতে মারতে তুইল্যা আনা হইছে। কিন্তু এত মারের পরেও মেহেদীর ঘাড় বাঁকা হয় নাই; তার চোখ জ্বলতাছিল ক্ষোভে আর অপমানে।
জব্বার শিকদার গলার খকখকানি দিয়া সালিশের এজলাস শুরু করলেন।
"শোনেন বালিয়াচরের মুরুব্বিয়ান আর ভাই সকল!" জব্বার শিকদারের কর্কশ আওয়াজ গমগম কইরা উঠল। "আজ আমাগো গেরামে বড় এক লজ্জার দিন। এই পবিত্র মাটির একটা পর্দা আছে, একটা শরীয়তি কানুন আছে। কিন্তু করিম শেখের বখাটে পোলা মেহেদী আর এই রহিমালীর মেয়ে ময়না দিনের পর দিন নদীর ঘাটে নির্জনে অনৈতিক মেলামেশা কইরা আমাগো গেরামের ইজ্জত ধুলোয় মিশাইয়া দিছে! কদমালী নিজের চোখে তাদের নাফরমানি দেখছে!"
গ্রামের মানুষদের ভেতর চাপা গুঞ্জন উঠল। কেউ কেউ ছিঃ ছিঃ কইরা উঠল, আবার অনেকেই চুপ মাইরা রইল, কারণ তারা জানত আসল খেলা কী।
মেহেদী নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা কইরা চিৎকার দিয়া উঠল, "মিথ্যা কথা! একদম ডাহা মিথ্যা কথা মাতব্বর সাব! আমি ময়নারে কোনো খারাপ নজরে দেহি নাই। আমরা দুজন দুজনাবে ভালোবাসি। আমি ময়নারে সততার সাথে নিজের ঘরে নিকাহ কইরা তুলতে চাইছিলাম! এতে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হইছে মাতব্বর সাব?"
"চুপ কর শুয়োরের বাচ্চা!" এক লাঠিয়াল মেহেদীর পিঠে সজোরে এক লাঠির বাড়ি বসাইল। মটাশ!
মেহেদী ব্যথায় কুঁকড়ে গেল, কিন্তু চোখ নামাল না।
ময়না কান্নায় ভাইঙ্গা পইড়া দুই হাত জোড় কইরা জব্বার শিকদারের পায়ের কাছে আছড়ে পড়ল। "মাতব্বর চাচা! আল্লার দোহাই লাগে ওরে মাইরেন না! মেহেদী ভাইর কোনো দোষ নাই। দোষ যদি থাকে আমারে দেন। আমরা কোনো পাপ কাম করি নাই চাচা!"
জব্বার শিকদার এক ঝটকায় নিজের পা সরাইয়া নিলেন। মুখে এক বিকৃত অবজ্ঞার ছাপ।
"শুনলেন মুরুব্বি সমাজ?" জব্বার শিকদার মকবুল মোল্লার দিকে তাকাইলেন। "মেয়েমানুষের তেজ দেখছেন? ভরা মজলিসে পরপুরুষের লাইগা কান্দে! এমন মেয়ে থাকলে গেরামের আর দশটা মেয়ের চরিত্র নষ্ট হইব। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার কি না?"
মকবুল মোল্লা দাড়ি নাড়িয়া সায় দিলেন, "অবশ্যই শিকদার ভাই! ব্যভিচারের বীজ অঙ্কুরেই বিনাশ করতে হইব। আপনি যে ফয়সালা দিবেন, সেটাই শরিয়ত।" জব্বার শিকদার এবার রায় ঘোষণার ভঙ্গিতে খাড়াইলেন। তাঁর কণ্ঠের বিষে যেন পুরো বাতাস বিষাক্ত হইয়া উঠল।
"সালিশের ফয়সালা শোন সবাই! এক নম্বর—মেহেদী সমাজের রীতিনীতি ভাইঙ্গা যুবসমাজকে বিপথে নিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছে। তার শাস্তি, একশত জুতার বাড়ি এবং আগামী বিশ মিনিটের মধ্যে এই বালিয়াচর গ্রাম থেইকা তারে চিরতরে ত্যাজ্য করা হইলো! এই গেরামের মাটিতে সে আর কোনোদিন পা রাখতে পারবে না। যদি পা রাখে, তার ঠ্যাং কাইটা নদীতে ভাসাইয়া দেওয়া হইব!"
