শহরের কোলাহল যেখানে এসে কিছুটা হাঁপিয়ে পড়ে, সেই গলির মোড়ে পুরোনো একতলা বাড়িটার নাম ‘নীলকণ্ঠ’। বাড়ির সামনে একটা প্রাচীন শিউলি গাছ, যার পাতাগুলো শীতে ঝরে গিয়ে এখন বসন্তের নতুন সবুজ ছোঁয়ায় আবার জেগে উঠছে। এই বাড়ির দোতলার একটা ছোট্ট ঘরে থাকেন অবিনাশবাবু। ঘরজুড়ে আসবাব বলতে একটা সেগুন কাঠের পুরোনো টেবিল, গুটিকয়েক বুকশেলফ আর একটা জানালার ধারের আরামকেদারা। টেবিলের ওপর থরে থরে সাজানো ডায়েরি, কালির দোয়াত আর একগোছা ফাউন্টেন পেন। ডিজিটালের এই যুগেও অবিনাশবাবু কাগজের গন্ধ আর কালির আঁচড় ছাড়া বাঁচতে পারেন না।
বিকেলের রোদের আলোটা যখন জানালার কাচ গলে তাঁর টেবিলের ওপর এসে পড়ে, অবিনাশবাবু তখন তাঁর চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে এনে একটা পুরোনো ডায়েরির পাতা ওল্টান। এই ডায়েরিটা সাধারণ কোনো খাতা নয়; এটি তাঁর জীবনের গত চল্লিশ বছরের নীরব সাক্ষী। প্রতিদিন এই সময়ে তিনি বর্তমানের জগৎ থেকে হারিয়ে যান এক চেনা অতীতে। তাঁর মনটা তখন এক দক্ষ ডুবুরির মতো স্মৃতির অতল সাগরে ডুব দেয়, যেখান থেকে প্রতিবারই তিনি তুলে আনেন কোনো না কোনো হারিয়ে যাওয়া মুক্তো।
আজকের বাতাসটায় কেমন যেন একটা উদাসীনতা আছে। ঠিক যেমনটা ছিল আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগের এক বসন্তের বিকেলে। অবিনাশবাবু চোখ দুটো বন্ধ করলেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পুরোনো লাইব্রেরি ঘরটা। চারিদিকে বইয়ের চেনা গন্ধ, আর জানালার বাইরে কৃষ্ণচূড়া গাছের লাল ফুলের মেলা। সেই ভিড়ের মাঝে টেবিলের ওপারে বসা একজোড়া চঞ্চল চোখ আর এক মাথা খোলা চুল—অনিন্দিতা।
অনিন্দিতা ছিল ঠিক ঝড়ের মতো, যে এলে চারপাশের সবকিছু ওলটপালট হয়ে যেত। আর অবিনাশবাবু ছিলেন শান্ত, কিছুটা অন্তর্মুখী। দুজনে মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন জীবনানন্দ দাশের কবিতার অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজতে গিয়ে, কিংবা কলেজ স্ট্রিটের কোনো এক সস্তা কেবিনে বসে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে দেশের রাজনীতি নিয়ে তর্ক করতে। মাঝরাস্তায় হঠাৎ কালবৈশাখী নামলে যখন সবাই আশ্রয়ের খোঁজে ছুটত, তখন অনিন্দিতা অবিনাশবাবুর হাত ধরে বৃষ্টির মাঝেই দাঁড়িয়ে পড়ত। সেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যখন অনিন্দিতার মুখে এসে পড়ত, অবিনাশবাবুর মনে হতো পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য যেন ওই একটা মুহূর্তেই এসে থমকে গেছে।
সময় নদীটার একটা নিষ্ঠুর নিয়ম আছে। সে কাউকে কারোর জন্য অপেক্ষা করতে দেয় না। সেদিনের সেই স্বপ্নালু তরুণ-তরুণী আজ জীবনের দুটি ভিন্ন প্রান্তে দাঁড়িয়ে। অনিন্দিতা আজ সুদূর প্রবাসে, নিজের পরিবার, সন্তান আর যান্ত্রিক ব্যস্ততার ঘেরাটোপে বন্দি। হয়তো তাঁর আর মনেও পড়ে না সেই কলেজ স্ট্রিটের বৃষ্টিভেজা দিনগুলোর কথা। আর অবিনাশবাবু? তিনি রয়ে গেছেন এই পুরোনো শহরেই, সময়ের সাথে সাথে তাঁর চুলে রূপোলি রেখা দেখা দিয়েছে, কপালে পড়েছে ক্লান্তির ভাঁজ।
কিন্তু মানুষের মন তো আর ঘড়ির কাঁটা মেনে চলে না। অবিনাশবাবু জানেন, এই যে ডায়েরির পাতায় বন্দি থাকা দিনগুলো, এগুলো কোনো বিষাদের দলিল নয়। বরং জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে, যখন চারপাশে একাকীত্বের অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, তখন এই স্মৃতিগুলোই মনের কোণে প্রদীপ জ্বেলে দেয়। এগুলো হলো বুকপকেটে লুকিয়ে রাখা কিছু সোনালী কয়েন, যা কখনো ফুরিয়ে যায় না, আর যা মানুষকে চরম দারিদ্রেও এক অদ্ভুত মানসিক ঐশ্বর্য এনে দেয়।
বাইরে তখন সন্ধ্যার আজান আর শাঁখের আওয়াজ একসাথে মিলেমিশে এক শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে। অবিনাশবাবু চোখ খুললেন। ডায়েরিটা আলতো করে বন্ধ করে টেবিলের ওপর রাখলেন। জানালার বাইরে তাকিয়ে একটা মৃদু হাসলেন তিনি। অনিন্দিতা যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক। জীবনের গল্পটা হয়তো মাঝপথেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেই গল্পের রেশটুকু যে আজও তাঁর বেঁচে থাকার পরম রস।