রাত ২টা ১৮ মিনিট।
আরশের ল্যাপটপের স্ক্রিনে নতুন মেইলটা তখনো খোলা। শেষ লাইনটা বারবার পড়ছিল সে—
“তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষটাই তোমাকে মেরে ফেলবে।”
কিন্তু তার সবচেয়ে কাছের মানুষ কে?
এই শহরে তার আপন বলতে কেউ নেই। মা মারা গেছেন ছোটবেলায়, বাবা নিখোঁজ সাত বছর আগে। আর বন্ধুবান্ধবের মধ্যে একমাত্র নীলয়, যে বিপদের সময় সবসময় তার পাশে দাঁড়িয়েছে।
আরশ ফোনটা হাতে নিল। নীলয়ের নম্বরে কল করল।
একবার।
দুবার।
তৃতীয়বার কল ধরতেই ওপাশ থেকে ঘুমজড়ানো কণ্ঠ ভেসে এল।
“হ্যালো, আরশ? এত রাতে কী হয়েছে?”
আরশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুই কি কখনো এমন কোনো জায়গায় গেছিস, যেখানে সময় থেমে থাকে?”
ওপাশে নীরবতা।
তারপর নীলয় ফিসফিস করে বলল, “তুই স্টেশনটার ছবি দেখেছিস?”
আরশের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“কোন স্টেশন?”
“আমি জানি না তুই কীভাবে ছবিটা পেলি। কিন্তু একটা কথা শোন—ওখানে যাস না।”
“কেন?”
নীলয় উত্তর দিল না।
আরশ আবার বলল, “তুই স্টেশনটা চিনিস, তাই না?”
কয়েক সেকেন্ড পর নীলয় বলল, “আরশ, তুই কি সত্যিই কিছু মনে করতে পারছিস না?”
“কী মনে করতে পারছি না?”
“সাত বছর আগের সেই রাতটা।”
আরশের মাথার ভেতর হঠাৎ তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো।
চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছু অস্পষ্ট দৃশ্য।
বৃষ্টিভেজা রেললাইন।
একটা মেয়ের কান্না।
রক্তমাখা হাত।
আর কেউ একজন চিৎকার করে বলছে—
“আরশ, আমাকে ভুলে যেয়ো না!”
সে কপাল চেপে ধরল।
“নীলয়! সাত বছর আগে কী হয়েছিল?”
কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না।
কল কেটে গেছে।
আর ঠিক তখনই ল্যাপটপের স্ক্রিনে আরেকটা মেইল ভেসে উঠল।
প্রেরক: আরশ নিজেই।
পাঠানোর সময়: আগামীকাল, রাত ৩টা ০১ মিনিট।
বিষয়: “তুমি ইতিমধ্যেই তাকে মেরে ফেলেছ।”
আরশের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
মেইলটা খুলতেই একটা ছবি দেখা গেল।
ছবিতে সে নিজেই দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত রেলস্টেশনে। তার জামায় রক্ত, হাতে একটা ছুরি।
আর তার পায়ের কাছে পড়ে আছে নীল শাড়ি পরা মেয়েটি।
ছবির পেছনে তারিখ লেখা—
২৫ অক্টোবর, ২০১৯।
সাত বছর আগের সেই রাত।
আরশ ছবিটা বড় করে দেখল। মেয়েটির মুখ স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার হাতে বাঁধা ছোট্ট কালো সুতোটা চোখে পড়ল।
ঠিক একই সুতো আরশের ডান হাতেও বাঁধা।
সে নিজের হাতের দিকে তাকাল।
সুতোটা সেখানে এখনো আছে।
কিন্তু এই সুতো তার হাতে কে বেঁধেছিল, তা তার মনে নেই।
পরদিন রাত ১১টা ৪০ মিনিট।
আরশ দাঁড়িয়ে আছে শহরের প্রান্তে পরিত্যক্ত রেলস্টেশনের সামনে।
আকাশে মেঘ জমেছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা স্টেশনটার ভাঙা সাইনবোর্ডে এখনো অস্পষ্ট অক্ষরে লেখা— শিউলিবাড়ি রেলস্টেশন।
গেটের পাশে একটা পুরোনো ঘড়ি ঝুলছে।
ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে রাত ২টা ১৭ মিনিটে।
আরশ পা বাড়াতেই পেছন থেকে একটা মেয়ের কণ্ঠ শোনা গেল।
“তুমি অবশেষে এসেছ, আরশ।”
সে ঘুরে দাঁড়াল।
নীল শাড়ি পরা সেই মেয়েটি তার সামনে দাঁড়িয়ে। ভেজা চুল কাঁধের ওপর ছড়িয়ে আছে। চোখ দুটো অদ্ভুত শান্ত, অথচ সেই শান্তির গভীরে জমে আছে বহু বছরের কষ্ট।
আরশ ধীরে ধীরে বলল, “তুমি কে?”
