সৃজিত মুখার্জির সিনেমা নিয়ে আমার লেখা প্রথম আলোচনা। তার অন্যসব সিনেমা বাদ দিয়ে এই দুটি সিনেমার পেছনে কেন লাগলাম এ নিয়ে পরে একদিন বিস্তারিত আলাপ হতে পারে। আপাতত আজকের আলাপে প্রবেশ করি।
সৃজিত মুখার্জির সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই এবং ভিঞ্চি দা সিনেমাদুটিকে পাশাপাশি রাখলে আমার কাছে সত্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের সত্যে বিশ্বাস করার মনস্তত্ত্ব। আমরা কেন কোনো একটি বক্তব্যকে সত্য বলে গ্রহণ করি? কেন নিজের বিশ্বাসের বিরোধী প্রমাণ সামনে এলেও অনেক সময় সেই বিশ্বাস আঁকড়ে থাকি? আর যে মানুষ অন্যের মিথ্যাকে শনাক্ত করার দাবি করে, সে নিজেই কি নিজের কাছে মিথ্যা বলতে পারে না? এই প্রশ্নগুলোকে কেবল চলচ্চিত্রের কাহিনি বা চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে তাদের রাজনৈতিক ও দার্শনিক তাৎপর্য অধরা থেকে যায়। বরং এই দুই চলচ্চিত্রকে পড়তে গেলে সত্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক সমস্যা, আত্মপরিচয়ের অস্থিরতা, অবচেতনের ভূমিকা এবং ক্ষমতার সঙ্গে সত্য উৎপাদনের সম্পর্ককে একই বিশ্লেষণী পরিসরে নিয়ে আসতে হবে।
সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই এই নামটির মধ্যেই একটি আপাতবিরোধ রয়েছে। যদি সত্য বলে কিছু না থাকে, তাহলে এই দাবিটিই বা কতটা সত্য? এই বিরোধকে নিছক শব্দের খেলা হিসেবে না দেখে জ্ঞানতাত্ত্বিক সংকটের প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখা যায়। বাস্তবতা এবং বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এক নয়। আমরা কোনো ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে পারি, কিন্তু সেই ঘটনার অর্থ নির্ধারণের সময় স্মৃতি, ভাষা, পূর্বধারণা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের মধ্য দিয়ে যাই। আবার অন্যদিকে, ভিঞ্চি দায় বাস্তবতার অনুকরণ, মুখের নির্মাণ এবং পরিচয়ের পরিবর্তন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে দৃশ্যমান সত্যের নির্ভরযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। একটি চলচ্চিত্রে সত্যের বিচার জড়িয়ে থাকে মানুষের বক্তব্য ও বিচারবোধের সঙ্গে; অন্যটিতে সত্যের দৃশ্যমান রূপ নিজেই প্রতারণার সম্ভাবনা বহন করে। এই পার্থক্যের মধ্যেই তাদের গভীরতর সংযোগ: মানুষ কেবল সত্যকে ভুল বুঝতে পারে না, কখনো নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সত্যের একটি সংস্করণও নির্মাণ করে। সত্য-মিথ্যা, মিথ্যা-সত্যের যে গোলকধাঁধা, যে কনফিউশন, তার একটা সারফেস লেভেলের পাঠ,চিন্তা এই লেখার মাধ্যমে করা যেতে পারে। আমি প্রথমেই ক্ষমা চাচ্ছি কারণ আমি আমার সীমাবদ্ধতা নিয়েই লিখেছি, লেখায় অনেক কিছু বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। যারা দীর্ঘ বোরিং লেখা পছন্দ করেন না তারা এখানেই এড়িয়ে যেতে পারেন।
আমার মনে হয় এখান থেকে যারা পড়ছেন তাঁরা এই আলাপে আগ্রহী।
এই সিনেমাদুটি পাঠের ক্ষেত্রে বেশ কিছু তাত্ত্বিকের বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশেষ করে লাকাঁ, দেরিদা, ফ্রয়েড, ফুকো ও অ্যাডলারের চিন্তা।
লাকাঁর মতে, মানুষের আত্মপরিচয় কোনো সম্পূর্ণ, স্বচ্ছ ও নিজের কাছে পুরোপুরি বোধগম্য সত্তা নয়; বরং ভাষা, অন্যের দৃষ্টি এবং প্রতিফলনের মধ্য দিয়ে তা গড়ে ওঠে। তাঁর Mirror Stage ধারণায় মানুষ নিজের একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিচ্ছবির সঙ্গে নিজেকে শনাক্ত করে, যদিও তার অভিজ্ঞতাগত সত্তা বাস্তবে অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন ও দ্বন্দ্বপূর্ণ। এই ধারণাকে ভিঞ্চি দার কেন্দ্রে থাকা মুখের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করে পড়া যায়। ভিঞ্চি অন্যের মুখকে কৃত্রিমভাবে পুনর্নির্মাণ করতে পারে, কিন্তু নিজের শিল্পীসত্তার একটি স্থিতিশীল সামাজিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। অন্যের মুখ নির্মাণের ওপর তার দক্ষতা এবং নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি অর্জনের ব্যর্থতার মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। সে বাহ্যিক অবয়বের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, কিন্তু অন্যের চোখে নিজের মূল্য নির্ধারিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্ত হতে পারে না। তার সংকট তাই শুধু অবমূল্যায়িত শিল্পীর সংকট নয়; এটি এমন এক আত্মপরিচয়ের সংকট, যা নিজের মূল্যকে অন্যের স্বীকৃতির মধ্যে খুঁজতে বাধ্য হয়। এই যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস এইটারে দেখতে না পেলে আবার বিপদ।
লাকাঁর চিন্তায় আকাঙ্ক্ষা প্রায়ই অন্যের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা শুধু কোনো বস্তু চাই না; অনেক সময় চাই, অন্যের কাছে আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও অস্তিত্বের একটি স্বীকৃত মূল্য থাকুক। ভিঞ্চি দার শিল্পীসত্তাকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তার স্বীকৃতির ক্ষুধা আরও জটিল হয়ে ওঠে। সে কেবল নিজের কাজের জন্য অর্থ বা সুযোগ চায় না; সে চায় তার প্রতিভা স্বীকৃত হোক, তার অস্তিত্ব গুরুত্ব পাক। আদি বোস যখন তার দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করে, তখন সেই প্রস্তাব ভিঞ্চির কাছে শুধু কাজের সুযোগ নয়, নিজের প্রতিভা প্রমাণ করার সম্ভাবনাও হয়ে ওঠে। এখানেই তার দুর্বলতা। যে স্বীকৃতি সে এত দিন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার কাছ থেকে পায়নি, সেটি অর্জনের আকাঙ্ক্ষা তাকে এমন এক নৈতিক সমঝোতার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার পরিণতি তার নিজের শিল্পীসত্তাকেই বিপন্ন করে। তবে এই পাঠকে সরল মনস্তাত্ত্বিক রোগনির্ণয় হিসেবে নেওয়া উচিত নয়; বরং এটি দেখায়, আত্মপরিচয়ের অনিশ্চয়তা কীভাবে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলতে পারে।
