উপমহাদেশের মুক্তির লড়াই ও সামাজিক পুনর্জাগরণের ইতিহাসে হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১–১৮৪০) এক অনন্য, ভাস্বর ও বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর সমগ্র বঙ্গভূমিতে যে রাজনৈতিক অন্ধকার, সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের অধ্যায় রচিত হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে প্রথম যে কয়টি কণ্ঠ গর্জে উঠেছিল—হাজী শরীয়তুল্লাহর কণ্ঠস্বর ছিল তার অগ্রভাগে। তিনি কেবল একটি ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না; বরং তাঁর সূচিত ‘ফরায়েজী আন্দোলন’ ছিল একাধারে আত্মশুদ্ধি, অর্থনৈতিক মুক্তি, সামন্তবাদবিরোধী প্রতিরোধ এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মূল ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দেওয়ার এক যুগান্তকারী কৃষক বিপ্লব। তৎকালীন পূর্ব বাংলার শোষিত, অধিকারবঞ্চিত, নীলকর ও জমিদারদের হাতে নিষ্পেষিত কৃষক-তাঁতি সমাজকে আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
ঐতিহাসিক পটভূমি: ব্রিটিশ রাজ ও অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা
১৭৫৭ সালে পলাশীর বিপর্যয় এবং ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর বাংলার চিরায়ত আর্থ-সামাজিক কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ১৭৭০ সালের (বাংলা ১১৭৬) ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’-এ বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। এরপর লর্ড কর্নওয়ালিস প্রবর্তিত ১৭৯৩ সালের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (Permanent Settlement) বাংলার কৃষকদের চিরদিনের মতো একদল লুটেরা ও অত্যাচারী জমিদারের করুণার পাত্রে পরিণত করে।
তৎকালীন বাংলায় সাধারণ কৃষকদের অবস্থা ছিল অবর্ণনীয়:
জমিদারদের কর-সন্ত্রাস: খাজনার বাইরেও কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো অন্তত পঁচিশ থেকে ত্রিশ প্রকারের অবৈধ আবওয়াব বা উপকর। যেমন—জমিদারের পারিবারিক পূজা-পার্বণ, বিবাহ, এমনকি জমিদারের হাতির খোরাকি ও গোঁফ রাখার কর পর্যন্ত দিতে হতো প্রজাদের।
দাঁড়ি ও টুপির ওপর কর: জমিদাররা মুসলিম কৃষকদের ধর্মীয় পরিচয়কে অবদমিত করতে দাঁড়ি রাখার ওপর বিশেষ ‘দাঁড়ি কর’ এবং টুপি পরার ওপর কর ধার্য করত।
নীলকরদের চাবুক: ইউরোপীয় নীলকররা উর্বর ধানি জমিতে জোরপূর্বক বিষাক্ত নীল চাষে বাধ্য করত। অস্বীকৃতি জানালে কৃষকদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হতো এবং কুঠির অন্ধকূপে চাবুক মেরে হত্যা করা হতো।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়: শতবর্ষের রাজনৈতিক দাসত্ব এবং প্রকৃত শিক্ষার অভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল চরম অজ্ঞতা, কুসংস্কার, শিরক ও বিদআত। মানুষ আত্মবিশ্বাস হারিয়ে অলৌকিক মাজার-পূজা ও ভণ্ডপীরদের অন্ধ মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।
এই চরম তমসাচ্ছন্ন সময়ে বাংলার নিঃস্ব peasantry বা কৃষক শ্রেণির ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন হাজী শরীয়তুল্লাহ।