মেহেদী স্তব্ধ হইয়া তাকাইল। এ যেন জ্যান্ত মানুষের ফাঁসির রায়! ভিটেমাটি, বাপের কবর, শৈশবের নদী—সবকিছু এক নিমেষে পর হইয়া গেল!
"আর দুই নম্বর ফয়সালা " জব্বার শিকদার ময়নার দিকে আঙুল তুললেন, "ময়নার চরিত্র কলঙ্কিত হইছে। এমন মেয়ের অন্য কোথাও বিয়া হইব না। কিন্তু রহিম আলীর দেনার কথা বিবেচনা কইরা এবং এই মেয়ের পবিত্রতা রক্ষার লাইগা আমাদের শ্রদ্ধেয় হাজী শামসুদ্দিন সাহেব তারে চতুর্থ স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হইছেন। দেনার সমস্ত টাকা শামসু ভাই মাফ কইরা দিবেন। আইজ মাগরিবের বাদেই কাজি ডাইকা এই বটের তলেই ময়নার নিকাহ সম্পন্ন হইব!"
"নাআআআ!" ময়না বুকফাটা এক চিলকার দিয়া উঠল। "আল্লারে... এ কেমন বিচার! ও মাতব্বর সাব, আমারে বিষ দেন, আমারে নদীতে ডুবাইয়া মারেন! কিন্তু ওই বুড়োর গলায় আমারে ঝুলাইয়েন না! বাবা, ও বাবা! তুমি কিছু কও বাবা!"
রহিম আলী মাটিতে কপাল ঠুকিয়া ডুকরাইয়া কাঁদতে লাগল, কিন্তু মুখ খুলল না। মাতব্বরের লাঠির ভয় আর দেনার শোধের বোঝা তার জবান বন্ধ কইরা দিছিল।
চারজন জোয়ান ছেলে মেহেদীকে জোর কইরা মাটিতে শোয়াইয়া জুতোপেটা শুরু করল। এক... দুই... তিন...
প্রতিটি আঘাতের সাথে সাথে ময়না বুক চাপড়াইয়া চিৎকার করতে লাগল। মেহেদীর শরীর রক্তে ভাইসা গেল, কিন্তু সে টু শব্দটি করল না। সে কেবল রক্তচক্ষু দিয়া তাকাইয়া রইল জব্বার শিকদার আর লম্পট শামসুদ্দিনের দিকে। মার শেষ হইলে লাঠিয়ালরা রক্তমাখা মেহেদীকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেল চরের খেয়াঘাটের নৌকায়। মাঝিকে হুকুম দেওয়া হলো ওপারে ফরিদপুরের সীমানায় নামাইয়া দিতে।
নৌকা যখন ঘাট ছাড়ল, মেহেদী রক্তাক্ত হাতে কুমার নদের পানির দিকে চাইয়া রইল। দূর থেইকা ভেসে আসছিল ময়নার শেষ আকুল চিৎকার—"মেহেদী ভাইরেএএএ!" তারপর সবকিছু নিস্তব্ধতায় ডুইবা গেল।
মাগরিবের নামাজের পরপরই বটের তলায় হ্যাজাক বাতি জ্বালানো হইলো। গ্রামের কাজি সাহেবকে আগেই ডাকাইয়া রাখা হইছিল। কাজি সাহেব একখানা সাদা কাগজের ওপর কলম ঘষতে ঘষতে গম্ভীর মুখে বইসা রইলেন। ময়নাকে ধরে এনে বসানো হলো একখানা লাল সুতি চাদরের ওপর। তার মুখে কোনো ঘোমটা আছিল না, তার চোখ দুটো যেন গর্তে ঢুইকা গেছে। চোখের সমস্ত অশ্রু শুকাইয়া গিয়ে সেখানে এক পাথরচাপা স্তব্ধতা জমাট বাঁধছে।
হাজী শামসুদ্দিন নতুন ধুতি আর পায়জামা পইড়া পান চিবাইতে চিবাইতে দাঁত কেলিয়ে বইসা আছিল। তার বয়স সত্তর ছুঁইছুঁই, ময়নার বাবার চেয়েও অন্তত দশ বছরের বড়।
"কও মা, কবুল কও," কাজি সাহেব নিরুত্তাপ কণ্ঠে কইলেন।
ময়না পাথর হইয়া রইল। তার মুখ দিয়া কোনো কথা বের হইলো না।
জব্বার শিকদার পাশ থেইকা নিচু গলায় হিসহিস কইরা উঠলেন, "রহিমালী, মেয়েরে বুঝাও। নইলে তোমার ভিটা কিন্তু আইজ রাতেই নিলাম হইব!"