আদি বোসের চরিত্রে সংকটটি আবার ভিন্ন। ভিঞ্চি যেখানে অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল, আদি সেখানে নিজের বিচারবোধকে প্রায় চূড়ান্ত কর্তৃত্বে উন্নীত করে। সে নিজের নৈতিক অবস্থানকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করে, যেন তার ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও ন্যায়বিচারের মধ্যে কোনো দূরত্ব নেই। লাকাঁর কাঠামো ব্যবহার করে বলা যায়, আদি নিজের জন্য একটি কল্পিত পূর্ণতার অবস্থান নির্মাণ করে—এমন এক অবস্থান, যেখানে সে নিজেকে দ্বিধাহীন বিচারক হিসেবে দেখতে পারে। অথচ মানুষের নৈতিক অবস্থান কখনোই সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নয়। নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া মানেই নিজের কাজের নৈতিকতা সম্পর্কে নির্ভুল হওয়া নয়। আদি যে ন্যায়বিচারের দাবি করে, সেই দাবির মধ্যেই তার ব্যক্তিগত ক্ষমতালিপ্সা ও আত্মবৈধতার সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। তার বিপজ্জনক দিক কেবল সহিংসতা নয়; বরং নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার প্রয়োজন অস্বীকার করা।
আবার সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব এই আত্মপ্রবঞ্চনার আরেকটি মাত্রা উন্মোচন করে। ফ্রয়েডের মতে, মানুষের মানসিক জীবন সচেতন যুক্তির দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত নয়; অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, অস্বস্তিকর স্মৃতি, অপরাধবোধ ও মানসিক দ্বন্দ্ব সচেতনতার আড়ালে কাজ করতে পারে। আমরা নিজেদের আচরণের যে ব্যাখ্যা তৈরি করি, সেটিই সব সময় সেই আচরণের প্রকৃত চালিকাশক্তি নয়। এই ধারণা ভিঞ্চি দার চরিত্রগুলোর নৈতিক আত্মব্যাখ্যা বোঝার ক্ষেত্রে কার্যকর। ভিঞ্চি নিজের শিল্পের স্বীকৃতি চায়, কিন্তু স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা কখন তাকে নিজের নৈতিক সীমা অতিক্রম করতে প্ররোচিত করছে, তা তার কাছে প্রথম থেকেই সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। আদি নিজের সহিংসতাকে ন্যায়বিচারের ভাষায় ব্যাখ্যা করে; তার নিজের ব্যাখ্যাই যে তার মানসিক প্রয়োজনকে রক্ষা করার উপায় হয়ে উঠতে পারে, সেই সম্ভাবনাও উপেক্ষা করা যায় না।
তবে ফ্রয়েডের আলোকে চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রতিটি আচরণের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট অবদমিত আকাঙ্ক্ষা আছে বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। চলচ্চিত্রের চরিত্র বাস্তব মানুষের মতোই বহুস্তরীয় হতে পারে, কিন্তু তার মনস্তত্ত্বের প্রতিটি দিককে একটি তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং ফ্রয়েডীয় পাঠের গুরুত্ব হলো, এটি সচেতন যুক্তির স্বচ্ছতার ধারণাকে প্রশ্ন করে। আদি নিজেকে ন্যায়বিচারের প্রতিনিধি হিসেবে দেখে বলে তার সহিংসতার অন্য কোনো মানসিক বা সামাজিক ব্যাখ্যা নেই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, ভিঞ্চি নিজের শিল্পকে ভালোবাসে বলেই তার শিল্পের সামাজিক ব্যবহারের দায় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যায় না। মানুষের আত্মব্যাখ্যা তার আচরণকে বোঝার একটি উপাদান, চূড়ান্ত সত্য নয়। এই জায়গায় জাক দেরিদার deconstruction বা বিনির্মাণের ধারণা আরও মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে। দেরিদা ভাষার মধ্যে উপস্থিত স্থির অর্থ, দ্বৈত বিরোধ এবং চূড়ান্ত ভিত্তির ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন। প্রচলিত চিন্তায় আমরা প্রায়ই সত্য ও মিথ্যা, বাস্তব ও কৃত্রিম, ন্যায় ও অন্যায়, অপরাধী ও নির্দোষ—এই জোড়াগুলোকে পরস্পরবিরোধী এবং সুস্পষ্ট বলে ধরে নিই। কিন্তু বিনির্মাণ দেখায়, এই বিরোধগুলোর অর্থ সব সময় এত স্থিতিশীল নয়; একটি ধারণা প্রায়ই তার বিপরীত ধারণার সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়েই অর্থ পায়। এর অর্থ এই নয় যে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, বরং সেই পার্থক্য কীভাবে নির্মিত ও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। ভিঞ্চি দায় মুখ ও মুখোশের সম্পর্ক এই পাঠের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মুখকে আমরা সাধারণত পরিচয়ের স্বাভাবিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করি। একজন মানুষ দেখতে যেমন, আমরা তার পরিচয়ও তেমন বলে ধরে নিতে চাই। কিন্তু প্রস্থেটিক মেকআপ যখন এই সম্পর্ককে অনিশ্চিত করে তোলে, তখন দৃশ্যমানতার ওপর আমাদের বিশ্বাস ভেঙে পড়ে। কৃত্রিম মুখ আর নিছক বাস্তবের অনুকরণ থাকে না; সেটি বাস্তবকে শনাক্ত করার প্রচলিত পদ্ধতিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। একইভাবে, আদি বোসের ন্যায়বিচারের ভাষাকে তার সহিংস কাজের বিপরীতে রাখলে ন্যায় ও অন্যায়ের প্রচলিত সীমারেখার রাজনৈতিক ব্যবহার দৃশ্যমান হয়। সে ন্যায়ের ভাষা ব্যবহার করে, কিন্তু ভাষাটির ব্যবহার তার কাজকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায়সংগত করে না। এই ব্যবধানেই সিনেমাটির নৈতিক দ্বন্দ্ব নিহিত।
