Story

নীল খামের ভেতর আকাশ

October 31, 2026

Zidan

38 views

শহরটা খুব বেশি বড় ছিল না। তবু সেখানে মানুষের ভিড়ের মধ্যে একাকিত্ব লুকিয়ে রাখার যথেষ্ট জায়গা ছিল।

শহরের এক পুরোনো গলিতে ছোট্ট একটি বইয়ের দোকান ছিল। দোকানটির নাম ‘অক্ষর’। কাঠের তাকগুলোতে সারি সারি বই, জানালার পাশে একটি পুরোনো চেয়ার, আর দরজার ওপরে ঝুলে থাকা ঘণ্টাটি বাতাসে দুললেই মিষ্টি শব্দ করে উঠত।

দোকানটির মালিক ছিলেন একজন বৃদ্ধ। নাম তাঁর আবদুল কাদের। প্রতিদিন সকালবেলা দোকান খুলে তিনি বইয়ের ধুলো ঝাড়তেন, চায়ের কাপে চুমুক দিতেন, আর জানালার বাইরে পৃথিবীটাকে দেখতেন।

কিন্তু তাঁর একটি অদ্ভুত অভ্যাস ছিল।

প্রতিদিন বিকেলে তিনি একটি নীল খাম বের করতেন। খামের ভেতরে একটি সাদা কাগজ। সেখানে কিছুই লেখা থাকত না।

একদিন দোকানে এল নীলয় নামের এক তরুণ। সে গল্পের বই খুঁজছিল। অনেকক্ষণ বই ঘাঁটাঘাঁটি করার পর হঠাৎ তার চোখ পড়ল বৃদ্ধের হাতে থাকা নীল খামটির দিকে।

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, একটা আকাশ।

নীলয় অবাক হলো।

আকাশ? খামের ভেতরে?

‘হ্যাঁ। তবে এই আকাশ সবাই দেখতে পায় না।

নীলয় ভেবেছিল, বৃদ্ধ হয়তো মজা করছেন। কিন্তু তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, কথাটির ভেতরে অন্য কোনো গল্প লুকিয়ে আছে।

পরদিনও নীলয় দোকানে এল। বই কিনল না, শুধু বৃদ্ধের সঙ্গে গল্প করল। কয়েক দিন পর তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব তৈরি হলো।

এক বিকেলে নীলয় আবার সেই খামের কথা জিজ্ঞেস করল।

বৃদ্ধ এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘অনেক বছর আগে আমার একটি মেয়ে ছিল। নাম তার নীলিমা। সে খুব চিঠি লিখতে ভালোবাসত। আমি তখন সংসার চালানোর জন্য দিনরাত কাজ করতাম। তার ছোট ছোট চিঠিগুলো পড়ার সময়ও পেতাম না।’

‘একদিন সে আমাকে একটি নীল খাম দিয়েছিল। বলেছিল, যখন খুব একা লাগবে, তখন খুলে দেখতে।’

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

‘সেদিনও আমি ব্যস্ত ছিলাম। খামটা রেখে দিয়েছিলাম টেবিলের ওপর। তারপর কত বছর কেটে গেল। একদিন হঠাৎ মনে পড়ল। খামটা খুলে দেখি, ভেতরে শুধু একটা সাদা কাগজ।’

নীলয় অবাক হয়ে বলল, ‘কিছুই লেখা ছিল না?’

‘না। কিন্তু কাগজের ভাঁজে ছোট্ট করে লেখা ছিল, “বাবা, তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন একটু আকাশের দিকে তাকিয়ো। আমি তোমার জন্য সেখানে অনেকগুলো স্বপ্ন রেখে দিয়েছি।”’

বৃদ্ধ জানালার বাইরে তাকালেন।

‘সেদিন বুঝেছিলাম, আমার মেয়েটা কত কিছু বলতে চেয়েছিল। অথচ আমি তার কথাগুলো শোনার সময় পাইনি।’

নীলয় ধীরে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার মেয়ে এখন কোথায়?’

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

‘অনেক দূরে। নিজের সংসার নিয়ে ভালো আছে। মাঝে মাঝে ফোন করে। কিন্তু জানো, কিছু দূরত্ব মানচিত্রে মাপা যায় না। কিছু দূরত্ব তৈরি হয় আমাদের অবহেলায়।

নীলয় শুধু শুনল।

ফোন রাখার আগে মা বললেন, কী হয়েছে বাবা? আজ এত কথা বলছিস যে!

নীলয় হেসে বলল, এমনিই মা। তোমার কথা শুনতে ইচ্ছে করল।

ফোনের ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মা বললেন, ‘আচ্ছা, ভালো থাকিস।

কিন্তু নীলয় বুঝতে পারল, ওই দুটি শব্দের ভেতরে কতখানি আনন্দ লুকিয়ে আছে।

পরদিন বিকেলে সে আবার বইয়ের দোকানে গেল।

বৃদ্ধ তখন জানালার পাশে বসে ছিলেন। নীলয় তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

চাচা, আজ আকাশটা খুব সুন্দর।

বৃদ্ধ মুখ তুলে তাকালেন। বাইরে নীল আকাশে কয়েকটি সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে।

তিনি হেসে বললেন, ‘তাহলে আজ তুমিও একটা চিঠি লিখে ফেলো।’

নীলয় একটি সাদা কাগজ নিয়ে বসল।

অনেকক্ষণ কলম হাতে নিয়ে থাকার পর সে লিখল—

মা

তোমাকে কখনো বলা হয়নি, তোমার ছোট ছোট কথাগুলো আমার কাছে কত মূল্যবান। তুমি যখন জানতে চাও আমি খেয়েছি কি না, তখন বুঝতে পারি, পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ আছে, যে আমার ভালো থাকার খবরটুকু জানতে চায়।

আমি হয়তো সব সময় তোমার কথা শুনি না। হয়তো কখনো বিরক্ত হই। কিন্তু বিশ্বাস করো

তোমার প্রতিদিনের সেই সাধারণ কথাগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ আশ্রয়।

তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

—তোমার ছেলে।

চিঠিটি ভাঁজ করে সে একটি খামে রাখল।

বৃদ্ধ চুপচাপ তাকিয়ে ছিলেন।

তারপর বললেন, ‘জানো নীলয়, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চিঠিগুলো লেখা হয় খুব সাধারণ মানুষদের জন্য। কারণ তাদের ভালোবাসা কখনো বড় বড় শব্দের অপেক্ষা করে না।

বাইরে তখন বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে।

দোকানের ছোট্ট ঘণ্টাটি বাতাসে দুলে উঠল।

আর নীল খামের ভেতরে এবার সত্যিই একটি আকাশ জমা হলো—যে আকাশের নাম ভালোবাসা, যার রং কৃতজ্ঞতা, আর যার বিস্তৃতি মানুষের সমস্ত অব্যক্ত কথার চেয়েও বড়।

কারণ, জীবনে কিছু মানুষ আমাদের কাছে আকাশের মতো। আমরা প্রতিদিন তাদের দেখি, অথচ কখনো বুঝতে পারি না—তাদের ছায়াতেই আমাদের পৃথিবী এত সুন্দর

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login