Poetry

নিঃসঙ্গ নায়ক

November 2, 2026

6 views

শহরের শেষ মাথায় তাঁতিপট্টির কোণে
যেখানে শ্রমের ক্লিষ্ট হাতগুলো কুঁড়েঘর বুনে রাখে,
সেখানেই থাকত শফিক,
এক অদ্ভুত কোমল, মায়াবী ও আহ্লাদী তরুণ।
তার মুখের চারপাশে যেন লেগে থাকত ফাগুনের নরম আলো,
অথচ নিয়তির নির্দয় বাতাসে সে
নিজেই ছিল একাকী ও ভাসমান।
মিতার সাথে তার যে নিবিড় মেলবন্ধন,
তাকে আমরা দূর থেকে ভাবতাম,
এ বুঝি পৃথিবীর তাবৎ কোলাহল
পেরিয়ে এক পরম গভীর প্রেম।
সন্ধ্যার ধূসর চাদর নামলেই
তাঁতিপট্টির ভাঙা ডাঙায় নেমে আসত মিতা,
তার পরনে থাকত শাড়ি ফুরিয়ে যাওয়া ঘ্রাণ,
কপালে লেপ্টে থাকা সজল অন্ধকার।

আমাদের চোখে তাদের সেই
নিঃশব্দ মুখোমুখি দাঁড়ানো মানেই ছিল,
প্রেমের এমন এক বন্দর,
যেখানে ঝড়ের কোনো অধিকার নেই।
শফিকের উঠোনে কোনো তারার দীপ জ্বলত না,
জোনাকিদের পিদিম জ্বেলে তারা বুনে চলত
না বলা হাজারও স্বপ্নের মায়াবী কারুকাজ।
শফিক তার শীর্ণ হাত বাড়িয়ে বলত,
মিতু, আজ বড় শীতের রাত,
মিতা তখন নিজের জীর্ণ আঁচলে ঢেকে দিত তার অবুঝ কাঁধ।
আমরা যারা সাক্ষী ছিলাম এই নিভৃত ও করুণ রোমাঞ্চের,
তারা জানতাম না অভাবের তীক্ষ্ণ কাঁটা
কীভাবে তিলে তিলে বিঁধে আছে তাদের গভীরে।
ভাবতাম, এই টিনের চাল আর ভাঙা বেড়ার
পৃথিবী কখনো ফুরোবে না;
শফিকের অসংকোচ হাসি আর মিতার চোখের নদী
আমাদের ভুলিয়ে রাখত সব গ্লানি।
কিন্তু জীবন তো কেবল উপকথার পাতা নয়,
এ এক নির্দয় বাস্তব সমুদ্র।
শীতের প্রথম কুয়াশা নামার আগেই একদিন বাতাসে খবর এল,
অন্য কোনো ঠিকানায়,
নিরাপদ আশ্রয়ে বিক্রি হয়ে গেছে মিতার ভবিষ্যৎ।
যেখানে পেটের টানে ঘাম ঝরাতে হয় না,
যেখানে রোদের উষ্ণতা কেনা যায় টাকায়,
সেই অচেনা শহরের কোনো মধ্যবিত্ত খাঁচায়
তাকে দেওয়া হচ্ছে বন্দি করে।
সেদিন তাঁতিপট্টির সেই ভাঙা গলিতে
শফিক এক ফোঁটা জলও ফেলেনি চোখে,
সে শুধু নির্বাক পাথরের মতো
চেয়েছিল আকাশের বিবর্ণ শূন্যতার দিকে।
বিদায়ের ক্ষণে মিতা যখন
শেষবারের মতো ছুটে এসেছিল ওই অন্ধকার কোণায়,
তার চোখের এক ফোঁটা জল
শফিকের কাঁধে গলে নামল শ্রাবণের মতো।
শফিক তখনো সেই একই আহ্লাদী সুরে
শুধু ফিসফিস করে বলেছিল, ‘ভালো থেকো মিতু,’
আর ঠিক তখনই আমাদের বিশ্বাসের চাদরখানা
টুকরো হয়ে ছিঁড়ে গেল বাতাসে।
আজ শফিক কোথায় আছে, কেউ জানে না;
সে হারিয়ে গেছে শহরের ভিড়ে,
কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে
তার সেই আহ্লাদী মুখ আর নরম দীর্ঘশ্বাস।
আমরা এখন আর কেউ তার খোঁজ রাখি না,
কোনো ব্যস্ত দুপুরের ফাঁকে
কালেভদ্রে কেবল মনে পড়ে,
ওই তাঁতিপট্টিতে আমাদেরই মতো এক তরুণ ছিল,
যাকে আমরা ভালোবেসেছিলাম,
সে এক অদ্ভুত বিরহী উপন্যাসের নিঃসঙ্গ নায়ক।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login