Story

কালো মেয়ে

October 29, 2026

13 views

আষাঢ়ের মেঘলা দুপুরে মেঘনা নদীর বাঁকে যখন ঘন কালো মেঘ জমে আকাশ একেবারে মাটির কাছাকাছি নেমে আসত, কুসুমপুরের প্রবীণরা বলত, "ঐ দেখ, কৃষ্ণপক্ষের আন্ধার নামছে।" ঠিক তেমনি এক ঘোর বর্ষার রাতে হাশেম আলীর ভাঙাচোরা কুঁড়েঘরের চাল চুইয়ে যখন অনবরত বৃষ্টির জল টুপটুপ করে পড়ছে মাটির সানকিতে, তখনই পৃথিবীর আলো দেখেছিল ময়না।

হাশেম আলী ছিলেন পেশায় এক সামান্য কামার। দিনভর হাপর টেনে আর লোহা পিটিয়ে যা রোজগার হতো, তাতে চালের সংস্থান হওয়াই ছিল কঠিন। দাই আমেনা বুড়ি যখন সদ্যোজাত শিশুটিকে কোলে তুলে কুপিবাতির টিমটিমে আলোয় ধরল, তখন কোনো আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল না সেই স্যাঁতসেঁতে ঘরে। আমেনা বুড়ি কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলে উঠল, "হায় রে কপাল! এ তো মাইয়া না, যেন অমাবস্যার নিশীথ রাইত! এমন কালকুচকুচে মাইয়া নিয়া হাশেম ভাই তুই করবি কী?"

মা রহিমা খাতুন প্রসববেদনার ক্লান্তিতে চোখ বুজে ছিলেন, মেয়ের গায়ের রঙের কথা শুনে তাঁর চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছিল নিঃশব্দ দুফোঁটা জল। বাবা হাশেম আলী লোহা-পোড়া খসখসে হাত দুটো দিয়ে সন্তর্পণে মেয়েকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। তিনি কারও কথার জবাব দেননি, কেবল ভেজা কণ্ঠে বলেছিলেন, "আল্লাহর দান। আমার ঘরে ময়না পাখি আইছে।"

সেই থেকে মেয়েটির নাম হলো ময়না। কিন্তু নামের সুবাস গ্রামের মানুষের মুখের বিষাক্ত বুলি ঢাকতে পারেনি। যত সে বড় হতে লাগল, গ্রামের মানুষের কাছে তার আসল পরিচয় হয়ে উঠল একটাই,‘কালী’, ‘কুচকুচে ময়না’ কিংবা ‘অলক্ষণী’।

কুসুমপুর গ্রামটি প্রকৃতির কোলে ছবির মতো সুন্দর হলেও সেখানকার সমাজ ছিল নির্মম সংস্কার আর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। গায়ের চামড়ার রঙ দিয়ে সেখানে মানুষের ভাগ্য ও সম্মান নির্ধারিত হতো। মেঠোপথ ধরে ময়না যখন হেঁটে যেত, সমবয়সী ছেলেমেয়েরা তাকে খেলার সাথী করতে চাইত না। পুতুল খেলার আসরে তাকে বসানো হতো সবার পেছনে, কিংবা তাকে দেওয়া হতো ডাকাত বা ডাইনির চরিত্র।

"তোর ছায়া লাগলে পুতুলের বিয়ে ভেঙে যাবে রে ময়না!",পাড়ার মোড়লের মেয়ে চম্পা খিলখিল করে হেসে বলত।

ময়না তখন এককোণে দাঁড়িয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকত। তার কোমল বুকটা ব্যথায় টনটন করত, কিন্তু অবুঝ চোখ দুটোতে জল জমতে দিত না সে। বাড়ি ফিরে এসে সে মায়ের ভাঙা আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াত। নিজের মুখখানা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করত। হ্যাঁ, তার গায়ের রঙ কালো, মেঘের মতো কালো, কিন্তু তার চোখ দুটো তো হরিণীর মতো টানা টানা; তার হাসিতে তো মুক্তোর মতো শুভ্রতা ঝরে পড়ে! তবে কেন মানুষ শুধু এই চামড়ার রঙটাই দেখে? কেন এই রঙের ওপারে থাকা তার রক্তমাংসের মনটাকে কেউ ছুঁয়ে দেখে না?

মা রহিমা খাতুন প্রায়ই মেয়ের মুখে কাঁচা হলুদ আর দুধের সর মেখে দিতেন। "একটুখানি যদি খোলতাই হয় রে মা! এই সমাজে তোরে পার করুম কেমনে?" মায়ের এই ব্যাকুলতা ময়নার আত্মসম্মানে চাবুকের মতো লাগত। একদিন সে মায়ের হাত থেকে হলুদের বাটিটা কেড়ে নিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেলেছিল।

"না মা! আমারে বদলাইতে চাইয়ো না। খোদা আমারে যেমন বানাইছে, আমি তেমনই থাকব। চামড়া ঘইষা কি ভাগ্য বদলানো যায়? আমি পড়ালেখা শিখুম। আমি নিজের পায়ে খাড়ামু।"

মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন অভাবী বাবা-মা। একটি দশ বছরের মেয়ের চোখে এমন আগুন তারা আগে কখনো দেখেননি।

কিন্তু পড়াশোনার পথটা কি সহজ ছিল? একেবারেই না।

গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ময়না যখন ভর্তি হতে গেল, পণ্ডিত মশাই শিবপদ বাবু ভুরু কুঁচকে বলেছিলেন, "হাশেম, মাইয়া তো এমনেই আন্ধার, তারে আবার কেতাবে মুখ গুঁজিয়া কী করবি? ঘরে বইসা রান্নাবাড়া শেখা, কোনো দূর চরের বুড়া মাঝির লগে গছায়া দিতে পারবি। স্কুলের খরচ টানবি ক্যামনে?"

হাশেম আলী হাত জোড় করেছিলেন। "না পণ্ডিত কাকা, ময়নার বড় শখ। আপনে একটু নজর রাইখেন।"

স্কুলে ময়নার জায়গা হতো পেছনের বেঞ্চের এক কোণে, যেখানে ছাদের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ত। সহপাঠীরা তার পাশে বসতে চাইত না। কোনো শিক্ষক ক্লাসে পড়া ধরলে ময়না সবার আগে হাত তুলত, অথচ তাকে সহজে সুযোগ দেওয়া হতো না। কিন্তু পরীক্ষার খাতা যখন জমা পড়ত, তখন আর কারও কোনো বাহাদুরি টিকত না। প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ময়না প্রতি বছর প্রথম স্থান অধিকার করে সবাইকে চমকে দিত। কিন্তু সেই সাফল্যের পরও জুটত কেবল তাচ্ছিল্য,"পড়ায় ভালো হইয়া কী লাভ? শেষমেশ তো হাড়িপাতিলই মাজতে হইব।"

ময়না যখন ক্লাস এইটে উঠল, তখন পরিবারে নেমে এল এক চরম দুর্যোগ। হাশেম আলী লোহা পেটাতে গিয়ে অসাবধানতাবশত বাঁ চোখে গরম লোহার ফুলকি লেগে দৃষ্টিশক্তি হারালেন। কামারশালার কাজ বন্ধ হয়ে গেল। সংসারে হাঁড়ি চড়া দায় হয়ে পড়ল। চালের অভাবে দিনের পর দিন কেবল ফেনভাত আর কাঁচামরিচ খেয়ে কাটতে লাগল দিন।

একদিন সন্ধ্যায় ময়নার দূর সম্পর্কের এক চাচা ঘটক নিয়ে উঠানে এসে হাজির হলেন। পাত্র পঞ্চাশোর্ধ্ব এক বিপত্নীক লোক, পাশের চরে তামাকের ব্যবসা করে।

চাচা বললেন, "হাশেম ভাই, মাইয়ার যা রূপ, এমন সম্বন্ধ স্বর্গেও পাইবা না। পাত্রের কোনো দাবি নাই। কালোর ঘরে আলো হয়ে যাইব। মাইয়াটারে পার কইরা দাও, ঘরে অন্তত একটা পেট কমব।"

রহিমা খাতুন কান্নাকাটি শুরু করলেন, হাশেম আলী নীরব হয়ে রইলেন। তাঁদের চোখের সামনে তখন শুধুই অন্ধকারের দেওয়াল।

ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এল ময়না। তার পরনে একটা তালি দেওয়া সুতি শাড়ি, মাথায় শক্ত করে বাঁধা খোঁপা। তার চোখ দুটো জ্বলছিল আত্মবিশ্বাসের আলোয়। সে ঘটকের মুখের ওপর স্পষ্ট ভাষায় বলল, "আপনার পাত্রকে গিয়া বলেন, ময়না কোনো বিক্রির মাল না যে বয়সের তোয়াক্কা না কইরা ঘাটে নামাইয়া দেবেন। আমার বয়স এখনো আঠারো হয় নাই, আমি কোনো বুড়ারে বিয়া করুম না।"

চাচা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, "মুখপুড়ি! তোর এত তেজ? রূপ নাই তার আবার দেমাগ! আইজ থাইকা তোর কোনো বিপদে আমরা নাই। দেখুম ক্যামনে তুই ভাত খাস!"

সবাই চলে যাওয়ার পর ময়না বাবার ভাঙা হাত দুটো নিজের কপালে ঠেকাল। "বাবা, তুমি ভাইবো না। আমি আছি তো। তোমার ময়না কোনোদিন তোমারে না খাইয়া মারব না।"

পরদিন ভোর থেকে শুরু হলো ময়নার আসল সংগ্রামের অধ্যায়। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে সে চলে যেত বিলের ধারে। সেখান থেকে শালুক আর কলমি শাক তুলে নিয়ে ভোরের বাজারে গিয়ে বিক্রি করত। সকাল আটটায় ফিরে এসে মাটির চুলোয় রান্না চড়াত, বাবার পথ্য তৈরি করত। তারপর একটা ছেঁড়া খাতা আর কলম ব্যাগে পুরে চার মাইল কাঁচা মেঠোপথ ধুলো উড়িয়ে হেঁটে যেত হাইস্কুলে।