মেয়েটি মৃদু হাসল।
“সত্যিই আমাকে চিনতে পারছ না?”
“না।”
মেয়েটির চোখে পানি জমল।
“তাহলে তোমাকে আবার পরিচয় করিয়ে দিতে হবে।”
সে এক পা এগিয়ে এল।
“আমার নাম মায়া। সাত বছর আগে এই স্টেশনেই তুমি আমাকে কথা দিয়েছিলে—যাই ঘটুক, কখনো আমার হাত ছাড়বে না।”
আরশের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
মায়া তার হাতের কালো সুতোটা ছুঁয়ে বলল, “এই সুতোটা মনে আছে?”
আরশ মাথা নাড়ল।
“এটা তুমি আমাকে দিয়েছিলে,” মায়া বলল। “আর আমি তোমাকে দিয়েছিলাম আমার শেষ নিঃশ্বাসের প্রতিশ্রুতি।”
“শেষ নিঃশ্বাস?”
মায়া উত্তর দেওয়ার আগেই স্টেশনের ভেতর থেকে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।
অথচ এই রেললাইনে সাত বছর ধরে কোনো ট্রেন চলেনি।
দূরের অন্ধকার চিরে একটা ট্রেন এগিয়ে আসছে। তার জানালাগুলো কালো, দরজাগুলো খোলা। ট্রেনের সামনের ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে—
২টা ১৭ মিনিট।
মায়া আরশের হাত শক্ত করে ধরল।
“কী কথা?”
মায়া তার চোখের দিকে তাকাল।
আরশ হাত ছাড়িয়ে পিছিয়ে গেল।
“মিথ্যা!”
“তাহলে নিজের স্মৃতিকে জিজ্ঞেস করো।”
ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রেনটা তাদের সামনে এসে থামল।
দরজা খুলে গেল।
ভেতর থেকে নেমে এল একজন বৃদ্ধ।
তার পরনে পুরোনো রেলওয়ের পোশাক। মুখে গভীর ক্ষতচিহ্ন। হাতে একটা কালো ডায়েরি।
বৃদ্ধ আরশের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
তারপর এমন একটা কথা বললেন, যা শুনে আরশের পায়ের নিচের মাটি যেন সরে গেল।
“বাবা, তুই এখানে আবার কেন এসেছিস?”
আরশ স্তব্ধ হয়ে গেল।
এই কণ্ঠ সে চেনে।
এই মুখ সে স্বপ্নে দেখেছে অসংখ্যবার।
এই মানুষটাই তার বাবা—যিনি সাত বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিলেন।
কিন্তু তার বাবা তো তখনকার ছবিতে বেঁচে ছিলেন।
বৃদ্ধ ডায়েরিটা আরশের হাতে দিয়ে ফিসফিস করে বললেন—
“মায়াকে বিশ্বাস করিস না। কারণ মেয়েটা সাত বছর আগে মারা গেছে।”
আরশ ধীরে ধীরে মায়ার দিকে তাকাল।
মায়া সেখানে নেই।
শুধু ভেজা রেললাইনের ওপর পড়ে আছে একটা নীল শাড়ির আঁচল।
আর তার ফোনে নতুন একটা মেইল এসেছে।
প্রেরক: মায়া।
পাঠানোর সময়: আগামীকাল, রাত ২টা ১৭ মিনিট।
মেইলের ভেতরে মাত্র একটি লাইন—
“আরশ, তোমার বাবা মিথ্যা বলছে। কারণ তোমার বাবা মানুষ নন।”
আরশ মাথা তুলে বৃদ্ধের দিকে তাকাল।
বৃদ্ধের চোখ দুটো তখন সম্পূর্ণ কালো।
তিনি হাসলেন।
“চল, বাবা। এবার তোর আসল গল্পটা শুরু হোক।”
চলবে...
তৃতীয় অর্থাৎ শেষ পর্বে: আরশের বাবার পরিচয় কী? মায়া কি সত্যিই সাত বছর আগে মারা গিয়েছিল? আর আগামীকাল থেকে আসা চিঠিগুলো কে পাঠাচ্ছে?