মামা, দু কাপ চা দিও, সাথে দুটো গরম গরম সিঙাড়া।
দিন দিন একেবারে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছি। দুটো গরম গরম চা আর সিঙাড়া খেয়ে চাঙ্গা হয়ে যাই। বেকারের গরম হওয়ার জন্য এর চেয়ে মোক্ষম উপায় আর হয় না, বুঝলে না মামা!
চা মামা আমার কথাগুলো শুনেই মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, বিয়ে করে ফেলুন না, মামা।
— কে আর এই বেকারকে মেয়ে দেবে, মামা?
— দেখুন না, বড়লোকের কোনো রাজকন্যা পেয়ে যাবেন, রাজত্বসহ রাজকন্যা।
বেকারের বন্ধুর তালিকায় বেকারের চেয়ে কর্মজীবীদের সংখ্যা বেশি হয়, যদিও তারা হয় ঠেকায় পড়া বন্ধু। তাদেরও দুটো গল্প হয়, বেকারেরও দুটো উপকার হয়। বিশেষ করে এই শ্রেণির মামারা বড্ড কাজে দেয়। দিন শেষে গল্পে মনোরঞ্জন করে, অন্তত বাকিতে কিছু খাওয়া যায়। আহা, বেঁচে থাকুক এই মামাগুলো। এদের সাথে বেকারের বন্ধুত্ব আজীবন।
আর কিছুক্ষণ কথা বলে চা-টা শেষ করে সিঙারাটা পেলেই হয়। না, শুধু এসবের জন্যই চা মামার সাথে কথা নয়, আরও অনেক কারণ আছে চা মামার সাথে আমার সখ্যতার।
— একটা প্রেমই করতে পারলাম না, আর বিয়ে, মামা!
(মনের অগোচরেই দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়ল।)
— বয়স কত, মামা?
— কত আর হবে, ২৫-২৬?
— ২৫-২৬! (চোখেমুখে এক রাজ্যের বিস্ময়। এর চেয়ে যেন বিস্ময় পৃথিবীতে আর নাই।) বলেন কী, মামা! আর এখনো প্রেম করেন নাই, এ কথা বিশ্বাস হয় না।
— কেন, মামা?
— বছরের হিসেবে দুই ডজন বছর বয়স হলো, আর প্রেম হলো না, তা কেমনে হয়? আপনার এই বয়সে, মামা, এক ডজন প্রেম করেছিলাম। ১৩তম প্রেমে ছাদনাতলায় বসতে হলো, না হলে দুই ডজন পূর্ণ করেই ছাড়তাম।
— তাই নাকি?
— শোনেন, মামা, পৃথিবীতে মানুষ বাঁচেই বা কয় দিন?
— তাই তো ভাবছি, মামা। ২৫ বছর তো চলেই গেল, অথচ একটা প্রেম হলো না।
— মামা, যুবক বয়সে প্রেমের স্বাদ না পেলে বুড়ো বয়সে স্মৃতি হাতড়ানোর কিছুই থাকে না। শুনেছি, মামা, কবিতাও নাকি লিখেন। তা, কী যে লিখেন? কবিতা আসবে বুক থেকে, কলমের মুখ থেকে না।
কথাগুলো শুনে মনটা শরৎকালের মাঠের মতো হাহাকারে ভরে গেল। হাহাকারে ভরা মনটা নিয়ে ভাবছিলাম, চা শেষ হয় না কেন।
চা শেষ করতে না করতেই ঢাকাগামী ট্রেন চলে এলো। ঠেলাঠেলি আর ভিড়ের মাঝে দেখলাম, একটা মেয়ে দৌড়ে ট্রেনে উঠতে চাইছে। কী জানি কী মনে হলো, আমিও চায়ের বিল না দিয়েই মেয়েটাকে অনুসরণ করলাম। আমি আবার একটু কেমন যেন, যে যা বলে, তাই মাথার মধ্যে বাজতে থাকে। সে কাজে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লাগি। এবারেও সে কাজের ভিন্নতা হলো না।
প্রায়ই ট্রেনে ভিড় থাকে, আজ তেমন ভিড় দেখা গেল না। কেন জানি মনে হলো, প্রকৃতির সাপোর্ট আছে। ভাগ্য সহায় থাকলে মেঘ না চাইতেও জল পাওয়া যায়। তার প্রমাণ হাতে-নাতে পেলাম। পেলাম আর কী, মেয়েটার পাশের সিট।
ট্রেনে অনেক দিন যাতায়াত করেছি, কিন্তু কোনো দিন কোনো একটা মেয়ে পাশের সিটে বসেনি। আজ কেমন জানি সব মিলে যাচ্ছে। মামা, কবিতা কাকে বলে তোমাকে দেখিয়ে দেব। সব ফাটিয়ে দেব, মামা।
আমি মেয়েটার দিকে ভদ্রভাবে একটু আড়চোখে তাকিয়ে দেখব, সে উপায় নাই। নাকের ডগা চোখের সবচেয়ে নিকটে হলে কী হবে, দূরের জিনিসের মতো নাকের ডগা পরিষ্কার দেখা যায় না। মেয়েটা যদি একটু দূরে বসত, তাহলে ভালো করে চোখাচোখি হতো, বোঝানো যেত, চোখ যে মনের কথা বলে।
না, এভাবে ভদ্র হয়ে কাজ নেই। মেয়েটার দিকে যতটা স্নিগ্ধ হওয়ার চেষ্টা করে, চোখেমুখে মায়া মায়া ভাবটা এনে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলাম, যাতে মেয়েটা আগ বাড়িয়ে আমার সাথে কথা বলে।
যা ভাবলাম, তাই! (প্রকৃতির সাপোর্ট বলে কথা।)
— ভাইয়া, আপনি যাবেন কোথায়?