স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরে সে বিশ্রাম নিত না। গ্রামের সম্পন্ন বাড়ির ছোট বাচ্চাদের টিউশনি শুরু করল সে। প্রথম দিকে অভিভাবকরা রাজি হতেন না,"কালো মেয়ের কাছে পড়লে ছাওয়ালের বুদ্ধি খাটো হইব!" কিন্তু ময়নার পড়ানোর কৌশল আর গভীর মনোযোগ দেখে একে একে চার-পাঁচটি বাচ্চা জুটে গেল। সেই টিউশনির টাকা দিয়ে সে বাবার চোখের চিকিৎসার ওষুধ কিনত, আর বাকি টাকায় নিজের বইখাতা আর স্কুলের মাইনে দিত। রাত যখন গভীর হতো, সারা গ্রাম যখন ঘুমিয়ে পড়ত নিস্তব্ধতায়, ময়না তখন মাটির সানকিতে কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে পড়তে বসত। কেরোসিনের গন্ধ আর ধোঁয়ায় তার চোখ লাল হয়ে যেত, কিন্তু তার পড়ার গতি থামত না। জানালার ওপাশে নিশাচর পাখিদের ডাক শোনা যেত, চরের দিক থেকে ভেসে আসত শিয়ালের হাঁক। ময়না সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আওড়াত,"অন্ধকার, তুই আমারে ভয় দেখাস? আমি তো তোরই রঙ মেখে বড় হইছি। তুই আমার শত্রু না, তুই আমার জেদের সঙ্গী।"

এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল যখন বের হলো, পুরো কুসুমপুর থমকে গেল। ময়না শুধু স্কুলেই প্রথম হয়নি, পুরো মহকুমায় মেয়েদের মধ্যে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। গ্রামের মানুষ যারা এতদিন তাকে দূরছাই করত, তারা এসে উঠানে ভিড় জমাল। কিন্তু কুৎসিত মানসিকতার মানুষের অভাব তো ছিল না। গ্রামের মাতব্বর সোবহান খাঁ মুখে পানের পিক ফেলে বললেন, "পাস দিয়া কী হইব? কলেজ তো শহরে। মেয়ে মানুষরে শহরে পাঠাইয়া কোনো বাপ ইজ্জত রাখতে পারছে? ওসব নষ্টামি ছাড়া কিছু না।"

সোবহান খাঁর এই কথা গ্রামের বহু মানুষকে দ্বিধায় ফেলে দিল। এমনকি মা রহিমা খাতুনও ভয় পেয়ে গেলেন। "মা রে, শহরে যাবি কেমনে? টাকা পামু কই? আর লোকে যা কয়..."

ময়না মায়ের হাত চেপে ধরল। "মা, লোক তো আমারে সুন্দর বলতেও পারে নাই, আমার সাফল্যে আনন্দ পাইব ক্যামনে? নদীর জল কি তীরের মানুষের কথায় চলা থামায়? আমি যামু।"

ময়নার এই অদম্য জেদ দেখে এগিয়ে এলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক অবিনাশ বাবু। তিনি ময়নাকে জেলা শহরের এক মহিলা কলেজের সরকারি হোস্টেলে সিট পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন এবং একটি স্থানীয় ট্রাস্ট থেকে মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করলেন।

শহরের জীবন ময়নার জন্য ছিল আরেক যুদ্ধক্ষেত্র। গ্রামের দরিদ্র কামারের মেয়ে, তার ওপর গায়ের রঙ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ,শহরের আধুনিক, সচ্ছল সহপাঠিনীদের মধ্যে সে যেন এক অচেনা গ্রহের জীব। হোস্টেলের ডাইনিং টেবিলে বসলে অনেকে নাক সিঁটকাত। ক্লাসে তাকে নিয়ে হাসাহাসি হতো, তার সাদামাটা পোশাক আর মোটা চালের ভাত খাওয়ার অভ্যাসকে কটাক্ষ করা হতো।

একদিন ইংরেজি ক্লাসের এক সুন্দরী মেয়ে অহংকার করে ময়নাকে বলেছিল, "এই যে কালো মেয়ে, তোমার নাম ময়না কেন? তোমার নাম তো হওয়া উচিত ছিল কোকিল বা দাঁড়কাক!"