দেরিদার দৃষ্টিতে সত্যি বলে সত্যি কিছু নেইর শিরোনামটিকেও একটি স্থির সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ না করে প্রশ্ন হিসেবে পড়া সম্ভব। সত্যকে ভাষায় প্রকাশ করতে গেলে আমরা ঘটনার বর্ণনা, সাক্ষ্য, স্মৃতি ও ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করি। কিন্তু ভাষা কখনো বাস্তবতার নিখুঁত প্রতিলিপি নয়। একই ঘটনার দুটি বিবরণে শব্দের নির্বাচন, গুরুত্ব আরোপ এবং বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ভিন্ন হতে পারে। এই ভিন্নতা সত্যের অনুসন্ধানকে জটিল করে, কিন্তু সত্যকে সম্পূর্ণ অসম্ভব করে না। দেরিদার বিনির্মাণের তাৎপর্য এখানেই: কোনো বক্তব্যের অর্থকে তার ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে আটকে না রেখে, তার ভেতরের অসংগতি, নীরবতা এবং বাদ পড়া সম্ভাবনাগুলোও পড়তে হয়। বিচারকক্ষের আখ্যান এই ধরনের পাঠের সুযোগ তৈরি করে, কারণ সেখানে কোনো বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা কেবল বক্তার আত্মবিশ্বাস দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তার বক্তব্যের গঠন, অসংগতি ও অন্য প্রমাণের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
মিশেল ফুকোর চিন্তা এই আলোচনাকে ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব থেকে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে যায়। ফুকোর কাছে সত্য কেবল কোনো নিরপেক্ষ বক্তব্যের গুণ নয়; সমাজে সত্য উৎপাদন, স্বীকৃতি ও প্রচারের সঙ্গে প্রতিষ্ঠান, জ্ঞান এবং ক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। কে কথা বলার অধিকার পায়, কার বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করা হয়, কোন প্রমাণ গ্রহণযোগ্য এবং কোন ব্যাখ্যা সামাজিক কর্তৃত্ব লাভ করে—এসব প্রশ্ন সত্যের সামাজিক অবস্থান নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এই ধারণা সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই এবং ভিঞ্চি দার তুলনামূলক পাঠে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই'র বিচারকক্ষকেন্দ্রিক পরিস্থিতিতে সত্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া মানুষের বক্তব্য ও বিচারবোধের ওপর নির্ভরশীল; ভিঞ্চি দায় আদি বোস নিজের হাতে বিচার করার ক্ষমতা গ্রহণ করে। সে কেবল কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা দেয় না, বরং কে অপরাধী এবং কে শাস্তির যোগ্য, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্তৃত্বও নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করে।
ফুকোর আলোকে আদি বোসের সমস্যা তাই ব্যক্তিগত নৈতিক বিচ্যুতির চেয়েও বড়। সে এমন একটি অবস্থান তৈরি করে, যেখানে নিজের বিচারবোধকে সত্যের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং অন্যের জীবনের ওপর সেই সত্যের প্রয়োগ ঘটায়। তার কাছে ন্যায়বিচার একটি নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নয়; এটি তার নিজস্ব নৈতিক বিশ্বাসের বাস্তবায়ন। অথচ ক্ষমতার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপগুলোর একটি হলো, যখন ক্ষমতা নিজেকে ক্ষমতা হিসেবে প্রকাশ না করে ন্যায়, শৃঙ্খলা বা সত্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করে। এই পাঠে আদি বোসের নৈতিক নিশ্চিততা সন্দেহের বিষয় হয়ে ওঠে: সে কি সত্যিই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করছে, নাকি ন্যায়বিচারের ভাষার মাধ্যমে নিজের ক্ষমতাকে বৈধতা দিচ্ছে?
তবে ফুকোর তত্ত্বকে এমনভাবে প্রয়োগ করা উচিত নয়, যাতে সব সত্যকে ক্ষমতাবানদের তৈরি কল্পনা বলে মনে হয়। ক্ষমতা সত্য সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু সে কারণে বাস্তব ঘটনা, বস্তুগত প্রমাণ কিংবা নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যের গুরুত্ব বিলুপ্ত হয় না। বরং ফুকোর পাঠ আমাদের শেখায়, সত্যের দাবিকে বিচার করতে হলে শুধু বক্তব্যের বিষয়বস্তু নয়, বক্তব্যটি কোন সামাজিক অবস্থান থেকে উচ্চারিত হচ্ছে এবং কীভাবে কর্তৃত্ব অর্জন করছে, সেটিও দেখতে হবে। এই দৃষ্টিতে আদি বোসের আত্মবিশ্বাস কোনো প্রমাণ নয়; তার ন্যায়বিচারের দাবিও নিজের সত্যতা নিজে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
এই পাঁচটি তাত্ত্বিক অবস্থানকে একত্রে রাখলে একটি জটিল চিত্র পাওয়া যায়। লাকাঁ দেখান, আত্মপরিচয় অন্যের দৃষ্টি ও স্বীকৃতির সঙ্গে জড়িত; ফ্রয়েড দেখান, সচেতন যুক্তি নিজের মানসিক চালিকাশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে জানে না; দেরিদা দেখান, ভাষা ও ধারণার অর্থকে স্থির ধরে নেওয়া যায় না; ফুকো দেখান, সত্যের সামাজিক স্বীকৃতি ক্ষমতার সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; আর অ্যাডলার দেখান, হীনতার অনুভূতি অতিক্রম করার তাগিদ থেকে জন্ম নেওয়া আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে। এই তত্ত্বগুলো একে অন্যের বিকল্প নয়, বরং সত্য ও আত্মপরিচয়ের ভিন্ন ভিন্ন স্তরকে আলোকিত করে। ভিঞ্চি দার স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা, আদি বোসের নৈতিক আত্মবৈধতা এবং বিচারকক্ষের মানুষের পূর্বধারণা—সবকিছুকে একই ব্যাখ্যায় নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু এই তাত্ত্বিক সংলাপ আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, মানুষ কীভাবে নিজের উপলব্ধির সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে এবং কেন নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্নাতীত সত্যে পরিণত করার প্রবণতা এত শক্তিশালী।
