শিউলি কাঁদতে কাঁদতে কখন যেন ঘুমিয়ে গিয়েছিলো।আচমকা ঘুম ভেঙ্গে যেতেই কিছুক্ষণ শূন্য দৃষ্টিতে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। রাত কতো হলো? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অবাক হলো। রাত দুটো বেজে গেছে। জানালা গলে চাঁদের আলো এসে বিছানা জুড়ে একটা অদ্ভুত আলোছায়ার ছবি এঁকে রেখেছে।
আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো শিউলি। পা টিপে টিপে পাশের দরজা দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। বারান্দা জুড়ে জ্যোৎস্না এসে হয়ত ওর জন্যেই অপেক্ষা করছিলো। বারান্দার গ্রিলে গাল ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো শিউলি। সারা আকাশ জুড়ে সাত জন্মের জ্যোৎস্না। কোথা থেকে আজই এলো এত জ্যোৎস্না! আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হঠাৎ করেই শাহেদের কথা মনে পড়লো। কোথায় আছে শাহেদ!
প্রায় একই সময়ে, শাহেদ একটা ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে একা একা বৈঠা চালিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে। পূর্ণিমা রাতে পদ্মার মাঝখানে যাবার অনেকদিনের শখ তার। আজ সে সুযোগটা এসেছে। অনভ্যস্ত হাতে বইঠা চালাতে চালাতে ঘেমে একাকার হয়ে গেছে। আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠা চালাতে চালাতে হাল ছেড়ে দিলো। আর শরীরে কুলাচ্ছে না। বৈঠাটা নৌকায় রেখে নৌকার উপর শুয়ে পড়ল শাহেদ। নৌকায় শুয়ে আকাশের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেলো শাহেদ। এত জ্যোৎস্না! আহারে আসমান, আজই তোকে এত জ্যোৎস্না আনতে হলো। কি মনে করে সাথে সাথে উঠে বসলো, শাহেদ। নাহ। জ্যোৎস্না দেখার সময় নাই এখন তার। পূর্ণিমা হয়ত অনেকের জন্য, কিন্তু তার জন্য নয়। সবার সব হয় না।
স্থির হয়ে বসে নৌকার দিকে তাকিয়ে রইল শাহেদ। সারা শরীরে একটা অশরীরি ঝিম ঝিম ভাব এসে ভর করছে। মাঝনদীতে মধ্যরাতে শীত শীত লাগে কেন? নাহ, এখন তো শীতকাল নয়। শাহেদ বুঝতে পেরেছে, নৌকায় উঠার আগে এতগুলো ঘুমের ঔষধ খাওয়ার একশন শুরু হয়ে গেছে। সারা নদীর বুকে জ্যোৎস্নার স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ঝিম ঝিম করা মাথার অনেক ভেতরে কে যেন কথা বলে উঠলো, সাঁতার না জানায় বেশ একটা সুবিধা হলো, তাই না, শাহেদ?
ঠোঁটের কোণায় একটা মুচকি হাসির ভঙ্গী আসতে আসতেও আসলোনা। শরীর আর নড়তে চাচ্ছে না ওর। অনেকটা চার হাত পায়ে আস্তে আস্তে নৌকার কিনারে এসে আরেকবার আসমানের দিকে তাকাল শাহেদ। নৌকার কিনারে এসে শরীরটা পানির দিকে হেলে দিতে দিতে তার শুধু মনে হলো, এত ঘুম আসছে কেন?
কাছেই গলির মুখে চৌকিদারের বাঁশি শুনে চমকে উঠলো শিউলি। জানালার গ্রিলে ঠেস দেয়া গালটা সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ঘুমুতে যাবে। খুব ঘুম পাচ্ছে তার। রুমের দিকে এগোতে এগোতে তার মনে হলো, শাহেদের সাথে আজ দুপুরে ওই নিষ্ঠুর আচরণটা না করলেও পারতো। ঠিক আছে, আগামীকাল মিষ্টি করে কথা বললেই হবে। শাহেদটা এত অভিমানী!