পুরো ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়েছিল। এমনকি শিক্ষকও মৃদু হেসে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। ময়না সেদিন এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি। সে উঠে দাঁড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে সেই মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে নিখুঁত ও চমৎকার ইংরেজিতে বলেছিল, "নাম দিয়ে মানুষের মূল্য বিচার হয় না সহপাঠিনী। রূপ তো চামড়ার নিচের কয়েক মিলিমিটারের খেলা, যা দুদিন বাদে ধুলোয় মিশে যাবে। কিন্তু জ্ঞান আর মেধা হলো অনন্ত, যা কোনো অন্ধকারের কাছে মাথা নত করে না। সময় বলে দেবে কার নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে আর কার নাম রূপের অহংকারে হারিয়ে যাবে।"

সেই দিনের পর থেকে ক্লাসে আর কেউ তাকে নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করার সাহস পায়নি। ময়না বুঝেছিল, এই অবজ্ঞার জবাব কেবল মেধা আর আত্মমর্যাদাবোধ দিয়েই দেওয়া সম্ভব।

কলেজের দিনগুলোতে ময়না অমানুষিক পরিশ্রম করত। সে দিনের বেলা ক্লাস করত, আর সন্ধ্যায় শহরের একটি ছাপাখানায় প্রুফ রিডারের কাজ করত। রাত জেগে বইয়ের পাতার পর পাতা ভুল সংশোধন করে সে যে সামান্য পারিশ্রমিক পেত, তা দিয়ে নিজের থাকা-খাওয়ার খরচ মিটিয়ে প্রতি মাসে মানি অর্ডার করে গ্রামে বাবার কাছে টাকা পাঠাত।

এইচএসসিতেও ময়না বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ফাইভ পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল। এবার তার লক্ষ্য ছিল আরও বড়,তাকে হতে হবে একজন ম্যাজিস্ট্রেট, একজন বিসিএস ক্যাডার। যে প্রশাসন আর আইন মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে, যে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে গরিব মানুষ সুবিচারের আশায় হাত পেতে দাঁড়ায়, সেই কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে তাকে মানুষের সেবা করতে হবে।

সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকার করল। ঢাকা শহরের কার্জন হল আর নীলক্ষেতের ফুটপাত ময়নার জীবনের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠল। পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে আইন আর সাধারণ জ্ঞানের পুরোনো বই কিনে সে মুখস্থ করে ফেলত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সে ছিল এক পরিচিত মুখ,সবার আগে যে ঢুকত আর সবার শেষে যে বের হতো।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সে গ্রামের কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভোলেনি। ছুটির দিনগুলোতে যখন অন্য শিক্ষার্থীরা বাড়ি যেত বা ঘুরতে বের হতো, ময়না তখন বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা পয়সায় পড়াত। সে নারী নির্যাতন ও যৌতুকের বিরুদ্ধে আইনি সচেতনতামূলক বিভিন্ন সেমিনারে সক্রিয়ভাবে অংশ নিত। তার বক্তৃতায় এমন তেজ আর যুক্তি থাকত যে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনত। তার সেই কালো মুখমণ্ডল তখন আর কারও কাছে কুৎসিত লাগত না; সেখানে ফুটে উঠত এক প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর নেতৃত্বের জ্যোতি।

অবশেষে এল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হলো। এক রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলে ফলাফল দেখতে গিয়ে ময়নার হাত কাঁপছিল। পিএসসির নোটিশ বোর্ডে রোলের সারি খুঁজতে খুঁজতে এক জায়গায় গিয়ে তার চোখ স্থির হয়ে গেল।

প্রশাসন ক্যাডারে সারা দেশে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে,ময়না খাতুন! মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের সমস্ত কোলাহল যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ময়নার চোখের সামনে ভেসে উঠল কুসুমপুরের সেই ভাঙা কুঁড়েঘর, মাটির সানকিতে বৃষ্টির জল পড়ার শব্দ, অন্ধ বাবার সেই লোহা-পোড়া খসখসে হাত, আর আমেনা বুড়ির সেই বিষাক্ত বাক্য,"এ তো মাইয়া না, যেন অমাবস্যার নিশীথ রাইত!"

ময়না বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনারের বেদিতে গিয়ে বসল। দুহাতে মুখ ঢেকে সে অঝোরে কাঁদতে লাগল। এ কান্না দুঃখের নয়, এ কান্না এক চরম প্রতিশোধের,যে প্রতিশোধে কোনো রক্তপাত নেই, আছে কেবল নিজের যোগ্যতায় অন্ধকারকে চূর্ণ করে আলোর শিখরে পৌঁছানোর পরম আনন্দ।

খবরটা কুসুমপুর গ্রামে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না। যেদিন ময়না প্রথম ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকারি নীল বাতিওয়ালা পাজেরো গাড়িতে চড়ে গ্রামে ফিরল, সেদিন ছিল চৈত্র মাসের এক উজ্জ্বল সকাল। পুরো হরিণটানা আর কুসুমপুর গ্রামের মেঠোপথ লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল। তোরণ নির্মাণ করা হলো, ফুল ছিটানো হলো রাস্তায়।

গ্রামের সোবহান খাঁ মাতব্বর, যিনি একসময় ময়নাকে শহরে পাঠালে ‘ইজ্জত থাকবে না’ বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন, তিনি ফুলের মালা হাতে নিয়ে গাড়ির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইলেন। চম্পা, যে একদিন ময়নার ছায়া লাগলে পুতুলের বিয়ে ভাঙার ভয় পেত, সে ভিড়ের এক কোণে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রইল।

গাড়ি থেকে নেমে এল এক তরুণী। পরনে সাধারণ একখানা জামদানি শাড়ি, চোখে চশমা, আর মুখাবয়বে এক রাজকীয় গাম্ভীর্য ও আত্মবিশ্বাস। ময়নার সেই কৃষ্ণবর্ণ গায়ের রঙ যেন আজ মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করছে।