পাশে তাকিয়ে ভাব নিয়ে বললাম, যেন বুঝিনি।
— আমাকে বলছেন?
— জি।
— কী যেন বললেন?
— ভাইয়া, আপনি যাবেন কোথায়?
— ও, আমি ঢাকাতে। (বাহ! বেশ বানিয়ে কথা বলতে পারি তো।)
— তুমি, মানে আপনি...
— না ভাইয়া, তুমি করেই বলেন। আমিও তো ঢাকাই যাচ্ছি।
মেয়েরা এত ভাইয়া ভাইয়া করে কেন? ছেলেরা তো এত আপু আপু করে না। যাকগে, এটা মনে হয় মেয়েদের স্বভাব।
মেয়েটা ইতিমধ্যে কিছু কথা বলেছে, আমি খেয়াল করিনি। তারপরে কী যেন বলল, আমি না শুনেই মনে মনে যা বলছিলাম, তাই বলে ফেললাম।
— ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি অনেক সুন্দর।
বলেই লজ্জা পাওয়ার ভান করলাম।
মেয়েটি আমাকে ধন্যবাদ দিল আর বলল, আপনি অবশ্য সুন্দর না।
মেয়েটা তো বেশ চটাং চটাং কথা বলে। আমিও কম না। বললাম, চেহারা সুন্দর না হলে কী হবে, আমি কিন্তু ছেলে হিসেবে মন্দ না। আছে না, অনেকে অনেক সুন্দর, কিন্তু ভেতরটা ততটাই কুৎসিত। আসলে বাইরের সৌন্দর্য কদিন, মনের সৌন্দর্য চিরদিন।
মেয়েটা আমার কথা কোনো গুরুত্ব না দিয়ে কথা বলেই যাচ্ছে। সে সব কথা আমার কানেই যাচ্ছে না, মনে কেবল ওই কথাই বাজছে—আমি দেখতে সুন্দর না।
মেজাজটা বিগড়ে গেল। মেয়েটা বেশি কথা বলে। কথা বলেই যাচ্ছে। না, মেয়েটাকে আর ভালো লাগছে না।
— আচ্ছা, তোমাকে একটা কথা বলব?
— বলুন?
— তুমি না বেশি কথা বলো।
এই কথাটা শুনেই মেয়েটা চুপসে গেল। বাহ, মেয়েটাকে কেমন চুপ করিয়ে দিলাম! উড়তে থাকা বেলুনকে যেন সুচ দিয়ে ফুটিয়ে হাওয়াহীন করে দেওয়া। মনে মনে একটু সুখী হলাম। কিন্তু মেয়েটার চুপসে যাওয়া মুখটা দেখে মায়া হলো। আহা, বেচারা! বলাটা ঠিক হলো না।
আচ্ছা, আমাকে যদি এই কথা বলত, আমার কি ভালো লাগত? ও হ্যাঁ, বলেছে তো, আমি নাকি দেখতে সুন্দর না। আমার কি খারাপ লেগেছে? না, লাগেনি। কারণ, আমি জানি, আমি দেখতে তেমন সুন্দর না। তাকে খুশি করার জন্য বললাম, বেশি কথা বললেও শুনতে কিন্তু বেশ লাগছে।
কিন্তু মেয়েটা আগের মতো আর সাবলীলভাবে কথা বলছে না। কিছুটা গম্ভীর। কী যেন ভাবছে।
মেয়েটা হঠাৎ বলে উঠল—
— ভাইয়া, একটা কথা বলব? কিছু মনে করবেন না তো?
আমি দ্বিগুণ উৎসাহে বললাম—
— বলো, বলো।
— ভাইয়া, এই সিটে একজন আছে। সামনে দুই স্টেশন পর থেকে উঠবে। তখন আপনাকে সিট ছেড়ে দিতে হবে।
— তা ছেড়ে দেব। তবে একটা কথা বলি?