এখানেই এই দুই চলচ্চিত্রের তুলনামূলক সমালোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতার প্রশ্নও আসে। তাত্ত্বিক ধারণা দিয়ে কোনো চলচ্চিত্রকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, কিন্তু তাতে চলচ্চিত্রের নিজস্ব নান্দনিকতা, সম্পাদনা, অভিনয়, দৃশ্য নির্মাণ ও আখ্যানের সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করা চলে না। ভিঞ্চি দার মুখ নির্মাণের মোটিফ সত্য ও পরিচয়ের প্রশ্নকে শক্তিশালী করে, কিন্তু সেই সম্ভাবনা কতটা গভীর মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধানে রূপ নেয়, সেটি আলাদা মূল্যায়নের বিষয়। একইভাবে, সত্যি বলে সত্যি কিছু নেইর বিচারকক্ষকেন্দ্রিক কাঠামো সত্যের বহুমাত্রিকতা নিয়ে ভাবার সুযোগ দেয়, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার নাটকীয়তা নিজেই সত্যের দার্শনিক সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান নয়। চরিত্রের দ্বন্দ্ব এবং প্লটের সমাধান দর্শককে চিন্তার দিকে নিয়ে যেতে পারে; কিন্তু চিন্তার সম্ভাবনা তৈরি করা আর সেই চিন্তাকে নান্দনিকভাবে সম্পূর্ণ বিকশিত করা এক বিষয় নয়।
আমার কাছে এই দুই ছবির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংযোগ তাই সত্যের অনুপস্থিতি নয়, সত্যের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠার প্রবণতা। ভিঞ্চি নিজের প্রতিভার স্বীকৃতি চায়, আদি নিজের নৈতিক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আর বিচারকক্ষের মানুষদের নিজেদের পূর্বধারণা ও প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়। তাদের সংকটের প্রকৃতি এক নয়, কিন্তু প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই প্রশ্নটি ফিরে আসে: নিজের বিশ্বাসের বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেকে বিচার করার ক্ষমতা কি মানুষের আছে?
“সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই”—এই বাক্যকে আমি তাই চূড়ান্ত আপেক্ষিকতাবাদের ঘোষণা হিসেবে পড়তে চাই না। বরং এটি সত্য সম্পর্কে আমাদের অহংকারের বিরুদ্ধে একটি সতর্কতা। বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অসম্পূর্ণ হতে পারে, আমাদের ভাষা সীমাবদ্ধ হতে পারে, আমাদের স্মৃতি ভুল করতে পারে এবং আমাদের নৈতিক বিশ্বাস আত্মপ্রবঞ্চনার আড়াল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতার অর্থ সত্যের অনুসন্ধান ত্যাগ করা নয়। বরং সত্যের দাবি যত দৃঢ়, তাকে যাচাই করার প্রয়োজন তত বেশি।
শেষ পর্যন্ত ভিঞ্চি দা ও সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই আমাকে এমন এক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়, যা কেবল সিনেমার নয়, মানুষের অস্তিত্বেরও: আমরা কি সত্য জানতে চাই, নাকি এমন একটি সত্য চাই, যার মধ্যে নিজেদের আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ, ভয় ও ক্ষমতার বাসনাকে নিরাপদে আশ্রয় দিতে পারি? মানুষ যখন নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করতে পারে না, তখন যুক্তি আত্মপক্ষসমর্থনে পরিণত হয়, ন্যায়বিচার প্রতিশোধের ভাষা ধারণ করে এবং পরিচয় হয়ে ওঠে নিজের সম্পর্কে নির্মিত একটি গল্প। সত্যের সবচেয়ে বড় সংকট তখন মিথ্যার উপস্থিতি নয়; বরং নিজের নির্মিত গল্পকে বাস্তবতার চেয়েও বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করা।
সত্যের বিপরীত সব সময় মিথ্যা নয়। কখনো কখনো সত্যের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হলো নিজের সত্য সম্পর্কে মানুষের অটল নিশ্চয়তা—যে নিশ্চয়তা তাকে আর প্রশ্ন করতে, অন্যের কথা শুনতে কিংবা নিজের ভুল স্বীকার করতে দেয় না।
আমি আপাতত বেশ কিছু তাত্ত্বিকের দেখার চোখকে ব্যবহার করে এই সিনেমাগুলোকে দেখব। আমার একান্ত ব্যক্তিগত খেয়াল বলতে পারেন। আগের আলাপগুলো একত্রে করেছিলাম। এইবার একটু গুছিয়ে আলাদা আলাদা করে করলাম।
লাকাঁ: আয়নার ভেতরের মানুষ, অন্যের দৃষ্টি ও বিভক্ত আত্মপরিচয়
জাক লাকাঁর মনোবিশ্লেষণ দিয়ে ভিঞ্চি দা এবং সত্যি বলে সত্যি কিছু নেইকে পড়লে সত্যের প্রশ্নটি আত্মপরিচয়ের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। লাকাঁর মতে, মানুষ নিজের সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি করে, তা কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ সত্তার সরাসরি প্রতিফলন নয়; বরং অন্যের দৃষ্টি, ভাষা এবং সামাজিক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। ভিঞ্চি দায় এই ধারণার একটি দৃশ্যমান রূপ পাওয়া যায় মুখ নির্মাণের শিল্পে। ভিঞ্চি অন্যের মুখকে পুনর্নির্মাণ করতে পারে, কিন্তু নিজের শিল্পীসত্তাকে সমাজের কাছে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তার দক্ষতা যত নিখুঁত, তার আত্মপরিচয়ের সংকট ততটাই তীব্র। এখানে মুখ কেবল শারীরিক পরিচয়ের বাহক নয়; এটি অন্যের চোখে নিজেকে চিনতে পারার একটি মাধ্যম। ভিঞ্চি যে স্বীকৃতি চায়, তা আসলে তার প্রতিভার সামাজিক স্বীকৃতির পাশাপাশি নিজের অস্তিত্বের মূল্য নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষা।
অন্যদিকে, সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই'তে আত্মপরিচয়ের সংকট অন্যভাবে প্রকাশিত হয়। বারোজন জুরির সদস্য একটি হত্যামামলার অভিযুক্তকে নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু তাদের প্রত্যেকের বিচারবোধ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পূর্বধারণার দ্বারা প্রভাবিত। লাকাঁর দৃষ্টিতে, মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ যুক্তিবাদী ও স্বচ্ছ বিচারক হিসেবে কল্পনা করলেও তার আত্মপরিচয় ও উপলব্ধি অন্যের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই গড়ে ওঠে। জুরির সদস্যরা শুধু প্রমাণ বিচার করছেন না; একই সঙ্গে নিজেদের নৈতিক পরিচয়ও রক্ষা করছেন। কেউ নিজের সামাজিক পূর্বধারণাকে সত্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন, কেউ নিজের অভিজ্ঞতাকে সর্বজনীন নিয়ম হিসেবে প্রয়োগ করেন। ফলে অভিযুক্তের অপরাধ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেককে নিজের বিচারবোধের সীমাবদ্ধতার মুখোমুখিও হতে হয়।