ময়না কোনো মাতব্বর বা গণ্যমান্য ব্যক্তির দিকে তাকাল না। সে ভিড় ঠেলে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল তার সেই পুরোনো মাটির কুঁড়েঘরের দিকে। উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলেন হাশেম আলী আর রহিমা খাতুন। হাশেম আলীর এক চোখ অন্ধ, অন্য চোখেও ঝাপসা দেখেন, কিন্তু মেয়ের পায়ের আওয়াজ তিনি ভুল করেননি।

ময়না গিয়ে সোজা বাবার ধুলোমাখা পা দুটো জড়িয়ে ধরে মাটিতে বসে পড়ল।

"বাবা! তোমার সেই কালকুচকুচে ময়না পাখিটা আজ ডানা মেলতে পারছে বাবা! তোমার কষ্ট সার্থক হইছে।"

হাশেম আলী কাঁপাকাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় স্পর্শ করলেন। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বললেন, "মা রে, তুই আমার ঘরের আন্ধার দূর করস নাই, তুই গোটা চরের মানুষের চোখ খুইলা দিছিস। রূপ তো মাটির জিনিস রে মা, গুণের কোনো জাত নাই, রঙ নাই।"

ময়না উঠে দাঁড়াল। সে ঘুরে তাকাল সমবেত গ্রামবাসীর দিকে। তার কণ্ঠ ছিল মেঘের মতো গম্ভীর অথচ মমতায় পূর্ণ।

"শোনেন কুসুমপুরের মানুষ! আপনারা আমাকে কালো বলে তাচ্ছিল্য করেছিলেন। আপনারা ভেবেছিলেন একটি মেয়ের জীবনের সার্থকতা কেবল তার গায়ের চামড়ার রঙে আর বিয়ের বাজারে চড়া দামে বিক্রি হওয়াতে। আজ আমি প্রমাণ করেছি, মানুষের আসল সৌন্দর্য তার মস্তিষ্কে, তার কর্মে আর তার আত্মসম্মানে। কোনো মেয়ে যেন তার গায়ের রঙের জন্য কোনোদিন ঘরে বন্দি না থাকে, কোনো বাবাকে যেন মেয়ের জন্ম হলে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে না হয়। যে অন্ধকারকে আপনারা অভিশাপ মনে করতেন, আমি সেই অন্ধকারের বুক চিরে আলো ছিনিয়ে এনেছি।"

গ্রামের মানুষ তখন স্তব্ধ হয়ে শুনছিল সেই কথা। কারো মুখে কোনো শব্দ ছিল না। নিন্দুকদের মাথা অপমানে আর অনুশোচনায় মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল।

সেই দিনই ময়না ঘোষণা দিল, তার সরকারি বেতন ও সহযোগিতায় কুসুমপুর গ্রামে একটি আধুনিক বালিকা বিদ্যালয় এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যার নাম হবে,‘আলোর পাঠশালা’। যেখানে গ্রামের প্রতিটি অবহেলিত, দরিদ্র মেয়ে বিনা পয়সায় পড়াশোনা শিখবে এবং নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখবে।

বিকেলে ময়না একা হেঁটে গেল মেঘনা নদীর পাড়ে। নদীর ওপারে তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আকাশের মেঘগুলো রক্তিম হয়ে উঠেছে, আর সেই রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে কালো জলের ওপর। বাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ছিল। ময়না নদীর বুক চিরে বয়ে চলা বাতাসের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। সে অনুভব করল, তার সংগ্রাম কেবল তার একার ছিল না; এ ছিল হাজার বছর ধরে সমাজের অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হওয়া সমস্ত কালো মেয়েদের আত্মমর্যাদার লড়াই।

যে নদীর কালো জলে একসময় তার দুঃখের প্রতিচ্ছবি দেখা যেত, সেই জলই আজ তার বিজয়ের সাক্ষ্য দিয়ে অনন্ত সাগরের পানে বয়ে চলেছে। কালো কোনো অভিশাপ নয়, কালো হলো সেই মহাশূন্যের রঙ, যার ভেতর জন্ম নেয় কোটি কোটি নক্ষত্র। আর ময়না আজ সেই অন্ধকারের বুক চিরে জ্বলে ওঠা এক চিরন্তন, অপরাজেয় ধ্রুবতারা। ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগ দেওয়ার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ময়নার হাতে আসে এক অপ্রত্যাশিত খবর।

যে কুসুমপুর গ্রামের মেঠোপথ ধরে একদিন সে অপমান সয়ে হেঁটে গেছে, সেই গ্রাম থেকেই এক গভীর রাতে তার সরকারি নম্বরে একটি ভীতসন্ত্রস্ত ফোন আসে। ফোনের ওপার থেকে এক কিশোরী কাঁদতে কাঁদতে বলে, "আপা, আমারে বাঁচান! কাইল দুপুরে আমারে জোর কইরা বিয়া দিতেছে। আমার বয়স সবে চোদ্দ। আর যে পাত্র, তার বয়স চল্লিশের ওপরে, যৌতুক হিসেবে আমার বাপের শেষ সম্বল দুই কাঠা জমিও লেইখা নিতেছে।"