রহিম আলী কাঁপতে কাঁপতে মেয়ের পিঠে হাত রাখল। "মা রে... আমার বংশের মুখে চুনকালি দিস না মা... কবুল বইলা দে... গরিবের মাইয়া হইয়া জন্ম নিছস, তর আবার পছন্দ কি রে মা..."
ময়না বাপের দিকে তাকাইল। সেই চোখে কোনো ঘৃণা ছিল না, ছিল এক মহাসমুদ্র পরিমাণ করুণা আর জীবনের প্রতি চরম বিতৃষ্ণা। সে উপলব্ধি করল, এই সমাজে গরিবের মেয়ের ভালোবাসার কোনো অধিকার নাই। তাদের শরীর আর মন সমাজের মাতব্বরদের দাবা খেলার ঘুঁটি ছাড়া আর কিছুই নয়। তিনবার জবরদস্তিমূলক সম্মতির ভান কইরা কাজি সই নিয়া নিল। বিয়ে সম্পন্ন হইয়া গেল।
সেই রাতেই ময়নাকে নিয়া যাওয়া হইলো হাজী শামসুদ্দিনের বিশাল টিনের অন্দরমহলে।
ঘরের ভেতরে একখানা বড় খাট। খাটের ওপর পুরোনো আমলের তোশক পাতা। ঘরের এক কোণে টিমটিম কইরা কেরোসিনের কুপি জ্বলতাছিল। বাতাসে চামচিকার বিষ্ঠা আর শামসুদ্দিনের মুখের পচা জর্দার দুর্গন্ধ পাক খাইতাছিল।
শামসুদ্দিন ঘরে ঢুইকা দরজার খিলটা সশব্দে আটকাইয়া দিল। ময়না খাটের এক কোণে জড়সড় হইয়া মাটির পুতুলের মতো বইসা আছিল। শামসুদ্দিন তার লোলুপ বুড়ো হাতখানা বাড়াইয়া ময়নার থুতনি ধইরা মুখটা উঁচা করার চেষ্টা করল।
"কী রূপ গো বউ তোমার!" শামসুদ্দিন খকখক কইরা হাইসা উঠল। "মেহেদী ছোকরা কি তোমারে এমন সুখে রাখতে পারত? আমি তোমারে রূপার গহনা দিমু, পেট ভইরা ভাত দিমু। খালি আমার সেবা করবা।"
ময়না এক ঝটকায় নিজের মুখ সরাইয়া নিল। তার চোখের দৃষ্টিতে এমন এক অচেনা, তীব্র বহ্নিশিখা জ্বইলা উঠল যা দেখে শামসুদ্দিনের মতো ধূর্ত বুড়োও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
"আমার শরীরে হাত দিবেনা বুড়ো!" ময়নার কণ্ঠ দিয়া যেন বরফশীতল বিষ ঝইরা পড়ল। "জোর কইরা সমাজ দিয়া আমারে কিনছো ঠিকই, কিন্তু মনে রাইখো, এই চামড়ার দেহটা হয়তো পাইবা, কিন্তু ময়নার পরাণডা সেই কুমার নদের জলেই মেহেদী ভাইর লগে ভাইসা গেছে। তোমার ঘরে আমি এক জ্যান্ত লাশ হইয়া থাকমু, আর প্রতিদিন আল্লার আরশের কাছে তোমার আর মাতব্বরের বিনাশের বিচার চামু!"