দুটি ছবির মধ্যে লাকাঁর তত্ত্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সংযোগ হলো, মানুষ বাস্তবতাকে বিচার করার সময় নিজের পরিচয়ের ধারণাকেও রক্ষা করতে চায়। ভিঞ্চি অন্যের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে নিজের মূল্য খোঁজে, আর জুরিরা নিজেদের বিচারবোধের মধ্য দিয়ে নিজেদের নৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু আত্মপরিচয় যখন বাইরের স্বীকৃতি কিংবা নিজের সম্পর্কে নির্মিত কোনো আদর্শ প্রতিচ্ছবির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়। লাকাঁর আলোকে সত্যের সংকট তাই শুধু মানুষ কী জানে, সেই প্রশ্ন নয়; সে নিজের সম্পর্কে কী বিশ্বাস করতে চায়, সেই প্রশ্নও।
ফ্রয়েড: অবচেতন, দমন ও নৈতিক আত্মপ্রবঞ্চনা
সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণে সচেতন যুক্তি মানুষের মানসিক জীবনের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। মানুষের আচরণের পেছনে এমন আকাঙ্ক্ষা, ভয়, স্মৃতি ও দ্বন্দ্ব কাজ করতে পারে, যেগুলো সে নিজেও পুরোপুরি উপলব্ধি করে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ভিঞ্চি দার ভিঞ্চি এবং আদি বোসের সম্পর্ককে পড়লে তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য ও অন্তর্নিহিত মানসিক প্রয়োজনের মধ্যে একটি সম্ভাব্য ব্যবধান দেখা যায়।
ভিঞ্চির ক্ষেত্রে শিল্পের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু মানুষ যখন কোনো আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজের অস্তিত্বকে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে ফেলে, তখন সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের সুযোগকে সে নৈতিকভাবে যাচাই না করেই গ্রহণ করতে পারে। ভিঞ্চির জন্য আদি বোসের প্রস্তাব তাই কেবল পেশাগত সুযোগ নয়; এটি দীর্ঘদিনের প্রত্যাখ্যানের পর নিজেকে প্রমাণ করার সম্ভাবনা। তার শিল্প যে অপরাধের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিজের আকাঙ্ক্ষা ও নৈতিক দায়ের সম্পর্কও পুনর্বিবেচনা করতে হয়। এই দ্বন্দ্বকে ফ্রয়েডীয় অর্থে সচেতন আকাঙ্ক্ষা ও অস্বস্তিকর মানসিক বাস্তবতার সংঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়, যদিও চলচ্চিত্রের চরিত্রকে নির্দিষ্ট কোনো ক্লিনিক্যাল অবস্থার সঙ্গে এক করে দেখা যুক্তিযুক্ত হবে না।
আদি বোসের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। তার সহিংসতা ব্যক্তিগত ন্যায়বিচারের ভাষায় প্রকাশিত হয়। সে নিজেকে অপরাধীদের শাস্তিদাতা হিসেবে কল্পনা করে এবং নিজের কর্মকাণ্ডকে সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করে। ফ্রয়েডের প্রতিরক্ষামূলক প্রক্রিয়ার ধারণা (যার বিস্তারিত শ্রেণিবিন্যাস মূলত তাঁর মেয়ে আনা ফ্রয়েডের কাজ) দিয়ে এখানে প্রশ্ন তোলা যায়: নিজের সম্পর্কে একটি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ধারণা বজায় রাখতে মানুষ কি কখনো নিজের আচরণের অস্বস্তিকর দিকগুলোকে আড়াল করে? আদি নিজের কাজকে ন্যায়বিচার হিসেবে ব্যাখ্যা করার মাধ্যমে নিজের সহিংসতার নৈতিক তাৎপর্যকে পুনর্গঠন করে। তবে তার আচরণকে শুধু অবদমিত আকাঙ্ক্ষার ফল বলে ব্যাখ্যা করলে চরিত্রটির সামাজিক ও রাজনৈতিক মাত্রা হারিয়ে যাবে। বরং ফ্রয়েডীয় পাঠ দেখায়, সচেতন নৈতিক যুক্তি কখনো কখনো নিজের গভীরতর দ্বন্দ্বকে ঢেকে রাখার মাধ্যমও হতে পারে।
সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই'তে অবচেতনের প্রশ্নটি আরও সমষ্টিগত বিচারবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। জুরির সদস্যরা নিজেদের সিদ্ধান্তকে যুক্তি ও প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করতে পারেন; কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ভয়, বিরাগ এবং সামাজিক পূর্বধারণা বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারে। কোনো জুরির ব্যক্তিগত ক্ষোভ যখন অভিযুক্ত সম্পর্কে তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তখন সে নিজের আবেগকে নিরপেক্ষ যুক্তি হিসেবে উপলব্ধি করতে পারে। ফ্রয়েডের দৃষ্টিতে এটি মানুষের আত্মজ্ঞান সম্পর্কে একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে: মানুষ সব সময় জানে না, তার সিদ্ধান্তের পেছনে কোন মানসিক শক্তি কাজ করছে।
এই তুলনায় ভিঞ্চি দা ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও নৈতিক আত্মবৈধতার সংকটকে ঘনীভূত করে, আর সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই দেখায় কীভাবে ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব একটি যৌথ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। দুটি চলচ্চিত্রই এই সম্ভাবনা উন্মুক্ত করে যে, মানুষ শুধু অন্যের কাছে সত্য গোপন করে না; কখনো নিজের কাছেও নিজের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখে।
দেরিদা: সত্য-মিথ্যার দ্বৈততা ও অর্থের অস্থিরতা
জাক দেরিদার deconstruction বা বিনির্মাণের ধারণা দিয়ে এই দুই চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করলে প্রশ্নটি দাঁড়ায়: সত্য ও মিথ্যা, বাস্তব ও কৃত্রিম, অপরাধ ও ন্যায়বিচার—এই ধারণাগুলোর মধ্যকার সীমারেখা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং সেই সীমারেখার ভেতরেই কি কোনো অসংগতি লুকিয়ে থাকে? বিনির্মাণের অর্থ সত্যকে অস্বীকার করা নয়; বরং কোনো বক্তব্য বা ধারণা যে স্থির, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও দ্বন্দ্বহীন অর্থ বহন করে বলে দাবি করে, তার ভিত্তিগুলোকে পরীক্ষা করা।