মেয়েটির নাম রূপা। ময়নার মনে পড়ে গেল, এই রূপা সেই পরিবারেরই মেয়ে, যারা একসময় ময়নার পড়াশোনা নিয়ে উপহাস করত। কিন্তু ময়নার মনে কোনো আক্রোশ ছিল না; বরং তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল শত শত নিরুপায় বালিকার মুখ, যাদের শৈশব এভাবেই বলি দেওয়া হয় কুসংস্কার আর সামাজিক লোভের কাছে। খবর নিয়ে ময়না আরও জানতে পারল, এই বিয়ের প্রধান মধ্যস্থতাকারী আর কেউ নয়,গ্রামের প্রভাবশালী মাতব্বর সোবহান খাঁ। গোপনে পাত্রপক্ষের সাথে চুক্তি করে সে নিজেই এই যৌতুকের টাকার একটা মোটা অংশ মধ্যস্থতার কমিশন হিসেবে পকেটে পুরছে।

পরদিন দুপুরে কুসুমপুর গ্রামের সেই মাতব্বর বাড়ির সামনের মাঠে বিয়ের এলাহী আয়োজন। শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে, ডেগিতে বিরিয়ানি চড়েছে। কাজি সাহেব খাতা খুলে বসেছেন আর বরপক্ষ তখনো আসরে বসে যৌতুকের বাকি পঞ্চাশ হাজার টাকার দাবিতে দেনদরবার করছে। মেয়ের বাবা আসরের এক কোণে মাথা নিচু করে হাতজোড় করে কাঁদছেন।

ঠিক তখনই সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের দুটো গাড়ি আর জেলা প্রশাসনের লাল-নীল বাতি লাগানো সরকারি জিপ মাঠের মুখে এসে ঢুকল। আকস্মিক এই ঘটনায় পুরো বিয়ের আসর স্তব্ধ হয়ে গেল।গাড়ি থেকে নেমে এলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ময়না খাতুন। কাঁধে সরকারি ব্যাজ, পরনে মার্জিত শাড়ি আর চোখে এক অনমনীয় কঠোর দৃষ্টি। সঙ্গে নারী পুলিশ সদস্য ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা।

সোবহান খাঁ মুখে পানের পিক ফেলে অপ্রস্তুত ভাব কাটিয়ে সামনে এগিয়ে এল। "আরে ম্যাজিস্ট্রেট সাব! আমাদের গ্রামের গর্ব! আসুন আসুন, কিন্তু এই সুখের দিনে পুলিশ নিয়া কেন মা?"

ময়না কোনো ভনিতা করল না। ফাইল হাতে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, "সোবহান খাঁ সাহেব, এটা কোনো আনন্দের আসর নয়, এটি একটি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও অপরাধের ক্ষেত্র। পাত্রী রূপা আক্তারের বয়স কত?"

কাজি সাহেব তোতলাতে শুরু করলেন। "জি... জি আঠারো পার হইছে, বয়সীর হলফনামা আছে..."

"মিথ্যা বলবেন না কাজি সাহেব," ময়না টেবিলের ওপর রূপার প্রাথমিক ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেটের কপি আছড়ে ফেলল। "রূপার জন্মসনদ ও স্কুলের রেজিস্ট্রি অনুযায়ী তার বয়স মাত্র চৌদ্দ বছর চার মাস। অপ্রাপ্তবয়স্ক জেনেও আপনি বাল্যবিয়ে রেজিস্ট্রি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী এটি দণ্ডনীয় অপরাধ।"

বর তখন আসর থেকে গোপনে সটকে পড়ার চেষ্টা করছিল। নারী ও পুরুষ পুলিশ সদস্যরা নিমেষেই বর ও তার বাবাকে ঘিরে ফেলল।

সোবহান খাঁ এবার গলা চড়িয়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করল। "দেখো ময়না, তুমি এই গ্রামেরই মেয়ে। সামাজিক নিয়মকানুন তুমি বোঝো। গরিবের মেয়ে বেশি বড় হলে ঘরে রাখা যায় না, কেলেঙ্কারি হয়। তাছাড়া দেনাপাওনা তো পারিবারিক সম্মতিতে হইছে, এখানে পুলিশ ডাকার কী আছে?"