প্রারম্ভিক জীবন, মক্কা গমন ও চিন্তার নবায়ন:
হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৭৮১ সালে তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার (বর্তমান মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার) শামুকচরের এক অতি সাধারণ তালুকদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি পিতা আবদুল জলিল তালুকদারকে হারান। পিতৃহীন বালক শরীয়তুল্লাহ চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে বড় হন। প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন স্থানীয় মক্তবে এবং পরবর্তীতে কলকাতার বিশিষ্ট আলেমদের সান্নিধ্যে।কিন্তু তাঁর অনুসন্ধিৎসু আত্মা বাংলার পরাধীনতার গ্লানি ও ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণ অনুসন্ধানে ব্যাকুল ছিল। মাত্র আঠারো বছর বয়সে, ১৭৯৯ সালে, তিনি পবিত্র হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা মুকাররমার পানে যাত্রা করেন। এই হিজরত তাঁর জীবনের মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়।
মক্কায় তিনি প্রায় বিশ বছর (১৭৯৯–১৮১৮) অবস্থান করেন। সেখানে তিনি তৎকালীন বিশ্বখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত তাহির সোমবলের অধীনে গভীর ইলম অর্জন করেন এবং মদিনার জ্ঞানপীঠে অধ্যয়ন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি:
১. আল-কোরআন ও হাদিসের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যার সাথে পরিচিত হন।
২. আরবের তৎকালীন ওয়াহাবি সংস্কার আন্দোলন এবং তার বিশুদ্ধিবাদী রূপ প্রত্যক্ষ করেন।
৩. শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভির সংস্কারমূলক রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তা অধ্যয়ন করেন, যা ইসলামকে কেবল আনুষ্ঠানিক ধর্মাচার নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ইনসাফের বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল।
বিশ বছর পর, ১৮১৮ সালে, যখন তিনি মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন তিনি আর শিবচরের সেই সাধারণ এতিম বালক নন; তিনি তখন এক প্রাজ্ঞ ধর্মতাত্ত্বিক, দূরদর্শী সমাজচিন্তক এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এক বৈপ্লবিক আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান অগ্রসেনানী।
ফরায়েজী আন্দোলনের জন্ম ও ধর্মীয় সংস্কার:
দেশে ফিরে হাজী শরীয়তুল্লাহ বাংলার সামাজিক পরিস্থিতি দেখে গভীরভাবে ব্যথিত হন। তিনি উপলব্ধি করেন, আত্মবিশ্বাসহীন ও ধর্মীয় দিক থেকে বিকৃত একটি জাতি কখনো ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না। মুক্তির প্রথম শর্ত হলো মানসিক ও আত্মিক মুক্তি। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি সূচনা করেন ‘ফরায়েজী আন্দোলন’। আরবি ‘ফারায়িজ’ (বাধ্যতামূলক কর্তব্য বা ফরজ) শব্দ থেকে এই আন্দোলনের নামকরণ। তাঁর আন্দোলনের মূল ধর্মীয় দর্শনগুলো ছিল:
ফরজের পূর্ণ বাস্তবায়ন: ইসলামের মৌলিক পাঁচটি ভিত্তি ও ফরজ বিধানাবলি যথাযথভাবে পালন করা।
শিরক ও বিদআতের মূলোৎপাটন: পীরপূজা, কবরপূজা, অনৈসলামিক রসম-রেওয়াজ, মহররমের তাজিয়া মিছিলের বাড়াবাড়ি এবং হিন্দু জমিদারদের চাপিয়ে দেওয়া পূজার চাঁদা বা প্রসাদ খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা।
তওবা ও আত্মশুদ্ধি: পাপ ও অন্যায়ের পথ ছেড়ে সত্যের পথে ফিরে আসার জন্য অনুসারীদের কাছ থেকে ‘তওবা’ পাঠ করানো। অনুসারীদের তিনি সম্বোধন করতেন ‘শাগরেদ’ বা ছাত্র এবং তিনি নিজে ছিলেন তাদের ‘উস্তাদ’ বা শিক্ষক।
রাজনৈতিক দর্শন: ‘দারুল হরব’ ঘোষণা ও ব্রিটিশের বৈধতা অস্বীকার
হাজী শরীয়তুল্লাহর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুঃসাহসিক পদক্ষেপ ছিল ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতবর্ষকে ‘দারুল হরব’ বা ‘যুদ্ধের দেশ’ হিসেবে ঘোষণা করা।
তৎকালীন ইসলামিক আইনশাস্ত্র অনুযায়ী, যে ভূখণ্ডে মুসলমানদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব থাকে না, যেখানে শাসকরা শরিয়া বিধানকে লঙ্ঘন করে ইনসাফ বিনষ্ট করে এবং জুলুমের রাজত্ব কায়েম করে, তা আর ‘দারুল ইসলাম’ (শান্তির ভূমি) থাকতে পারে না।
হাজী শরীয়তুল্লাহ ফতোয়া দেন:
"যেহেতু ভারতবর্ষ আজ বিদেশি কাফের শক্তি ব্রিটিশের পদানত এবং তারা সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম কায়েম করেছে, সেহেতু এই দেশ দারুল হরব। আর দারুল হরবে জুমার নামাজ এবং ঈদের জামাত আদায় করা বিধিসম্মত নয়।"
এই আপাত ধর্মীয় ঘোষণার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক প্রলয়ঙ্করী রাজনৈতিক কৌশল:
১. ব্রিটিশ শাসনের বৈধতা প্রত্যাখ্যান: তিনি সাধারণ মুসলিমদের বুঝিয়ে দেন যে, ব্রিটিশরা কোনো বৈধ শাসক নয়; তারা দখলদার শত্রু।
২. অসহযোগিতার বীজ বপন: ঈদের মতো আনন্দোৎসব বর্জন করে তিনি কৃষক সমাজে এই বার্তা পৌঁছে দেন যে, পরাধীন জাতির আনন্দ করার কোনো অধিকার নেই; যতদিন না আজাদি অর্জিত হচ্ছে, ততদিন জাতি শোক ও যুদ্ধের আবহে বাস করবে।
৩. একতাবদ্ধ হওয়ার ডাক: জুমার জামাত বন্ধ থাকায় কৃষকরা সাপ্তাহিক জমায়েতের বিকল্প হিসেবে ফরায়েজী পঞ্চায়েত গঠন করতে শুরু করে, যা ব্রিটিশদের নজরদারির বাইরে এক শক্তিশালী সমান্তরাল রাজনৈতিক নেটওয়ার্কে রূপ নেয়।
অর্থনৈতিক লড়াই: সামন্তবাদ ও নীলকরদের বিরুদ্ধে মহাবিদ্রোহ:
হাজী শরীয়তুল্লাহর আন্দোলন কেবল মেহরাব আর মিম্বরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ধর্মীয় সংস্কারের পরদা সরিয়ে তা দ্রুত এক প্রচণ্ড অর্থনৈতিক ও শ্রেণি-সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়। কারণ ফরায়েজীদের অধিকাংশই ছিল সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক অংশ দরিদ্র চাষি, তাঁতি, জেলে ও রায়ত।
১. জমিদারি আবওয়াব বর্জন
হাজী শরীয়তুল্লাহ ঘোষণা করলেন, জমির আসল মালিক আল্লাহ। জমিদাররা কেবল খাজনা আদায়ের অধিকার রাখে, কোনো প্রজার ওপর অন্যায় উপকর বসানোর অধিকার তাদের নেই। তিনি কৃষকদের নির্দেশ দিলেন: জমিদারের দুর্গাপূজা, কালীপূজা কিংবা ব্যক্তিগত বিলাসিতার জন্য কোনো অবৈধ চাঁদা দেওয়া হবে না।