ভিঞ্চি দায় মুখের নির্মাণ এই প্রশ্নের একটি চলচ্চিত্রীয় রূপ। সাধারণত মুখকে ব্যক্তির পরিচয়ের প্রত্যক্ষ চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু প্রস্থেটিক মেকআপ যখন একটি মুখকে অন্য মুখের মতো করে তোলে, তখন চেহারা ও পরিচয়ের সম্পর্ক আর নিশ্চিত থাকে না। যে দৃশ্যমান অবয়বকে সত্যের প্রমাণ বলে মনে করা হয়েছিল, সেটিই প্রতারণার মাধ্যম হয়ে ওঠে। এখানে কৃত্রিমতা বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং বাস্তব বলে যা শনাক্ত করি, সেই প্রক্রিয়াটিকেই অস্থিতিশীল করে তোলে। এই অর্থে ভিঞ্চি দার শিল্প শুধু মুখের অনুকরণ নয়, পরিচয় সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত বিশ্বাসেরও পরীক্ষা।
দেরিদার বিনির্মাণ দিয়ে আদি বোসের চরিত্রকেও পড়া যায়। তার ন্যায়বিচারের ভাষা ও সহিংস কর্মকাণ্ডের মধ্যে যে ব্যবধান, তা ন্যায় ও অন্যায়ের প্রচলিত দ্বৈততাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। আদি নিজেকে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে, কিন্তু তার কাজের পদ্ধতি তাকে অপরাধীর অবস্থানের কাছাকাছি নিয়ে যায়। এর অর্থ এই নয় যে ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; বরং ন্যায়ের ভাষা ব্যবহার করলেই কোনো কাজ ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। একটি ধারণার নাম এবং সেই ধারণার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ফাঁক থাকতে পারে। চলচ্চিত্রটির নৈতিক দ্বন্দ্ব সেই ফাঁককে দৃশ্যমান করে।
সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই'তে বিনির্মাণের সম্ভাবনা তৈরি হয় বিচারপ্রক্রিয়ার ভাষা ও যুক্তির মধ্যে। প্রত্যেক জুরি সদস্য নিজের সিদ্ধান্তকে সত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করতে পারেন, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি পরীক্ষা করলে অসংগতি, অনুমান ও অপ্রমাণিত বিশ্বাস সামনে আসতে পারে। কোনো সাক্ষ্যকে সত্য বলে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা, বক্তব্যের ধারাবাহিকতা এবং অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে তার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় সত্য কোনো ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসের সমার্থক নয়; তা বক্তব্যের ভেতরের অসংগতি পরীক্ষা করারও বিষয়।
তবে এখানে দেরিদাকে এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে বিচারপ্রক্রিয়ার সব সিদ্ধান্তই অর্থহীন হয়ে পড়ে। বিনির্মাণ কোনো প্রমাণকে অগ্রাহ্য করার পদ্ধতি নয়; বরং প্রমাণ ও বক্তব্যকে যেসব ধারণাগত কাঠামো অর্থ দেয়, সেগুলোর সীমাবদ্ধতা অনুসন্ধানের পদ্ধতি। এই দৃষ্টিতে দুই চলচ্চিত্রের তুলনা আমাদের শেখায়, সত্যের দাবি যতই সুসংহত মনে হোক, তার ভিত্তিকে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকা প্রয়োজন। সত্যের স্থিতিশীলতা সম্পর্কে সন্দেহ মানেই সত্যের অনুপস্থিতি নয়; বরং সত্যকে নিজের একচেটিয়া ব্যাখ্যার মধ্যে বন্দি না রাখার চেষ্টা।
ফুকো: ক্ষমতা, জ্ঞান ও সত্য নির্ধারণের অধিকার
মিশেল ফুকোর দর্শনে সত্যকে বোঝার জন্য শুধু কোনো বক্তব্য সঠিক কি না, তা পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়; সেই বক্তব্য কীভাবে সামাজিক কর্তৃত্ব অর্জন করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞান ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে ফুকো দেখিয়েছেন, সমাজে কোন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, কার কথা বিশ্বাসযোগ্য বলে বিবেচিত হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠান সত্য নির্ধারণের অধিকার পাবে—এসব প্রশ্ন সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। এই ধারণা সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই ও ভিঞ্চি দার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংযোগ তৈরি করে।
সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই'তে বিচারকক্ষের পরিসর এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষের বক্তব্য ও প্রমাণকে মূল্যায়ন করে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়ার অংশগ্রহণকারীরা সামাজিক অবস্থান, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পূর্বধারণা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নন। ফলে সত্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় কেবল প্রমাণ নয়, প্রমাণকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো বক্তব্যকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করা, কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখা কিংবা একটি ঘটনার নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়া—এসব সিদ্ধান্ত সামাজিক ধারণার প্রভাব বহন করতে পারে। ফুকোর আলোকে বিচারপ্রক্রিয়াকে তাই কেবল নিরপেক্ষ যুক্তির প্রয়োগ হিসেবে নয়, সত্য নির্ধারণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।
ভিঞ্চি দায় এই প্রশ্নটি আরও প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। আদি বোস প্রচলিত বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতাকে নিজের হাতে বিচার করার নৈতিক অনুমতি হিসেবে গ্রহণ করে। সে কেবল অপরাধীদের শাস্তি দিতে চায় না; কে অপরাধী, কে শাস্তির যোগ্য এবং কোন শাস্তি ন্যায়সংগত—সেই সিদ্ধান্তের কর্তৃত্বও নিজের হাতে নিতে চায়। ফলে সে নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে একটি বিকল্প বিচারব্যবস্থায় রূপান্তরিত করে। এখানে ক্ষমতা নিজেকে নিছক সহিংসতা হিসেবে প্রকাশ করে না; বরং ন্যায়বিচারের দায়িত্ব হিসেবে বৈধতা অর্জনের চেষ্টা করে।
