Post

এক বুলেট এক শত্রু

January 21, 2024

Original Author সজীব সেন

1,376 views
'এক বুলেট এক শত্রু'
কি আশ্চর্য উক্তি!
ব্যাটারি চালিত টমটমে পহাড়ের মাঝে ১২-১৪ ফিটের চওড়া পিচঢালা আঁকা বাঁকা, উঁচু নিচু রাস্তায় আবারো সেই পরিচিত ব্যারিকেট । যেখানে কোনটায় লেখা সাবধান, কোনটায় লেখা থামুন, কোনটায় লেখা সামনে...
টমটমটি সেই ব্যারিকেটরে নাইন ডি মুভির মত পাশ কাটিয়ে হেলে দুলে সমানে গিয়ে দাঁড়ালো।
তারপর নানান গম্ভীর প্রশ্ন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি । আমার দৃষ্টি গেল পাশের অল্প উঁচু এক টিলায়। টিলার
উপর কিছুছোট ছোট বস্তা দিয়ে ঘেরা একটি ছাউনি।
যেখানে নিষ্পলক তাকিয়ে এক যন্ত্রধারী।
তার হাতের যন্ত্রটিরে সমর অস্ত্র বলে। আমার মত চ্যাংড়া পোলায় যদি বন্দুকধারী কয় তাহলে বোধ হয় আপনাদের বুঝতে সুবিধে হবে। তবে এই অবেলায় বন্দুকধারী নাকি সমরাস্ত্রধারী ওইটা নিয়ে আলোচনার কোন ইচ্ছা আমার নাই। কারণ আগেই বলছি আমি চ্যাংড়া পোলা। শব্দের প্যাঁচাল কম বুঝি।

আচ্ছা, এবার লাইনে আসি। আমার চোখ আবার বন্দুকধারীরে যখন খুঁজে নিল, তখন মনে হল তার চেহারাটা কি আশ্চর্য রকমের ভাবলেশহীন গম্ভীর। আর বন্দুকধারীর ছাউনির উপরে বাংলা অক্ষরে বড় বড় করে লেখা 'এক বুলেট এক শত্রু'। লেখাটা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও স্পষ্ট পড়া যাবে।
মুর্হূতে মনে হল বন্দুকধারী কি অপেক্ষায় আছে? যদি অপেক্ষায় থাকে তবে কি তা শুধুই শত্রুর জন্য! আচ্ছা, সব শত্রু কি বুলেটে পরাস্ত হয়। অপেক্ষমান বন্দুক ধারী কি ওই একটি উক্তিকে জীবনের ব্রত করে নিয়েছেন! নাকি তা আরোপিত!
'এক বুলেট এক শত্রু'

দুপুরের কড়া তির্যক রোদে বন্দুকধারী মানুষটির কাছে যেতে ইচ্ছে হল। মনে একটু দ্বিধা থাকলেও টিলার পাশের ইটের রাস্তা বেয়ে মানুষটার কাছাকাছি গেলাম। সমান্য একটু রাস্তাও আজ অনেক দূর মনে হল! এমন একটা উপলব্ধির কারণ কি? এটা কি ভয়, নাকি কৌতূহলের উত্তেজনা ।
বন্দুকের নলের পাশটায় স্বাভাবিক দূরত্বে দাঁড়ালাম। তখনই বন্দুকধারীর প্রশ্ন
- কোথায় যাবেন? এখানে কেন উঠে এসেছেন? কি খুঁজছেন?
- কিছু খুঁজছি না। আমি অবাক হয়ে আপনাকে দেখতে আসলাম। আপনার ছাউনির উপরে লেখা
'এক বুলেট এক শত্রু'
- এখানে অবাক হওয়ার কিছুতো নেই। আমি অন ডিউটি। আর আপনাকে তো ট্যুরিস্ট মনে হচ্ছে। ঘুরাঘুরি শেষ করে সন্ধ্যার মধ্যে গেস্ট হাউসে ফিরে যান।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে টিলা থেকে ইটের রাস্তাধরে পিচঢালা রাস্তায় নেমে আসলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝতে পারলাম টমটমটা আমারে রেখে চলে গেছে, ভাড়াটাও নিয়ে যায় নি। কি এক অবস্থা।
তাই ভাবলাম অল্প কিছুটা হেঁটে আবার না হয় সবুজ রঙের কোন এক টমটমে চেপে গেস্ট হাউসে
চলে যাবো। কিন্তু একের পর এক শুধু লাল নীল আর হলুদ টমটম আসে আর আমি যাবো কিনা
জানতে চেয়ে চলে যায়। কারণ আমি ঠিক করেছি সবুজ টমটমে যাবো।