— বলুন।
— (মেয়েদের গম্ভীর মুখ দেখতে ভালো লাগে না। আর মেয়েরা সম্মুখ প্রশংসা পেতে ভালোবাসে। এর ব্যতিক্রমও অবশ্য আছে। তবুও মেয়েটাকে খুশি করার জন্য বললাম), তুমি না দেখতে সত্যি অনেক সুন্দর।
মেয়েটা এরপরও মুখটা ভারী করে বসে আছে। আমি কথা কীভাবে এগিয়ে নেব, বুঝতে পারছি না। কেন যে ওই কথাটা বলতে গেলাম!
নিজেই আগ বাড়িয়ে বললাম—
— একটা কথা, সুন্দর বলার পরেও তুমি লজ্জা পেলে না কেন?
— ছোটকাল থেকেই শুনে আসছি তো, তাই আর কিছু মনে হয় না।
মনে মনেই ভাবলাম, মেয়েরা অনেক ভাগ্যবতী। কত সহজেই ছেলেদের প্রশংসাবাক্য পেয়ে যায়। অথচ ছেলেদের মেয়েদের প্রশংসা পেতে রীতিমতো তপস্যা করতে হয়।
মেয়েটা বলল—
— কী এত ভাবছেন, বলুন তো?
— তোমার সাথে এইভাবে যেচে কথা বলছি, কিছু মনে করোনি তো?
— আরে না।
মেয়েটা জবাবে বলল।
— আমি ট্রেনে করে ঢাকা যাচ্ছি না, কিন্তু।
মেয়েটা বলল—
— কিছুক্ষণ আগে যে বললেন?
— আমি আসলে তোমাকে দেখে ট্রেনে উঠেছি।
— আমাকে দেখে মানে কী?
আমি ওকে সব খুলে বললাম।
মেয়েটা মিটমিট করে হাসছে।
— হাসছ যে?
— না, এমনি।
— হাসির তো একটা কারণ আছেই।
— আপনি না একটা পাগল!
শুনে খুব ভালো লাগল, একটা মেয়ে আমাকে ভালোবেসে পাগল বলছে! আচ্ছা, ভালোবেসে বলছে, না আমাকে নিয়ে মশকরা করল? তা করুক, তাতে যদি খুশি খুশি মুখখানা দেখা যায়।
তাহলে কি এভাবেই প্রেম হয়?
অনেক বন্ধুকেই তো বলতে শুনেছি, আবার গল্পেও পড়েছি, বাস বা ট্রেনে যাওয়ার সময় একটা মেয়ের সাথে পরিচয়, তারপর প্রেম।
আমি আবার ওর দিকে তাকিয়ে আছি, ওকে প্রাণভরে দেখছি। আচ্ছা, সত্যি আমাকে ও পাগল মনে করছে না তো? মনে মনে ভাবছি, প্রেমটা তাহলে হয়ে যাবে। আর কী বলে ওকে খুশি করা যায়?
ট্রেন নিজস্ব গতিতে চলছে, আর আমিও নিজস্ব গতিতে ভাবছি।
হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়ল। ট্রেনেরও গতির ছেদ পড়ল। ট্রেন একটা স্টেশনে থামল। ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।
কিছুক্ষণ পর একজন সুদর্শন পুরুষ আমাদের সিটের সামনে এলো। আমি সেভাবে খেয়াল না করে বলেই চললাম—
— এতক্ষণ কথা বলছি, তোমার নামটা জানা হলো না।
মেয়েটা জবাবে বলল—
— তিথি।
আর সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল—
— ইনি আমার হাজব্যান্ড, তন্ময়। প্লিজ, সিটটা যে এবার ছাড়তে হয়।
আমি স্বভাবতই মুখ দিয়ে 'ওকে, শিওর' বলে পাশেই দাঁড়িয়ে রইলাম আর নেক্সট স্টেশনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।
কিন্তু নেক্সট স্টেশন যেন আসতেই চায় না। যাক, অবশেষে স্টেশন এলো। ততক্ষণে শুনছিলাম, মেয়েটা তার হাজব্যান্ডকে বলছে, কিছু পুরুষ আছে, মেয়ে মানুষ একা পেলেই হয়। গায়ে পড়ে কথা বলতে আসে। ডিজগাস্টিং!
স্টেশনে নেমেই আরেক কাপ চা মেরে দেওয়ার জন্য দোকানদারকে বললাম।......... চা হাতে পেয়ে যখন চুমুক দিতে গেলাম, চা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
চা মামাকে ঝাড়ি দিলাম—
— কী চা দিয়েছ? ঠান্ডা চা?
দোকানদার বলল—
— চা তো কখন দিয়েছি! না খেলে তো ঠান্ডা হবেই। আপনি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ভাবনার সাগরে ডুব দিয়েছিলেন।
আরে হ্যাঁ, তাই তো! কী ভাবছিলাম?
হয়তো ভাবছিলাম, বুড়ো বয়সে স্মৃতি হাতড়ানোর মতো কিছু পেলাম কি না।