এই জায়গায় ফুকোর তত্ত্বের রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট। ক্ষমতা অনেক সময় নিজের কর্তৃত্বকে ন্যায়, শৃঙ্খলা বা সত্যের ভাষায় উপস্থাপন করে। আদি বোসের আত্মবিশ্বাস তাই তার সিদ্ধান্তের যথার্থতার প্রমাণ নয়; বরং প্রশ্ন তোলার বিষয়। সে যদি নিজেই অপরাধ নির্ধারণ করে, নিজেই প্রমাণের অর্থ স্থির করে এবং নিজেই শাস্তি কার্যকর করে, তাহলে তার সিদ্ধান্ত যাচাই করবে কে? এই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির পার্থক্য সামনে আনে।
দুটি ছবির মধ্যে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্যও রয়েছে। সত্যি বলে সত্যি কিছু নেইর বিচারকক্ষকেন্দ্রিক কাঠামোতে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক এবং প্রমাণ পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা থাকে; ভিঞ্চি দায় আদি বোস নিজের নৈতিক নিশ্চয়তাকে বিচারপ্রক্রিয়ার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করায়। একদিকে সত্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, অন্যদিকে একজন ব্যক্তি সত্য নির্ধারণের ক্ষমতাকে নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করছে। ফুকোর আলোকে এই তুলনা দেখায়, সত্যের সমস্যা কেবল ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়; সত্য নির্ধারণের অধিকার কার হাতে থাকবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ক্ষমতার সঙ্গে সত্যের সম্পর্ক দেখানো মানে সব সত্যকে ক্ষমতাবানদের বানানো মিথ্যা বলে ধরে নেওয়া নয়। ফুকোর বিশ্লেষণ বরং আমাদের শেখায়, সত্যের দাবি কোন প্রতিষ্ঠান, সামাজিক নিয়ম এবং জ্ঞান উৎপাদনের প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তা পরীক্ষা করতে হবে। সত্যের রাজনৈতিক প্রশ্ন তাই শুধু কী সত্য, তা নয়; কে সত্য নির্ধারণ করছে, কীভাবে করছে এবং সেই সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার সুযোগ কার রয়েছে।
অ্যাডলার: হীনম্মন্যতা, শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্ক্ষা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার রাজনীতি
আলফ্রেড অ্যাডলারের ব্যক্তিত্ব-মনোবিজ্ঞানের (Individual Psychology) আলোকে ভিঞ্চি দা এবং সত্যি বলে সত্যি কিছু নেইকে পড়লে মানুষের আচরণের পেছনে থাকা আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অ্যাডলারের মতে, হীনতার অনুভূতি মানুষের বিকাশের একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা হতে পারে; মানুষ এই অনুভূতিকে অতিক্রম করতে দক্ষতা অর্জন, সৃজনশীলতা ও আত্মোন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। কিন্তু নিজের অপ্রতুলতার অনুভূতি যখন অন্যদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা আধিপত্যের রূপও নিতে পারে। এই পার্থক্যটি ভিঞ্চি দা ও আদি বোসের চরিত্র বিশ্লেষণে বিশেষভাবে কার্যকর।
ভিঞ্চি দার ক্ষেত্রে নিজের প্রতিভার স্বীকৃতি না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তার আত্মপরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত। সে দক্ষ শিল্পী, কিন্তু পেশাগত জগতে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তার হতাশা কেবল সুযোগের অভাব থেকে আসে না; এর মধ্যে রয়েছে অন্যদের কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার তীব্র প্রয়োজন। অ্যাডলারের দৃষ্টিতে এই আকাঙ্ক্ষাকে হীনতার অনুভূতি থেকে আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে বোঝা যায়। তবে ভিঞ্চির সংকট হলো, তার সৃজনশীল উৎকর্ষের আকাঙ্ক্ষা ক্রমে বাইরের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে সে যখন নিজের প্রতিভাকে কাজে লাগানোর একটি বড় সুযোগ পায়, তখন সেই সুযোগের নৈতিক মূল্যায়ন এবং নিজের শিল্পীসত্তার স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
আদি বোসের ক্ষেত্রে আত্মপ্রতিষ্ঠার রূপটি আলাদা। সে নিজের বিচারবোধকে অন্যদের ওপর প্রয়োগ করতে চায় এবং নিজের নৈতিক সিদ্ধান্তকে সামাজিক কর্তৃত্বের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। অ্যাডলারের ধারণা দিয়ে এখানে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়: আদি কি কেবল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, নাকি নিজেকে এমন এক অবস্থানে স্থাপন করছে, যেখানে অন্যের নৈতিক মূল্য নির্ধারণের অধিকার তার নিজের বলে মনে হয়? এই পাঠ তার সহিংসতাকে হীনম্মন্যতার সরল ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে না; বরং দেখায়, আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা কখন অন্যের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই'তে অ্যাডলারের তত্ত্বকে প্রয়োগ করা যায় জুরিদের আত্মপরিচয় ও মতামতের সংঘাতের ক্ষেত্রে। বিচারপ্রক্রিয়ায় কেউ নিজের অভিজ্ঞতা ও সামাজিক অবস্থানকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, যেন তা অন্যদের চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা কখনো যুক্তির ফল, আবার কখনো নিজের কর্তৃত্ব বা আত্মমর্যাদা রক্ষা করার উপায়ও হতে পারে। যখন নতুন প্রমাণ সামনে আসার পরও কেউ নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে অনিচ্ছুক হন, তখন প্রশ্ন ওঠে—তিনি কি সত্যকে রক্ষা করছেন, নাকি নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও আত্মপরিচয়কে রক্ষা করছেন?