হাঁটতে হাঁটতে কখন দাঁড়িয়ে গেলাম জানি না, মনে মনে ভাবছি বন্দুকধারীর কথা। আচ্ছা তার কোমরে, বন্দুকের মধ্যে কতগুলো বুলেট সে কি জানে? তার কি সব সময় হিসেব থাকে কত গুলো বুলেট নিয়ে সে অপেক্ষায় আছে!
কি আবোল তাবোল ভাবছি, বন্দুকধারীর বুলেটের সংখ্যা মনে থাকা আবশ্যক। কারণ শক্ত পোক্ত করে ধরে থাকা বন্দুকের ট্রিগারে একটি আঙ্গুলের চাপে স্থীর বুলেট ছুটবে অসীম বেগে, আর লক্ষ্যভেদে একটি প্রাণ বাতাসে মিলিয়ে যাবে। ছাউনিতে লেখা অক্ষরগুলোর কি আর্শ্চয স্থিরতা 'এক বুলেট এক শত্রু'

এখনো আমি কোন সবুজ টমটমের দেখা পেলাম না। তাই আবারো মনের মধ্যে ভবনা,
আচ্ছা বন্দুকধারীর কাছে কি ততগুলোই বুলেট আছে যতগুলো শত্রু আছে। কি অবাক করা দৃঢ়তা নিয়ে এক মানুষ পাহাড় ঘেরা প্রকৃতির মাঝে পিচঢালা রাস্তার বাঁকে টিলায় ছাউনিতে বসে আছে। যে টিলায় কোন ঘাস নেই। আর সে টিলায় বসে একাগ্র চিত্তে অপেক্ষা করছে তত জন শত্রুর জন্যে
ঠিক যতটি বুলেট তার কাছে আছে।
আচ্ছা কখন এই অপেক্ষার প্রহর শেষ করে শত্রু তার সামনে এসে দাঁড়াবে। আর তখন বন্দুকধারী চিৎকার করে করে বলবে প্রিয়তম/প্রিয়তমা শত্রু আমার, আমিতো তোমারই অপেক্ষায় একটি বুলেট বরাদ্দ করে বসে আছি। মুহূর্তেই বিকট শব্দে বসন্তের রঙে রাঙ্গা পলাশ শিমুল গাছে বসা
কোকিল, ঘুঘু, শালিক, ফিঙে, চড়ুই উড়ে যাবে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে। উড়ে গিয়ে জঙ্গলের অন্য সব পাখিদের বলে দিবে 'জানো জানো ওই রাস্তার পাশে ন্যাড়া টিলায় পালা করে বসে থাকা একটা মানুষ শত্রুকে খুঁজে পেয়েছে। আর শত্রুর বুকে বুলেট পুঁতে দিয়েছে গর্জন করে। মুহূর্তে মনে হল যেন প্রলয় হুঙ্কার। সে হুঙ্কারে আমরা পালিয়ে এসেছি গন্তব্যহীন হয়ে।
কিন্তু সবচেয়ে বুড়ো তিলাঘুঘু, যে পালায়নি, যে বনের মাটি খেয়েছিল, আর সরু লতা, ঘাস, শিকড় দিয়ে বাসা বেঁধেছিল ঝোপে,
সে দেখেছে একই পরনের এক দল আজব মানুষের আজব আনন্দ'
আচ্ছা যদি এমন হত, সেই ন্যাড়া টিলাটি ফুলে ফুলে ভরে উঠতো, যেখানে ভ্রমর, প্রজাপতি ফুলের
মধু নিতে আসত সময়ে অসময়ে। টিলার উপরে থাকবে এক মস্ত বড় পলাশ বা শিমুল গাছ । যার
ডালে বসে এক ঝাঁক পাখি কিচির মিচির করবে, গাছের শেকড়ে বসে কেউ একজন মন ভোলানো
কবিতা পাঠ করবে, গান করবে। আলগোছে এক টুকরো পাথরে লেখা রইবে 'এক ফুল, এক বন্ধু,
এক হ্রাস ভালোবাসা, এক হ্রাস স্বপ্ন'...

তখন আমি কিংবা কোন পথিক ফুলের সুবাস নিতে নিতে টিলার উপরে গিয়ে স্বপ্নচারী হব, বুঝে নিব প্রাপ্য একটি ফুল। যে ফুল একটু পরেই হয়তো মাটিতে মিশে যেত প্রকৃতির নিয়মে। তবে ঝরে পরার আগে সেই ফুল বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার স্বাক্ষী হবে ।
হঠাৎ টমটমের হর্নে বাস্তবে ফিরে এলাম। সামনেই দাঁড়িয়েছে সবুজ রঙা একটি পুরানো টমটম। আমি টমটমে উঠে বসতেই তা হেলেদুলে বিদঘুটে কর্কশ শব্দ করে সামনে এগুতে লাগল। হায়রে আমার কল্পনা। কিছুই আমাদের কল্পনার মত হয় না। তবে একদিন হবে!

মানুষ কত সহজ সরল ও বোকা! কি সুন্দর দায়িত্ব নিয়ে, পালা করে শত্রুর জন্য অপেক্ষা করে! 
ঠিক একই ভাবে কি মানুষ পালা করে বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করবে! মুখে থাকবে হাসি, হ্রদয়ে ক্লান্তিহীন আনন্দ ...

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login