চকবাজারের শাহি মসজিদের যখন মাগরিবের আজান দিলো, চারপাশটায় তখন কেমন একটা আবছা অন্ধকার নেমে আসছে। গলিটার বাতাসে ডালপুরি আর আলুর চপ ভাজার মায়াবী গন্ধের সাথে মসজিদের নিচে ধর্মীয় বইয়ের দোকানগুলোর একটা অদ্ভুত গন্ধ যেন মিলেমিশে এক হয়ে আছে। এই গলির মোড়ে এক ফুট বাই দুই ফুটের একটা চটের বস্তা পেতে বহু বছর ধরে বসে আছে গোবিন্দ। কত শত মানুষের পায়ের ক্ষয়ে যাওয়া জুতোয় সে নতুন করে প্রাণ দিয়েছে, তার কোনো হিসেব নেই। চকবাজারে এমন কোন মানুষ নাই, যাকে গোবিন্দ চেনে না। মানুষের জুতোর ছেঁড়া দেখে সে মানুষের আসল রূপটা অনায়াসে টের পেয়ে যায়।
মিনিট দশেক হলো, কোন কাস্টমার নেই। গোবিন্দ যেই মনে মনে ভাবল, এক কাপ চা খাবে; ঠিক তখনই হন্তদন্ত হয়ে গলিতে ঢুকলেন এক বয়স্ক ভদ্রলোক। গায়ে তাঁর দামি পাঞ্জাবি, চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা। কিন্তু ডান পায়ের চামড়ার বুটটার শুকতলা আলগা হয়ে হা করে আছে, লোকটার পুরো আভিজাত্যকে যেন চরম ভেংচি কাটছে সেই জুতো। ভদ্রলোক অস্বস্তি নিয়ে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে গোবিন্দর কাঠের বাক্সের সামনে ঝুঁকে দাঁড়ালেন।
ও গোবিন্দ! জলদি একখান সেলাই মারো তো বাপু! মসজিদের মিলাদে দাওয়াত, কয়েকজন ইজ্জতওয়ালা মানুষ আইবো। এই ছ্যাঁড়া জুতা নিয়া গ্যালে মান-ইজ্জতের ফালুদা হয়া যাইবো!
গোবিন্দ কোনো কথা বাড়াল না। অভ্যস্ত হাতে বাঁটুল আর মোটা সুতোয় খানিকটা মোম ঘষে নিয়ে শক্ত দুটো গেঁথনি দিল। কিনারে একটু আইকা গাম লাগিয়ে সুতার শক্ত টানে নিমিষেই জুতোর ফাঁক বন্ধ হয়ে গেল।
কাজ শেষ হতেই লোকটা পকেট থেকে দুমড়ানো মুচড়ানো একটা ১০ টাকার নোট গোবিন্দর কাঠের বাক্সের ওপর ছুঁড়ে মারলেন। অথচ এই কাজের আসল মজুরি ৩০ টাকা।
গোবিন্দ শান্ত চোখে তুলে তাকাল, বাবু, মজুরি তো ৩০ টাকা হইব...
লোকটা গাল থেকে পানের কষ ফেলে তাচ্ছিল্যের একটা হাসি দিলেন,
আরে থোও তো মিয়া! ডাল-ভাত খাইয়া চকবাজারের গলিতে পইড়া থাকো, চাইরডা সুতা টানার আবার দরদাম কিসের? যা দিছি, হেইডাই অনেক!
কথাটা শেষ করেই লোকটা হনহন করে মিলাদের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। গোবিন্দ কোনো তর্ক করল না, চিল্লাচিল্লিও করল না। শুধু চুপচাপ লোকটার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
ততক্ষণে মসজিদের মাইকে মাগরিবের আজান ধ্বনিত হতে শুরু করেছে। রাস্তায় লোকটার নতুন সেলাই করা জুতো আর খটখট করছে না ঠিকই, কিন্তু গোবিন্দ কাঠের বাক্সের ওপর পড়ে থাকা ময়লা নোটটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করল,
ছ্যাঁড়া চামড়া তো সেলাই মাইরা ঢাকলি বাবাজী, কিন্তু মনের ভেতর যে পচন ধরছে, হেইডা ঢাকবি ক্যামনে? হেই সেলাই তো দুনিয়ার কোনো গোবিন্দ করতে পারবো না। শালা, বখিল!
(ছোট গল্প)
Comments
Be this story’s first reader
+20 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.