প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বা MIS রিপোর্টিংয়ের একটি বড় অংশজুড়ে থাকে এক্সেলের তথ্য সাজানো, হিসাব করা, প্রতিবেদন তৈরি এবং তা ব্যবস্থাপনার কাছে উপস্থাপন করা। কাজগুলো খুব জটিল না হলেও সময়সাপেক্ষ। বিশেষ করে একই ধরনের প্রতিবেদন প্রতি মাসে তৈরি করতে হলে কাজটি অনেকটা নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক হয়ে যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার এই জায়গাতেই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ChatGPT-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম ব্যবহার করে এক্সেলের তথ্য থেকে খুব দ্রুত একটি পেশাদার বিক্রয় ড্যাশবোর্ড তৈরি করা সম্ভব। তবে এর জন্য শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার জানলেই হবে না; প্রয়োজন একটি সঠিক ও বারবার ব্যবহারযোগ্য কাজের পদ্ধতি।
শুরুটা হতে হবে এক্সেল থেকেই
একটি ভালো ড্যাশবোর্ডের ভিত্তি হলো সঠিক তথ্য। তাই প্রথম ধাপে এক্সেলে তথ্য সঠিক ও পরিষ্কারভাবে সাজাতে হবে। সম্ভব হলে প্রতি মাসে একই কলাম ও একই তথ্য কাঠামো অনুসরণ করা উচিত। এতে পরবর্তী মাসের প্রতিবেদন হালনাগাদ করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
ধরা যাক, একটি বিক্রয় ড্যাশবোর্ডে মোট অর্জন, লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জন, অর্জনের শতকরা হার, বিক্রয়কেন্দ্রভিত্তিক কার্যক্রম, সেরা ও পিছিয়ে থাকা বিক্রয়কেন্দ্র, লক্ষ্যমাত্রা থেকে ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় সূচক দেখানো হবে। ড্যাশবোর্ড তৈরির আগে এসব বিষয় ঠিক করে নেওয়া যেতে পারে।
এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে দিতে হবে তথ্য ও নির্দেশনা
প্রস্তুত করা এক্সেল ফাইলটি ChatGPT-কে দিয়ে ড্যাশবোর্ডটি কীভাবে দেখতে চাই, তা পরিষ্কারভাবে জানাতে হবে। শুধু ‘একটি ড্যাশবোর্ড তৈরি করো’ বললে হবে না। কোন তথ্য কোথায় থাকবে, কোন সূচকগুলো গুরুত্বপূর্ণ, কী ধরনের বিন্যাস প্রয়োজন—এসব নির্দেশনা যত পরিষ্কার হবে, ফলাফলও তত ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
ChatGPT-এর মাধ্যমে এমন ড্যাশবোর্ড তৈরি করা যায়, যা HTML ফাইল হিসেবে সংরক্ষণ করা সম্ভব। ফলে এটি সাধারণ স্থির প্রতিবেদন না হয়ে অনেকটা ওয়েবভিত্তিক ড্যাশবোর্ডের মতো ব্যবহার করা যায়।
তৈরি করলেই কাজ শেষ নয়
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ড্যাশবোর্ড তৈরি হওয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো তথ্য যাচাই।
ড্যাশবোর্ড দেখতে সুন্দর হলেই একটি প্রতিবেদন নির্ভরযোগ্য হয়ে যায় না। মোট লক্ষ্যমাত্রা, মোট অর্জন, অর্জনের শতকরা হার, বিক্রয়কেন্দ্রভিত্তিক তথ্য এবং সেরা বা পিছিয়ে থাকা বিক্রয়কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মূল এক্সেল ফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত প্রতিবেদনের তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ব্যবহারকারীর।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা ম্যানুয়ালি যাচাই করলেই অনেক সম্ভাব্য ভুল ধরা সম্ভব।
OneDrive-এ রাখলেই ব্যবস্থাপনার কাছে পৌঁছে যাবে
ড্যাশবোর্ড চূড়ান্ত হওয়ার পর HTML ফাইলটি OneDrive-এর নির্দিষ্ট ফোল্ডারে রাখা যায়। একই সঙ্গে মূল এক্সেল ফাইলটিও আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। এতে ভবিষ্যতে কোনো তথ্য যাচাই বা নতুন ড্যাশবোর্ড তৈরির প্রয়োজন হলে মূল তথ্য পাওয়া যাবে।
এরপর OneDrive থেকে ফাইলটি শেয়ার করে সংযোগের ঠিকানা কপি করে ব্যবস্থাপনার কাছে WhatsApp, Viber বা অন্য কোনো মাধ্যমে পাঠানো যায়।
এর ফলে বসকে প্রতিবার বড় এক্সেল ফাইল পাঠানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার—বিভিন্ন যন্ত্র থেকেই ড্যাশবোর্ড দেখা সম্ভব হবে। বড় ড্যাশবোর্ড হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্রের তথ্য খুঁজে দেখা যেতে পারে।
পরের মাসে কী হবে?
এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা এখানেই।
একবার ড্যাশবোর্ডের কাঠামো ও নকশা ঠিক হয়ে গেলে পরবর্তী মাসে একই ধরনের তথ্য কাঠামোর নতুন এক্সেল ফাইল ব্যবহার করে ড্যাশবোর্ড হালনাগাদ করা যায়। অর্থাৎ প্রতি মাসে শূন্য থেকে নতুন প্রতিবেদন তৈরি করার পরিবর্তে একটি তৈরি করা কাজের পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে প্রতিটি মাসের ড্যাশবোর্ড আলাদা সংস্করণ হিসেবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। যেমন—BSO_Dashboard_Jun-26, BSO_Dashboard_Jul-26 বা BSO_Dashboard_Aug-26। এতে পুরোনো প্রতিবেদনও সংরক্ষিত থাকবে এবং প্রয়োজনে সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে।
সুবিধার পাশাপাশি সতর্কতাও জরুরি
এই পদ্ধতিতে প্রতিবেদন তৈরির সময় কমানো এবং ড্যাশবোর্ড তৈরির কাজ সহজ করা সম্ভব হলেও তথ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে কোম্পানির বিক্রয় বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকলে ড্যাশবোর্ডের সংযোগের ঠিকানা যত্রতত্র শেয়ার করা উচিত নয়। সম্ভব হলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশাধিকার দেওয়া ভালো।
কোনো সংযোগের ঠিকানা অননুমোদিত ব্যক্তির কাছে চলে গেলে শুধু ফাইল মুছে ফেলাই একমাত্র সমাধান নয়; আগে শেয়ার করার অনুমতি পরিবর্তন বা প্রবেশাধিকার বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি কোনো প্রতিবেদন যাচাই না করে সরাসরি ব্যবস্থাপনার কাছে পাঠানো উচিত নয়। সুন্দর ড্যাশবোর্ডের চেয়ে সঠিক তথ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতের MIS রিপোর্টিং কি এমনই হবে?
MIS রিপোর্টিংয়ের মূল কাজ হলো তথ্য থেকে প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ তৈরি করা এবং সেই বিশ্লেষণ ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগানো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই প্রক্রিয়াটিকে দ্রুত ও সহজ করার একটি নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে এখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বিকল্প নয়। বরং সঠিক তথ্য, মানুষের বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতা—এই তিনটির সমন্বয়েই একটি কার্যকর রিপোর্টিং ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।
একবার তথ্যের কাঠামো এবং ড্যাশবোর্ডের বিন্যাস ঠিক হয়ে গেলে, পরবর্তী মাসগুলোতে শুধু নতুন তথ্য যুক্ত করে একই কাজের পদ্ধতি অনুসরণ করে দ্রুত ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদন তৈরি করা সম্ভব।
অর্থাৎ, লক্ষ্য শুধু একটি ড্যাশবোর্ড তৈরি করা নয়; লক্ষ্য হলো পুরো রিপোর্টিং ব্যবস্থাকে একটি বারবার ব্যবহারযোগ্য, দ্রুত ও আরও কার্যকর কাজের পদ্ধতিতে নিয়ে আসা।