ময়নার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে সোবহান খাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, "পারিবারিক সম্মতি নয়, একে বলে জোরপূর্বক ব্ল্যাকমেইল ও যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আপনারা একটি শিশুর জীবনকে কেনাবেচার পণ্য বানিয়ে ফেলেছেন। আর সোবহান খাঁ সাহেব, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং বাল্যবিয়ে সংঘটনের প্রধান সহযোগী হিসেবে আপনি সমান অপরাধী।"

মুহূর্তের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত (মোবাইল কোর্ট) বসানো হলো। উপস্থিত গ্রামবাসীদের সামনেই আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ময়না আদেশ জারি করল:

পাত্র ও তার বাবাকে যৌতুক দাবি ও বাল্যবিয়ের উদ্যোগ নেওয়ার অপরাধে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হলো। ভুয়া বয়স দেখিয়ে বিয়ে পড়ানোর চেষ্টার দায়ে কাজির লাইসেন্স বাতিল করার সুপারিশসহ এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলো। সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে বাল্যবিয়ে চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগে মাতব্বর সোবহান খাঁকে তাৎক্ষণিক পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হলো।

সোবহান খাঁ মাঠের মাঝখানেই ফ্যাকাশে মুখে বসে পড়ল। তার সেই দাপুটে গর্জন তখন এক নিমেষে মিলিয়ে গেছে।

ময়না এরপর সোজা চলে গেল অন্দরমহলে। লাল বেনারসী পরা রূপা তখন এক কোণে জড়সড় হয়ে কাঁপছিল। ময়না তার পাশে গিয়ে বসল, মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিল। "ভয় নেই বোন। যতক্ষণ আইন আছে, ততক্ষণ তোর ইচ্ছে ছাড়া কেউ তোকে এই বয়সে সংসার নামের নরকে ঠেলে দিতে পারবে না।"

রূপা ময়নাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। "আপা, আমি পড়তে চাই। আমি আপনার মতো মানুষ হতে চাই।"

"তুই পড়বি," ময়না রূপার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল। "তোর পড়াশোনার সব দায়িত্ব আমি ব্যক্তিগতভাবে নিলাম। আজ থেকে কুসুমপুরের কোনো মেয়ে বিয়ের বাজারে বিক্রি হবে না।"

বাইরে এসে ময়না পুরো গ্রামবাসীকে ডেকে ঘোষণা দিল,কুসুমপুর ও এর আশপাশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে ‘বাল্যবিয়ে ও যৌতুক প্রতিরোধ কমিটি’ গঠিত হবে, যার নেতৃত্বে থাকবে স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক ও সচেতন তরুণীরা। কোথাও এমন কোনো আয়োজন দেখলে সরাসরি প্রশাসনের টোল-ফ্রি নম্বরে যেন খবর দেওয়া হয়।

গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো সেদিন করতালি দিয়ে ময়নার এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাল। কুসুমপুরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ক্ষমতার অপব্যবহারকারী মাতব্বর বা যৌতুকলোভী মানুষ রেহাই পেল না। যে সমাজে একসময় ময়নাকে কালকুচকুচে বলে অবহেলা করা হয়েছিল, সেই সমাজেই সে প্রতিষ্ঠা করল এক নির্ভীক ন্যায়ের শাসন,যেখানে অন্যায়কারীর চোখ রাঙানি আইনের দৃঢ়তার সামনে ধুলোয় মিশে গেল। কুসুমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তখন বসেছে বার্ষিক লোকজ ও সংস্কৃতি উৎসবের জমজমাট আসর। মাঠে নানা রঙের শামিয়ানা, বাঁশঝাড়ের ধারে নাগরদোলা আর বাতাসে উড়ছে গরম জিলাপি ও চিনাবাদাম ভাজার সুবাস। মঞ্চের একপাশে বড় বড় অক্ষরে লেখা,‘আলোর পাঠশালা ও কুসুমপুর যুবকল্যাণ সমিতির বার্ষিক উৎসব ও কৃতি সংবর্ধনা’।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ময়না খাতুন। তবে মঞ্চের দামি সোফায় বসে থাকার চেয়ে ময়নার চোখ খুঁজছিল মাঠের পেছনের পরিচিত কদমগাছতলাটা, যেখানে একদিন একদল কিশোরী গোল হয়ে পুতুল খেলত, আর তার ছায়া এড়াতে তাকে দূরে তাড়িয়ে দেওয়া হতো।আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা ও শিক্ষার্থীদের পুরস্কার বিতরণের পর্ব শেষ হতেই ময়না নেমে এল সাধারণের ভিড়ে। তার দেহরক্ষী ও প্রটোকল অফিসারদের বিনয়ের সাথে দূরে থাকতে বলে সে এগিয়ে গেল পুরোনো কদমগাছটার দিকে।

সেখানে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল একদল তরুণী। তারা সবাই ময়নারই বয়সি, কিন্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতায় তাদের চোখেমুখে ইতিমধ্যেই নেমে এসেছে ক্লান্তির ছায়া। তাদের মধ্যে একজন বারবার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকছিল,চম্পা। সেই চম্পা, যার একদা ধবধবে ফর্সা রূপের অহংকার ছিল পুরো পাড়ায়, যে একদিন ময়নাকে তার পুতুলখেলার আসর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে বলেছিল, "তোর ছায়া লাগলে পুতুলের বিয়ে ভেঙে যাবে!" আজ চম্পার কোলে আঠারো মাস বয়সি এক রোগাপাতলা শিশু, পরনে একটা সাধারণ ছাপা শাড়ি, চোখের কোণে এক বুক লজ্জা আর অপরাধবোধের ছাপ। পাশে দাঁড়িয়ে রেশমা, শেফালী আর পারভীন,ময়নার পুরোনো স্কুলের সহপাঠিনীরা।

ময়না গিয়ে সরাসরি দাঁড়াল তাদের সামনে। তার মুখে কোনো রাজকীয় দূরত্ব ছিল না, ছিল ছেলেবেলার সেই সরল স্নিগ্ধ হাসি।

"কী রে চম্পা, তোর ময়না পাখিটারে চিনতে পারস না? নাকি ম্যাজিস্ট্রেট বইলা এখন আর পুতুলখেলায় নেওয়া যাবে না?"