শামসুদ্দিনের মুখের হাসি মিলাইয়া গেল। সে রাগে গজগজ করতে করতে খাটের অন্য প্রান্তে গিয়া শুইয়া পড়ল।
সেই কালরাতে ঘরের চালের ওপর দিয়া এক নিশাচর পেঁচা কর্কশ গলায় ডাইকা উঠল। আর ময়না সারারাত জানালার শিক ধইরা অন্ধকারের দিকে চাইয়া রইল, যেখানে দূরবর্তী কোনো চরে হয়তো একলা রক্তমাখা শরীরে বাঁইচা থাকার লড়াই করতাছিল তার মেহেদী।
পরের তিনটে বছর বালিয়াচর গ্রামের ওপর দিয়া কেমন যেন এক অভিশপ্ত মেঘের মতো কাইটা গেল। মেহেদী আর ফেরেনি। কেউ বলত সে শহরে গিয়া কুলিগিরি করে, কেউ বলত সে ক্ষোভে-দুঃখে নদে ঝাঁপ দিয়া মরছে। কিন্তু ময়না জানত, মেহেদী মরতে পারে না। মেহেদী বেঁচে আছে তার অন্তরের দহনে।
এদিকে হাজী শামসুদ্দিনের ঘরে ময়নার দিন কাটছিল যেন এক নরককুণ্ডে। সে কোনোদিন হাসত না, কারও সাথে কথা কইত না। সকাল থেইকা রাত পর্যন্ত দাসীর মতো কাজ করত, ধান ভানত, গরু চরাত, রান্নাবাড়া করত। কিন্তু তার সেই টানা টানা ডাগর চোখের ভাষা ছিল মৃত মানুষের মতো স্থির। শামসুদ্দিন ময়নার এই নীরবতায় ভয় পাইত। কোনো কোনো রাতে মদ গিলে মাতাল হইয়া সে ময়নার ওপর চাবুক চালাত, কিন্তু ময়নার মুখ দিয়া কোনো ‘উহ্’ শব্দও বের হইতো না। কেবল নীরবে চোখের জল ফেলত।
ময়নার এই নিঃশব্দ কান্না যেন এক অদৃশ্য বিষবাষ্প হইয়া বালিয়াচরের বাতাসে ছড়াইয়া পড়তাছিল। আর মাতব্বর জব্বার শিকদার? তাঁর অহংকার তখন আসমান ছুঁইছে। মেহেদীকে তাড়ানোর পর এবং রহিম আলীর জমি দখল করার পর তাঁর লোভ আরও বাইড়া গেল। তিনি এবার চরের সাধারণ কৃষকদের ফসলের ওপর অতিরিক্ত খাজনা বসাইলেন। যে কৃষক ধান দিতে দেরি করত, তার গরু ধইরা আনতেন। যুবকদের সামান্য অপরাধে সালিশ বসাইয়া জরিমানা আর মারধোর নিত্যদিনের ব্যাপার হইয়া দাঁড়াল।
কিন্তু ইতিহাসের এক অলিখিত কানুন আছে, অত্যাচারের পাত্র যখন পূর্ণ হইয়া উপচাইয়া পড়ে, তখন তার পতন ঘটে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত দিক থেইকা।
সে বছর আশ্বিন মাসে চরে নেমে এলো এক ভয়াল বন্যা।পদ্মা আর কুমার নদ এক হইয়া গেল। বাঁধ ভাইঙ্গা চরের পর চর প্লাবিত হইলো। জব্বার শিকদারের ধানের গোলাগুলো সব পানির তলায় চইলা গেল। কিন্তু আসল বিপদ এলো অন্য দিক থেইকা। সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক তদন্ত দল এলো ফরিদপুরের সেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে।
নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের এক পুরোনো মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের টিম ফরিদপুর জেলা পুলিশকে সাথে নিয়া তল্লাশি শুরু করল। আর সেই দুর্নীতির মূল হোতা হিসেবে নাম উঠল স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং তাঁর মূল দোসর এই জব্বার শিকদারের! জব্বার শিকদার ভেবেছিলেন তাঁর লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে তিনি আগের মতোই সব ধামাচাপা দিবেন। কিন্তু এবার আর গ্রামের নিরক্ষর সাধারণ মানুষ নয়; এবার সামনে খাড়াইয়াছিল স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্র।
কার্তিক মাসের এক স্নিগ্ধ সকালে বালিয়াচর চরে মানুষের ভিড় জমল আবার সেই শতবর্ষী বটগাছের নিচে। তবে আজকের পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন। বটের তলায় আজ কোনো জব্বার শিকদারের কাঠের চেয়ার নাই। চত্বরে দাঁড়িয়ে আছে জেলা প্রশাসনের তিনটি কালো রঙের গাড়ি এবং জেলা পুলিশের এক বিশাল সশস্ত্র দল। তাদের সাথে আছেন তরুণ এক ম্যাজিস্ট্রেট এবং ফরিদপুর জেলা পুলিশের একজন সিনিয়র সার্কেল এসপি।
আর সেই সরকারি কর্মকর্তাদের ঠিক পাশে, একজন দক্ষ সিভিল কন্ট্রাক্টর এবং সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের অফিসার হিসেবে স্যুটেড-বুটেড হইয়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক দীর্ঘদেহী যুবক। তার উজ্জ্বল চোখ, আত্মবিশ্বাসী চেহারা আর চিবুকের সেই পুরোনো ক্ষতচিহ্নটি স্পষ্ট চেনা যাচ্ছিল।
সে আর কেউ নয়,সেই বিতাড়িত, রক্তাক্ত মেহেদী! গ্রামের মানুষ ফিসফিস কইরা উঠল, "আরে! এ তো করিম শেখের পোলা মেহেদী রে! এ কী বেশে আইছে!"