এখানে অ্যাডলারের তত্ত্বের একটি সীমাও মনে রাখা জরুরি। প্রতিটি একগুঁয়েমি বা আধিপত্যের প্রবণতাকে হীনম্মন্যতার ফল বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। কোনো চরিত্রের আচরণ বোঝার জন্য তার সামাজিক অবস্থান, অভিজ্ঞতা এবং আখ্যানের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিও বিবেচনা করতে হয়। তবু অ্যাডলারের আলোকে এই দুই চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য সামনে আসে: মানুষ নিজের মূল্য প্রমাণ করতে গিয়ে কখনো সত্যের অনুসন্ধানের চেয়ে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠাকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। আত্মপ্রতিষ্ঠা যখন আত্মসমালোচনার বিকল্প হয়ে ওঠে, তখন সত্যের অনুসন্ধান সহজেই ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়।
আমি কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে চাই না। আমি জাস্ট আলাপটা উত্থাপন করলাম। একদম সারফেস লেভেলের আলাপ। আমার জানাশোনার ভিতরের আলাপ। আমি আমার এই আলাপের উপর আপনাদের যেকোন ধরনের আলাপ গ্রহণ করতে রাজি আছি। মানে আমি ডিবেট আহবান করছি আরকি। আলাপের বিপরীতে আলাপ।
তুলনামূলক সমালোচনা: পাঁচটি তত্ত্ব, সত্যের পাঁচটি সংকট
লাকাঁ, ফ্রয়েড, দেরিদা, ফুকো ও অ্যাডলারের তত্ত্বকে পাশাপাশি রাখলে ভিঞ্চি দা এবং সত্যি বলে সত্যি কিছু নেইর মধ্যে একটি বহুমাত্রিক সম্পর্ক তৈরি হয়। লাকাঁর কাছে আত্মপরিচয় অন্যের দৃষ্টি ও স্বীকৃতির সঙ্গে জড়িত; ফ্রয়েডের কাছে সচেতন যুক্তির নিচে কাজ করে অবচেতন আকাঙ্ক্ষা ও দ্বন্দ্ব; দেরিদা আমাদের শেখান, কোনো বক্তব্য বা ধারণার অর্থকে স্থির ও চূড়ান্ত ধরে নেওয়া যায় না; ফুকো সত্য নির্ধারণের সঙ্গে ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক উন্মোচন করেন; আর অ্যাডলার দেখান, হীনতার অনুভূতি অতিক্রম করে আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা কীভাবে মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই তত্ত্বগুলোকে একত্রে পড়লে ভিঞ্চি দার চরিত্রটি শুধু অবমূল্যায়িত শিল্পীর প্রতিকৃতি থাকে না। সে এমন একজন মানুষ, যার আত্মপরিচয় স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে; যার সচেতন সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করে ব্যক্তিগত অপূর্ণতা; এবং যার সৃষ্টিশীলতা এমন একটি ক্ষমতাব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করে, যেখানে শিল্পের অর্থ ও ব্যবহার তার নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। একইভাবে, আদি বোস শুধু একজন অপরাধী নয়, বরং এমন একজন মানুষ, যে নিজের নৈতিক বিশ্বাসকে প্রশ্নাতীত করে তোলে এবং সেই বিশ্বাসের মাধ্যমে অন্যের জীবন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দাবি করে। অন্যদিকে, সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই-র বিচারকক্ষকেন্দ্রিক আখ্যান সত্যের প্রশ্নকে ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব থেকে সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নিয়ে আসে। জুরিদের প্রত্যেকের সামনে শুধু একজন অভিযুক্তের অপরাধ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন নেই; রয়েছে নিজের পূর্বধারণা শনাক্ত করার, অন্যের যুক্তি শোনার এবং নিজের অবস্থান সংশোধন করার প্রশ্ন। এখানে সত্যের অনুসন্ধান তখনই অর্থবহ হয়, যখন কোনো ব্যক্তির আত্মবিশ্বাসকে প্রমাণের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয় না।
তবে এই দুই চলচ্চিত্রের নান্দনিক ও আখ্যানগত পার্থক্য অক্ষুণ্ণ রাখা প্রয়োজন। ভিঞ্চি দা একটি মনস্তাত্ত্বিক অপরাধ-থ্রিলার, যেখানে মুখের নির্মাণ, অপরাধ এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার সংঘাত মুখ্য। সত্যি বলে সত্যি কিছু নেই একটি বিচারকক্ষকেন্দ্রিক নাট্যধর্মী চলচ্চিত্র, যার কেন্দ্রে রয়েছে সাক্ষ্য, যুক্তি, পক্ষপাত ও যৌথ সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া; এটি Twelve Angry Men–এর আখ্যানধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ভিঞ্চি দায় সত্যের সংকট দৃশ্যমান পরিচয় ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, আর সত্যি বলে সত্যি কিছু নেইতে তা বিচারবোধের সীমাবদ্ধতা ও প্রমাণের পুনর্মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে সামনে আসে।
সত্যের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো এই নয় যে মানুষ মিথ্যা বলে; বরং মানুষ নিজের আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও ক্ষমতার প্রয়োজনের সঙ্গে মিলে যাওয়া কোনো বিশ্বাসকে সত্য বলে গ্রহণ করে, তারপর সেই বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার ক্ষমতাটুকুও হারিয়ে ফেলে। মানুষ ভেবে নেয় সে সঠিক। এই যেমন আমি এই লেখাটা লিখে ভেবে নিয়েছি আমি যা লিখেছি তা সত্য। কত বড় হিপোক্রিট ভাবেন একবার। আমরা আসলে একটা ইল্যুশনে বাস করি, সবকিছু ধোঁয়াশা। পথ খুঁজছি, কিন্তু পাচ্ছি না। হাতড়ে হাতড়ে বেড়াচ্ছি।
সিনেমা দুটি নির্মাণের জন্য সৃজিতকে দেখলে জড়িয়ে ধরব। ওর প্রতি ভরসা অনেক। আমি সারাদিন ওকে গালি দিলেও আমার কেন জানি মনে হয় শেষমেষ ওই জিতে যায়। ভালো সিনেমার খারাপ বিশ্লেষণ পড়ার পর আপনাদের উচিত সিনেমাগুলো দেখা। এই সিনেমা নিয়ে আরও বিস্তারিত আর গভীর আলাপ শিগগিরই দেবো।