দাড়ি রাখার ওপর চাপানো ‘দাঁড়ি কর’ কোনো কৃষক পরিশোধ করবে না। কারণ দাড়ি রাখা সুন্নাত, এর ওপর কর বসানো সরাসরি ঈমানের ওপর আঘাত।
২. নীল চাষে সর্বাত্মক প্রতিরোধ
ইউরোপীয় নীলকররা যখন লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে কৃষকদের দাদন নিতে বাধ্য করত, তখন হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরায়েজীদের নির্দেশ দেন এক ছটাক জমিতেও নীল চাষ না করতে। তিনি কৃষকদের একত্রিত করে সংগঠিত লাঠিয়াল দল গঠনের প্রশিক্ষণ দেন। ফলে নীলকরদের পেটোয়া বাহিনী যখন গ্রামে হানা দিত, তখন কৃষকরা দা, বল্লম ও বাঁশের লাঠি নিয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলত।
৩. সমবায়ী চেতনা ও মানবিক ঐক্য
হাজী শরীয়তুল্লাহ তাঁর শাগরেদদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করেন। কোনো কৃষক জমিদার বা নীলকরের মামলার শিকার হলে সমগ্র ফরায়েজী তহবিল থেকে তার আইনি লড়াইয়ের খরচ চালানো হতো। কোনো কৃষকের ফসল নষ্ট হলে বা ঘরে খাবার না থাকলে অন্য কৃষকরা নিজেদের গোলা থেকে ধান দিয়ে সাহায্য করত। এই অর্থনৈতিক সংহতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে জমিদারদের ঋণের ফাঁদ থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার সাহস জুগিয়েছিল।
জমিদার-নীলকর আঁতাত ও শরীয়তুল্লাহর ওপর নিপীড়ন:
ফরায়েজী আন্দোলনের এই অভূতপূর্ব জাগরণ তৎকালীন হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। তারা বুঝতে পারল, নিরীহ গোবেচারা রায়তরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়, তবে তাদের বংশপরম্পরার শোষণ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে ফরিদপুর, ঢাকা, বাখেরগঞ্জ (বরিশাল), ময়মনসিংহ ও ত্রিপুরার (কুমিল্লা) প্রতাপশালী জমিদাররা একত্রিত হয়ে হাজী শরীয়তুল্লাহর বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়:
মিথ্যা মামলার জাল: তারা ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে অভিযোগ তোলে যে, শরীয়তুল্লাহ ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা করছেন এবং শান্তিপ্রিয় প্রজা ও জমিদারদের ওপর অস্ত্রধারী বিদ্রোহ পরিচালনা করছেন।
শারীরিক আক্রমণ ও গ্রেফতার: ১৮৩১ সালে নয়াপাড়ার জমিদার এবং নীলকর ডানলপ সাহেবের যৌথ বাহিনী হাজী শরীয়তুল্লাহর ডেরায় আক্রমণ চালায়। কিন্তু হাজার হাজার ভক্ত-কৃষক নিজেদের বুক পেতে দিয়ে তাদের প্রিয় উস্তাদকে রক্ষা করেন।
নির্বাসন ও গৃহবন্দিত্ব: ব্রিটিশ পুলিশ তাঁকে জননিরাপত্তার অজুহাতে বারবার কারারুদ্ধ করে। ১৮৩১ সালের পর তাঁকে ঢাকা থেকে বহিষ্কার করে তাঁর জন্মভূমি শিবচরে পুলিশি নজরদারিতে অন্তরীণ রাখা হয়।
কিন্তু কোনো রক্তচক্ষু, পুলিশি তল্লাশি বা জমিদারের চাবুক হাজী শরীয়তুল্লাহকে তাঁর লক্ষ্য থেকে এক চুলও বিচ্যুত করতে পারেনি। শিবচরে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থাতেও তিনি দূর-দূরান্তের গ্রামে দূত পাঠিয়ে ফরায়েজী আন্দোলনের সাংগঠনিক জাল বিস্তার করতে থাকেন।