মেহেদী গ্রাম থেইকা বিতাড়িত হইয়া ঢাকায় গিয়ে দিনমজুরি করতে করতে হার মানে নাই। সে এক সমাজসেবী প্রকৌশলীর নজরে পইড়া কারিগরি শিক্ষায় ডিপ্লোমা পাশ করেছিল। তারপর এক বড় কনস্ট্রাকশন ফার্মে নিজের মেধা ও সততা দিয়া বড় পদ অর্জন করেছিল। সে ফিরে এসেছে, সরকারি নদীভাঙন রোধ প্রকল্পের প্রধান টেকনিক্যাল অফিসার হিসেবে, সাথে নিয়ে এসেছে শিকদারদের বহু বছরের দুর্নীতির অকাট্য নথিপত্র!
গ্রামের মানুষ দেখল, পুলিশের হ্যান্ডকাফ পরা অবস্থায় সেই বটতলায় টেনেহিঁচড়ে আনা হইছে মাতব্বর জব্বার শিকদার, তাঁর ভাই আক্কাশ শিকদার এবং লম্পট হাজী শামসুদ্দিনকে!
জব্বার শিকদারের মাথার টুপি খইসা পড়ছে, পরনের খদ্দরের পাঞ্জাবি ধুলোয় মাখামাখি। যে মানুষটির সামনে কোনোদিন কেউ চোখ তুইলা কথা কইতে পারত না, তিনি আজ পুলিশের বুটের সামনে কাঁপতাছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট মাইক্রোফোনে ঘোষণা করলেন:
"বালিয়াচর গ্রামবাসী! সরকারের নদী রক্ষা প্রকল্পের দশ কোটি টাকা আত্মসাৎ, জোরপূর্বক কৃষকদের জমি দখল, জাল দলিল তৈরি এবং সমাজে নারীদের ওপর মধ্যযুগীয় বর্বর নির্যাতন চালানোর দায়ে জব্বার শিকদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এই তথাকথিত মাতব্বরদের ব্যক্তিগত আদালত বা বেআইনি সালিশি প্রথা আজ থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো!"
গ্রামের শত শত শোষিত কৃষক, যাদের ভিটেমাটি এই শিকদাররা কেড়ে নিয়েছিল, তারা একযোগে উল্লাসে ফেটে পড়ল।
"বিচার চাই! জব্বার শিকদারের ফাঁসি চাই!"
সেই আকাশ-বাতাস কাঁপানো চিৎকারে বটের প্রাচীন ডালপালাগুলো পর্যন্ত থরথর কইরা কেঁপে উঠল। জব্বার শিকদার বুঝতে পারলেন, যে ভয়কে পুঁজি কইরা তিনি সাম্রাজ্য গড়েছিলেন, সেই ভয় আজ সাধারণ মানুষের ক্ষোভে পরিণত হইয়া তাঁর পায়েই আছড়ে পড়ছে।
ভিড়ের এক কোণে, ধুলোমাখা শাড়ির আঁচল মাথায় টেনে দাঁড়িয়েছিল এক নিঃস্ব নারী। ময়না।
কত বছরের নির্মম নির্যাতনে তার শরীরের সেই রূপ-লাবণ্য অনেকটাই ম্লান হইয়া গেছে। কিন্তু চোখের সেই প্রখর দৃষ্টি আজও অক্ষত ছিল। সে বিস্ফারিত চোখে তাকাইয়া দেখতাছিল সেই দৃশ্য। যেই বটের তলায় তিন বছর আগে তাকে পশুর মতো নিলামে তোলা হয়েছিল, যেই বটের তলায় দাঁড়িয়ে মাতব্বররা তার জীবনের সমস্ত আলো নিভাইয়া দিয়েছিল, আজ সেই বটের তলাতেই সেই জালিমদের গলায় অপরাধীর তকমা ঝুলতাছে!