চম্পা যেন কেঁপে উঠল। তার মাথা আরও নুয়ে পড়ল মাটির দিকে। সে ফিসফিস করে বলল, "আমারে লজ্জা দিস না ময়না। আমরা যে তোর সাথে কত বড় পাপ করছি, আজ তা নিজের চোখে দেখতেছি। তোরে কত কথা শুনাইছি গায়ের রঙের লাইগা, আর আজ তুই গোটা দেশের মাথা উঁচু করছিস, আর আমরা..." চম্পার গলা ধরে এল, চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল ঝরে পড়ল কোলের শিশুর কাপড়ে।

ময়না এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে দুই হাত বাড়িয়ে চম্পাকে জড়িয়ে ধরল। ম্যাজিস্ট্রেট ময়নার দামি জামদানির আঁচলে মিশে গেল চম্পার ধুলোবালি আর চোখের জল। চারপাশের কোলাহল যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

"পাপ-পুণ্যের হিসাব করতে তো আমি আসিনি রে চম্পা," ময়না অত্যন্ত নরম গলায় বলল। "আমরা তখন অবুঝ ছিলাম। সমাজ আমাদের যে বিষ শিখাইছিল, তোরা সেটাই বিশ্বাস করছিলি। কিন্তু আমি তোদের ঘৃণা করলে আজ এই জায়গায় পৌঁছাতে পারতাম না। তোদের সেই উপহাসই তো আমাকে লড়তে শিখাইছে।"

রেশমা আর শেফালীও এগিয়ে এসে ময়নার হাত দুটো চেপে ধরল।

"আমাদের মাফ কইরা দে ময়না," রেশমা ফুঁপিয়ে উঠল। "তোর সাথে আমরাও তো পড়তে পারতাম। তুই যখন রাতে ল্যাম্পপোস্ট আর কুপির নিচে পড়তিস, আমরা হাসাহাসি করতাম। আর দেখ, উনিশ বছর না পেরোতেই আমাদের জীবন সংসারে বন্দি হইয়া গেছে। প্রতিদিন স্বামীর মার আর লাঞ্ছনা ছাড়া কপালে কিছু নাই।"

ময়না চম্পার কোল থেকে শিশুটিকে নিজের কোলে তুলে নিল। পরম স্নেহে শিশুটির কপালে চুমু খেয়ে সে তার সব বান্ধবীদের মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকাল।

"শোন চম্পা, শোন রেশমা,জীবন কোনোদিন শেষ হয়ে যায় না। যে ভুল আমাদের মায়েরা করছে, আমরা করছি, আমাদের এই মেয়েদের সেই ভুলের বলি হতে দেওয়া যাবে না। তোরা আর কাঁদতে পারবি না। আমার গায়ের রঙ যেমন কোনো অভিশাপ ছিল না, তোদের এই দুঃখের জীবনও কোনো স্থায়ী ভাগ্য নয়।"

ময়না চম্পার চোখের জল নিজের আঙুল দিয়ে মুছিয়ে দিল।

"আগামী শনিবার থেকে তোরা তিনজন ‘আলোর পাঠশালা’র হস্তশিল্প ও পুতুল তৈরির প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যোগ দিবি। চম্পা, তুই তো মাটি দিয়ে খুব সুন্দর পুতুল গড়তে পারতিস, মনে আছে? এবার তোরা শুধু পুতুল বানাবি না, সেই পুতুল বাজারে বেচে নিজের পায়ে দাঁড়াবি। তোদের মেয়েদের আমি নিজে স্কুলে ভর্তি করাব।"

চম্পা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ময়নার পায়ে হাত দিতে গেল, কিন্তু ময়না শক্ত করে তাকে টেনে তুলে বুকে চেপে রাখল।

"পায়ে হাত দিবি না! আমরা সবাই বন্ধু। আজ কোনো কালো আর ফর্সার তফাত নেই রে, আজ আমরা সবাই কুসুমপুরের মেয়ে।"

কদমগাছের পাতায় তখন পড়ন্ত বিকেলের সোনালি রোদ ঝিকমিক করছে। চারপাশের সমবেত গ্রামের নারীদের চোখে তখন এক অপূর্ব তৃপ্তি আর শ্রদ্ধার নীরব অশ্রু। যে কদমগাছতলা একদিন ভেদাভেদ আর অপমানের সাক্ষী ছিল, আজ সেটাই সাক্ষী হয়ে রইল এক অপরূপ ভালোবাসা, ক্ষমা আর পুনর্মিলনীর।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login