তিতুমীর ও হাজী শরীয়তুল্লাহ: সমান্তরাল দুই সূর্য
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের আলোচনায় হাজী শরীয়তুল্লাহর পাশাপাশি যাঁর নাম অবধারিতভাবে আসে, তিনি হলেন ২৪ পরগনার শহীদ মীর নিসার আলী তিতুমীর (১৭৮২–১৮৩১)। এই দুই মহাপুরুষ ছিলেন কার্যত সমসাময়িক এবং একই আদর্শের সৈনিক।
তুলনামূলক দিক
হাজী শরীয়তুল্লাহ
শহীদ তিতুমীর
আন্দোলনের নাম
ফরায়েজী আন্দোলন
তরিকায়ে মুহাম্মদীয়া
মূল ভিত্তি অঞ্চল
পূর্ব বাংলা (ফরিদপুর, মাদারীপুর, ঢাকা, বরিশাল)
পশ্চিম বাংলা (বারাসাত, নদীয়া, ২৪ পরগনা)
কর্মপদ্ধতি
দীর্ঘমেয়াদী সাংগঠনিক ভিত্তি, সামাজিক সংস্কার ও আইনগত-কৃষক প্রতিরোধ
প্রত্যক্ষ সশস্ত্র লড়াই ও ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ (বাঁশের কেল্লা)
আদর্শিক মিল
উভয়েই 'দারুল হরব' দর্শনে বিশ্বাসী, জমিদারি কর ও নীলকরবিরোধী এবং কৃষকস্বার্থ রক্ষায় নিবেদিত তিতুমীর যখন ১৮৩১ সালে নারকেলবেড়িয়ায় বাঁশের কেল্লা গড়ে ব্রিটিশ কামান ও গোলার মুখে বীরত্বের সাথে শাহাদাতবরণ করেন, হাজী শরীয়তুল্লাহ তখন পূর্ব বাংলায় এক সুবিশাল জনভিত্তি তৈরি করছিলেন—যা পরবর্তীতে তাঁর সুযোগ্য পুত্র পীর মহসিনউদ্দীন দুদু মিয়ার নেতৃত্বে এক অপ্রতিরোধ্য সশস্ত্র কৃষক গণসংগ্রামে রূপ নিয়েছিল।
আন্দোলন ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা: দুদু মিয়ার আগমন
১৮৪০ সালে এই মহান মুজাহিদ ও সমাজসংস্কারক শিবচরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর ইন্তেকালের পর ফরায়েজী আন্দোলনের হাল ধরেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র মুহসিনউদ্দীন আহমদ, যিনি বাংলার ইতিহাসে ‘দুদু মিয়া’ নামে সুপরিচিত। পিতার আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত দুদু মিয়া আন্দোলনকে আরও বেশি কার্যকর, সামরিক ও প্রশাসনিক রূপ দেন:
পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ও নিজস্ব সরকার: তিনি সমগ্র পূর্ব বাংলাকে একাধিক ‘হালকা’ বা প্রশাসনিক জোনে বিভক্ত করেন এবং নিজস্ব কর সংগ্রহ ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যা ব্রিটিশ আদালতের প্রতি অনাস্থা প্রকাশের এক চূড়ান্ত রূপ ছিল।
'জমির মালিক আল্লাহ' নীতির পূর্ণ রূপায়ণ: দুদু মিয়া স্পষ্ট ঘোষণা করেন—"জমি আল্লাহর দান, সুতরাং জমিতে কর বসানোর অধিকার কোনো জমিদারের নেই।"
লাঠিয়াল বাহিনী: তিনি হাজার হাজার কৃষকের সমন্বয়ে নিজস্ব আধুনিক লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন এবং নীলকুঠিগুলো একের পর এক ধ্বংস করে দেন। হাজী শরীয়তুল্লাহ যে আদর্শিক বীজ রোপণ করেছিলেন, দুদু মিয়া তাকে এক সুবিশাল মহীরুহে পরিণত করেছিলেন—যার ধাক্কায় ব্রিটিশ প্রশাসন বাধ্য হয়েছিল নীল কমিশন গঠন করতে এবং পরবর্তীকালে প্রজাস্বত্ব আইন সংস্কারের উদ্যোগ নিতে।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও মূল্যায়ন
ইতিহাসের নির্মোহ মূল্যায়নে হাজী শরীয়তুল্লাহকে কেবল একজন আলেম হিসেবে দেখলে তাঁর প্রতি চরম অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন বহুমুখী এক বিপ্লবের রূপকার:
১. জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ
অনেকে উনিশ শতকের কলকাতাকেন্দ্রিক 'বেঙ্গল রেনেসাঁ' বা নবজাগরণকে বাংলার একমাত্র রেনেসাঁ হিসেবে প্রচার করতে চান। কিন্তু সেই রেনেসাঁ ছিল উচ্চবিত্ত ও সুবিধাভোগী শহুরে শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলন ছিল আসল ‘গণ-রেনেসাঁ’ বা সাবঅল্টার্ন (Subaltern) শ্রেণির জাগরণ। বাংলার হতদরিদ্র মাটির মানুষদের মধ্যে আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার আগুন প্রথম তিনিই জ্বালিয়েছিলেন।
২. অসাম্প্রদায়িক কৃষক ঐক্যের পথপ্রদর্শক
যদিও তাঁর আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ইসলামিক অনুশাসন ও শুদ্ধি দিয়ে, কিন্তু জমিদারি শোষণ ও নীলকরদের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করেছিল। বহু নিম্নবর্ণের হিন্দু রায়ত জমিদারের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে ফরায়েজী পঞ্চায়েতের আশ্রয় গ্রহণ করেছিল এবং হাজী শরীয়তুল্লাহ তাদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছিলেন।
৩. ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রথম গণ-প্রতিরোধ
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের বহু আগেই হাজী শরীয়তুল্লাহ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ শক্তিশালী সমান্তরাল শক্তি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ আইন ও আদালতকে অকার্যকর প্রমাণ করে দেশি সালিশি ও স্বনির্ভর গ্রামীণ সমাজ গড়ে তোলার ডাক দিয়েছিলেন—যা পরবর্তীকালে মহাত্মা গান্ধীর 'অসহযোগ আন্দোলন'-এর মৌলিক ধারণার সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়।
উত্তরপ্রজন্মের জন্য প্রেরণার মশাল
হাজী শরীয়তুল্লাহ কোনো রাজপ্রাসাদের অধিপতি ছিলেন না; তাঁর কোনো কামান বা আধুনিক সেনাবাহিনী ছিল না। কিন্তু তাঁর কাছে ছিল সত্যের অবিচল বিশ্বাস, সততা এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। তিনি একটি জীর্ণ-শীর্ণ, শোষিত ও মেরুদণ্ডহীন জাতিকে আত্মবিশ্বাসী এক বিপ্লবী শক্তিতে রূপান্তরিত করেছিলেন।
আজ একুশ শতকের স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যখন আমরা সামাজিক বৈষম্য, শোষণহীন সমাজ এবং সার্বভৌম আত্মমর্যাদার কথা বলি, তখন হাজী শরীয়তুল্লাহর নাম আমাদের সামনে এক চিরন্তন প্রেরণার আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলে ওঠে। তিনি শিখিয়েছেন, অন্যায়কারী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, শোষকের বিরুদ্ধে যদি দুর্বলরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সত্যের ওপর দাঁড়ায়, তবে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তলোয়ারই তাদের চিরকাল বন্দি করে রাখতে পারে না।
বাংলার মাটির প্রতিটি কণা, পদ্মার প্রতিটি পলি এবং কৃষক সমাজের প্রতিটি ঘামের ফোঁটায় হাজী শরীয়তুল্লাহর নাম চিরকাল লেখা থাকবে, এক নির্ভীক মুজাহিদ, কৃষককুলের অকৃত্রিম বন্ধু এবং উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অগ্রসেনানী হিসেবে।