মেহেদী ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেল হাজী শামসুদ্দিনের সামনে।
শামসুদ্দিন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে প্রস্রাব করার উপক্রম হইয়া বলল, "মেহেদী বাজান... আমারে বাঁচাও... আমি বুড়ো মানুষ..."
মেহেদী এক সেকেন্ড তাকাল তার দিকে। তার চোখে কোনো হিংসা ছিল না; ছিল এক মহাকাব্যিক ঘৃণা ও অবজ্ঞা।
"শামসুদ্দিন সাহেব," মেহেদীর কণ্ঠ শান্ত কিন্তু বজ্রের মতো কঠোর শোনাল। "গরিবের মেয়েকে জোর কইরা কেনা যায়, কিন্তু কারও মন কেনা যায় না। আপনি ধর্মকে ঢাল বানিয়ে পাপের পাহাড় গড়েছিলেন। আজ সেই পাহাড় আপনার বুকের ওপরই ভেঙে পড়েছে।"
মেহেদী ঘুরে তাকাল পুলিশের দিকে। "অফিসার, এদের প্রিজন ভ্যানে তুলুন।"
পুলিশের দল যখন শিকদার আর শামসুদ্দিনকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন ময়নার সাথে মেহেদীর চোখাচোখি হলো। মাঝখানে মাত্র দশ হাত দূরত্ব।
সেই দশ হাতের ভেতর দিয়া বয়ে গেল তিনটি দীর্ঘ বছরের নিঃশব্দ হাহাকার, রক্তক্ষরণ আর অশ্রুর নদী।
মেহেদী এক পা বাড়াইল ময়নার দিকে। তার চোখ ভিইজা আসছিল। সে চাইল ময়নার হাতখানা আবার নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিতে, সে চাইল বলতে 'ময়না, আমি ফিরে এসেছি। আমি সব শোধ করে দিয়েছি।'
কিন্তু ময়না এক পা পিছিয়ে গেল। তার চোখের কোণ দিয়া দুই ফোঁটা তপ্ত জল গড়াইয়া পড়ল। সে মৃদু কিন্তু স্পষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল, 'না।'
ময়না জানত, সমাজ হয়তো বদলে যাবে, মাতব্বরদের জেল হবে, কিন্তু তার জীবনে সেই বছরের দহন আর পোড়া ক্ষতচিহ্ন কোনোদিন মুছে ফেলা যাবে না। সে আর সেই আগের ষোল বছরের চঞ্চলা ময়না নয়; সে এক ধ্বংসস্তূপের সাক্ষী। ভালোবাসা বেঁচে থাকে আত্মায়, কিন্তু বাস্তবতার যে দাগ তার কপালে এই তথাকথিত মাতব্বর সমাজ এঁকে দিয়েছে, তা সে মেহেদীর এই নতুন, আলোকিত জীবনে কালিমা হিসেবে লেপে দিতে চায় না।
ময়না তার আঁচলটা শক্ত কইরা বুকে জড়াইয়া নিল। তারপর এক করুণ, প্রশান্ত হাসি মুখে ফুটিয়ে সে ধীরে ধীরে উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করল, কুমার নদের সেই শান্ত, চিরন্তন জলের দিকে। যেখানে কোনো মাতব্বরের সালিশ নাই, কোনো বুড়োর কামুক হাত নাই; যেখানে আছে কেবল বয়ে চলা নদীর অনন্ত মুক্তি।
মেহেদী ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সেই বটগাছের ছায়ায়। তার চোখ দিয়ে জল ঝরছিল, কিন্তু তার বুক ভরে উঠছিল এক নতুন ভোরের বাতাসে। সে বুঝতে পারল, প্রেম হয়তো এই নশ্বর সংসারে মিলন দিয়ে সার্থক হয় না; প্রেম সার্থক হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক টান করে দাঁড়ানোর শক্তিতে, দহনের আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হওয়ার গৌরবে।
বালিয়াচরের আকাশ তখন পরিষ্কার। কুয়াশার চাদর ভেদ করে ভোরের সূর্য তার রক্তিম কিরণ ছড়িয়ে দিচ্ছিল কুমার নদের বুকে। আর সেই আলোয় ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছিল এক শতাব্দীর পুরোনো অন্ধকারের সালিশি অহংকার।